ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিস্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ :: বার্টল ব্রেখট

স্বাগত


Click here for Myspace Layouts

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

অন্যদের পড়তে বলুন


ফেলানি 

                 ণি স্নান করে এসছে। সে আজকাল খুব সকাল সকাল স্কুলে যায়। দশম মানে উঠেছে থেকেই সকালে স্কুলে কোচিং ক্লাস করে। আগামীবার মেট্রিক দেবে। কী করে যে সময়গুলো পেরিয়ে গেল। মণি স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়বে।  হবে, তার মণি বড় মানুষ হবে। স্নানে যাবার আগেই বেগুন দুটো গাছ থেকে ছিঁড়ে চুলোর কাছে রেখে গেছিল। গাছটা  ঘরের ভিটেতে এনে লাগিয়েছিল সেই। কোত্থেকে যে গুটি বিচি এনেছিল সেই জানে। সে মাটিতে গুজে দিলেই গাছ হয়, ফল ধরে। সাদা সাদা বেগুনগুলো ভাতে দিয়ে তেলনুনে ভর্তা করে খেতে সে ভীষণ ভালোবাসে। একদিন মণিরও একটা ঘর হবে। চারদিকে গুজে দিলেই ফল হয় যে হাতে সেই হাতের লাগানো গাছপালার ছায়া আর সে –মণির মা। সে গাছের তলাতে বসে নাদুসনুদুস ছেলে কোলে রূপকথার গল্প বলে যাবে। পাখির গল্প, বেড়ালের গল্প, রাজা-রানির গল্প। ভাতে দেবার জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে বেগুনগুলো ধুতে যাবে ডাঁটার চোখা কাঁটাতে বুড়ো আঙুল বিঁধে গেল। কাঁটাও যে সে নয়, একেবারে বরই গাছের কাঁটার মতো। ওর আঙুল থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ে মেখেলার চাদরে লাল দাগ ফেলে  দিল।  মুখে চোষে সে রক্ত বন্ধ করল। মণি আসতে আসতে তার ভাতও হলো, বেগুন ভর্তাও হয়ে গেল।
         মণি যাবার পর ও মুড়ি ভাজতে বসল। কাল বাজার বার। মোড়ার কাজ করতে করতেই সময় চলে গেল। আজকের দিনটা বসতে পারলেই হয়ে যাবে। মণি রান্না করা ভাত দু’মুঠো খেয়ে গেছে। সে এলে আবার দু’মুঠো বসিয়ে দেবে। মাগুরি  ধানের মুড়িগুলো ফুলে ফুলে উঠছে।
    “বৌদি, ও বৌদি!” বুলেনের ডাক। কি যে অসময়ে এসছে মানুষটা। মুড়িগুলো ফেলে এখন যায় কী করে?
    “ আয় ভাই, এখানে আয়। সে যে পিড়িতে বসেছিল সেটি বুলেনকে এগিয়ে দিয়ে চাদরের আঁচলে মুখখানা মুছে নিল। খবরের কাগজে পেচিয়ে কিছু একটা এনেছে বুলেন। সে এলে খালি হাতে আসে না, মণির জন্যে কিছু না কিছু আনবেই। কথাবার্তা বলে, চা পান খেয়ে যাবার বেলা চুপটি করে তোড়াটা রেখে যায়, “এগুলো মণির জন্যে  এনেছিলাম গো।” কলাপাতাতে মোড়ে লাই একমুঠো, লাউ এক টুকরো, কলা চারটা, ছোট মাছ কটা।
     কিন্তু আজ সে এসেই কাগজের তোড়াটা খুলল। একটা সবুজ দখনা, পাড়ের কাছে ছোট ছোট হলদে লতা আঁকা। বুলেনের গলার স্বরে ফণিমনসার হুল, “ বেঁচে থাকবার ইচ্ছে আছে যদি এটা পরবি।”
    “কী এটা?”
    “ দেখিস না?” সে কাপড়টা মেলে ধরল।
    “এগুলো রঙিন কাপড়। তুই কেন ভুলে গেলি ভাই? মণির বাবা...।”
    “বডোদের মধ্যে এসব নিয়ম নেই।”
    “ এসব কাপড় আমি কোনোদিন পরিনি...।”
    “ না পরলে নেই, আমি ভালোর জন্যে বলছি, এই বলে রাখলাম।”
    “তোর হয়েছে কী, বল দেখি?” ওর স্বরটা কান্নার মতো শোনাচ্ছিল।
    “কী হয়েছে আমার ঘরে দেখগে গিয়ে।”
    “সুমলার কিছু হয়েছে। বেশি ঘোর উঠেছে কি?”
    বুলেন হনহন করে বেরিয়ে গেল। কী করে না করে ভাবতে বাহতে সেও মুড়ির চুলো সামলে সুমলে বুলেনের পিছু নিল। কীই বা হলো মেয়েটির! ঘোরের বশে ছেলেটাকেই কিছু করে বসেনিতো? বুলেন ফিরে তাকিয়ে তাকে দেখে দাঁড়ালো।
    “বৌদি তুইই বল, আমাদের এমন অত্যাচার করলে আমরা আলাদা রাজ্য দাবি না করে কী করব? আমি ভাঙুয়ার ছেলের পার্টিতে নাম লিখিয়েছি।”
    “এই পার্টি কী করবে?”
     “আমাদের জন্যে রাজ্য আনবে।”
    “ এই রাজ্যে তোরা একা থাকবি না অন্যদেরও থাকতে দিবি?”
    “কাউকে তাড়াবো না, মিলে মিশে থাকতে হবে। আমাদের রাজ্যে আমাদের কথা শুনে থাকতে হবে।”
    “ একদলতো নিজে একা খাবে বলে রাজা হলো, তোরাই বা একা খাবি বলে কী করিস!” মণির মা হাসল।
    “বৌদি এগুলো হাসি ঠাট্টার কথা নয়। অনেক সয়েছি, আর নয়।” বুলেনের রাগত মুখখানা দেখে সে চুপ করে গেল। বুলেনের বাড়ির উঠোনে বসে আছে সুমলা। ওর গায়ে রশি দিয়ে বেঁধে পরানো লাল দখনা ও শরীর থেকে টেনেটুনে খসিয়ে বসে আছে। সুমলাতো ঠিকই আছে। তবে আবার কার কী হলো? ছেলেটাও স্কুলে গেছে। সে প্রশ্নবোধক চিহ্নটা চোখে নিয়ে বুলেনের দিকে তাকালো। বুলেন ফণিমনসার নিচে বসে মাটিতে কিলোচ্ছে। অদ্ভূৎ এক রাগে মানুষটাকে কালো দেখাচ্ছে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার আর সাহস হলো না মালতির। সে বারান্দাতে বসবে বলে ভেতরে যাচ্ছিল কি একটা গোঙানোর শব্দ কানে এলো। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে তের চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ে গায়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে শুয়ে আছে। পাশে বুকে মেখলা পরে মাঝ বয়েসী এক মহিলা মেয়েটির মাথাতে বাতাস করছেন।
    “কী হয়েছে ওর?”    মহিলা কিছু বললেন না।
    “কোনো অসুখ করেছে? মেলেরিয়া?”
    বুলেন ভেতরে এলো, রাগে মানুষটা কাঁপছে। ওর রাগটুকু যেন একটুকরো বিধ্বংসী আগুন। চোখের পলকে এই চাল থেকে শুকিয়ে ঠনঠনে অন্য চালে ঝাপিয়ে পড়ছে যেন। মহিলাটির মুখও রাগে লাল হয়ে পড়েছে, “ দেখ, তোদের সরকারে আমার এই কচি মেয়েটাকে কেমন কাক-শকুনের মতো খেয়েছে।” মহিলা মেয়েটির অচেতনপ্রায় শরীর থেকে কাপড়টা সরিয়ে দিলেন। মালতি চেঁচিয়ে উঠল প্রায়। বুকের মাংস খুবলে তুলেছে। পুরো শরীরে দাঁতের দাগ। যৌনাঙ্গে একটা কাপড় গুজে দেয়া রয়েছে।
    “পুলিশ, আমদের সরকারের পুলিশ? আমদের সরকার...” মালতি মহিলাটিকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সরকারের সঙ্গে ওর সম্পর্ক কী? ওর সরকার বলে কেন বলছে মহিলাটি? মহিলা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বুলেনও এলো। সে বেড়ার থেকে একটা দা বের করে মাটিতে কোপাচ্ছে।
    “দেখলি বৌদি, আমার এই পৃথিবীতে আপন বলতে ছিলেন  এই পিসিই। ভাতিজি বলেছিল এখানে থেকেই কলেজে পড়বে, ওর পড়ার বড়ো ইচ্ছে ছিল।”
    “পুলিশ কেন?”
    “ গাঁয়ের আরো অন্য অনেকের সঙ্গে সেও মিছিলে গেছিল।”
    “কিসের মিছিল?”
    “আন্দোলনের সময় যে রকম তোদের লোকেরা গেছিল। পুলিশ আমাদের মেয়েদের ছিঁড়ে কুরে খেল।  বল বৌদি,তুইই বল এই সরকারের শাসন না থাকত যদি কোন কুকুরের এতো সাহস হতো?” এতো জোরে দা’টা মাটিতে কোপালো যে মাটিতেই বসে গেল সেটি।
    “মিছিল করতে হলো কেন?”
    “নিজের রাজ্যের জন্যে। এই কুকুরদের সঙ্গে আমরা আর থাকব না। দেখবি, তুই চেয়ে থাকবি আমরা নিজেদের রাজ্য আদায় করেই ছাড়ব। একজনকে আধমরা করলি, আরো কত আছে আমাদের দেখতে থাক। হরি ভাঙুয়ার ছেলে পাহাড়ে গেছে, সে বোমা বানানো শিখে আসবে। ওরা ঘুরে এলেই দেখবি, সব ছারখার হবে।”
    “ওহ!” খুব ছোট্ট করে শব্দটা উচ্চারণ করল সে।
    “বৌদি দেখ, তোর গায়ে বডো রক্ত আছে বলেই এগুলো বলছি। তোকে আবারো বলি, নিজের পোষাক পরবি। কিছু হবে না। নাহলে দেখবি আগুনে ছাই হয়ে যাবি।”
    সুমলা ইতিমধ্যে টেনে টেনে দখনাটা খুলে ফেলেছে। ওদের দিকে সে এগিয়ে আসছে।
    “ভাই, তুই শরণীয়া  , সুমলা কোচ, তোরা এই আলাদা রাজ্য দাবির পার্টিতে কেন ঢুকলি?”
    “আমার ভাতিজিটা কী ছিল? ও আমাদের রক্তের নয়? সে কী করেছিল? বন্ধুদের সঙ্গে কী হচ্ছে দেখতে গেছিল। আর আমি সুমলাকে বিয়ে করেছি, ওর পেটে আমার ছেলে দিয়েছি।”
    সুমলা দখনাটা লম্বা করে মেলে মাটিতে ছ্যাঁচড়াচ্ছিল , একটা গিঁটে এক টুকরো লেগে ছিল মাত্র। ও এখন ভাত খাবে। ভাত না দিলে খানিক পরেই মানুষটির ঘোর চড়বে।
    “ আমি যাচ্ছি হে, মুড়ির বালি ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আজ মুড়িগুলো না ভাজতে পারলে পেটে গামছা। ” সে একটু হেসে বলল, “বুঝলি ভাই, আমি তোদের সব কথা বুঝি না। কিন্তু একটা কথা বুঝেছি , পেটের ভাতমুঠো জোগাড় করা বড় কঠিন কাজ। যে কাজই করিস করবি, কিন্তু আমাদের ভাতমুঠো জোগাড় করবার রাস্তাটা বন্ধ করবি না।”
    যাবার জন্যে গেট অব্দি যেতেই সে দেখে কলাপাতাট মোড়া তোড়া একটা ওর হাতে দিচ্ছে বুলেন, “ সৌলফা একমুঠো আছে, মণিকে রেঁধে দিবি।” সৌলফাগুলো মুঠোতে ধরে সে বুলেনের দিকে তাকালো, “ভাই, ঘর একটা উচ্ছন্নে যেতে একরাতও লাগে না, পাততে...।” কেন জানি ওর চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে এলো। সে  দ্রুত পথ ধরল।
    বস্তির মানুষগুলো দেখি দৌড়াদৌড়ি করে বিশেষ একটা গলির দিকে এগুচ্ছে। কীই বা হলো? লোকগুলো যে চেঁচামেচি করছে , তাও নয়। মুখ গোমড়া করে আছে। ভয় না পেলে হোক না হোক একটা কিছু নিয়ে  কাজিয়া ঝগড়া করবে, হাসি তামাসা করবে, এভাবে থাকে না মানুষগুলো। কীই বা হলো, কোথায় বা কী হলো?
                  ঐ যে লাতুর মা। একই চেহারা , জল তেল নাপড়া চুল, অপরিপাটি কাপড়, নোংরা হাত পা। আজ লাতুর মাও চুপচাপ হাঁটছে। সে হাজিরা কাজ করে। কাজ মানে কাপড় ধোয়া, উঠোন লেপা, বাসন মাজা। ওর নোংরা চেহারা দেখে কেউ ওকে কাজে লাগায় না। আবার মানুষটাই নোংরা, ওর ধোয়া কাপড়, মাজা বাসন দেখলে আবার ডাকেও কাজে। উৎসবে অনুষ্ঠানেও ওকে ডাকবার লোক রয়েছে। দাদা বৌদির সংসারের এক কোনে পড়ে থাকে। স্বামী ছিল। বিয়ের পাঁচ মাসের মাথাতে ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দাদার সঙ্গে এক সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ করত।বোধহয় বিহারি লোক ছিল। লাতুর মা নিজে রেঁধে বেড়ে খায়।  ওর একটাই কথা, ওর ভাই বৌ ওর এই অবস্থা করেছে। ওর স্বামী ভালো মানুষ ছিল। বারে বারে সে বলতেই থাকে, তার কিনে দেয়া শাড়ির কথা, দুটো বালার কথা, সে দেখানো সিনেমার কথা, তার  দেয়া খাটি সোনার আঙটিটা, সে যে জমিটা কিনবে বলেছিল তার কথা, যে ঘর তুলবে বলেছিল তার কথা। একমাত্র বৌদিটাই  কান মন্ত্র দিয়ে দিয়ে ওর মন ভেঙ্গে ফেলেছিল। ওর ছেলে মামা-মামীদের ওখানে থাকে, সেখানেও খায় দায়। মামীর ছেলেমেয়ে নেই। মামার সঙ্গে যোগালির কাজ করে।  পুরো দিন রান্দা মেরে , কাঠ কেটে এসে সে মায়ের বক-বকুনির থেকে মামীর হাসতে হাসতে এগিয়ে দেয়া জল এক গ্লাস খেতে ঢের বেশি ভালোবাসে।  মায়ের চালা ঘরে কম তেলে, জল ছিটিয়ে ভাজা আলুভাজা, রেশন চালের ভাতের থেকে মামীর হাতের মাছের ঝোলের ভাত খেতে সে বেশি ভালোবাসে। মামার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে গৃহস্থ যদি এভাবে কর, ওভাবে কর বলে বোঝাতে শুরু করে মুখের উপর ফোঁস করে বলে দেয়, “এতো মাথা খেয়ে কাজ করতে পারব না কিন্তু।” নইলে এমনিতে সে বেশি কথা বলেই না। মামা যদি দিন দুইর জন্যে ঠিকাদারের সঙ্গে দূরে কোথাও কাজ করতে যায়, মামী তবে, “আমার ভয় করে, আমার সঙ্গে শুবি আয়। ” বলে নিয়ে চলে যায়।মায়ের চালা ঘর থেকে মামীর সঙ্গে ফেনের নিচে ঘুমোতে ও বেশি ভালোবাসে। ভালো লাগার অনুভূতি, ভরপেট ভাত এবং গোটা দিনের পরিশ্রম। লাতু নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ে। কখনো বা মামী দাঁত খটমট করে বলে উঠে, “এই পাগলিটার জন্যে একটু শোবারও উপায় নেই!” সে জেগে ওঠে। ওদিকে চালাঘরে মা বকতে থাকে, “রাক্ষসী, সব খেলো সে আমার। আমার ছেলেকে যাদু করেছে, আমার স্বামীটাকেও তাড়িয়েছে।” লাতুর মা কখনো বা কেঁদে ফেলে, “আমাকে এই রাক্ষসী শেষ করেছে।”  মামী লাতুর গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, “শুয়ে থাক। পাগলী মানুষ। সকালে আবার কাজে যেতে হবে।” ভালো লাগার অনুভূতির মধ্যে মাঝে মাঝে এই এক মেয়ে মানুষের কান্না।  লাতুর ভালো লাগে না, রাগ উঠে। ‘এটো মাথা খেতে পারব না’ , বলে যে নাক ডাকতে শুরু করে।
 
    আজ সেই লাতুর মাও বকা বকি করছে না, মাথা নিচু করে হাঁটছে। কিসে বা ওর মুখখানা বন্ধ করেছে?  আশ্চর্য হলো , ওর পাশে পাশে মামীও। সাপে নেউলে একসঙ্গে! ঐ যে লাতু আর ওর মামা, সঙ্গে ওদের মিত্রির পার্টিও। জগুও এসছে। নবীনও। রত্নার বাবা, এমন কি ড্রাইভারও পা চালিয়ে বিশেষ একটা গলির দিকেই এগুচ্ছে। কিছু একটা হলে ছেলে মেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ড্রাইভার ড্রাইভারনীর কাজিয়া, জগুকে মিনতির মারা চড়টা, হরি ভাঙুয়ার জমি বিক্রি করে পাওয়া টাকাতে  লাউপানি* দিয়ে শুয়রের মাংস খাবার আসরে বাপে ছেলেতে হুড়োগুড়ি—এসব ঘটনাই এই মানুষগুলোকে জড়ো করবার পক্ষে যথেষ্ট। কালীবুড়ির জটা উঠে ঘোর লাগা,  হাঁপানির শ্বাস টেনে টেনে নীল কাঠের মতো স্বামীকে তেল মালিশ করে জোনের মায়ের হায় হায় করে কান্না , নবীনের একটা ছোট টিভি নিয়ে আসা—এরকম ঘটনা ঘটলেতো কথাই নেই। কলবল করতে করতে মানুষগুলো ঠিক জায়গাতে এসে জড়ো হবেই। তৎক্ষণাত কারণটা জানাজানি হয়ে যায়।
    “কালীবুড়ির ঘোর লেগেছে, আজ জটা হাঁটু অব্দি এসে পৌঁছেছে।”
    “নবীন টিভি এনেছে। আনবেই, বই বিক্রি করে কম টাকা কি পায়?”
    “ করুণার বাবা মারা গেল। বৌটা কী করে? এতো জোয়ান বৌ।”
    “ লাতুর মা ভাইবৌকে ঘা দুয়েক মেরেছে।  না না, ভাই বৌটাই ননদিকে চেরা কাঠ দিয়ে মেরেছে... পাগলি মানুষ... না হে পাগলি... লাতুর মাই মেরেছে।”
    কারণগুলোর নিজের নিজের ব্যাখ্যাও আরম্ভ হয়ে যায়।
    আজ উল্টো হচ্ছে। লোকগুলো কেমন যেন গুমড়ো হয়ে গেছে। কেউ মুখ খুলতে চাইছে না। কিসের এতো ভয় পেয়েছে লোকগুলো? বুড়ো দর্জি আর ফুলের বাড়ির কাছাকাছি এসে লোকগুলো দাঁড়িয়ে পড়ছে। সেখানে জোনের মা আর মিনতি আগে থেকেই রয়েছে। মিনতির কাছে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? মিনতি মানুষের ফাঁকে ফাঁকে ওকে নিয়ে এগিয়ে গেল।
               বুড়ো দর্জি আর ফুল ওদের ওদের উঠোনের সামনে রাস্তাতে কানে ধরে, হাঁটু মোড়ে বসে আছে।  উঠোনে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে ফুলের মদ বানাবার জিনিসপত্তর। বুড়ো দর্জি যেন আরো বাঁকা হয়ে গেছে। মাথাটা মাটি ছোঁয় ছোঁয়।  চোখা রোদে মানুষটা একটা ছিঁরে ফেলা আমরুতের ডগার মতো নেতিয়ে আছে। এমনিতেই বেমারী মানুষ। ফুলের চোখে জল আর ক্রোধ। সে কানে ধরে ধরেই স্বামীর দিকে তাকাচ্ছে। বুড়ো দর্জির মাথাট ঘুরছে যেন, চার দিকে ধোঁয়া ধোঁয়া দেখছে। লোকে থ হয়ে দেখছে। কেউ কিছু বলছে না। হঠাৎ মণির মা এগিয়ে গেল। সে ফুলের মাথাতে হাত দিল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ জোড়াতে জল। এবারে ফুল থাকতে পারল না। হাঁটু মোড়েই মণির মায়ের পা দুটো ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল, “মণির মা, আমি কেন মদ বানাই বল? সে কেন মেশিনে বসতে অক্ষম হয়ে গেল বল। বল , মণির মা এই অসুস্থ মানুষতার কী দোষ? যা করেছি, আমি করেছি। আমাকে শাস্তি দে, এই বেমারি মানুষটাকে কেন? কত যত্ন করে মানূষটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি।”
    বুড়ো দর্জি  বাঁকা হাড়গুলো যতটা পারে তুলে ট্যাঁরা চোখে ফুলের দিকে তাকালো। চাউনিটা ট্যাঁরা মনে হয় বটে, আসলে বাঁকা ঘাড়ে ওর তাকাতে অসুবিধে হয়। চোখ জোড়া মরা মাছের মতো ম্লান হয়ে গেছে। ফুল ওর পা ছেড়ে দেয় নি, “ তুই বোঝদার মানুষ, পারলে আমার মানুষটাকে বাঁচা। দেখছিস না ওর মুখখানা। ও মরলে আমি কার সঙ্গে থাকবরে মণির মা!”
    “চুপ থাক, মদ বানাবি আবার এখন কান্না জুড়েছিস!” মটর সাইকেলে করে আসা দুটো ছেলে ফুলকে ধমকে দিল। সবাই দেখল ছেলে দুটোর কোমরে অস্ত্র চিকমিক করছে।
    “শুন, কেউ যদি মদ বেচিস বা বানাস, বা জুয়ার আড্ডা বসাবি তো কী হবে জানিসই।”
একটা ছেলে কোমর থেকে পিস্তল বের করে ব্লেংক ফায়ার করল, মানুষগুলো হুড়মুড় করে সরে গেল। কোনো শব্দ নেই। মাটি ধ্বসে পড়ে যেমন তেমনি ঢেলাগুলো ধ্বসে পড়ল। দাঁড়িয়ে রইল শুধু ফেলানি-মণির মা।  ফুল ওর পা দুটো ছাড়েনি।  ছেলে দুটো মটরসাইকেল থেকে নেমে ওদের দিকে আসছিল। সে আস্তে আস্তে বলল, “ মানুষটা অসুস্থ, তাঁকে ছায়াতে যেতে দেবেন?”
    “মদ বানাবার বেলাট সে অসুস্থ ছিল না।”
    “ মদ আমি বানাই, আমাকে শাস্তি দিন। অসুস্থ মানুষটাকে নয়।”
    “চুপ কর , তুই!”
ফুল চুপ করে গেল। মালতির স্নিগ্ধ মুখে এক ধরণের কঠোরতা জায়গা করে নিল, “ অসুস্থ মানুষটা যদি ছায়াতে গিয়ে হাঁটু গাড়ে কিছু হবে বুঝি!”
    “ উঠ ! ছায়াতে যা। ঐ বেটি, তুইও যা!”
    “ না, আমি যাব না! বেমারী মানুষটাকে যেতে দে!”
    বুড়ো দর্জি উঠতে পারে নি। মালতি গিয়ে দর্জির বাঁকা শরীরটা ধরে ধরে ছায়াতে বসিয়ে দিল গিয়ে।  সে পিস্তল কোমরে ছেলেদের দিকে না তাকিয়েই ফুলের ঘরে ঢুকে এক গ্লাস জল এনে বুড়োকে খেতে দিল। চাদরের আঁচল ভিজিয়ে সে দর্জির মুখ মুছিয়ে দিল।
    ছেলেগুলো যাবার জন্যে বেরিয়েছে। মটর সাইকেলের শব্দ হচ্ছে। আবার বন্ধ হচ্ছে। ছেলেগুলো এবারে ওর দিকে আসছে। ওর মনে হলো শুকনো কলাপাতায় ভরা গর্ত একটাতে ও ঢুকে যাচ্ছে, এখনই আগুন দেবে, গায়ে এসে লাগবে দাউ দাউ আগুনের এক টুকরো। সে যেন মণিকে কাছে টেনে নিয়েছে। “মণি।” অস্ফুটভাবে সত্যিই সে মণির নামটা উচ্চারণ করল।
    “আপনি আমাদের মানুষ হয়ে এই বেজাতগুলোর  হয়ে ওকালতি করতে এসছেন কেন?” ছেলেগুলোর কথাতে সম্ভ্রম থাকলেও স্বরটি বেশ কঠিন।
        “ দেখবেন কিন্তু, এই বেজাতদের সবাইকে এখান থেকে উঠতে হবে, আর কথায় আছে না নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না!” এই ছেলেটার স্বর আগেরটার থেকেও কঠোর।
    “লোকগুলো যাবে কোথায়?” মালতির স্বর কান্নার মতো শোনালো। মটর সাইকেলের শব্দে ওর ক্ষীণ  স্বরও মিলিয়ে গেল। ছেলেগুলোর দিকে সে তাকিয়ে রইল। ওরা কী করতে চাইছে? ওদের স্বাধীন দেশে কে থাকবে? আর বুলেনদের নিজের রাজ্যে? কী কী ভাগ করবে এরা? মাথার উপরের আকাশটা? নদীর জল? এই গাছগুলো? মাটি? না মানুষকে? ও আর কালীবুড়ি? সুমলা আর মিনতি? জোনের মা আর জগুর বৌ? কালীবুড়ি আর ফুল? কী করে ভাগ করবে? কেটে টুকরো টুকরো করে? নদীতে বাঁধ দিয়ে? জমিতে গড়খাই দিয়ে? গাছগুলো মাটিতে গড়িয়ে দিয়ে? এ রাজ্য থেকে ঐ রাজ্যে ওরা কি উড়ে যেতে দেবে ঘরমুখো পাখির দল?  মায়ের সঙ্গে মাছের পোনাগুলোকে কি উজিয়ে আসতে দেবে? ভেসে যেতে দেবে ফুলের সুবাস? এক গাছের ফুলের রেণু আর গাছে নিয়ে যেতে দেবে কি ভোমরাকে?
               সে ঘরে ফিরে এলো। বেলা মাথার উপরে এসে গেছে। সমস্ত কাজগুলো পড়ে আছে। মুড়িগুলো ভাজতে হবে, কাপড় ধুতে হবে, ভাত রাঁধতে হবে। কোনটা রেখে কোনটা করে ? আকাশের কোনে কালো মেঘ জমেছে। বৃষ্টির কথা বলা যাবে না। এখনো আসতে পারে, রাতেও আসতে পারে। কাপড় ক’খানা না শুকোলে দিগদারি আছে। সেই সকালে বেগুন ছিঁড়তে গিয়ে চাদরে দাগ লাগিয়ে দিল। রক্তের দাগ তাড়াতাড়ি না ধুলে যাবে না, শুকোনোতো দূরেই থাক। বাজারে পরে যাবার এই একখানাই আছে। নদীতে যাবার সময় নেই। আর নদীতে চাড়ি ভরে কাপড় নেবার ওর আছেই বা ক’টা?
       সে চাদরটা আর ছোটখাটো কাপড় কতকগুলো নিয়ে কালীবুড়ির কলের পাড়ে গেল। পাথর ফেলে কলের পাড়টা বেশ ভালো করে তুলেছে মণি। মণির কথা ভাবলেই তার গর্ব হয়। পাথরে সে চাদরের দাগ লাগা আঁচলটা মেলে ধরল। বেশ বড় করে লেগেছে দাগটা। সেখানে কাপড় ধোবার সাবান খানিক ঘসে ও বসে রইল। এ ওর রক্তের দাগ। কার কার রক্ত মিশে আছে এই দাগে?
    ওর দিদিমা মৌজাদারের মেয়ে রত্নমালার?
    ওর দাদু হাতির মাহুত কিনারাম বডোর?
    মায়ের রক্তে কার রক্ত বেশি ছিল? রত্নমালা না কিনারামের? না বাবা ক্ষীতিশ ঘোষের রক্তই একটু বেশি আছে ওর রক্তে?
    আর সেই মানুষটা? ওর কোলে বাচ্চা দিল যে! তার রক্ত কি সিঁদূর হয়ে ওর কপালে ভাস্বর হয়ে ছিল না?
    দিদিমা রত্নমালার কর্দৈমণিহারটা।
    দাদু কিনারামের মায়ের বওয়া দখনাটা।
    মায়ের সোনার কাজ করা শাখা ক’গাছা।
    ছেলে হলে মণির বাবার কিনে দেয়া সেই বড় ফুলের ছাপ থাকা মুগার কাপড় জোড়া।
  কী পরবে ও? কী নেবে ও? বেঁচে থাকবার ইচ্ছে হলে শাখাগুলো খুলে রাখতে বলেছিল বৈশ্য। বুলেন বলল, বেঁচে থাকবার ইচ্ছে থাকলে দখনা পরতে। বন্দুকধারী ছেলেগুলো বলল বেজাতের লোকগুলোর সঙ্গে থাকলে বেঁচে থাকতে হবে না। কী করে বেঁচে থাকবে সে?
    মেঘ অনেক উপরে উঠে এসছে। বৃষ্টি রাত অব্দি অপেক্ষা নাও করতে পারে। অল্প পরেই যদি চলে আসে তবে আর মুড়িগুলোও ভাজা হবে না। চালটাতে বেশ ভালো করে একটা ফুটো হয়েছে। অল্প বৃষ্টি দিলেই হুড়হুড় করে জল পড়ে।  আজ মুড়িগুলো ভাজা না হলে কাল আবার বাজার আছে। সে হাত চালিয়ে চাদরে সাবান মাখিয়ে কচলে দিল। রক্তের দাগ উঠে গেল। কাঁচা রক্তের দাগ, বেশিক্ষণ হয় নি , তাই সহজে দাগটা উঠে গেল।
    সে কাপড়ক’টা মেলে মুড়ির খোলাতে গিয়ে বসল।
    বেঁচে থাকবার জন্যে ওকে এখন এই ছেঁড়া শাড়িতেই শরীর ঢেকে আগে মুড়িগুলো ভাজতে হবে। পারলে মোড়াদুটোর কাজও শেষ করতে হবে। মণি আসবে অল্প পরেই, ভাতদুটোও বসাতে হবে। ওর রান্নাঘর থেকে মুড়ি ভাজার গন্ধটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

টীকাঃ
•    লাউপানিঃ ঘরে তৈরি মদ।

ফেলানি

             ণির মা কদিন ধরেই বুলেনের ওখানে একবার গিয়ে আসবার কথা ভাবছিল। হরি ভাঙুয়ার ছেলেটা আজকাল সবসময় ওর ওখানে বসে থাকে। সে জন্যেই বুলেনের ওখানে যেতে ওর ভালো লাগে না। বুলেনের সঙ্গে ওর কীইবা এতো কথা। গেল বাজারটা মার খেলো, মুড়ি যেমন ছিল টিনে তেমনি আছে। আজ বিশেষ কাজ নেই। অনেক পর আজ ও খানিক অবসর সময় পেয়েছে।  মাথাটা আঁচড়ে খালি হাতখানাই মুখের উপর বুলিয়ে ও বেরিয়ে গেল। মণি হবে হয়তো আছে কোথাও। সে আজকাল সময় পেলেই মোড়ের সিং গ্যারেজে গিয়ে বসে থাকে। সে বুঝি কর্তার সিং ছেলেটার থেকে গাড়ি চালানো শিখছে। মাথাতে পাগড়ি পরা ছেলেটা বেশ ক’দিন মণির খোঁজে এসছে।  লম্বাটে গড়নের ছেলেটার হাসিটা ওর বড় ভালো লাগে। এতো অল্প বয়সে এতো বেশি দায়িত্ব সামাল দিতে পারছে, বাপের হাতের বিদ্যা সবটাই শিখেছে। মালতি দেখেনি মণিকে গাড়ি চালাতে, শুনেছে সে চালায় বলে।শুনলে ওর বড় ভয় করে। গাড়ি একটা চালানো কী চাট্টিখানি কথা? রাস্তা ভর্তি গরু-ছাগল, মানুষজন, রিক্সা-ঠেলা, গাড়ির লাইন। এতো সবের ভিড়ে একটু বেটা ছেলে হয়ে উঠেছে বলেই কি মণি গাড়ি চালাতে শুরু করবে? পাগড়ি পরা ছেলেটা বুঝি মণিকে গাড়ির কাজও শেখাচ্ছে।প্রায় রোজই বিকেলে সে জামাতে তেল মবিল লাগিয়ে ঘরে ফেরে। মালতি কিছু বলে না।  শিখুক হাতের কাজ একটা ,  মণি ওর কীইবা আর বাজে কাজে হাত দেয়? সব্বাই বলে মণি হলো এক সোনার টুকরো ছেলে। ছেলের গম্ভীর  মুখখানা মনে পড়াতে মালতির মুখেও রং পালটে গেল,  দেখে মনে হয় যেন এক পশলা বৃষ্টির পর সূর্যকে দেখায় যেমন ঠিক তেমনি। আগামীবার ও মেট্রিক দেবে।  ওকে কলেজে পড়াতে হবে। যা করেই হোক পড়াবে, সে মোড়া বানাবে,মুড়ি ভাজবে, কাঁথা সেলাই করবে। আজকাল ও জানে না কোন কাজটাইবা। দরজাটা বন্ধ করে ও এমনিই মুখে হাতদুটো বুলিয়ে নিল। কী যে ওর অভ্যেস এই একটা।  হাতের খসখসে ছোঁয়া অনুভব করল গালে। যে লোকটা লাজুক হাসি হেসে ‘মনে হয় যেন টগর ফুল!’ বলে   হাতদুখানা ঠোঁটের কাছে নিয়ে ধরে রাখতে ভালোবাসত সে যদি আজ এই পঁচা অশ্বথ পাতার মতো হাত দু’খানা দেখত তবে কী ভাবত?  কাজকম্ম মালতির থাকত না বিশেষ, থাকলেও কাজ সেরে অবসর হাতদুখানা নিজের সেগুন পাতার মতো  ছড়ানো হাত দুটোতে আলতো করে তুলে ধরত মানুষটা, দিত দু’খানা ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়া। ছোঁয়াটা যেন ওর শরীর দিয়ে গড়িয়ে গেল, পুরোটা শরীর নাড়িয়ে দিল। বন্ধ দরজাতেই সে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তরঙ্গের পর তরঙ্গ। দরজাতে হেলান দিয়ে সে কেঁপে উঠল।
     “কী করছ, মামী?” সাইকেল থেকে না নেমেই ও একটা চীৎকার দিয়ে গেল। নবীনের ডাক, ওর হাসি কিছুই চোখে পড়ে নি ফেলানির। পড়ল শুধু সাইকেলের পেডেল মারতে মারতে ওর পেন্টের ভেতর থেকে প্রকট গোপনাঙ্গগুলো। পেডেল মারতে মারতেই সেগুলো   অদৃশ্যও হয়ে গেল। এবারে সে প্রায় দৌড়ে  কালীবুড়ির উঠোনে কালিমূর্তির সামনে গিয়ে লম্বা হয়ে পড়ল। কালীবুড়ি লেপে রেখেছিল সে জায়গাটা, মালতির চোখের জলে ভিজে গেল সে মাটি। ধীরে ধীরে ওর শরীরের তরঙ্গগুলো মুছে গেল। খানিকক্ষণ ও হাঁটু মোড়ে কালীমূর্তির দিকে তাকিয়ে রইল।
     কালীবুড়ি বেরিয়ে এসে প্রথমে ধরতে পারে নি যে এ মণির মা। বুড়ি দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আবছা একটা সাদা কিছু চোখে পড়ল বুড়ির। একটু পরে গলা শুনে ধরতে পারল যে এ মণির মা। বুড়ি কাছে চাপল। কাছে গিয়ে মণির মাকে ওমন দণ্ডবতের ভঙ্গীতে দেখে একটু অবাকই হলো। কোনদিনই ওকে দেবীর সামনে প্রণাম করতে দেখেনি।বুড়ি গিয়ে মণির মাকে আশীর্বাদের ফুল এনে দিল। দেবার সময় হাতখানা কাঁপছিল। বুড়ির যেতুকু উপার্জন হয় তাতেই একজন মানুষের চলে যায়। কিন্তু ও পাইপয়সাটাও জমায়। বছরের কালীপুজোটা গেলবার বুড়ি করতে পারে নি। এবারে করবেই করবে। কতকষ্টে বুড়ি টাকা জমাচ্ছে মণির মা জানে।   জীবনে যা কিছু রোজগার করল সবই কালীমার নামে দিয়ে দিল  ওর মাথাতে নির্মাল্য দিতে গেলে মণির মা বুড়ির হাতখানা কিছু সময় ধরে রইল। এই মহিলাকে কে বাঁচিয়ে রেখেছে? এই মাটির মূর্তি? বুড়ি কি কখনো সাইকেল চালানো জোয়ান ছেলের অণ্ডাশয় দেখেছিল?  বুড়িরতো একটা মণিও ছিল না। সে খানিকক্ষণ  ঘি রঙের কোঁচকানো ছাল একটাতে পেচিয়ে রাখা বুড়ির কতকগুলো হাড় পরম মমতাতে বুকের কাছে ধরে রইল। এই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে এই হাতখানা থেকে শক্তিশালী আর কিছুই নেই। ওর মনটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল।
    
          “মা তোর মঙ্গল করবেন।” কালীবুড়ি হাতটা ওর মাথার উপর রাখল। তারপর গিয়ে যে খাট থেকে নেমে এসছিল, সেটিতে বসল গিয়ে। আজ বুড়ি চিঁড়ার নাড়ু বানিয়েছে। কিছু দিন থেকে সে কাঁথা সেলাই করতে পারছে না, আন্দাজে আন্দাজেও  না। সেই থেকে বুড়ি চঁড়া মুড়ির নাড়ুই বানাচ্ছে। জগুর বৌ আজকাল বেশি কাজ করতে পারে না। ওর বেমারটা বেড়েছে। জগু ওকে আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করে এনেছিল।  সেই তখন থেকেই নারকেলের  কত কত নাড়ু সে বানিয়ে এলো, জগু লাল চায়ের সঙ্গে বাজারে দোকান দিয়ে এসছে। এখন মানুষটা করেই বা কী? ওর বৌএর এখন নারকেল কুরোবার ক্ষমতা নেই। শরীরে দেয় না। কালীবুড়ি এই সুবিধেটা নিয়েছে। জগু নারকেল কিনে খোসা  ছাড়িয়ে , ফাটিয়ে বুড়িকে এনে দিয়ে যায়। বুড়ি নাড়ুগুলো বানিয়ে রাখে। আজকাল মণির মা দেখে আরো বাক হয়। বুড়ি কালীপুজোর জন্যে পয়সা জমাচ্ছে। সেটুকু পয়সা জমেছে তাতে প্রতিমার খরচও হবে না। তার চোখে ভেসে উঠল মাঝে রাতে সেই যে বুড়ি কালী প্রতিমার সামনে পড়ে কাঁদছিল তার ছবি। কঠিন এই মহিলাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে ওরও মন কেমন করে উঠেছিল। পুজো করতে না পেরে বুড়ির যেন মাথারই ঠিক নেই।  বাড়ি ভাড়ার জন্যে যেমন করে তাগদা দেয়, জগু সেদিন পয়সা দিতে একদিন দেরি করেছিল বলে একেবারে খ্যাঁকখ্যাকিয়ে উঠল। কুষ্ঠ আক্রান্তদের মতো অনবরত পয়সা গুনতে থাকে। ফেলানি জানে বুড়ি একবার রেঁধে তিনবারে খায়।  এমনিতেই কম খায়, এখন পাখির মতো খুটোখুটি করে। বুড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সে বেরিয়ে গেল। বুলেন আর সুমলাকে একবার দেখে আসবে। বুলেনের ছেলেটার জন্যে একতা প্যাকেটে মুড়ি কতকগুলো নিয়ে নিল।
     দেখতে দেখতে বস্তিটা ভরে পড়ল। সে যখন এসছিল তখন এতো ঘিজিঘিজি বাড়িঘর ছিল না।  এখনে একটার গায়ে ঘেঁষে অন্যটা গড়ে উঠেছে। কাল রাতে বৃষ্টি দিয়েছিল। সাত সকালেই আকাশ পরিষ্কার করে রোদ উঠেছে। সে আস্তে আস্তে হাঁটছিল। কোথাও একটা কোকিল ডাকছিল। বহুদিন পরে আজ কোকিল ডাকছে। কথাটা মনে পড়তেই ওর হাসি পেয়ে গেল। কোকিলে কেন ডাকবে না? নিশ্চয়ই ডাকে। তারই কি আর সে ডাক শোনার সময় আছে? বিহু এসেই পড়ছে। মণিকে একটা গামছা দিতে হবে। হঠাৎই ওর ইচ্ছে হলো, সব কাজ বাদ দিয়ে ও একটা তাঁতশাল দিয়ে বসবে । বাড়ির সামনাতে আমগাছের ছায়াতে বসে ও গামছা বুনবে। কাকে কাকে দেবে সে গামছা? অবাক কথা। আমাগাছের ছায়াতে  তাঁতশাল আছে যেখানে সেই সবুজ শ্যামল গাঁইয়ের একটা মানুষও ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল না। এমনকি সেগুন পাতের মতো ছড়ানো ছিটোনো হাতের সেই মানুষটা, অল্প আগে যে ফেলানির ফেটে যাওয়া হাতখানা ঠোঁটে নিয়ে বিব্রত করছিল সেই মানুষটাও ওর চোখের সামনে এগিয়ে এলো না। এলো একদল সহায় সম্বলহীন মানুষ, জাতপাতের চিহ্নছাড়া ম্লান একদল মানুষ  এসে হাত পেতে একটা একটা করে গামছা নিয়ে গেল। জোনের মা, মিনতি, কালীবুড়ি, ফুল, জগুই, জগুর অসুস্থ স্ত্রী, বুলেন, সুমলা, নবীন,  রত্নার মা, এমনকি কাঁপা কাঁপা হাতে পায়ে বাঁকা হয়ে ঝুঁকে পড়া সেই বুড়ো দর্জিও এলো।  ওর ইচ্ছে হলো, লেপেপুছে  লাল করে রাখা রান্নাঘরে  সব্বাইকে বসিয়ে ছাই আর তেঁতুলে মেজেঘসে সোনার মতো চকচকে করে তোলা কাঁশার বাটিতে পিঠে নাড়ু খেতে দেয়। কী তৃপ্তি করে সেই দৈ চিঁড়ে খাবে মানুষগুলো। মণি ছোট থাকতে যেমন ভরা দুধে ওর বুকদুটো ব্যাথায় টনটন করত আজও তেমনি টনটন করে উঠল। কোকিলটা তখনও ডাকছে।
              “ কই যাস মণির মা?” জোনের মা ওর সাদা দাঁতগুলো বের করে হাসছে।  স্নান করে আধুলির সমান ফোঁটা পরেছে কপালে, তাতে মেয়ে মানুষটি পাকা জামের মতো চকচক করছে। রোজ যেমন তাকায় আজো মানুষটির দিকে সে মুগ্ধ হয়ে তাকালো। কত সুন্দর শরীর ওর, মুখের গড়নও তেমনি সুডোল। স্বামীর পিঠে কিছু একটা মালিশ করছিল। অনেকদিন হলো লোকটা হাটে হাটে ইঁদুর মারা, আরশোলা মারার ঔষধ বিক্রি ছেড়ে দিয়েছে।  মোড়ের রাস্তার  দোকান থেকে চাল আধাকিলো নিয়ে আসতেও মানুষতির কষ্ট হয়।
           “ আয়।” জোনের মা ডাকল ওকে।
          “ না গো, আজ আসছি না, বুলেনের ওখান থেকে আসি গে।”  সে ফিরে তাকিয়ে দেখল শক্ত সমর্থ স্বাস্থ্যবান যুবতী কেউ যেন শিশু একটাকে তেল মালিশ করছে। একটা গন্ধ এসে নাকে লাগল। জোনের মায়ের উঠোনে এলাচ লেবুর গাছে ফুল ফুটেছে নিশ্চয়। নতুন জল পেয়েছে, এখনতো লেবু, জাম্বুরা এসবে ফুল ফোটার  সময়।
        “ কই যাস মণির মা? দাঁড়াতে  বলছে যে?” গলা শুনে ও ফিরে দাঁড়াল, মিনতি।  মাথাতে এক গামলা কাপড় নিয়ে নদীতে যাচ্ছে। একটু পেহনে পেছনে  ওর ছেলের হাতে সাবান আর বালতি। সুন্দর নাক-মুখের থুলথুলে পরিষ্কার ছেলেটিকে দেখলেই মায়া হয়। মালতি ছেলেটার হাতে একটু মুড়ি দিল। মুড়ি পেয়ে ও হেসে ফেলল। ও তাকে আরো কিছু মুড়ি দিল। ওরা নদীর দিকে এগিয়ে গেল।
     সাইকেলে বোঝাই নারকেল নিয়ে জগু ওর পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেল। সে বোধহয় সেই সকালেই নারকেলের খোঁজে বেরিয়েছিল। অসুস্থ সেই মহিলাটি বা কেমন আছে?  সেদিন মিনতি বলছিল, অসুখটা বুঝি বেড়েছে।    ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল দু’পায়ের মাঝে ঝুলে থাকা এক টুকরো লালচে মাংস, শুকিয়ে ফেটে চৌচির মাঠের মতো এক জোড়া চোখ। কানে গুমগুমিয়ে উঠল একটা কথা, “ মরা মরদকে মনে নিয়ে সব করতে পারি, কিন্তু আমার মতো জ্যান্ত স্বামী...” কেমন বা আছে অনাবৃষ্টিতে শুকনো মাটির মতো রোগা সেই মহিলাটি। সে বুলেনের বাড়ি যাবার গলির থেকে পথ পালটে অন্য এক গলিতে পা দিল। দু’তিনটে মানুষকে চলতে হলেও এই গলিতে সামনে পেছনে চলতে হয়। তার উপর দু’পাশে নালা। ছোট ছোট বাড়িগুলোতে ঘরটা দাঁড় করবার জায়গা ছেড়ে আর অল্পই মাটি বাকি থাকে। নোংরা জলগুলো ছোট নালা একটা খোঁড়ে আসবার যাবার রাস্তার দিকে বইয়ে দেয়।  রাস্তার দু’পারে নালাগুলোতে ভেসে আছে ভাত, মাছের কাঁটা, শাক সবজির বাকল, নানা রঙের প্লাস্টিকের বেগ, ব্যবহৃত নিরোধ, মালা ডি বড়ির পেকেট। সে নালাগুলোর দিকে ভালো করে না তাকিয়েই হাঁটবার চেষ্টা করল। অল্প দূরে গিয়ে সে টোকা দিয়ে একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালো। লেপেপুছে পরিচ্ছন্ন থাকত যে বাড়িটা তার কী ছিরি হয়েছে। উঠোনে ঢেকি শাক উঠেছে। বেড়াগুলো খসে পড়েছে। ভুল হলো কি? লেপামোছা বারান্দায়  যে রোগা মহিলাটি নারকেল নাড়ু দিয়ে লাল চা খেতে দিত এ সেই মহিলার বাড়ি নয় কি? হতেইতো হয়।  ঘরের উপর ঢলে পড়া বরই গাছটাতো দেখি ঠিকই আছে। এই গাছের বরইতে কত কত আচার এই রোগা মহিলা বানিয়ে দিল, আর ওর বর জগু সেগুলো  বিক্রি করে গেল।   সেই ঝাল-মিষ্টি-টক আচারের স্বাদ মালতিও চেখে দেখেছে , এই বাড়িতেই। সে ঢুকে গেল। বাড়িতে ঢোকার  দরজা বলে কিছু নেই। বাঁশ একটাতে সুপারির খোল ঝুলিয়ে বেড়ার নামে যে একটা আড়াল তৈরি করা ছিল তারও একটা দিক বসে গেছে। খোলগুলো খসে খুলে পড়ে এক জায়গাতে জমা হয়ে আছে। উঁই ধরেছে, আদ্ধেক খোল ইতিমধ্যে মাটি হয়ে গেছে, বাকিটাও শীগগির তাই হয়ে যাবে। খোলগুলোর পাশ দিয়ে সে ভেতরে এলো। কোনো সাড়া শব্দ নেই। আজানো দরজার কাছে নারকেলের স্তূপ  ও যে জগুকে সাইকেলে করে নারকেল আনতে দেখেছিল এগুলো সেই নারকেলই হবে।  পুরো ঘরটাতেই একটা পচা পচা গন্ধ।
     “কে?”   দুর্বল একটা ডাক শুনে সে চমকে গেল।
     “আমি ,মণির মা। এদিকে আয়।”
     এদিকে ওদিকে তাকিয়ে ঢিগা দিয়ে রাখা ঘরটার পেছনে গিয়ে ছেঁড়া কাঁথার স্তূপ একটা পড়ে থাকতে দেখতে পেল। তেল চিটকে পড়া, সেলাই করা থেকে জলের ছোঁয়া না মেলা এই কাঁথার স্তূপ থেকেই হয়তো গন্ধটা আসছে। সে দেখল দুর্বল ডাকটা এই কাঁথার ভেতর থেকেই বেরুচ্ছে। কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে।  পুঁজ , রক্ত লেগে আছে কাঁথাগুলোতে। তার ভেতর থেকে মেয়ে মানুষটি ডাক দিল।
     “মণির মা, কে মণির মা?” কাঁথার স্তূপের ভেতরে বসেছে জগুর বৌ। মালতির নাকে একটা গন্ধ লাগল, কংকালসার মহিলাটির গা থেকেই বেরুচ্ছে।
     “ তোর বেমার...মিনতি বলল...” সে কিছু একটা বলতে গিয়ে বলতে পারছিল না, গলাতে আটকে যাচ্ছিলজগুর বৌও ওর কথাগুলো ধরতে পারেনি।
     “ তোকে দেখিনি অনেকদিন, জগু...
জগুর বৌ হাত একটা তুলে জোরে নাড়ালো, যেন একটা শুকনো পেঁপের পাতা ডাল সহ বাতাসে নড়ছে। ভেঙ্গে দু’টুকরো হবেই এইমাত্র।
     “মণির মা তুই আমার বিচার করতে এসছিস?” মণির মা ভালো করে দেখল গর্তে বসে পড়া চোখজোড়া থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।
     “ কি আর খবর নিবি এই মরা শরীরের?” মহিলার রক্তে পূঁজে ঘায়ে ভরা ঝুলন্ত জরায়ু কাপড়ের থেকে বেরিয়ে এসছে। মালতিকে সে দিকে তাকাতে দেখে সে দাগে ভরা শাড়িতেই সেটি ঢাকার চেষ্টা নিল।
     “ ডাক্তার , হাসপাতাল...” সে তাকে চিকিৎসার কথা জিজ্ঞেস করতে চাইছিল।
     “ যন্ত্র দিয়ে আর ঢুকিয়ে দিতে পারে না। উঠিয়ে দিতে হবে। হাসপাতালের মহিলা ডাক্তারটি আমাকে খুব গালাগাল করেছে। করলে কী হবে?  এটা উঠাতে অনেক টাকা লাগবে, এতো টাকা কোথায় পাব? বুঝলি মণির মা আমার ভেতরে সব পচে গেছে। খালি রক্ত আর পূঁজ, কি যে দুর্গন্ধ।” বলতে বলতে নিজেই নাকে হাত দিল।
     পায়ের শব্দ শুনে দু’জনে ঘুরে তাকালো। জগু। সে ভেতরে ঢুকে কাপড় পাল্টাচ্ছে। বৌ  আর মাতলি চুপ রইল। সে একজোড়া পরিষ্কার কাপড় পরল। তারপর বেরিয়ে গেল। পেছনটায় যে দু’জন মহিলা বসে আছে তাদের কোনো অস্তিত্বই অনুভব করল না। সে বেরিয়ে যাবার পর ওর বৌ নড়ে চড়ে বসল। পচা গন্ধটা ভোক করে নাকে লাগল।
     “আমি মরলেই ভালো ছিল। তুই কি জানিস এসব অসুখে লোক মরে কতদিনে?”
     “ডাক্তারনীকে...” সে চিকিৎসার কথাটা আবার পাড়তে চাইছিল।
     “ডাক্তারদি কী বলছিল , জানিস মণির মা?”
     “কী বলেছে?”
     “ বলেছে আমার এই অসুখটা হয়ছে কেন?”
     “কেন হয়েছে?”
     “সেই আঠারো বছর বয়স থেকে আমি প্রতি রাতে ত্রিশটা করে নারকেল কুরেছি, পাটায় পিষেছি, সন্দেশ নাড়ু বানিয়েছি। মহিলা ডাক্তার ওকে খুব বকা বকি করেছে।”
     “ঠিক করেছে।” মণির মায়ের হঠাৎ  মিনতির বলা কথাগুলো। সে হাতে পয়সা পেলেই ড্রাইভারনীর ওখানে যায়। সে বুঝি একদিন ফুলের ওখানে মদ খেতে গিয়ে ওর হাতে চড় খেয়েছে। মিনতি জগুর নাম শুনলেই চটে যায়। সে বুঝি আজকাল যার তার সঙ্গে গড়াগড়ি করে বেড়ায়। মিনতির বিটকোনো ঠোঁট দু’টর থেকে বেরিয়ে ঝরে পড়া শব্দগুলো ওর মনে পড়ল।  বজ্জাতটা বৌকে খাতিয়ে খাটিয়ে বেমারী করল, এখন তার ডিমদুটোর চুলকানো বেড়েছে।” মালতি আবার বলল, “ভালো করেছে ডাক্তারনী।”      
     “ ওমন করে বলবি না মণির মা। সে বেটা মানুষ, তাতে জোয়ান পুরুষ। সে বলেই এখনো একজনকে নিয়ে আসেনি। ভাত রাঁধতে না পারলে সে আমার জন্যে কিছু না কিছু রেখে যায়। এই দেখ মণির মা।” কাপড়ের তলা থেকে সে ছোট একটা ব্রেড বের করে দেখালো। “ তাকে আমি কীইবা দিতে পেরেছি, না পেরেছি সংসার চালাতে, না দিতে পেরেছি বিছানার সুখ।” কংকালসার মেয়েমানুষটির কথাগুলো শুনে ওর যেন গায়ে লংকাপোড়া লাগল। ঠিক মিনতির মতো মুখ বিটকে ও হঠাৎই নিজের অজান্তে বলে উঠল, “ তোকে খাটিয়ে খাতিয়ে মারল, এখন তার...” থেমে গেল সে।
     “কী বলতে চাস মণির মা! সে জোয়ান পুরুষ, জোয়ান পুরুষের খালি বিছানা।” মুখ বাঁকা করে কেঁদে ফেলল জগুর বৌ, সেদিকে তাকিয়ে কেমন এক বিতৃষাতে মন ভরে গেল মালতির, ঠিক যেমন মিনতির হয় মুখখানা যখন জগুর কথা বলে, ওরও তাই হলো।
     “ ছেলেমেয়েগুলো গেছে কৈ?” সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইল।
     “ কী করবে আর? একটা ভাঙ্গাচোরার ব্যবসাতে নেমেছে, একটা রদ্দি জোগাড় করে ফেরে, একটা...” মহিলাটি কথা বলতে গিয়ে হাঁপাচ্ছিল।“ কী করবে, মা হলো ওদের মরা লাশ।”
     “বাবা কী করে, সে দেখতে পারে না?”
     “ ওর কথা তুই ওমন করে বলবি না, সে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছে বলেই দু’মুঠো খেতে পাচ্ছি।”
হঠাৎ সে উঠল।
     “যাই , বুঝলি। বুলেনের ওখান থেকে আসিগে একটু।” মুড়ির তোড়াটা ওর হাতে দিয়ে ও বেরিয়ে এলো। পচা গন্ধের সঙ্গে কোথাও যেন মিশে গেছে এক সস্তা আতরের গন্ধ। জগু কাপড়ে মেখে বেরিয়ে গেছে। ওর ঠোঁটদুটো মিনতির মতো ভাঁজ হয়ে গেছে, ভাঁজ করা ঠোঁটে বিড় বিড় করছে সেই শব্দগুলো। নালার দিকে তাকিয়ে সে পিক করে থু এক দলা ফেলে দিল। অল্প শান্তি পেল যেন।
     রত্নার মা পিড়িতে বসে বাঁশের শলা চাঁচছিল। সে ডাক দিল।
     “ কি করছ, রত্নার মা?”
     “কী আর করবি, শলা দুটো চাঁচছি।”
     “গেল বাজারটা মার খেল।”
     আমি বাসস্টেণ্ডে গিয়ে দু’জোড়া বিক্রি করে এসছি। কোনোক্রমে চাল কতকগুলো আছে।”
     “মণি সিঙের গেরেজে কাজ করে চালের খরচটা তুলেছে বলেই উপোস করতে হলো না।”
     “তুই হলি বেটার মা।” রত্নাদের ঘর  থেকে তখন বুড়ো মানুষটা বেরিয়ে আসছিল কিছু  বলতে বলতে। হাতে একগুচ্ছ ঠোঙা।  বুড়োর কথাতে দুনিয়ার তেতো মেশানো, “ আজ আমার একটা ছেলে থাকত তবে আমাকে কি এই বুড়ো শরীরে এসব করতে হতো?” বুড়ো ঠোঙার তোড়া উপরে তুলে দেখাচ্ছে। মালতির পাশ দিয়েই বুড়ো বেরিয়ে গেল।
     “রত্নার মা, বুড়ো যে ঠোঙা বানায় এ চোখ দিয়ে পারে?”
     “চোখে সব পারে, খেতে পারে, শুতে পারে, কী করতে পারে না? মা-মেয়েকে গালি পাড়বার সমই বুড়োর গলা শুনবি, জোয়ান মানুষে ওর সঙ্গে পারবে না। কাজের সময় ওর বেটা নেই।”
     “ঠোঙা কে বানালো তবে?”
     “ কে আবার, আমি!”
     “রত্না” রত্নার কথা কিছু ওর কানে আসছে। বেশিরভাগ সময় ও ড্রাইভারনীর বাড়িতে থাকে। জোনের মা বলছিল চাকরের কাজ করে।  ওর কানে বেজে উঠে একটা তীব্র মিহি শিষ। একটা গাড়িতে হেলান দেয়া পুরুষ আমার মেয়েমানুষের রোজগারে খায় বলে গালি পাড়তে পাড়তে মাতাল একটাকে নিয়ে যাচ্ছে আরেকজন মানুষ। সেই বাড়িতে, সেইসব মানুষের সঙ্গে...
     রত্নার মা কিচ্ছু বলেনি, একমনে শলা চাঁচছে।
     “বুকের ব্যাথাটা?” সে মেয়েমানুষটির শরীরের কথা, বুকের ব্যথার কথা জিজ্ঞেস করতে চাইছিল। মানুষটি কোনো উত্তর করল না। সেও কিছু না বলে সেখান থেকে চলে এলো।
     ড্রাইভারনীর বাড়িটা পেরিয়ে একটা পাক দিলেই বুলেনের ঘর। ড্রাইভারনী নতুন ঘর তুলছে। নতুন ঘরের টিনে টিভির এণ্টেনা বাঁধা। শুনেছে রঙিন টিভি , বড় কাঁচের বড় টিভি। বুড়ো দর্জি বা নবীনের ঘরের ছোট সাদা কালো টিভি নয়। নতুন ঘরের সামনে ড্রাইভারের সাদা রঙের গাড়ি।
     বস্তির ভেতরে ড্রাইভারনীরই অবস্থা ভালো। ড্রাইভারনীর ঘর থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছে।  বড় কাঁচের বড় টিভির থেকেই হয়তো। সেইটুকু জায়গা ও মাথা নিচু করে পেরিয়ে গেল। কেন জানি ওর মনে হলো কেউ ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। তার মনে হলো যেন গলা শুকিয়ে আসছে।
    
      বুলেন ভেরেণ্ডা গাছ দিয়ে বেড়া তৈরি করেছিল , এখন এগুলো বেড়ে এমন হয়েছে যে একটা মুরোগও এপার ওপার হতে পারবে না। বেশ সবুজ হয়ে উঠেছে বেড়াগুলো। লিচু গাছটাও দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেছে। গাছাটাতে ছোট ছোট ফুল ধরেছে।বুলেনের বাড়ির উঠোনে সে এক নতুন গাছ দেখতে পেল। ফণি মনসার গাছ একটা বাড়তে বাড়তে ডালপালা মেলে একেবারে মাঝ উঠোনে এসে পড়েছে। গাছাটার চারদিকে বেড়া । দেখলেই বোঝা যায় বুলেনের কাজ। গাছটার চারদিক লেপাপোছা করে রাখা, একটা প্রদীপও জ্বলছে। বুলেন হরি ভঙুয়ার ছেলের সঙ্গে বসে আছে। মালতি ভেতরে ঢুকে এলো।
     “ আয় বৌদি।” বুলেন ওর দিকে একটা কাঠের টুল এগিয়ে দিল।
     “সুমলা কৈ? ভালো আছেতো?”
     “কী আর ভালো থাকবে? ভাঙা গাছ শেকড় কি মেলব কখনো?”
কমলা রঙের একটা দখনা আধা মাটিতে ছ্যাঁচড়ে আধা পরে সুমলা বেরিয়ে এলো। ওর  মাথার লম্বা চুলগুলো নেই। কদম ছাট দিয়ে ছেটে ফেলা হয়েছে।
     “ চুলগুলো, চুলগুলো কেটে দিলি কেন?”
     “ উকুন হয়েছিল।”
     “ এই কাপড়টা ও পরবে কী করে? বাজার থেকে একটা মেক্সি কিনে এনে...।” 
ওর কথা শেষ না হতেই বুলেন গিজগিজিয়ে উঠল, “পরতে হবে! জাতের কথা আছে, না পরলে হবে কি?”
     “বেজাতের পোষাক পরতে নেই। এখন সমস্ত বডো মানুষকে নিজের পোষাক পরতে হবে।” ভাঙুয়ার ছেলে মালতির গায়ের কো-অপারেটিভের সস্তা শাড়ির দিকে চোখ বাঁকা করে তাকালো।
     “বৌদি ,তুইও এসব কাপড় ছাড়। নিজেদের পোষাক পর।”
     “নিজেদের পোষাক?” কী বলে বুলেন? বুলেন এতো পালটে গেছে?
     “তোর গায়ে বডোর রক্ত। তুই কিনারাম বডোর নাতনি।”
সে অবাক হয়ে বুলেনের দিকে তাকিয়ে রইল।
     “ বড়ো সড়ো আন্দোলন হবে। অসম আন্দোলনের থেকেও বড়ো, আমরা নিজেদের রাজ্য নিয়েই ছাড়ব।” হরি ভঙুয়ার ছেলে যখন কথা বলে চোখগুলো লাল অঙ্গারের মতো হয়ে পড়ে।
     “আন্দোলন হবে?”
     “হবে।” বুলেনের গলার স্বর এই ফণিমনসার গাছের মতো তীব্রগন্ধী।
     “তারমানে আবার গোলমাল হবে?” ওর কানে বেজে উঠল এক হাবাগোবা মানুষের স্বর , “ মাথা নেই, চোখ নেই।”
কী করে সে ভুলে লোকটার সেই গোঙানোর স্বর, “ দাদু...দিদা, শিমুল গাছের তলায়, বুলাবুলির মাথা...লাল লালা লক্ত।”
     “হবে, গোলমাল, বন্ধ, সব হবে। আমরা রাজ্য আদায় করেই ছাড়ব।” হরি ভঙুয়ার ছেলের চোখে সে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠা এক অগ্নিকুণ্ড দেখতে পেল। 
     “ এগুলো যদি না হয়, এগুলো কি না করলেই নয়?”
     “হবে না, দেখলি না ওরা কী করল? বিদেশী তাড়াবে বলে গদী দখল করল। কোদাল দিয়ে ধন তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। আমাদের কী হলো? আমরা পেলাম কী? আমার বাড়িঘর ধ্বংস করেছে ওরা, আমার বৌ পাগল হলো। চাইই চাই, নিজেদের রাজ্য চাই।”
হরি ভঙুয়ার ছেলে চলে গেল। যেতে যেতে ওর শরীরের শাড়িটার দিকে আরো একবার তাকিয়ে গেল।
“তুই ঐ মিনতি না টিনতি ঐ হারামজাদীর সঙ্গ ছাড়।” বুলেনের স্বর ছোট হয়ে আসছে, “পাক্কা খবর পেয়েছি ওর শরীরে ওই জারজ জন্ম দেয়া লোকটার সঙ্গের অনেকে সারেণ্ডার করবে, সেও করবে। তার পর দেখবি ঐ হারামজাদী রেণ্ডির বিছানাতে এসে মরা লাশে যেমন  শকুন পড়ে , তেমনি এসে পড়বে এই সব ক’টা। তোকে বলে রাখলাম।”
মালতি ঢোক গিলল। সুমলা এসে ওদের সামনে দাঁড়ালো। ওর শরীরের দখনাটা খুলে গেল। গায়ে শুধু পেটিকোট। পেটিকোটে লাল লাল দাগ। বুলেন দখনাটা ওর শরীরে পেচিয়ে একটা রশিতে সেটি বেঁধে দিল। পুরো পরিবেশটা—বুলেন, এই দখনা পরা সুমলা সবই যেন কেমন অচেনা ঠেকল মালতির।
“যাইরে, মণি আসবার সময় হল। ভাত দুটো বসিয়ে দিইগে’ ।“ ধপ করে উঠে সে বুলেনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
“বৌদি, গাছটাতে একটা প্রণাম করে যা।” বুলেনের ডাক না শোনার ভান করে সে চলে গেল।
কেন জানি ওর মনটা খারাপ  হয়ে গেল। চারদিকে যেন লকলক করে বেড়ে উঠেছে তীক্ষ্ণ কাঁটার ফণিমনসার গাছ। ও সেদিকেই যায় সদিকেই পাতাগুলো ওকে ঘিরে ফেলে। কী করে সে যায়, কোনদিকেই বা?


ফেলানি

   
রিজার্ভের দিকে বস্তিটা বাড়বার আর জায়গা নেই।বাড়ছে এদিকটাতে । মাঠগুলো এক কাঠা, আধা কাঠা মাটি নিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে ভরে গেছে। সেইখানেই এক কাঠা একসালা মাটিতে বুড়া দর্জির ঘর। লোকটার জোয়ান বয়সেও ঐ একই নাম ছিল। বুড়ো নামটা পেল কেন, জানি না । দুটো কারণ হতে পারে । সে বুড়ো মানুষের কাপড়ই সেলাই করে । শহরের চারআলিতে যখন দোকান ছিল তখন বয়স্ক মানুষের পাঞ্জাবি, ফতোয়া বা পেছনে লম্বা লম্বা ভাঁজ দেয়া ধুতির সঙ্গে পরবার সার্ট, বয়স্কা মহিলাদের লম্বা রশি বা বোতাম লাগানো ব্লাউজের দেদার ওর্ডার পেত। সেই সময়েই বুড়োর বিয়েও হয়েছিল। মেয়েটি দর্জির থেকে বারো তেরো বছরের ছোট,দেখতেও বেশ সুন্দরী রসেটসে ভরা মেয়ে। কাপড় সেলাই করে করেই বোধহয় গলার খানিকটা নিচে দর্জির মেরুদণ্ডে একটা ভাঁজ পড়ে গেছে। সেজন্যে বয়সের থেকে একটু বুড়োই দেখায় তাকে । বুড়ো দর্জির হাতে তৈরি কাপড় নয়, বাজারের ফুল পাতা আঁকা, চুমকি বসানো, বড় গলার, ছোট হাতা ব্লাউজের থেকে লাল শাড়ির আঁচল পিছলে পিছলে ওর বৌ যখন বেটাছেলেদের সঙ্গে আলাপ জমায় তেখন যেন বুড়ো দর্জির বয়সটা আরেকটু বেড়ে যায়। সে সময় বুড়ো দর্জির আয় উপার্জন ভালো ছিল। বৌকে তিনবেলা ভালো খাইয়েছিল। প্রতি বাজারবারে বৌ ব্লাউজ, শাড়ি, পাউডার , স্নো কিনেছিল। নিজে পিছলে ফেলে না দিলেও ওর ভরপুর শরীর থেকে শাড়ির আঁচল এমনিতেই পিছলে যেত।রূপোর পায়েল পরে ওকে হেঁটে যেতে দেখলে মেয়েলোকেরা বলত, “বাঁজা মেয়েমানুষ না? শরীর ওমনটি হবেই।পুরুষমানুষেরা চোখ দিয়ে প্রায় চেটে ফেলতে চাইত বাচ্চার মুখের ছোঁয়া না লাগা, গায়ে কাপড় রাখতে অনিচ্ছুক এই শরীর।
         সে বাজারে যাবার বেলা দর্জির দোকানে বসে যেত। আসবার সময় সঙ্গের সবাইকে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে চা-জিলিপি খেত, কিন্তু পয়সা নিত এই বুড়ো দর্জির থেকে। বাজারে থেকে নিয়ে আসা মাছগুলো দেখিয়ে স্বামীটিকে তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে ভাত খাবার কথা বলে আসত। সবাই দেখত পুরো দিনটা সেজেগুজে এবাড়ি ওবাড়ি করে ঘুরে বেড়ালেও সন্ধ্যে হতেই মেয়েলোকটি বাড়ি চলে আসত। গরম ভাত রেঁধে, জল গরম করে সে আস্তে আস্তে পথ চলতে অভ্যস্ত একজন বাঁকা মানুষের ঘরে ফেরার পথে তাকিয়ে থাকত। লোকটা বেরিয়ে না যাওয়া অব্দি হাজার ডাকলেও সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসত না । কেউ কেউ বলে ও কখনো দর্জিকে স্নান করিয়ে দেয়, ভাত খাইয়ে দেয়। কখনো কখনো কেউবা দেখেওছে শীতকালে সে রোদে বসিয়ে বুড়ো দর্জিকে তেল মালিশ করে দিচ্ছে, নখ কেটে দিচ্ছে; গরমের দিনে বাড়ি ফিরে আসা মানুষটাকে পাখাতে বাতাস করে দিচ্ছে। হাসিচাঁপা এই মেয়েটি শুধু একটা কথাতেই রেগে কালভৈরবীর রূপ ধরে । যদি কেউ বলে যে, পেটে বাচ্চা দিতে পারেনা যে লোকটা তার সঙ্গে ও ঘর করছে কেন? কত আছে, ওকে কাছে পেলে ধন্য হয়ে যাবে, তারও কোল ভরবে। এইসব কথা শুনলেই ও ক্ষেপে যায়, চুল মেলে একেবারে পাগল হয়ে যায়। কথাটা শুনলেই ও যেখানে আছে সেখানেই বসে পড়ে, যে বলে তার চুল টেনে টেনে আক্রমণ করতে শুরু করে। কথার কোনো ঠিক থাকে না, চোখ লাল হয়ে আসে। চুল এলো মেলো হয়ে যায়।
            “আমার জামাই জোয়ান নয়! ও যেমন করে রেখেছে, তোদের কটা জামাই তোদের রাখতে পেরেছে...! তোদের ঘরেতো দেখি একবেলা ভাত জুটে না, আমার ঘরে তিনবেলা মাছভাত...! দেখগেআমার বাক্সে কটা নতুন কাপড়...আমার বুড়ো জামাই আমাকে বাচ্চা দিতে পারে না, তোদের জোয়ান জামাইদের বিছানায় তুলে তুলে যত ইচ্ছে বাচ্চা বিইয়ে থাক না, আমাকে দেখে জ্বলে মরিস কেন?”
              সেই দর্জির বৌ ফুল আজকাল ঘরেই মদ তৈরি করে বিক্রি বেচে। মদ খেতে যাবার থেকে বেশিরভাগ লোকই ওর ঘরে তামাশা করতেই যায়। ফুলকে কেন দর্জি মদ বেচার কাজে লাগাতে গেল সেও এক কাহিনি । তখন ফেলানি, বুলেনরা নিজের নিজের বাড়িতে ছিল। শুরু হয়েছিল অসম আন্দোলন। লোকে বুঝে না বুঝে ছেলেছোকরাদের হাবভাব দেখে যাচ্ছিল। সে সময়ে যারা আন্দোলনে নেমেছিল তারা স্বাবলম্বিতার শপথ নিয়েছিল। বুড়ো দর্জির দোকানের সামনে একটা দর্জির দোকান বসল। দোকান মানে দুটো মেশিন আর একদল ছেলেছোকরা । মেশিন নিয়ে যে ছেলেটি বসেছিল সেই ছেলেটিকে ফুলেরা চিনত। বস্তিতে থাকে, স্কুল ছেড়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। কিছু দিন থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গ নিয়েছে । ওর মা ওকে বুড়ো দর্জির দোকানে দিয়েছিল। একমাসের মতো থাকল। কাজ শেখার কোনো আগ্রহ নেই। শেষে দর্জি তাকে ওর্ডার আনা, কাপড় দিয়ে আসা ইত্যাদি কাজে লাগালো। সেখানেও সে গোল পাকালো । সেটুকুন অভিজ্ঞতা নিয়ে সে মেশিনে বসেছে । বুড়ো দর্জি ওদের কীর্তি কলাপ দেখতে থাকল। ছেলেগুলো কাপড় সেলাই করবার অর্ডার পেল ঢের। বিচিত্র কাপড়ে ওদের আলমিরা ভরে গেল। একদিন ছেলেগুলো এক দলা রঙিন কাপড় দর্জির দোকানে দিয়ে গেল। সেলাই করবার সময়ও দিল। কাপড়গুলো নিয়ে মানুষটি আরো বেশি বাঁকা হয়ে গেল। কী করে কী করে? যে মানুষ কিনা বুড়ো মানুষের জন্যে কাপড় সেলাই করে, সে এইসব রংচঙে ভরা পিচ্ছিল কাপড়গুলো নিয়ে কী করে? এই ভারি বোঝাটা নিয়ে কী করে? কীই বা করে? সময় পেরিয়ে গেল। গাল-ধমক খেয়েও মানুষটি কাজে হাত দিল না। একদিন সবকটা ছেলে এসে, দোকান পাট ভেঙে, মেশিনগুলো লণ্ডভণ্ড করে দিল। বুড়োর গায়েও হাত দিল। মানুষটাকে মূর্চ্ছা যেতে দেখে ভাবল বুঝি মরেই গেছে, ওরা চলে গেল। পুরো দুটো দিন একটা রাত পর বুড়োর জ্ঞান ফিরল। জ্ঞানই ফিরল, মেরুদণ্ডের ব্যথাতে নড়াচড়া করা মুস্কিল হয়ে পড়ল। জল এক গ্লাসও তুলে খাবার মতো অবস্থা রইল না । হাত থরথর করে কাঁপে । তারপর থেকেই ফুল বাড়িতে মদ বানিয়ে বেচে । ওর মদ বেচার সময় হলো সন্ধ্যে বেলা । বুড়ো দর্জির বাড়িতে রাত অব্দি লোকে ভর্তি থাকে । শেষ লোকটা না যাওয়া অব্দি দর্জি বসে থাকে । কাঁপা কাঁপা হাতে ফুলকে সাহায্য করে । একটা কাজই মূলত দর্জি বেশি করে, টাকা পয়সা নেই আর খুচরো পয়সা ঘুরিয়ে দেয়।
     আজ ফুল ফেলানিদের সঙ্গে বাজারে এসছে। দর্জির জন্যে ওষুধ নেবে আর নিজের জন্যেও টুকটাক কিছু কিনবে । মণির মা, ফুল, কালীবুড়ি, মিনতি, জোনের মা সবাই হাতের পোটলাপুটলি সামলে সামলে জোরে পা চালিয়ে এসে বড় রাস্তাতে উঠল। মণির মায়ের হাতে মোড়া, মাথাতে মুড়ির টিন, কালীবুড়ির হাতেও কাঁখে বাচ্চা নেবার মতো করে নেয়া মুড়ির টিন, মিনতির মাথাতে ছোট টুকরিতে ভাদালি পাতা, থানকুনি পাতা, ভাতুয়া শাক, আমরুলের শাকের মুঠো  ,জোনের মায়ের হাতের পোটলাতে গরম মশলার পেকেট। এই কাজ জোনের মা নতুন নিয়েছে।বেশি করে এলাচ, দারচিনি কিনে ছোট ছোট পেকেট করে বেচে। জোনের বাবার হাঁপানির টানটাও বেড়েছে আজকাল। বাজারে যেতেই পারে না । জোনের মা চারদিক সামলেও পেরে উঠছে না ।
             সবাই নিজের নিজের ভাবনায় বিভোর। গেল বাজারে টানা বৃষ্টি দিয়েছিল। এদের সব্বার লোকসান হয়ে গেল। মিনতিকে এক টুকরো শাক ফেলে দিতে হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি বাড়ি নিয়ে গিয়েও বিক্রি করতেও নিয়ে যেতে পারে নি। কাকে গিয়ে দেবে? বস্তির বাড়ি বাড়িতে এই সব শাক তোলা থাকে। এক বোতল তেলে সাত দিনের কাজ চালায় যারা তারা কি আর সাধ করে এই শাক ওই শাক ভেজে খাবে? ওর চোখে ভেসে উঠল টুকরির শাকগুলো। রিজার্ভে কত কষ্ট করে তুলে আনা শাক ওভাবে ফেলে দিতে হওয়াতে তার মনটাই কেমন হয়ে গেছিল। আজকাল আগের মতো রিজার্ভে যেতেও ভয় করে । কখনো বা এক দল ছেলে পাহাড় থেকে নেমে এসে এক দু রাত এখানে থেকে যায়। ওরা সাধারণত রিজার্ভের ভেতরে থাকে, নদীর পাড়ে এক দু রাত থেকে চলে যায়। সে গেল বাজারবারের আগের দিন ঢেকি শাকের খোঁজ করতে করতে নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। সেখানে থেকে সাধারণত আর আগে যায় না কেউ। পাহাড় অব্দি ছড়িয়ে পড়া এই অরণ্য এখান থেকেই নিঃঝুম হতে শুরু করেছে । পাহাড় থেকে নেমে এসে ওরা ওপারেই থাকে । রিজার্ভে ঢুকলেই ওর যেন কী হয়ে যায়, নদীর পাড় ওকে সুর সুর করে টেনে নিয়ে যায়। একবার নদীখানা দেখে না গেলে ও শান্তি পায় না । সেদিনও গেছিল। দুটো লোকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না এত্তো বড় কয়েকটা শিমূল গাছের তলায় প্রচুর ঢেকি শাক। ভয়ে ভয়ে ও এগিয়ে গেছিল।
                     লোকে বলে শিমূল গাছগুলোর তলায় একটা জায়গা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কেউ কেউ ওখান থেকে রাজহাঁসের মতো ডাক শুনতে পায়। কালীবুড়ি প্রায়ই বলে বস্তিরই বুঝি রাউতা বলে একটা লোক ছিল, তাকে সেই জায়গাতে নীল করে ফেলেছিল। কাউকে কাউকে বুঝি ওখানে প্রকাণ্ড সাপে তাড়া করেছিল। রাজহাঁসের মতো ডাকে, বাসার চারপাশটা পরিষ্কার করে রাখে এটি বুঝি বিশাল কালনাগ ।               ঢেকি শাকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মিনতির মনে পড়ছিল, মানুষের সাড়াশব্দ পেলেই ঐ কালনাগ তেড়ে আসে। ওর হাত খালি । ছেলেটা ডিম খাবার বায়না ধরেছে । সে ঘপ করে ডেঁকি শাকের ঝোপে ঢুকে গেল। একটা না দুটো বড়ই গাছকে স্বর্ণলতাতে ঘিরে ফেলে বেড়ার মতো করে ফেলেছে । বেড়ার পাশটা পরিষ্কার। সে দৌড়ে ওখান থেকে সরে এসছিল। কেউটে টেউটে নয়, ছেলে একটা হাতে বন্দুক নিয়ে তেড়ে এসছিল। সে চেঁচিয়ে  নয়, কিন্তু স্পষ্ট করে গলা চড়া করে আস্তে আস্তে বলেছিল, “আমরা কাল চলে যাব। সাবধান! যদি কাউকে কিছু বলো।মিনতি দৌড়োচ্ছিল। লোকে যেখানে নতুন বসতি গড়ছে, জঙল যেখানে পাতলা হয়ে এসছে সেই খানে এসে ও থেমেছিল। পরের দিন বস্তিতে রটে গেল মিনতি কালনাগটাকে দেখেছে । কালীবুড়ি ওর হয়ে বাতি দিয়েছিল।
          “মিনতি , তোকে কাল কালনাগে তাড়া করেছিল?”
     “না, তাড়া করেনিতো।
     “ বেরিয়ে এসছিল?”
     “কত লম্বা?”
     “কালো না হলদে ?”
     “তোর ভয় লেগেছিল?
     “ একটা না এক জোড়া?”
     “ফণা তুলেছিল?”
     “রাতে তুই স্বপ্নে দেখেছিলি?”
     সবাই মিলে মিনতিকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। মিনতি চুপ করে রইল। ভয়ে ওর চোখের মণিদুটো গোলগাল হয়ে গেছে ।
     “ও ভয় পেয়েছে।
     “কাল নাগ যদি, তবে জোড়ায় দেখেছে, হবে।
     “ওর মুখখানা দেখ।
     “হ্যাঁ,কেউ যেন এই ফরসা সুন্দর মেয়েটির মুখখানার উপর ছাই মেখে দিয়েছে।
     “ ও যদি স্নান না করা শরীরে...
     “ জোড়াতে দেখলে মেয়েদের শরীরের...
     মিনতিকে প্রশ্ন করা ছেড়ে কথা বলতে বলতে ওরা একজন অন্যজনের গায়ে গা লাগিয়ে কাছে চেপে এল। মিনতির মতো ওদের মুখেও যেন কেউ ছাই মেখে দিয়েছে ।
      প্রথমে শুনেছিল মণির মা। মাথার থেকে মুড়ির টিনটা নামিয়ে খানিক দাঁড়ালো । ওকে দেখে অন্যরাও দাঁড়ালো । তারপর কালীবুড়ি শুনতে পেল। তারপরে বাকি সবাই শুনতে পেল শহর থেকে লাগাতার বোম ফোটার মতো শব্দ । গিটঁ না খুলেই যেন কেউ একপাতা মরিচ বোমের শলতেতে আগুন দিয়ে দিয়েছে । শব্দটা শুধু তার থেকেও অনেক বেশি । কিসের শব্দ কিছু বুঝবার আগেই ওরা দেখে শহরের দিক থেকে এক দল লোক হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে এদিকটাতে আসছে । কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না, লোকগুলো হাত তুলে তুলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আসছে।
     “একেবারে শেষ।
     “মরার পরেও গুলি করে যাচ্ছিল।
     “আমেরিকার ষ্টেনগান।
     “পুলিশ বাড়িটা ঘিরেই রেখেছিল।
     “ডিমান্ড ছিল যে।
     “ টাউনের ব্যাপারীদের মুখিয়াল ছিল।
     “ সভাপতি ছিল।
     “ এখন সব ব্যাপারী হয় ব্যাপার করা ছাড়বে, নইলে গিয়ে ওদের পায়ে ধরবে।
    “গাড়ি গাড়ি আর্মি নেমেছে।
     “কার্ফিউ দেবে।
     নবীন এলো ওর বইপত্তের ওপচানো সাইকেল নিয়ে, পোটলাগুলো থেকে টপ টপ করে একটা একটা করে জিনিস পড়ে পড়ে যাচ্ছে। সে গিয়ে মাত্র জিনিসগুলো বাজারে নামিয়েছিল।
     জগু এলো লাল চা, আর নারকেলের নাড়ুর ঘুমটি গুটিয়ে। রমাকান্ত এলো সবুজ মটরের টুকরিটা নিয়ে । টুকরিটা ভেঙে রাস্তাতে মটর পড়ে পড়ে যাচ্ছে আর সেই সঙ্গে যেন ওর চলার পথের চিহ্ন রেখে রেখে যাচ্ছে ।
     বাজারে যারাই গেছিল সব্বাই একে একে ফিরে এলো। বাসা ভাঙলে কাক যেমন করে তেমনি হৈ হট্টগোল করছিল ওরা ।
     মালতিরা রাস্তার উপরের দল বেঁধে দাঁড়িয়ে । হঠাৎ মিনতির কী হলো । এতোক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ যেন ওর বাই উঠল। যেখানকার টুকরি সেখানে ফেলে কাপড় কুঁচকে বস্তির দিকে দৌড় দিল। দুহাত তুলে কাকের ভিড়ের মতো ছুটোছুটি ভিড়ে ও হারিয়ে গেল।
     “আমি সব জানতাম, দেখতে থাক। আরো হবে , সবাই মরবি। কেউ বেঁচে থাকবি না ।
     সবাই মিলে মিনতির পিছু নিল। এতোক্ষণ বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েলোকটির মুখে এই কটা ভয়ঙ্কর শব্দ শুনে সবার মনে পাক খেয়ে ফণা মেলে দুলে উঠল এক একটা কালনাগ। সবাই যেন পাগল হয়ে গেল নিজের নিজের সন্তান , স্বামী আর বাড়িঘরের ভাবনায়।
     বাসা ভেঙ্গে দিশে হারা কাকের ভিড়ে ছটফট করতে করতে ওরাও এক একজন কাক হয়ে ভিড়ে গেল।


ফেলানি পড়বার জন্য ধন্যবাদ!

ফেলানির ছবিগুলো

ব্লগ অলঙ্করণে আমার সহযোগী

আমাকে চিঠি লিখুন

Subscribe via email

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

ফেলানি অসমিয়া সাহিত্যের সেরা দশের একটি

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

Powered by Blogger.

কে কী বললেন

আমাকে নিয়ে

বিষয় আশয়

ফেলানি

I heart FeedBurner

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

কেমন লাগল বলুন !

^ উপরে ফিরে আসুনঃBack to Top