ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন

book


           
  
কাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেল মণির মায়ের। অবশ্য গত রাতে সে বেশ তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিল। মণি একটা বিয়ের ভাড়া নিয়ে গেছে। দুই রাত থাকতে হবে। বর কনে নিয়ে একেবারে আসবে। দিনরাতের তফাৎ ভুলে গিয়ে খাটছে ছেলেটা। মা-ছেলের পেট চালাবার পরেও সিঙের ধার মারছে। মাঝে মধ্যে তার গ্যারেজে গিয়েও কাজ করে দিয়ে আসে। দুই একজন কখনো বা তাদের গাড়ি-স্কুটার বাড়ি অব্দি নিয়ে আসে। মাঝে মধ্যে মণিকেও নিয়ে যায়। কখনো বা মালতী ছেলের হাত দু’খানা দেখে। আঙুলের গাঁটগুলো কঠিন হয়ে বেরিয়ে পড়েছে, তালু সোজা হয়ে গেছে। ছেলেটার গায়ের সেই ফর্সা রং আর নেই। রোদে বাতাসে পুড়ে গেছে। মালতীর নিজেরও কি আর সেই পুকুর ভরা মাছের বাড়িতে বাড়িতে কাটানো দিনগুলোর মতো আছে? নেই। টগর ফুলের মতো হাতের ঠাঁই এখন এটা এক গাঁট বেরোনো কঠিন হাত। যদি দেখত সেই মানুষটা, কীই বা বলত এখন? সেই যে সেগুন পাতের মতো ছড়ানো হাতের মানুষটা?
    শরীরের কাপড়টা ভালো করে জড়িয়ে নিলো। পাহাড়ের কাছের এই জায়গাতে শীত বড় তাড়াতাড়ি নেমে আসে। আজ বহু দিন পর সে আকাশের দিকে তাকালো। নীল রংটা পরিষ্কার হয়ে এসেছে। নীল পাহাড়টাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনেকক্ষণ সে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। নীল রংটা আকাশের নীলের মতো এতোটা উজ্জ্বল নয়, খানিকটা সবুজ মেশানো। মাঝের উঁচু পাহাড়ের উপরের সাদাটুকু এই ভোরে স্পষ্ট হয় নি। সামান্য আভাস শুধু পাওয়া যাচ্ছে।
    হাতে ঝাড়ু নিয়ে সে উঠানে নেমে গেল। উঠোনে মাঝে মাঝেই ঘাস উঠেছে। কতদিন এই ঘাসগুলো ছাটতে পারে নি। গোলমাল, গোলমাল করে করে লোকগুলো আর কোনোদিকে নজরই দিতে পারে নি। আজ এই মাস কয়েক ধরে খানিক শান্তি হয়েছে। আবার বা কী হয়? সেই মণিদের ধরে নিয়ে যাবার পরে কম কিছু হলো? শুধুই কি এখানে? সেবারে সেই যে একটা রেল গড়িয়ে পড়ল, তারপরে আরো একটা। কত মানুষ মারা গেল। কত বাসে বোমা ফুটল। আজ ক’মাস ধরে কিছু ঘটে নি। নবীনের থেকেই সে জেনেছে, বুলেনের পার্টিকে সরকার সম্প্রতি আলোচনার জন্যে ডেকেছে। সেজন্যেই মনে হয় গোলমাল সামান্য কমেছে। রোদ কোনদিকে গেল, বৃষ্টি কোনদিকে গেল কেউ টেরই পেল না। দেখতে দেখতে আশ্বিন মাস এসে গেল। পুজোও এলো বলে। সে যতটা পারে হাতে ঘাসগুলো ছিঁড়ে সাফ করবার চেষ্টা করে বাদ দিল, সময় করে কোদাল-খুন্তি নিয়ে সাফ করতে হবে। ঝাড়ু দিয়ে বাকি উঠোন পরিষ্কার করে নিলো। কালী থানের পাশে কালী বুড়ির লাগানো গাছে শিউলি ধরেছে। তলাটা সাদা হয়ে গেছে। এক দু’টো হাতে নিয়ে সে শুঁকে দেখল। গন্ধটা নাকে নিয়ে খানিক বসে রইল। তারপর আবার উঠোন ঝাড়ুতে লাগল। পুরো বাড়ি নোংরা হয়ে আছে। চারদিকে জঞ্জাল আবর্জনাতে ভরে পড়েছে। এতো আবর্জনা যে কোত্থেকে জমে এসে। করে না করে না বলেও, সময় পেলেই সে ঝাড়ু নিয়ে উঠোন ঝাঁট দেয়। চারদিকটা ভালো করে দেখে নিলো। এতো সব খড়-কুটো এলো কোত্থেকে? কালী বুড়ির ঘরে চাল ফুটো হয়ে গেছে। যে ঘরটাকে সে পাকঘর করে ব্যবহার করে তার চালও ফুটো হয়ে গেছে। ফুটো চালে শালিক আর চড়াই পাখি বাসা করে আরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে খসিয়ে দিচ্ছে চাল। মণি আর কতটুকু করবে? টিন লাগিয়ে একটা ঘর তুলতেই তার কি কম পয়সা গেছে? দিনকে রাত করে খাটছে ছেলেটা। মিলিটারির মার খাবার পর থেকেই ওর ডান কাঁধে একটা ব্যথা। রোজ রাতে লবণ বাঁধা পোটলা একটা দিয়ে সেঁকা দিতে হয়। ঘুমের মধ্যে একাৎ ওকাৎ করতে গিয়ে প্রায়ই সে কোঁকিয়ে উঠে। বিয়ের ভাড়া নিয়ে গেছে, পুরো রাত ঐ গাড়ির সিটেই বসে থাকবে। ওর বিয়েটাও দিয়ে দিতে হবে। খড়-কুটোগুলো এক জায়গাতে জমা করে দাঁড়ালো মালতী। কোমর টনটন করছে। আজকাল টানা কোনও কাজ করতে গেলেই কোমরটা এমন টনটন করে উঠে। কালী বুড়ির ঘরটা পারছে ছেয়ে দিতে হবে। ঠাকুরের ঘরটা পাকা করে দেবার সময় মণি টিনের চালও লাগিয়ে দিয়েছিল। কে কবে লাগিয়েছিল এই সব খের । না পচে যাবে কই? কিছু একটা করতে হবে। খেরের দাম কি কম বেড়েছে? পাওয়াও যায় না আগের মতো। তার থেকে টিন লাগালে সস্তা পড়বে। কালী ঠাকুরের থানের পাশের চালাটা, কালী বুড়ির ঘরটা, এদের নিজেদের পাকা ঘর ----সব ক’টার চাল টিনই হোক , কিম্বা খের --কিছু একটা লাগাতে হবে। পুরো কাজটা করতে খরচ কেমন পড়বে হিসেব করতে সে বসে পড়ল।
     “ ও মণির মা, কী করছিস?” সেই জোনের মা। অসুখের পর থেকে তার আগের স্বাস্থ্য আর নেই, তাও যেটুকু মজবুত আছে তার ধারে কাছে বাকিরা টিকতে পারবে না। কী গাধার খাটুনি যে মানুষটি খাটতে পারে। ছেলে দু’টোকে নিয়ে দুই হাতে খেটে মানুষটি সংসার সামাল দিচ্ছে। জোনের মা ভেতরে এলো। হাতে একটা কাঁচি।
     “ধান কাটতে বেরুলি কই?”
    রোজকার মতো হাত-পা মেলে সে বসল।
    “ এই একটু কাশ বন কাটব গিয়ে ভাবছি। ঘরের চালটা যদি এখনই ঠিক না করি আসছে বর্ষাতে বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। এবারেই বেশ কয়েকটা জায়গাতে ফুটো হয়েছে। বাটি ঘটি দিয়ে রাখতে হয়।
    “কই কাটবি?”
    “ওই চেনিপাড়ার দিকে।”
    “কত দূরে?”
    “দূর কিছুটা আছে। রেল পথ ধরে গেলে কিছু সামনে পড়বে।”
    “একা একা যাবি?”
    “মিনতি, মীরার মায়েরাও যাবে।”
     “কখন যাবি?”
    মিনতি, মীরার মা, রত্না, ফুল সবাই এসেছে। সবার হাতে কাঁচি।
     মণির মা রোজকার মতো আজও অবাক হলো। ওদের সবার সঙ্গে ওর ব্যাপার স্যাপার মিলে যায় কী করে? সে যদি বা ভাবল একটা কম্বল কিনবে, দেখা যাবে কেউ এসে খবর দিয়ে যাচ্ছে, ওই দোকানে একটু ফুটো টুটো থাকা কম্বল সস্তাতে বিক্রি করছে। ইঁদুরে কেটেছিল। সামান্য তালি দিলেই হবে। কাপড় একটা কিনবার কথা বললে একজন বলে উঠবেই “ আমারটাও ছিঁড়েছে। গেলবার একসঙ্গে কিনেছি না? সাধনা বস্ত্রালয়ে জোড়া দেয়া শাড়ি এসেছে। আঁচল ভাল, পাকা রং। জোড়াটাও নজরে আসে না, দাম...” লাকড়ি চাই, শীত আসছে। একজনের বাড়িতে তুষ পাবেই, অন্যজন এসে গোবরের খবর দেবে। এক সঙ্গে সবার দাওয়াতে দেখা যাবে গোবর খুঁটির লাইন। হাওয়াই চপ্পল ক্ষয়ে যেতে যেতে আর ফিতে পালটানো যাচ্ছে না। একজন না একজন এসে বলবেই না, আগরওয়ালা স্টোর্সে কম দামে স্যান্ডেল দিচ্ছে। দোকানের সামনে চাল বাড়িয়ে দিয়ে দেদার স্যান্ডেল বের করে দিয়েছে, চিনিতে পিঁপড়ে পড়ার মতো গিয়ে উপচে পড়েছে মানুষে। পরদিন বাজারে যাবার পথে সবার পায়ে নতুন স্যান্ডেল। ক্ষয়ে যাওয়া, ফিতা পালটানো নয়—একেবারে নতুন চকচকে। আজও মিলে গেল। সেও ফুটো চাল নিয়ে ভাবছিল। ওরাও এসে গেছে।
     “আমিও যাই, দাঁড়া।” সে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে ওদের দিকে তাকালো। “ আয় না, একটু চা খেয়ে যা এসে। আমিও যাবো।” সবাই এরা চা-মুড়ি নিয়ে বসল। সে রাতের জল দেয়া ভাতে একটা প্যাঁজ কেটে লংকা ভেঙ্গে মেখে নিলো। সকাল বেলাই যদি দু’টো ভাত পেটে পড়ে যায়, তবে আর গোটা দিনের জন্যে ভাবনা নেই। এই কথাতেও তার ওদের সঙ্গে মিল। সবাই লংকা ভেঙ্গে ঠাণ্ডা ভাত একটু একটু খেয়ে এসেছে।
     রাস্তাতে পা দিয়েই সে পাহাড়গুলোর দিকে তাকালো। আজ দেখা যাচ্ছে না। মেঘে ঢেকে রেখেছে। আবহাওয়াও একটু ভার। আকাশ জুড়ে ছেয়ে আছে হালকা কালি রঙের একটা চাদর। এরা বস্তি পেরিয়ে এলো। উজাড় করা জঙ্গল পেরিয়ে এলো। সেই জঙ্গলের ঠাঁই এখন ঘরই ঘর। ছেলেদের মিশন পার হলো। মিশনের সামনে রোজ ওদের চলাটা ধীর হয়ে আসে। কী করে এতো সাজিয়ে সুন্দর করে রাখে মিশনটা? গেলবছরে রোপণ করা হয়েছিল ছোট ছোট বোতামের মতো ইন্দ্রমালতী ফুলগুলো। সেগুলো আগে থেকেই ফুটে গিয়ে জকমকিয়ে রেখেছে ফুলের বাগান। মণির মা আন্মনেই বলে উঠল, “দেখ, কী সুন্দর এই ফুলগুলো!”
    
   
আবার চলার গতি দ্রুত হলো। কেক কেক করে একটা কাঠবেড়ালি এক নারকেল গাছ থেকে লাফিয়ে আরেকটা নারকেল গাছে চড়ে তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে গেল। সবাই সেদিকে তাকালো। এখানে চারদিকে সার বেঁধে লাগানো নারকেল গাছে ঘেরা বিশাল উঠোনের এক বাড়ি আছে। শহরের এক বিশাল বড়লোকের বাড়ি। বিরাট ব্যবসা আছে। গ্যাসের ব্যবসা ছাড়াও শহরের মধ্যিখানে ঔষধের দোকান, জুতোর দোকান। আজ বছর খানেক হলো পরিবারটি উঠে চলে গেছে। জুতোর দোকানে বসত বড় ছেলেটাকে গুলি করে মেরেছিল। অনেক টাকা চেয়েছিল। ওই কাপড়ের বুড়ো দোকানীকে গুলি করে মারবার পরের ঘটনা। ছেলেটা আর্মি পুলিশকে খবর দিয়ে রেখেছিল। ওদের ছেলেরা সময় দেয়া মতোই টাকা নিতে এসেছিল। একটা আর্মির গুলিতে মরল, অন্যটি ধরা পড়ল। তার এক সপ্তাহ না যেতেই সবাই ভালো বাসে এমন শান্ত ছেলেটি রক্তগঙ্গাতে ডুবে গেল। তারপরেও এই পরিবারটি ছিল। বাড়ির মূল মানুষটিকে যখন গুলি করল, একরাতেই এরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। ভাগ্য ভালো যে মানুষটি বেঁচে গিয়েছিল। এতোদিন বাড়িটাতে তালা ছিল। স্বর্ণলতা গজিয়ে গাছগুলোকে হলদে করে ফেলেছিল। কাঠবেড়ালি মনের আনন্দে নারকেল গাছে গাছে ঘুরে ফল খেয়ে যাচ্ছিল। তলাটা ভরে গেছিল কাঠবেড়ালিতে খেয়ে ফুটো করে ফেলে দেয়া পচা নারকেলে। সে জায়গাটা পেরুলেই পচা নারকেলের ভাতের মাড়ের মতো গন্ধ একটা নাকে লাগে এসে। আজ এদের নাকে গন্ধটা লাগল না। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল দরজা জানালা সব খোলা হয়েছে। দু’টো লোক উঠে নারকেল গাছগুলো পরিষ্কার করছে। শুকনো পাতাগুলো কেটে ফেলছে, পাকা ফল সব পেড়ে ফেলছে। নারকেল খেতে এসে কিচ্ছু না পেয়ে কাঠবেড়ালি চিৎকার করেই পালিয়ে যাচ্ছে। কাঠবেড়ালির রাগ দেখে এদের হাসি পেয়ে গেল।
     “ পরিবারটা এলো মনে হয়।”
    “ঘর দোয়ার ছেড়ে এতোদিন এরা ছিল কই?”
    “আজ নিশ্চয় নিজের বাড়িতে ফিরে এদের বড় ভালো লাগছে।”
    “মেয়েরাও এসেছে।”
    “কী করে জানলি?”
    “ ভেতরের দিকে মেয়েদের কাপড় মেলে দিয়েছে।”
    “তোর চোখটা তো কম নয়!”
    সবাই বড় করে হাসা দিল। আসলে এতোদিন শ্মশানের মতো খালি পড়ে থাকা বাড়িটাতে মানুষজনের ফিরে আসা দেখে এদের মনটা এমনিই ভালো হয়ে গেল।
    “একেবারে থাকবে বলেই এসেছে হয়তো।”
    “ পরিবারটা থাকবে কী?”
    “ দেখ , থাকতে পারে কি না।”
    “হয়তো বাড়ি ঘরে অবস্থা দেখতেই এসেছে।”
    নিজেদের ভেতরে আলোচনা করতে করতেই ওদের মন ভার হয়ে এলো। কথা না বলে জোরে পা চালিয়ে এরা যেতে থাকল।
    প্রায় শহরের শেষে গিয়ে এরা রেলপথে উঠল। পথের পাশে পাশে পাথরের উপর দিয়ে চলতে থাকল। একটা মালগাড়ি পেরিয়ে গেল। ফুটুকা ১ , নাগা গাছের ২  ঝোপের মাঝে পড়ে এরা দাঁড়ালো কিছু। আবহাওয়া ফর্সা হচ্ছে। কোমল রোদের কিছু কিরণ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়শ্রেণি নজরে আসছে। বাতাস ভেজা ভেজা। রেলের সেতুতে গিয়ে পৌছুলো। সিঁড়ির মতো ফাঁকা ফাঁকা সেতুটা এরা একে অন্যের হাত ধরে ধরে রেলের উপর দিয়ে পেরিয়ে গেল। এর নিচে দিয়েই চলে গেছে ছোট্ট নদী। ফুটফুটে পরিষ্কার জল। নদীর বুকের পাথরগুলো জিলকোচ্ছে। এক দল ছেলে মেয়ে হৈ চৈ করে সাঁতার কাটছে। নদীর পাড় দিয়ে এরা রেলের সেতুতে চড়ে। সেখান থেকে ঝপাং করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জলের তোরে সেতুতে চোঁও চোও শব্দ একটা করে। রোদ পড়ে সেই ছিটকে বেরুনো জলকে দেওয়ালির সময়কার বাজি কলাগাছের মতো দেখায়। জলে তৈরি ফুলে ভরা একখানা গাছ গজায়, পর মুহূর্তে আবার মিলিয়ে যায়। এরা ক’জন ওখানে সামান্য দাঁড়িয়ে ছেলেমেয়েদের খেলাটা দেখল। তারপর আবার এগিয়ে গেল। বাচ্চারা অনেকেই ন্যাংটো। সেই ন্যাংটো শরীর দুলিয়ে নেচে নেচে এই মহিলাদের দেখে কী সব বলতে বলতে পাড় দিয়ে উঠল, আবার ঝাঁপিয়ে নদীতে পড়ল। এক সঙ্গে বেশ কয়েকটা জলে তৈরি ফুলভরা গাছ। এই গজায়, এই মিলিয়ে যায়।
     আরেকটু এগিয়ে রেলের আঁকা বাঁকা পথ ধরে গিয়ে এরা ঢালু পথে নেমে গেল। নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল আবার। আপনিই এদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। একটু সময়ের জন্যে সব কিছু ভুলে গেল এরা। শুধু তাকিয়ে রইল। আদি অন্তহীন একটি কাশ ফুলের সমুদ্র। ভেজা বাতাস কাশবনের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই সাদা সমুদ্রের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। হালকা কালো এক টুকরো মেঘে সূর্য ঢেকে ফেলেছে। দেখা যাচ্ছে না সূর্য। শুধু মেঘের কিনার ধরে রূপালি পাড় নজরে এলো। কালো মখমলের কাপড়ের রূপালি আঁচলের ছেঁড়া অংশটা দিয়ে কয়েকটা রূপালি সুতো জিরজির করে এসে কাশবনের উপরে পড়ে গেল। যেখানে পড়ল সেখানেই একটা চুমকি বসিয়ে গেল। রূপালি চুমকি বসানো একটা সাদা পাটের চাদর ঢেউ খেলাতে খেলাতে নীল পাহাড়ে গিয়ে ঠেকল।
     কাশবনের ভেতরে চলে গেল এরা ক’জন। রূপালি কাজ করা মোলায়েম পাটের চাদরের তলায় লুকিয়ে পড়ল। ফেলানি এর আগে কখনো কাশবন কাটতে আসে নি। কোন ঘরের কোথায় চাল দিতে হবে, কোথায় বেড়া বসাতে হবে এসব কালীবুড়ি দেখত। দু’বারের মতো ঘরের চাল ছাওয়া সে দেখেছিল। ওসব কাশই ছিল না সন ওসব সে নজর দিয়ে দেখে নি। জোনের মায়েরা প্রতিবছরই কাটে। যেটুকু কাজে লাগে লাগিয়ে বাকি নল বিক্রি করে দেয়। খের-টিন যারা কিনতে পারে না সেসব মানুষের জন্যে এই বিনা পয়সার কাশবন বড় কাজে আসে। চাল ছাওয়া যায়, বেড়া দেয়া যায়। শক্ত করে ছাওয়া কাশের চাল খেরের থেকে কম কিছু নয়। এমনিতে সামান্য হালকা হয়, কিন্তু বাঁশে তৈরি রশি দিয়ে বেঁধে দিলে বর্ষাটা পেরিয়ে যায়। কাশের ডাঁটা দিয়ে বেড়া করে মাটি দিয়ে সামান্য লেপে দিলে আর যদি বৃষ্টির জল না পড়বার ব্যবস্থা করা যায় বেশ কিছু দিন টিকে থাকে। ফেলানি তাকিয়ে দেখে শুধু এরা ক’জনই নয় আরো অনেকে এসে কাশ কাটছে।
     কালো মেঘের থেকে সূর্য বেরিয়ে এলো। চুমকি বসানো চাদরটা আর নেই। তার জায়গাতে ওই বাচ্চা বিয়োনোর সঙ্গে সঙ্গে যে সোনা রঙের দুধ বেরোয় সেরকম রঙের মসৃণ তাঁতশাল থেকে এই মাত্র কেটে বের করে আনা একখানা পাটের চাদর বিছিয়ে গেল। ঢেউ খেলে খেলে পাহাড়ের কাছে পৌঁছে সেই চাদর হয়ে গেল একটা নদী। বুকে জল নয়, এই মাত্র খিরানো বাচ্চা বিয়োনো গাইর দুধ নিয়ে নদীটা এঁকে বেঁকে পাহাড়ের তলায় তলায় বয়ে গেল।
    
       
হাতে কাঁচি নিয়ে জোনের মায়েরা কাশ কাটতে শুরুই করে দিয়েছে। ওকে সামান্য অন্যরকম করতে দেখলেই ওর মুখের উপর কালো কালো চোখের মণিগুলো স্থির করে রেখে জিজ্ঞেস করবে, “ কী হলো রে, মণির মা?” রোজকার মতো আজও তার হাসি পেল। কিন্তু কিছু বলতে পারল না। দুধের নদী পাটের চাদরে ঢেকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ফেলানিকে টেনে কাছে আনতে পারল না জোনের মা। কাশবন কাটা ছেড়ে সবাই তাকেই দেখছে। জোনের মা বলে উঠল, “ এই মণির মা, বল আবার। দেখ, কী সুন্দর কাশবনটা। আবার বল।” খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল সবাই। এই হাসিই তাকে দুধের নদী থেকে পাড়ে টেনে আনল। শরীর থেকে খুলে ফেলল পাটের মোলায়েম চাদরখানা।
     “ তাই তো। দেখ কী সুন্দর!” কোমরে কাপড় প্যাঁচিয়ে সেও কাশ বন কাটতে শুরু করে দিল ।
    মীরার মা, জোনের মায়ের মতো সেই ঘন কাশবনের মধ্যে প্রথমে ঢোকে ঝোপ একটার চারপাশের গাছগুলো কেটে ফেলছে।তারপরে মাঝে পড়ে থাকা ঝোপটা কেটে মুঠো করে পাশে এক জায়গাতে রাখছে। কাশের ডাঁটার ভেতরের সাদা রসটা একবার ছুঁয়ে দেখল। কিছুটা আঠালো আর কষা। জোনের মায়েদের মতো এতো দ্রুত হাত চালাতে না পারলেও কেটে সে ঠিকই গেল। মাথার উপর দিয়ে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়োউড়ি করছে ছোট ছোট পাখি কিছু। পুরো কাশবন জুড়ে এই ছোট ছোট পাখির ঝাঁক। 
     “এতো এতো পাখি। লোকে যদি সব কাশ কেটে নিয়ে যায় , এরা থাকবে কই?”
    ওর প্রশ্ন শুনে বাকিরা হাসল।
    “এতো এতো কাশ। কে কেটে শেষ করতে পারবে রে?”
    “ এটা কী পাখি, দেখছিস?”
    “ বছরে বছরে টুনটুনি পাখিগুলো কমে আসছে।”
    “কী পাখি বললি?
    “টুনটুনি পাখি।”
    “ওই যে উড়ে গেল, ওগুলো কি টুনটুনি?”
    “চড়াই পাখির মতো পাখি।”
     “ওগুলোই টুনটুনি।”
    “আগে এরা ঝাঁকে ঝাঁকে পুরো কাশবন ভরে ছিল।”
    “গাঁয়ের মানুষ রাতে আগুন হাতে করে আসে।”
    “কাঁসি বাজিয়ে বাজিয়ে আসে।”
    “খাগড়াতে বানানো বাঁশিও বাজায়।”
    “পাখিগুলো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।”
    “নিথর পাখিগুলোকে মেরে মেরে খায় গো লোকে, পারে কী করে!” টুনটুনির কথা বলতে বলতে এক সময় এরা চুপ করে গেল। চারদিকে শুধু কাঁচিতে কাশ কাটার শব্দ।
     কোমরটা সোজা করতে সামান্য দাঁড়ালো ফেলানি। পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, রঙ নীল হয়ে এসেছে। পাহাড়তলির নদীকে দেখতে লাগছে রাজহাঁস রোদ পোহাচ্ছে। শরীরে ঝিলিক । একবার হাত বুলোতে পারলেই যেন রেশমি ছোঁয়াতে সম্পূর্ণ শরীর শিরশিরিয়ে উঠবে।
     “পাহাড়ের নিচের কাশবনটা দেখতে নদীর মতো লাগে না?”
    “কী বলছে রে ও?”
    “সেতো নদীই ছিল।”
    “জল ছিল?”
    “নদীতে জল না থেকে কী থাকবে?”
     “তুই তখন বস্তিতে আসিসই নি।
    “তোর বিয়ে হয়েছিল?”
    “হয় নি, দিদির বাড়িতে ছিলাম।”
    “পাহাড়ের উপরের জালিমুখে তিনটা নদীই বাঁধ দিয়ে রাখা আছে। কেউ একবার বাঁধটা কেটে দিয়েছিল। ভাঙ্গা বাঁধ দিয়ে জল উপচে এসে নদী তিনটা মিলে গেছিল।
    “কী জলই না হয়েছিল সেবারে!”
    “সেবারেই রাস্তার সব পুল ভেঙ্গে গিয়েছিল।
    “পুলগুলো ভাসিয়ে কোথায় যে ফেলেছিল নিয়ে।”
    “আমাদের বস্তি পুরো ডুবে গিয়েছিল।”
    “ঘরের ভেতরে কোমর অব্দি জল।”
    “ রাধিকা আর কৃষ্ণাই সঙ্গ নিয়েছিল।”
    “ দু’টো নদী মিলে এদিকটাতেই এগিয়ে এসেছিল।”
     “এ জায়গাটা তো ধানের খেত ছিল।”
     “কী ধানই না হয়েছিল সেবারে!”
    “বড় বড় থোক হয়েছিল।”
    “পুরো মাঠ জলে ভরে গিয়েছিল।”
    “ জল ছিল পুরো আট দিন।”
    “জল শুকোবার পরে চারদিকে শুধু বালিই বালি। মাঠটাকে তলায় ঢেকে ফেলল।”
“ এতো এতো কাশবন হলো কী করে বলে ভাবছিস?”
“কী করে হবে আবার?”
 “নদীর বানে গুটি ভেসে এসেছে।”
 “বাতাসে ভেসে এলো।”
 “গুটি যেখানেই পড়ল, সেখানেই গাছ হলো।”
 “কাশের বীজে পাখা আছে, বুঝলি?”
 “ ফুলগুলোই পাখা হয়ে গুটিগুলোকে উড়িয়ে আনে।”
 “নদীর জলে ডোবে না, ভেসে থাকে।”
 “বালি মাটিতে পড়লেই গাছ হয়।”
 কথা বলতে বলতে বেশ কিছু কাশ এরা কেটে ফেলল। আকাশে মেঘ আছে বলে সময়টা ঠিক ধরতে পারে নি। পেটে সবার কিঁউ কিঁউ করছে। বাজারে গেলে এতক্ষণে বন বা সেদ্ধ পিঠা একটা নিয়ে চা এক কাপ খেয়ে নিত।
 “চল যাই, বেশি করে কেটে ফেললে নিবি কী করে?” মীরার মা নিজের ভাগের কাশগুলো বেঁধে ফেলল।
     জোনের মায়েরাও বাঁধতে শুরু করে দিল। বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। আবহাওয়া আবার ভার হয়ে এসেছে। সবার বাঁধা হয়ে গেছে, আর ভাবতে না ভাবতে হঠাৎই বৃষ্টি নেমে এলো। বর্ষার বৃষ্টির মতো হুড়হুড় করে নামে নি। ইলশে গুড়ি। তাড়াতাড়ি কাশের বোঝা এরা মাথাতে তুলে নিলো। বোঝার আড়ালে এদের মুখ ঢাকা পড়ে গেল। রেল পথ ধরে এরা এগিয়ে গেল। রেল সেতুর তলাতে ছেলেগুলো নেই। জায়গাটা এখন নির্জন পড়ে আছে। সেখানে সামান্য দাঁড়ালো এরা। সাবধানে ফাঁকা ফাঁকা জায়গা আর কাঠগুলো দেখে দেখে একে একে পেরিয়ে এলো। আবার হাঁটা দিল।
 বৃষ্টি পড়ে পড়ে কাশের বোঝাগুলো ভিজে গেছে।
“জোনের মা, কাশগুলো সব ভিজে গেল যে! এখন?” ভাবনায় পড়ে জিজ্ঞেস করল ফেলানি।
“ভিজলে কী হবে?”
“পচে যাবে না?”
“রোদে মেলে দিবি, শুকিয়ে যাবে।”
“আর রোদ না দিলে?”
 “কী যে বলছিস মণির মা, আশ্বিনের বৃষ্টি আর কদিন থাকে?”
 “ পচলে আবার এসে কাটবি।”
 “এতো এতো কাশবন কে কেটে শেষ করতে পারবে?”
 “কাশবনের গুটির পাখা আছে।”
 “নদীতে ভাসে গুটি।”
 “উড়ে আসে।”
 “ উদোম বালি মাটিতে পড়লেই গাছ হয়।”
     কেউ কারো মুখ দেখছে না। ভেজা কাশের বোঝার নিচে মুখ ঢাকা পড়েছে। সবাই জোরে পা চালাচ্ছে। সংসারের সারা রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। রোদ দিলে কাশগুলো শুকোতে হবে। বেড়া দিতে হবে, চাল ছাইতে হবে। মেঘ না কাটলে যদি পচে যায় তবে আবার এসে কাশ কেটে নিয়ে যেতে হবে।
    কাশবনের বোঝার নিচে ঢাকা মুখ নিয়েই  এই ক'জন  মেয়ে মানুষ যাচ্ছে , এগিয়ে যাচ্ছে...
টীকা:
    ১) ফুটুকাঃ সাধারণত সড়ক, রেলপথ বা পাহাড় টিলাতে এই ছোট গাছগুলো দেখা যায়। বৈজ্ঞানিক নামঃMelastoma malabatricum
    ২) নাগাগাছঃ অসমিয়াতে শব্দটি নগাবন। পঞ্চম অধ্যায় দেখুন।



      ফেলানি         

         
        
 
  সবার আগে জাগল জোনের মা। সে উঠে একটা হাই দিতেই বাকিরাও সেই শব্দে সাড়া পেয়ে উঠে গেল। রাতে শুতে যেতেই একটা বেজে গেছিল। “আমরা নাহয় উপোস থাকলাম। কিন্তু এই ছেলেমেয়েগুলোকে কী করে না খাইয়ে রাখি?” বলে ফুলই প্রথম ভাত বসাবার কথাটা তুলল। এই ক’দিন সে ড্রাইভারণীর মেয়েটিকে বুকের থেকে নামায় নি। মেয়েটাও ওর গায়ে চ্যাপ্টা হয়ে লেগে আছে। চাল-ডাল মণির মায়ের ঘরে ছিল। আজ দু’দিন আগে মণি মাকে বাজার টাজার এনে দিয়েছিল । কে কে তিন চারজন লেগে পড়ে যেন নিজের নিজের বাড়ি থেকে কী কী নিয়ে এলো। সবার জন্যে খিচুড়ি হয়ে গেল। সবাই সাত সকালে ঘুম ছেড়ে উঠেছে। রাতে শুতে যেতে যতটাই হোক, ভোর না হতেই বিছানা ছাড়াটা সবার অভ্যাস। আর জেগে উঠেই কেউ বসে থাকতেও পারে না।
    মীরা বাসন ধুতে গেল। সঙ্গে গেল রত্না।
    জোনের মা ফুলঝাড়ু হাতে নিলো।
    মিনতি নিলো শলার ঝাড়ু।
    ফুল ঘর মোছার বালতি আর কাপড়।
    মীরার মা বিছানাগুলো তুলে ফেলল।
    মুহূর্তের মধ্যে ফু দিয়ে ঘরটা ভাত খাবার যোগ্য হয়ে গেল। তারপরে সবার স্নান-টানও হয়ে গেল। লবণ দেয়া লাল চা নিয়ে সবাই বসেছিল মাত্র। একটা ছেলে, মণিদের বয়সের, সঙ্গে একটি মেয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালো।
    মণির মা গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই মেয়েটি ঝড় তুফানে দোলানো মূলি বাঁশের মতো তার বুকে ঢলে পড়ল। বুক ভাঙ্গা কান্নাতে অস্থির মেয়েটিকে বুকে ধরে রাখতে পারে নি মণির মা। মেয়েটির কান্না সবার মধ্যে গড়িয়ে গেল।
     “কাঁদবি না রীণা, কাঁদবি না।” ওকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মণির মাও কেঁদে ফেলল। কীই বা হচ্ছে ছেলেটার! সে কি এতোই বড় হয়ে গেছে যে তাকে মিলিটারি ধরে নিয়ে যেতে পারে। ও করেছে কী? ধনী মানুষের ছেলে হতো তবে কলেজে পড়ত, ছোট্ট ছেলেটি হয়ে থাকত।
    সবারই যেন হঠাৎ ই ছোট বলে ভাবতে ভাবতে ছেলেগুলো বড় হয়ে গেল। চালের মুঠো জোগাড় করতে করতে ছেলেগুলো বড় হয়ে গেল, পুলিশ মিলিটারি ধরে নিয়ে যাবার মতো বড়ো হয়ে গেল। সবাই মিলে হাউ হাউ করে কাঁদততে শুরু করল।
     ফুল কাঁদছে অসুস্থ কুঁজো মানুষটির জন্যে।
     মীরার মা কাঁদছে অন্যের দোকানে জিনিস বিক্রি করে, তার গোঁফ গজানো ছেলে মণ্টুর জন্যে।
    নতুন ঠেলা একটা কিনে ধানের মিল থেকে তুষ নিয়ে হোটেলগুলোতে পৌঁছে দিয়ে ঘরে কিছু চাল নিয়ে আসে জোন। জোনের মা কাঁদছে সেই জোনের জন্যে।
    মিনতি নবীনের জন্যে।
    রীণা মণি নামের দাদার বন্ধু জোয়ান ছেলেটার জন্যে।
    ফেলানি মণি নামের হঠাৎই বড় হয়ে উঠা ছোট ছেলেটার জন্যে।
    মীরা কাঁদছে দাদার জন্যে।
    রত্না তার চোখের সামনে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া বস্তির মানুষগুলোর জন্যে।
    ফেলানির বাড়ি হয়েছে যেন মরা বাড়ি। আধা তৈরি ঘর, কালী বুড়ির থান ---সবটাই কান্নাতে ডুবে গেল।
    হাউ হাউ করে কান্নার শব্দ ফোঁপানোতে পরিণত হয়েছে। কেঁদে কেঁদে নেতিয়ে পড়া মহিলাদের দেখে ফেলানির রাগ উঠে গেল।     কালী বুড়ি ঠিকই বলত, মেয়ে মানুষ খালি ভেঁ ভেঁ করে কাঁদতে পারে। কী করে যে কাঁদছে মেয়ে মানুষগুলো! কিসের আশাতে কাঁদছে? বাইরে একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ালো। কান্নার শব্দ শুনে ভেতরে আসবে। এসে কী বলবে? “ মাল তো বেশ বড়িয়া দেখছি! ভাগিয়ে নিয়ে যাবি কি রে?”
     “ এই তোরা চুপ করলি ?” ফেলানির গলা শুনে সবাই চমকে উঠল।
     “ কাকে শোনাবার জন্যে কাঁদছিস? কোন পেয়ারের লোক আসবে?”
    “ ওভাবে বলছিস কেন মণির মা?” আমার ছেলেটা ঠেলাতে করে ক’বস্তা তুষ টানে জানিস? ওকে আর্মি নিয়ে গিয়ে...” জোনের মা আবার কাঁদছে। সঙ্গে সঙ্গে সামান্য সময় বন্ধ হয়ে পড়া কান্নার রোল আবার উঠল।
    “তোদের কি ছেলে , স্বামী ফিরিয়ে চাই? না ওদের আর্মির হাতে ছেড়ে দিবি?”
    “ পাক্কা খবর । সবাইকে অল্প পরেই চালান দেবে।” রীণার দাদা কথাটা বলেই মাটিতে বসে পড়ল। ভেতরে আসা ছেলেটার মুখে এই কথা শুনেই ফোঁপানো কান্না আবার হাউ হাউ-তে পরিণত হলো।
    কান্নার শব্দে বাইরে টহলদার কয়েকটা আর্মি ভেতরে এলো।
     “কিউ হাল্লা –চিল্লা করতা হে?”
    “কার্ফিউ লাগা হুয়া হে, মালুম নেহি?”
     “চুপ নেহি রেহনে ছে...” একটা তেড়ে আসছিল।
     “ কী করবি কুত্তার দল?...” কথাটা মুখের ভেতরে গিলে থেমে গেল ফেলানি। ওরা চলে গেল।
    “ দাদা, তুই যা গিয়ে।” পেছনে গিয়ে লুকোনো দাদাকে বলল রীণা।
    “তুই ?”
    “ও থাকুক আমার সঙ্গে।” রীণাকে নিজের পাশে বসিয়ে বলল ফেলানি। “শুনলি ওরা কী বলে গেল? শুনলি না , না?”
    “কী করবে ওরা আমাদের?” মীরার মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
    “ কী আর করবে? কিচ্ছু করতে পারবে না।” ফেলানির কথাতে যেন সবাই সাহস ফিরে পেলো।
    “কী করবি মণির মা? মানুষগুলোকে মরতে দিবি কি?”
     “ কী করবি? ওদের চালান দেবে। তখন কী হবে?”
    “কী হবে আর? মেরে ফেলবে?” নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে উত্তরটা দিল ফেলানি।
    “ কী বলছিস রে , মণির মা?”
    “ তোর মুখে কিসে ভর করেছে?”
    “তুই মা হয়ে এই কথাটা বলছিস?”
    “পোকা পড়ুক তোর মুখে।”
    “তোর বুকে কি মায়া মমতা নেই?”
    সবাই ফেলানিকে চটে গিয়ে ঘিরে ধরেছে। আবার ফোঁপানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
    “ কেঁদে কেঁদে প্যারের লোকগুলোকে ডাকতে থাকবি? না কিছু একটা করবার কথা ভাববি?”
    “কী করবে?” রীণার কথা বড় কষ্টে বেরিয়ে এলো।
    “ কী আর করবি?”
    “আমাদের হাতে বন্দুক আছে, না টাকা আছে?”
    “কোথায় যাবো আমরা?”
    “ আর্মির কাছেই বা যাই কী করে?”
     “গেলেই বন্দুক দেখাবে।”
    “হট যাও, হট যাও—বলে তেড়ে আসবে।”
    ফোঁপানো কান্নার শব্দ বাড়ছে।
    “মরতে তোদের প্রচুর ভয়, তাই না?” একটু হাসল ফেলানি। কেউ কিছু বলল না।
    “আমাদের আবার মরা কী, বাঁচাই কী?” জোনের মা প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।
     “ঠিক বলেছিস জোনের মা। আমরা জ্যান্ত মরা হয়েই আছি।” মিনতি গলা ভার করে বলল।
    “জোনের মা মরতে মরতে ফিরে এসেছে। তুইও মরার থেকে বেঁচেছিস।”
    “ঠিকই বলছিস, আমাদের আর মরা-বাঁচা কী?” হাতের যে জায়গাটা ফুলে গেছে সেখানে হাত বুলিয়ে বলল মীরার মা।
     “আমাদের কত মরল। জগু মরল, ওর বৌ মরল।” ওদের মনে করিয়ে দিতে চাইল ফেলানি।
    “জোনের বাবা, সুমলা, বুলেন।”
    “হরি ভাঙুয়ার পোলা।”
    “রত্নার মা।”
    “কালী বুড়ি।”
    “ড্রাইভার।”
    “রত্নার বাবা।”
    “ড্রাইভারের ছেলেটা।”
    “হ্যাঁ, অনেক মানুষ মরল।” কথাটা এমন করে বলল ফুল যেন লোকগুলো মরার কথা সে জানেই না।
    “আমাকেও মরা বলেই ধরো।” রত্না মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল।
    “মা মরল, বাবা মরল।” হুঁ হুঁ করে কাঁদছে সে।
    “তার মানে মরতে তোদের ভয় নেই?”
    “তোর, মণির মা?” মীরার মা তার দিকে তাকিয়ে আছে।
     “আমার আর কী?” ছেলেটাই আমার সব। আমার বাঁচা-মরা কি আর আলাদা কিছু?”
     ফেলানি সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
    “তোরা যাবি আমার সঙ্গে?”
    “কই?”
    “এখনো ওদের চালান দেয় নি। সেখানেই আছে। যাবি?”
     “কী করব?”
    “কোথায় যাবো?”
    “কী করে যাবো?”
    “কোথায় যাব আবার কী? আর্মি ক্যাম্পে!” গায়ের কাপড় ঠিক করে নিলো ফেলানি।
    সবাই উঠে দাঁড়ালো।
    “দেখিস নি তোরা কতবার মেয়েরা গিয়ে ক্যাম্প ঘিরে ধরেছিল?”
    “সেবারে জংলি পার্টিটার পাঁচটা ছেলে বের করে নিয়ে যায় নি?”
    “একবার ক্যাম্পে বুলেনের পার্টির মেয়েরা তিনদিন তিনরাত গিয়ে ছিল না?”

     নিঃশব্দে দাঁড়ালো এরা আর আর্মি ক্যাম্পের দিকে পা বাড়ালো। নিঃশব্দে বস্তিটা পার হলো, পাকা রাস্তাতে পা দিল। কেটে খালি করে ফেলা রিজার্ভ পার হয়ে গেল। তারপর আর্মি ক্যাম্পের সামনে এরা বসে গেল। যেখানে বসেছিল তার থেকে সামান্য দূরে ছিল শিশু গাছ একটার কাটা গুড়ি। সেখানেই পড়ে রয়েছিল সুমলা পাগলি। একটা পুরো গাছ ছিল সেখানে। এখন পড়ে আছে কিছু শুকনো গুড়ি।
     ওদেরকে দেখে দুই একটা বন্দুকধারী বেরিয়ে এলো। ওরা বসেই আছে। কেন বসে আছে জিজ্ঞেস করল বন্দুকধারীরা। এখান থেকে চলে যেতে বলল। ফেলানি দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গের বাকিরাও দাঁড়ালো।
     “আমাদের লোকজনকে নিয়ে যেতে এসেছি।” ক্যাম্পের ভেতর থেকে আরো কয়েকজন বন্দুকধারী বেরিয়ে এলো। ওরা বন্দুকের পেছন ভাগ দিয়ে ফেলানিকে ঠেলা দিল। এরাও ওদের চলে যেতে বলল।
    “আমার মানুহকিটা লাগে।”
    “হামার আদমি...”
    “ আমাদের লোক আমাদের চাই।”
     “হামার মরদ...”
    “হামারা বেটা।”
    একটাও মহিলা ফিরে যাবে না। ওদের মানুষজন না নিয়ে যাবে না।
    
    
দিন গেল। রাত হলো। একজনও উঠেনি। ক্যাম্প থেকে এনে দেয়া রুটি কেউ ছুঁয়েও দেখল না। শুধু জল একটু একটু খেলো।
    পরদিন পুলিশ এলো। বোঝালো, গালি দিল। একজনকেও নাড়াতে পারল না। মনে হয় কার্ফিউ খুলেছিল, পুরো দিন পুরো রাত বসে থাকা মহিলাদের কথা শহর জুড়ে জানাজানি হয়ে গেছে। বহু লোক এসে আশেপাশে ভিড় বাড়াতে শুরু করল। জিপগাড়িতে করে অফিসার এলো। এই মহিলারা যেমন ছিল তেমনি বসে রইল। কিছু জিজ্ঞেস করলে ওদের একটাই কথা,
    “মানুষগুলো, আমাদের মানুষ...।”
    আরেকটা দিন গেল, সঙ্গে আরেকটা রাত।
    ভোরের দিকে রত্না ঢলে পড়ল। দেখতে আসা লোকজনই ডাক্তার ডেকে আনল। সবাই নেতিয়ে পড়েছে। মাটিতে বালিতে পড়ে থাকা মহিলাদের খবর নিতে কাগজের লোক এলো। ছবি তুলল। সব প্রশ্নের উত্তর একটাই।
    “আমাদের লোক, আমাদের লোক ফিরিয়ে চাই।”
     দু’টো দিন শেষ হলো, তিন নম্বর রাত আসবার হয়েছে। চোখে ততক্ষণে ধোঁয়াশা দেখছে এই ক’জন মেয়ে মানুষ, তাদের চোখে সন্ধ্যার অন্ধকার আরো ঘন হয়ে নেমে এলো। একজনও ভালো করে মাথা তুলতে পারছিল না। “আমাদের আর বাঁচা-মরা কী?” কে যেন বিড়বিড়িয়ে কথাগুলো বলল। সবার খিদে-কাতর শরীরে লেগে রইল একটাই কথা, “আমাদের বাঁচা-মরা...আমাদের বাঁচা-মরা...।”
    ভালো করে অন্ধকার নেমে আসবার ঠিক আগেই ফেলানি শুনল একটা ডাক, “মা।”
    সঙ্গে সঙ্গে সবাই শুনতে পেল কিছু চেনা চেনা ডাক।
    “মা।”
    “মিনতি।”
    “ফুল।”
    “ও মা।”
    “মীরা।”
    সবাই উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। ভুল দেখে নি এরা। ওদের আপনারজন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কারো মুখে কথা নেই।
     একসঙ্গে সবাই বস্তির দিকে পা বাড়ালো। উজাড় করা অরণ্য পেরুলো। পাকা রাস্তা পার করল। তারপর প্রায় নিঃশব্দ পড়ে থাকা বস্তি। বস্তি আর রিজার্ভের কিছু মানুষ রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই মিলে এগিয়ে গেল।
     আকাশে চাঁদ উঠেছিল। সেই চাঁদের কোমল আলোতে ফেলানি দেখল মণি রীণার দিকে তাকিয়ে হাসছে। রীণা মাথা নত করেছে লজ্জায়। ফেলানির মুখেও একটা স্নিগ্ধ মিষ্টি হাসি।
 





ফেলানি

      
  
কার্ফিউ চলছে। কখন খুলবে কেউ জানে না। এই বন্ধ আগের বন্ধগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। কোত্থাও একটাও বাজার বসে নি। বাড়ির বুড়ো হতে ধরা ঝিঙে বা পুরল টুকরিতে করে কেউ বিক্রি করতে নিয়ে যায় নি। অথবা বিকেলে নদীতে মাছ ধরে ঢেঁকি পাতাতে ঢেকে চালনিতে করে রাস্তার পাশে বসে নি। একটাও ছোট ছেলে রাস্তাতে ক্রিকেট খেলতে বেরোয় নি। সবাই ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ করে চুপ চাপ বসে আছে। বসে নি একটিও তাসের আড্ডা। শুধু কোথাও কোথাও কিছু মানুষ জটলা করে বসে আছে।
    এক ঘণ্টার জন্যেও খুলে নি কার্ফিউ। নারকেলের খোলা দিয়ে শেড তৈরি করে ইলেকট্রিক তারে হুক লাগিয়ে একশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালানো হয়েছে। সবাই প্রায় হুক লাগিয়ে সামনে পেছনে লাইট জ্বালিয়েছে। কেউ বা বাঁশের বেড়াতেই ঝুলিয়ে দিয়েছে। কেউ বাঁশেই লাগিয়েছে। কেউ বারান্দার খুটাতে বেঁধে দিয়েছে। এমনই করে এরা প্রায়ই। লাইন ম্যান ধরলে দু’চার টাকা ধরিয়ে দেয়। এখন আর কোনও বাধা নিষেধ নেই। চারদিকে দিনের মতো আলো ছড়িয়ে লাইট জ্বলছে। দুর্বল পুলগুলো ঘটং ঘটং করে নাড়িয়ে দিয়ে দিনে রাতে আর্মি পুলিশের গাড়ি যাতায়াত করছে। আর্মির কড়া হুকুম বস্তির সবাই পাহারা দিতে হবে। সবাই পালা করে পাহারা দিচ্ছে।
    সর্বত্র একটা ভয়। এই আসবে। ভয়ানক সব অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসবে। কে মরবে ঠিক নেই। সবাইকে মরতে হবে, শুধু আগে আর পরে। উত্তর থেকে আসবে, দক্ষিণ থেকে আসবে, পূব থেকে আসবে, পশ্চিম থেকে আসবে...চারদিক থেকে আসবে।
    জংলি পার্টিও আসবে ওদের বাপদের সঙ্গে।
    একটাও বাঙালি বাঁচবে না।
    আর্মির সঙ্গে যারা থাকে তারা আসবে শিলিগুড়িতে যারা বোমা ঠেসে বসে আছে তাদের সঙ্গ নিয়ে।
    একটাও অসমিয়া বাঁচবে না।
    বাগানীয়া দলটা আসবে তীর ধনুক নিয়ে। তীরে বিষ মাখানো, শরীরে লাগলেই কেঊটের ছোবলের মতো নীল হয়ে আসে ।
    একটাও বডো বাঁচবে না।
    বাঁচবে না বিহারিরাও। হিন্দুগুলোও মরবে, মুসলমান একটাও থাকবে না।
    তাহলে থাকবেটা কে?
    কেউ থাকবে না।
    সবাই মারা পড়বে?
    সবাই মারা পড়বে।
    বাঘ সিংহে ভরা একটা অরণ্যতেও সজারুরা কান মাথা ঝাঁকিয়ে খুটে খেতে সময় পায়, সাহস করে। সজারুও জানে বাঘ –সিংহেরও যখন তখন খিদে পায় না। কিন্তু এই যে ছুঁতে না পারা, ধরতে না পারা শত্রুগুলো এদের রক্তের পিপাসা প্রতি মিনিটে থাকে। এই আসবে, এই আসবে, মিনিটে সব ছারখার করে চলে যাবে।
    সত্যিই এলো। টিভিতে যখন অসমিয়া সংবাদ দিচ্ছিল ঠিক তখন সবাই দেখল আকাশে ধুম করে কী একটা ফুটে চারদিক আলো করে ফেলেছে। এতো আলো যে উঠোনের দূর্বা ঘাস অব্দি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তারপর ঠিক ফটকা নয়, তার থেকেও ভারি আওয়াজ সবার কানে বাজল। এই শব্দ সবার চেনা হয়ে গেছে। রক্ত পিপাসু ভূতের পায়ের শব্দ। তারপরে সব নিঝুম! শব্দগুলো এসেছিল ড্রাইভারের বাড়ির দিক থেকে। একটাও পুলিশ মিলিটারির গাড়ির শব্দ নেই। অন্য সময় যারা ঘটং ঘটং করে পুল নাড়িয়ে আসে যায় এদের গাড়িগুলো সব গেল কই? কই হারিয়ে গেল টহলদারি মিলিটারিরা? ওরাতো থাকেই অনবরত। ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, আসা যাওয়া করা মানুষের সাইকেল কেড়ে রাখে। তিন চারদিন, কখনো বা এক সপ্তাহ দশদিন পরেও ঘুরিয়ে দেয় না। কখনো বা সঙ্গে নেয়া বেগ, তল্পি তল্পা খুলে দেখে দুই একটা চড় থাপ্পড়ও বসিয়ে দেয়। পাহারা দেয়াতে কোনও ঢিলে ঢালা ভাব দেখলে গালি গালাজ মার পিট এসব আছেই। আজ এরা সবাই গেল কই?
    শুরুতে বস্তির কেউ নড় চড় করল না। মণিই বলল প্রথম, কী হয়েছে দেখতে তো হবে। মণির সাহসের কথা বস্তির সবাই জানে। তার কথাতে সাহস পেয়ে সবাই উঠে ড্রাইভারের বাড়ির দিকে এগুলো। ভেতরে কেউ কোঁকাচ্ছে। মণির পেছনে পেছনে সবাই গিয়ে ঢুকলো। রক্তের স্রোতে পড়ে আছে ড্রাইভার, তার শরীর ফুটো ফুটো করে ফেলেছে চালনির মতো। আরো কোঁকানির শব্দ শুনে এগিয়ে দেখে রত্নার বাবা পড়ে আছে। একবার চোখ মেলে তারপরেই মাথাটা একদিকে কাত করে ফেলে দিল। মেয়ের হাতে রান্না করিয়ে দু’মুঠো ভাত নিয়ে এসেছিল ছেলে মেয়ে দু’টোর জন্যে । এদের মাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবার পরে থেকেই এরা উপোস করেই দিন কাটাচ্ছিল। ড্রাইভারের সমান না হলেও তার শরীরেও বেশি ক’টি গুলির দাগ। কারো চাপা ফোঁপানোর শব্দ শুনে দেখল বিছানার নিয়ে ছেলে মেয়ে দু’টি। ছেলেটা পড়ে আছে, মেয়েটি তাকে ধরে কাঁদছে। বিছানার নিচে থেকে তাদের দু’জনকে বের করে আনা হলো। ছেলেটির শরীরে গুলি লেগেছে , শরীর শক্ত হয়ে গেছে। মেয়েটির গায়ে রক্তের কিছু দাগ লেগেছে মাত্র। ওর কিছু হয় নি। ওকে কেউ ধরে দাঁড় করাতে গেলেই সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ভয়ে মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। কে যেন ওকে বুড়ো দর্জির হাতে তুলে দিল, দর্জি ওকে বুকে করে সেখান থেকে চলে গেল।
     কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল লোকগুলো। হচ্ছেটা কী এসব? কাকে জিজ্ঞেস করবে? এতো সব পুলিশ মিলিটারি থাকতে এসব হতে পারে কী করে? আকাশের এক একটা টুকরো আলো করে তোলা পুরো শহর দেখেছে। ধম করে ফুটা শব্দ শুনেছে। আর্মি –পুলিশে দেখে নি? তবে? ভয় করে? নিজের প্রাণের ভয়?
     ব্যাপার সবাই বুঝতে পারল। বা মনে হলো যেন বুঝে উঠেছে। বোকা মানুষগুলোই ক্ষেপে গেল। ঠাট্টা হচ্ছে? ওরা যাদের যা বলে তাই করে আসছে। কানে ধরে ওঠ বস কর। করেছে। পুরোটা দিন বাজার করে আসে রাতে যদি বলেছে পাহারা দে, দিয়েছে। ভোর হতেই আবার চোখে মুখে জল দিয়ে দৌড়েছে। লাগে বললেই সাইকেল দিয়েছে। ডেকে নিয়ে বলেছে রাস্তাতে পাথর বিছিয়ে দে, দিয়েছে। ক্যাম্পে বাঁশের বেড়া দিয়েছে। সুমলা পাগলি ওদের ক্যাম্পের মুখে বলির ছাগলের মতো পড়ে রইল। ভেতরের গরুগুলো কিছু বলল? একটাও আঙুল তুলল? ওরা দেখে নি?
     ড্রাইভার, ড্রাইভারের ছেলে আর রত্নার বাবাকে নিয়ে মানুষজন বসে রইল। বস্তির কারো ঘরে চুলো জ্বলল না। চোখে ঘুম এলো না। তিনটা প্রাণীর রক্তে বস্তির সবাই ডুবে গেল। সকালে সবার চোখে দেখা গেল রক্ত জমাট।
     ভোরের আলো ফুটতে পুলিশের একটা গাড়ি এলো। বডিগার্ড সহ এক অফিসার নেমে এলো।
     কেউ একজন প্রথম ঢিলটা ছুঁড়ল। গাড়ি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। বৃষ্টির মতো পাথর পড়তে শুরু করল গাড়িতে। অফিসারটি বন্দুক বের করতে যেতেই নবীন না মণি কে যেন একটা চড় মেরে সঙ্গে লাথিও বসিয়ে দিল কয়েকটা। প্রাণ নিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে গেল।
    কিছু সময় পরে আর্মির গাড়ি এলো। পাথর জড়ো করে রাখাই ছিল। লোকজনও তৈরি হলো। ঠনর ঠনর করে পাথরের ঢিল পড়তে শুরু করল আর্মির গাড়িতে। সবাই নয়, কিন্তু অনেকেরই ছেলে বেলা গুলতি মারার অভ্যেস ছিল, হাতগুলো সোজা । ধমাধম ভাঙ্গা ইটের টুকরো পড়তে শুরু করল। আর্মির ভান ঘুরে গেল। এলো বেশ ক’খানা বোঝাই করা পুলিশের গাড়ি। ওয়াকি টকিতে কথা বলছে। আর্মির গাড়িও আরো এলো। পুরো বস্তি পুলিশের আর্মিতে ঘিরে ফেলল।
     
   বন্দুকের কুঁদা দিয়ে মেরে মেরে কানে ধরে ধরে সবাইকে সার করে বসিয়ে দিল। তারপরে অজগর সাপের মতো হা করে মুখ মেলে রাখা কালো গাড়িতে এক এক করে সবাইকে তুলতে শুরু করল। মহিলারা তাই দেখছে কালী বুড়ির থানে বসে বা দাঁড়িয়ে। মুখরা যে ক’জন মহিলা, তারা শিলাবৃষ্টিতে জর্জর কপৌ ফুলের মতো চুপ।
    মণিকে কোনও এক আর্মি বন্দুকে একটা খোঁচা দিয়ে আবার লাথও মেরে দিয়েছে, “লিডারি করত্যা হায় ক্যা?” মণি শক্ত হয়ে বসে আছে। তাকে নাড়ানো যায় নি। পুলিশ একটা এসেও তাকে গুঁতো দিল, “ কোন বাপের ব্যাটারে তুই! শালা হারামজাদা!”
    মণির মা তাই দেখছিল। সে চাদরের আঁচলখানা কোমরে বেঁধে দৌড় দিল, “কাকে তুই হারামজাদা বলছিস রে?”
    মণির মায়ের পেছনে পেছনে মিনতি, রত্না, মীরার মা, ফুল, জোনের মা সবাই দৌড় দিল। যেন ওরা মণির মায়ের গায়ে আঠা দিতে সাঁটা।
    পুলিশের একটা হাসছিল, “ মালতো বেশ বড়িয়া দেখছি! ভাগিয়ে নিয়ে যাবি কি রে?”
    “ মা তুই গেলি?” দাঁত কামড়ে বলল মণি, “ মা , তোরা ভেতরে যা গে, এই কুকুরগুলোর সামনে এসেছিস কেন?”
    “ ওই কাকে কুকুর বলছিস বে?” কেউ একজন মণিকে মার একটা দিয়ে ভেনে ভরিয়ে দিল।
    “মিনতি, তোরা যা গে’।” ভেনে ঢুকে নবীন চেঁচিয়ে বলল।
    চোখের সামনে ভ্যানখানা ঘরঘর করে চলে গেল। মণির মা এক দৃষ্টিতে ভেনের দিকে তাকিয়ে রইল। যেখানটাতে ভ্যানটা মিলিয়ে গেল সেখান থেকে একটা মানুষ আসতে সবাই দেখতে পেল। মীরার বাবা। আজ বহুদিন পরে এসেছে মানুষটা। চেহারা দেখে মনে হয় যেন কোনও কঠিন অসুখে পড়েছে। চুলগুলো ঝরে গেছে, পুরো বুড়ো দেখাচ্ছে তাকে। বোধহয় অনেক আগেই বস্তিতে ঢুকেছিল। গোলমাল দেখে কোথাও লুকিয়েছিল। পুলিশ-আর্মিকে চলে যেতে দেখে বেরিয়ে এসেছে। তাকে দেখে মীরার মা তাড়াতাড়ি হেঁটে বাড়ি চলে গেছে। কান্না-কাটি করে ভয়ে বিব্রত অন্য মহিলারা তা দেখেনি।
    প্রথমে দরজাটা বাইরে থেকে তালা দিল মীরার মা। ছেলেকে পুলিশে নিয়ে গেছে, মীরা অন্য মেয়ে মানুষদের সঙ্গে। আজ বেশ কয়েক বছর পর বাড়ি আসা স্বামীর জন্যে পথে তাকিয়ে রইল। বাড়ির মুখে অচেনা মানুষকে দেখলে কুকুর যেমন ঝাঁপিয়ে উঠে মীরার মা তেমনি ঝাঁপিয়ে পড়ল বরের উপর। শুরুতে ওর বুক ভেঙ্গে পাড়ভাঙ্গা কান্না বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোৎস্না আলোতে পড়ে ঝলমল দুটি সংলগ্ন শরীর। ওর চেনা মানুষটির শরীরে এক আলদ সাপ কিড়মিড় করছে, কুচকুচে কালো, অন্ধকারের থেকেও কালো। ওর কানে বেজে উঠল এক নেশাসক্ত নারী কণ্ঠ, “বুর্বক বেটিটা শুয়ে পড়েছে।” বুকের কান্না শুকিয়ে গেলো, ওর শুকনো বুকে এখন শুধু তপ্ত বালির উপর দিয়ে হোঁ হোঁ করে বয়ে যাওয়া বাতাস।
      মানুষটা ভেতরে চলে এসেছে। দরজাতে দিয়ে রাখা তালার দিকে তাকাচ্ছে।
     “আমি লোকের মুখে জানতে পারলাম। এতোসব গোলমালের মধ্যে তোরা পড়ে আছিস। ট্রাক একটাতে চড়ে চলে এলাম। বুকটা জ্বলে যাচ্ছিল।” চারদিকে তাকাচ্ছিল সে, “ বাড়িঘর ভালোই উঠালি। ছেলে দোকানে ঢুকেছে। তুই ভালো বাড়িতে কাজ করিস, খবরাখবর সব রাখি। তোদের রোজগার পাতি ভালো।” মীরার মায়ের বুকের বালিগুলো হোঁ হোঁ করে উপরে উঠে আসছে, ওর নাকে মুখে চেপে ধরেছে, সে শ্বাস নিতে পারে নি।
     “আমি এবারে চলে এসেছি, বুঝলি। ঐ বেটি আমাকে ওষুধ করেছিল। আমাকে অসুস্থ করে ফেলেছে।” লুকিয়ে একবার মীরার মায়ের কঠিন মুখটা দেখে নিলো সে। “একজন বাবা আমাকে পানি ঝাড়া খেতে দিয়েছে। জ্যান্ত কী একটা বেরিয়ে এসেছে বমি থেকে। আমি একেবারেই চলে এসেছি। তোরে এখানে থাকলে আমি বেঁচে যাবো, নইলে ও আমাকে একেবারেই মেরে ফেলবে।”
    মীরার মা দেখে যাচ্ছে লোকটাকে। লোকটাও সোজা না হলেও বাঁকা চোখে তার কঠিন মুখের দিকে নজর ফেলছে।
     “বড় খিদে পেয়েছে। কিচ্ছু না খেয়ে আমি রাতের অন্ধকারে ইটের ট্রাকে উঠেছি। এইটুকু জায়গা হেঁটে এসেছি। এখানেই যত গোলমাল। কলাইগাঁও থেকে সব খোলা। এখানে আসব বলে জেনে সবাই ভয় পেয়েছিল। এদিকে তোরা পড়ে রয়েছিস...।” সে ধরতে পারছে মীরার মা আরো শক্ত করে আনছে নিজেকে।
    “দরজাটা খোল।” মীরার মায়ের কাছে চেপে এলো। “তোর চেহারাটা ভালো হয়েছে। বড় ঘরে খাচ্ছিস দাচ্ছিস ভালো। ছেলে রোজগার করছে। আমারই এখন কষ্ট বড়...... বেমার হয়েছে থেকে কাজ কর্ম নেই।” এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে মীরার মায়ের পিঠে হাত রাখতে চাইছিল।
     “একবার যদি আমার গায়ে হাত দেবে!”
     “কী করবি? তুই আমার বিয়ে করা বৌ। আমার ছেলে মেয়েদের পেটে ধরেছিস তুই।” লোকটার কথার মোলায়েম সুরটা হঠাৎই মিলিয়ে গেল।
     “খোল বলছি দরজা। নইলে ঘর দরজা সব ভেঙ্গে ফেলব। সব জ্বালিয়ে দেবো।” ধম করে সে দরজাতে লাথি মারল।
     “খুলব না দরজা। তোকে আমি ঘরে তুলব না। এই ঘর আমি করেছি। আমি কিনেছি মাটি। তুই চলে যা। যেভাবে এসেছিস সেভাবে চলে যা। তোর ঐ মেয়েছেলের ওখানে চলে যা। যা! মাংস রাঁধ গিয়ে, মদ খা গিয়ে, ওর সঙ্গে এক বিছানাতে উঠ।” শান্ত মহিলা উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।
     এবারে সে মীরার মায়ের চুলে ধরে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে, “শালা মাগী বেটি, দু’পয়সা রোজগার করিস বলে এতো কথা।” দরজাতে আরো দু’বার লাথি দিয়ে সুবিধে করতে না পেরে সে কাছে শুকিয়ে রাখা লাকড়ি একটা তুলে এনে ধমধম করে কোপাতে শুরু করল, “ বজ্জাত মাগি, রেণ্ডীগিরি করে পয়সার ফুটানি দেখাচ্ছিস!”
     “ কী বললে, রেণ্ডীগিরি করেছি?” কুনুই থেকে রক্ত বেরুচ্ছে।
    “ বৌ বজ্জাত না হলে কোন পুরুষ ছেড়ে যায়? তোদের বড় ছোট দুই বোনই রেণ্ডী। তোর বোনকে কেন ও ছেড়ে গেল? তোরা ভালো বলে কি আর পুরুষগুলো ছেড়ে চলে যায়?”
    “বোনের কথা বলবি না। তোর খায় না পরে?”
    “ওকে ওর মরদ ছেড়ে গেছে। তোর মরদ বাড়ি ফিরেছে।” তার গলা সামান্য মোলায়েম হয়েছে।
    “ইহ! মরদ হতে এসেছে! লাগবে না এমন মরদ আমার! আমি তোকে ঘরে তুলব না বলেছি, তুলব না।”
     “তোর সব ধ্বংস হবে। ছেলেকে পুলিশে নিয়ে গেছে। রেণ্ডীর মেয়ে রেণ্ডী হবে। তোর আবার ফুটানি...।”
     “তুই এখান থেকে চলে যা বললাম। তোর মাগিকে কথাগুলো শোনা গিয়ে যা। আমি মরি, আমার ছেলে মরে, তোর কী? আমি তোকে ঘরে তুলব না।”
    এবারে সে লাকড়ি দিয়ে মীরার মাকে মারতে গেল।
    “আমাকে মেরে ফেলছে রে!” বলে চিৎকার দিয়ে মীরার মা জটলা পাকানো মেয়েদের দিকে দৌড় দিল। চিৎকার শুনে জোনের মা, মণির মায়েরা সবাই এমনিতেই এগিয়ে আসছিল। মীরার মা গিয়ে মণির মাকে জড়িয়ে ধরল। “আমাকে বাঁচা, এর হাত থেকে বাঁচা!” ওর কুনুই থেকে বেরুনো রক্তে কাপড়ে দাগ লেগে গেছে। “ ও মেয়েছেলে রেখেছে। আমি কিছু বলিনি। মেয়েছেলের সঙ্গে একই বিছানাতে আমাকে শুতে দিয়েছে । আমি কিছু বলিনি। একটা কানাকড়িও ও আমাকে দেয় নি। আমি যা পারি রোজগার করে খেয়েছি। তোরাই বল, এখন ও এলো বলেই কি আমি ঘরে তুলব?” মীরা এসে মাকে জড়িয়ে ধরল, “মা, হাতে ব্যথা পেলি কিসে? এতো রক্ত বেরুচ্ছে!”
    হাতের লাকড়িটা ফেলে দেয় নি লোকটা।
    মীরার মাকে জোনের মায়েরা ঘিরে ফেলেছে। মণির মাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
    লাকড়িটা উপরে তুলে নাচাতে নাচাতে একবার এগিয়েও পিছিয়ে গেল লোকটা, “আমার বিয়ে করা বৌ, আমি যাই করি। অন্যের কী?”
     “বিয়ে করা বৌ! এতো বছর ধরে তুই একে খাইয়েছিলি না পরতে দিয়েছিলি?”
     “তোর বেমার হলো বলে গুয়াহাটিটি আরেক পুরুষ ধরেছে। এখন বাড়ির কথা মনে পড়ল?”
     “বিয়ে করা বৌকে মারতে এসেছিস?”
    “বাড়ি ঘর দেখে এলি?”
    “রোজগার দেখে এলি?”
     সব্বাই মিলে ওকে চেপে ধরল। মীরার মা মণির মাকে জড়িয়ে ধরেই আছে।
    “ বল মীরার মা, ওকে ঘরে তুলবি?”
    “তুলব না। এমন মরদ আমার লাগবে না।”
    “শুনলিতো? যাগে তুই! যেভাবে এসেছিলি সেভাবেই যাগে!”
    পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে সবাই একটু চমকে গেলো।
     “চল আমার ঘরে চল।”
  
     
  পিঁপড়ে দলের মতো একের পেছনে আর জন কালীমায়ের থান পেরিয়ে একবার একবার প্রণাম করে মণির মায়ের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল।
    “ভয় করবি না। আমরা এতো জন আছি। কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।” কী যেন একটা ছিল ফেলানির কণ্ঠে। সবাই মাথা তুলে তাকালো।
     “ কেমন কেটেছে দেখ তো মীরার মায়ের হাতটা।”
     “এগুলোই লাগিয়ে দিই, এখানেই বেঁটে দিয়ে দি।” হাতের তালুতে টিপে রাখা কিছু গন্ধ বেরুনো জংলি পাতা মেলে দেখালো মীরা।
     মিনতি বিছানার নিচে থেকে পাটা বের করে মীরার হাত থেকে পাতাগুলো নিয়ে থ্যাঁতলাতে শুরু করল।
    বাইরে মীরার বাবার গালি গালাজ দুই একটা শোনা যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে গালির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
    এবারে একেসঙ্গে অনেকগুলো গাড়ির গোঁ গোঁ শব্দ। গাড়িগুলোর শব্দও মিলিয়ে গেল।
    পুরো ঘরে এখন ওই থ্যাঁতলানো গন্ধপাতার কড়া গন্ধ। কে যেন মীরার মায়ের শরীরে পাতার রস লাগিয়ে দিল।
    “উফ! উফ! ধরছে তো!”
    “ সামান্য না ধরলে রক্ত বন্ধ হবে কী করে? ঘা হয়ে যাবে যে নইলে?”
    মণির মায়ের কথাতে সবার মুখে সামান্য হাসি দেখা দিল।

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় একুশ (২১)

ফেলানি (এপ্রিল, ২০১৬ সংখ্যা মাসিক সাময়িক ব্যতিক্রমে বেরুলো এই অধ্যায়)              রি জার্ভের দিকে বস্তিটা বাড়বার আর জায়গ...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India