ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন



      
ফেরিখানা ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে এসে আমিনগাঁয়ে দাঁড়ালপাড়হীন একখানা শাদা শাড়িতে শরীর প্যাঁচানো যুবতীটির ম্লান চোখজোড়া উজ্জ্বল হয়ে পড়েছেকালো ভোমরার মতো ওর চোখ দুটো এক জোড়া খঞ্জনা পাখির উপর পড়ে স্থির হয়ে আছেখঞ্জনা দুটো টুপ টুপ করে লেজটা ওঠাচ্ছে আর নামাচ্ছেছোট্ট ফড়িঙের মতো খঞ্জনাদের লেজের ছন্দে ওর চোখের ভোমরা দুটোও ফেরি ঘাটের বালির উপর দিয়ে গুণ গুণ করে পাখা মেলে দিলযে স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো রূপালী বালুকণা চিকমিক করছিল সেগুলোর একএক টুকরোতে এই পড়ল তো, এই উঠলভোমরাদের পায়ে রূপোর গুঁড়ো লেগে গেল
           কেঁদে কেঁদে ফুলে উঠা ওর চোখজোড়াতেও হাসির বালুকণা চিকমিক করে উঠেছেসে বাবার সঙ্গে এসে রেলে চড়লএই রেল রঙিয়াতে যাবেতারপর রঙিয়াতে রাতটা থেকে সকালে ব্রাঞ্চ-লাইনের ছোট রেলটাতে চড়বেব্রাঞ্চ-লাইনের রেলে চড়ে বাপে মেয়েতে যাবে ভুটান পাহাড়ের নিচের সেই রাধিকা আর কৃষ্ণাইকে বুকে ধরে রাখা সেই জায়গাটিতে
যতই রেলখানা বন জঙ্গলে ভরা জায়গাটিতে গিয়ে ঢুকছে, ততই মেয়েটির চোখের ভোমরা দুটো চঞ্চল হয়ে উঠছেএখানে পড়ছে , ওখানে পড়ছেযেখানে পড়ছে সেখানেই ঝিরঝির করে ঝরছে পায়ের বালুকণাওর বয়সটাই হলো রূপালী বালুকণা কুড়িয়ে বেড়ানোরকেঁদে কেঁদে ফুলে ওঠা চোখের পাতাও উড়ন্ত ভোমরা কটিকে বেঁধে রাখতে পারে নারত্নমালার মনটি এ কদিন গুয়াহাটির সেই একদল মানুষের ঘরে বালিতে এক ভাঙ্গা শামুকের ওলটানো খোলার মতো পড়ে ছিলদেখলেই যে লোকটিকে ভয় করে, লোকটি যাতে কিছুতেই রাতে ওর কাছে না আসে তার জন্যে ঈশ্বরের কাছে কত প্রার্থনা সেই মানুষটি হঠাৎ চলে গেলআসলে লোকটি আজ প্রায় মাসখানেক ছিলই নাবায়ু পাল্টাবার জন্যে টিবি রোগী মানুষটিকে কোথাও নিয়ে গেছিলনিশ্চিন্ত রাতগুলোতে সে প্রাণভরে শুয়েছিল, গুনগুণ করে গান গেয়েছিলযেদিন রাতে বাড়িটিতে কান্নার রোল উঠল, সেদিন সে ভাশুরের মেয়েটির জন্যে ছেঁড়া কাপড়ে তৈরি বর-কনেকে ঘরে তৈরি পাটের খুদে খুদে জামা পরিয়ে শেষ করেছিল মাত্রওর ঘরে একদল মানুষ ঢুকে পড়েছিলওর শরীর থেকে জামা কাপড়, গয়না গাটি সব খুলে ফেলেছিলসাদা কাপড় পরতে দিয়েছিলতাকে মাটিতে শুতে দিয়েছিলএতো আগ্রহে তৈরি করা বর-কনেকে কেউ আবর্জনার সঙ্গে ঝেড়ে নিয়ে গেছেবর কনের জোড়টিকে এনে গুটিয়ে রাখতে গিয়েও সে আর তা করে নি
আজ মানুষটি চলে যাবার মাস খানিক পরে এই রত্নমালা নামের এক আধফোটা সাদা পদ্মটির মতো মেয়েটি সাদা একখানা কাপড় প্যাঁচিয়ে বাবা চন্দ্রধর মৌজাদারের সঙ্গে ঝোপ ঝাড়ের মধ্যি দিয়ে ব্রিটিশ সাহেবের বসানো ব্রাঞ্চ-লাইনের রেলটিতে উঠে বাড়ি আসছে
রেলটি দাঁড়িয়েছেএই জনশূন্য স্টেশনে রত্নমালা ও তার বাবা নামবেঅরণ্য ঘেরা এই স্টেশনে সময়ের থেকে আগে সন্ধ্যা নামেখুব কম মানুষের সমাগম হয় এখানেশুধু সোমবারে সোমবারে উজান মুখো রেলখানা যাবার বেলা স্টেশনটিতে কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা যায়বেশ কিছু গরুর গাড়ি এসে দাঁড়ায়গরু-গাড়ির থেকে চা পাতার বাক্স নামেবাক্সগুলো রেলে উঠেব্রাঞ্চ-লাইনের রেলটি আমিনগাঁয়ে দাঁড়াবেসেখানে বাক্সগুলো নামবেব্রহ্মপুত্র নদী ফেরিতে পার করে বাক্সগুলো পাণ্ডুতে নামাবেতারপর বাক্সগুলোর সাত সাগর তের নদী পার করবার যাত্রা শুরু হবেআজ একখানা ছই দেয়া গরু-গাড়ি এসে স্টেশনের কাছের শিমূলতলাতে দাঁড়িয়ে আছে রত্নমালা দৌড়ে গিয়ে গাড়িটার কাছ চাপলঝাঁপ দিয়ে ছইর ভেতরে ঢুকল
        
           
  ছইতে ছাওয়া গাড়িটা এসে গাছ গাছালিতে ঢাকা বাড়িটার মুখে দাঁড়ালবড় সড় ঘরশীতে রোদ পোহাবার মতো করে প্রশস্ত পূবের বারান্দা, গরমে গায়ে বাতাস লাগাবার মতো দক্ষিণের বারান্দাদুহাত শক্ত ডাঁট করে বওয়া খড়ের চালের উপর জালের মতো কাটা বাঁশের সিলিংউঠোনে ঢোকার আগে একটা ছোট্ট জলের ধারা তথা খাল পেরোতে হয়খালটি লোকে ব্যবহার করে তাতে একটা জলের শব্দ সারাক্ষণ শোনা যেতেই থাকেমৌজাদারের সঙ্গে যারা দেখা করতে আসে তারা সবাই সেখানে হাত পা ধুয়ে আসে জলের ধারা পার করে একটি তোরণ বিষ্ণুর দশাবতার খোদাই করা পাকা তোরণটা রত্নমালার পার হবার পক্ষে যথেষ্ট উঁচু সবাই তোরণটির নিচে একটু থেমে গিয়ে প্রণাম করে তবে বাড়িতে প্রবেশ করেএমন কি রত্নমালাও শুঁড় তুলে একটা নমস্কার করেমৌজাদারের মেয়ে রত্নমালা নিজের নামটা হাতিকেও দিয়েছিলরত্নমালা বলে ডাকলে হাতিটাও মাথা তোলে আর মেয়ে রত্নমালাও দৌড়ে আসে
বাপে মেয়েতে বাড়িতে ঢুকতেই কান্নার রোল উঠলরত্নমালা খানিক ক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলমায়ের কান্না দেখে সেও খানিকটা কাঁদলচোখে নাচতে থাকা ভোমরাগুলো নিয়ে সে আর কতক্ষণই বা চোখের জল ফেলতে পারে? পারে নিসে ঠাকুমার পুরোনো ফাটা পাটের চাদর একটা নিয়ে খুড়তুতো বোনের জন্যে বর কনে তৈরি করতে শুরু করলতাকে বর কনে তৈরি করতে দেখে মা ঠাকুমা পিসিরা আবারো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল
          বর কনে তৈরি করতে করতে সে একটা লক্ষ্য করল তার বহু চেনা ঘরখানা একেবারে বদলে গেছে, কোথাও কিছু একটা হয়েছেযেই আসে সেই তাকে ধরে কেবলই কান্না জুড়ে বসেচোখের জলগুলো তার চোখের ভোমরা দুটোকেও ভিজিয়ে ফেললউড়তে না পেরে পাখা দুটো মিইয়ে গেলচেয়ে থাকতে থাকতে পাখাগুলো ভেসে গেলওর ঝলমলে চোখদুটো যেন দুটো কালো অঙ্গার হয়ে গেলআলো নেই, প্রাণ নেই, রং নেইকেবল নিথর দুটুকরো জ্বলে পুড়ে শেষ হওয়া কালো অঙ্গারযেখানে সেখানে চুপটি করে বসে থাকা রত্নমালার চোখের অঙ্গার দুটো দেখে এবারে বাড়িটিতে নতুন করে অশ্রুধারা বইতে শুরু করলগোপনে , সে টের না পায় এমন করে, বাড়ির যেখানে সেখানে অশ্রুধারা বইতে থাকলতার চোখের ভোমরাগুলোকেই নয় শুধু, সে মানুষটাকেও এই চোখের জল ডুবিয়ে ফেললসব্বাই দেখল সে শুধু চুপ করে বসেই থাকে না, যেখানে বসে সেখানে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতেও থাকে
            রত্নমালাকে একদিন ওর খুড়ো এসে নিয়ে গেলবাড়ির সবাই চাইছিল সে অল্প বেড়িয়ে টেরিয়ে আসুক, মনটা ভালো হবেমৌজাদারের ভাই কুলধর বরুয়া পলাশতলি বাগানের বড়বাবুপলাশতলি বাগানটাই ভুটান পাহাড়ের নিচেদূরের থেকে দেখলে বাগানখানাকে একটি ঢেউ খেলানো সবুজ সাগর বলে মনে হয়ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল পাহাড়ের নিচে এ অঞ্চলে সোনা গজাতে পারবেনামটাই বা কে পলাশতলি রাখলফাল্গুন মাসে এ অঞ্চলে মাঘ বিহুর মেজি আগুনের মতো পলাশ ফোটেসে জন্যেই বোধ হয় বাগানটির নাম পলাশতলি হয়েছেপলাশতলি পর্যন্ত যোগাযোগের মাধ্যম হল হাতি আর গরুর গাড়িবাগানের বড় সাহেব অলিভার স্মিথ সাহেব বাগানের স্টাফের মানুষজনকে কোথাও যেতে হলে কাগজে লিখে দেনতাদের নিয়ে আসতে বা রেখে আসতে যাবার বেলা Bullock cart with Soi’ ব্যবহার করতে হয়চা পাতার বাক্স বা অন্যান্য জিনিসের জন্যে হাতি আছেমৌজাদারের হাতি রত্নমালাকে বাগানে মাস কয়েকের জন্যে দেয়া হয়েছেচতুর বড়বাবুটি এই জন্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগটুকু করে দিয়েছেন
রত্নমালা হাতির উপরে চড়ে খুড়োর সঙ্গে মৌজাদার তনয়া রত্নমালা এসে সেই নদীটার কাছে পৌঁছুলোশুকনো নদীশুধুই ভেজা পাথররত্নমালা দাঁড়ালোমাহুত ওকে দাঁড় করায় নিনিজেই দাঁড়িয়েছেহাতিটি জানে নদীটি পার করার আগে অল্প দাঁড়াতে হয়সবাই দাঁড়ায়কখন বা শুকনো নদীতে পাগলা জোয়ার আসে কোনও ঠিক ঠিকানা নেইদাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই দেখা গেল, ঢেউ তুলতে তুলতে শুকনো নদীতে নুড়ি-পাথর ভেঙ্গে জোয়ার আসছেবেশি সময় নয়খুবই কম সময়ে নদী আবার আগের মতো হয়ে যায়আজও হলোমানুষ রত্নমালাকে পিঠে নিয়ে হাতি রত্নমালা নদীখানা পার করে গেলএবারো, তাকে কেউ কিছু বলে নিজেনে বুঝে সে নিজেই নিজের কাজ করেছে
         
           
  এর আগেও রত্নমালা খুড়োর সঙ্গে বাগানে এসেছেমা কাকীমাদের সঙ্গে আসে আর চলে যায়এবারে সে একা অনেকদিন থাকবে বলে এসেছেসঙ্গে এসেছে রম্ভা দিদিবাগানে এসে তার সবসময়েই ভালো লাগেসবচেভালো লাগে উড়ন্ত ময়ূরগুলোকে দেখতে দিনটিতে এক না হয় একবার সে ময়ূরের পেখম তোলা দেখবেইছোট ছোট ছাগলের মতো হরিণগুলোকে দেখেও ওর ভালো লাগেআর এত্তোগুলো সারি সারি চা গাছ! সবুজ ঢেউ খেলানো একটা চাদর মেলে গিয়ে নীল পাহাড়টিতে গিয়ে মিশে গেছেসন্ধেবেলা বাঘের গর্জন শুনতে পেলে ও ভয়ও পায়আর ভয় পায় সময়ে অসময়ে এসে পড়া বন্য হাতির দলকেমাঝে মাঝে বাগানের মজুরেরা মেরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা প্রকাণ্ড সাপগুলোকে দেখলেও তার ভয় করেসবচেভয় করে গা কাঁপানো জ্বরটিকেবাবা তাকে বাগানে আসতে দিত না কেবল ঐ জ্বরটির জন্যে বাগানে আসবার কথা উঠলেই জ্বরের কথা উঠেখুড়োর প্রথম ছেলের মরবার কারণও ছিল ঐ গা কাঁপুনি জ্বরকথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎই এই কাঁপুনি জ্বর একটা পুরো মানুষকে কাবু করে ফেলেবাতাসে যেমন করে কলাপাতা কাঁপে তেমনি কাঁপতে শুরু করে তার পর গা পোড়া জ্বরকুইনাইন খেলেও লাভ কিছু নেইজ্বর কমলেও লিভার বেড়ে যায়পেট ঢোল হয়ে পড়েমানুষটা যে চা গাছের গুড়ির মতো হয়ে পড়েকোনও কাজেই আর লাগে নাগুড়ি পচার মতো পচতে শুরু করে উঁচু জমির এই পলাশতলি বাগানের জল একেবারে বিশুদ্ধএই বিশুদ্ধ জলে ম্যালেরিয়ার মশা প্রবল প্রতাপে বংশ বিস্তার করেম্যালেরিয়ার বীজাণু শরীরে নিয়ে মশাগুলো গোটা অঞ্চল জুড়ে বনবন করতে থাকেলেবারদের পাতা মাপতে আসবার সময়েই দুদুটো কুইনাইন পিল খেতে দিতে হবেম্যানেজার স্মিথ সাহেবের কড়া হুকুমখুড়ো তাকেও তেতো বড়ি গুটি কয় দিয়ে সবসময় খেতে বলেছেসব সময় ঐ তেতো বড়িগুলো খেতে তার ভীষণ বাজে লাগেবাবাই বা তাকে কেন বাগানে পাঠালো? ম্যালেরিয়া হয় বলেই, একটা সময় ছিল, বাবা তাকে এদিকটাতে আসতেই দিত নাসে বুঝতে পেরেছেখুড়োও তাকে আদর করে এখানে আনে নিতাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে রাখতে চাইছেতেতো বড়ি কটা গিলবার বেলা তার চোখের জল নেমে আসে
              কিছু দিন থেকে ওর মনটা ভীষণ খারাপ লাগছেওর যেন কেউ নেইবাবারাও ওর কোনও খবর টবর নেন নিনীরব এই বাড়িটাতে সে আর রম্ভা দিদিরম্ভা দিদি কাজের ভেতর ওই ভাত কটা রান্না করে, গাল ভরে খায় আর পাটি একটা পেতে শুয়ে থাকেডাকলেও রাগ করেখুড়ো বাড়িতে নেইযুদ্ধের জন্যে বাগান থেকে শখানিক মজুর নিয়ে মিছামারি গেছেসেখানে নিজের নিজের বাগান থেকে মজদুর নিয়ে গিয়ে আলাদা আলাদা বাগান থেকে মানুষগুলো গিয়ে জড়ো হবেমিছামারিতে এয়ার ফিল্ড আছেসেখান থেকে ইংরাজ সরকার যুদ্ধের কাজে খাটাবার জন্যে বাগান থেকে মজদুর চেয়ে পাঠিয়েছেআর খুড়োরই বা কি, ঘরে থাকা আর না থাকাবন্ধ পেলেই বাড়ি চলে যায়
          বাকি রইল রত্নমালা আর মাহুত কিনারামরত্নমালা আর কিনারাম সাধারণত বাগানের কাজে লেগে থাকেপাহাড়ের নিচের দিকে বাগানে নতুন চারা গাছ রোয়া হচ্ছেপ্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাছ কেটে ফেলা গড়িয়ে ফেলা হচ্ছেরত্নমালা নইলে কারবা সাধ্য সেই গাছ নাড়াবার? দিন দুই কাজ বন্ধরত্নমালাকে নিয়ে কিনারাম ঘরেই আছে
        মেয়ে রত্নমালাকে দীর্ঘ নির্জন দিনটি যেন একেবারে চেপে ধরেছেকিনারাম জাল দিয়ে মাছ মেরে এনে দিয়েছিলতাই দিয়ে রান্না করা ঝোলে ভাত খেয়ে রম্ভা দিদি পাটি পেতে নাক ডাকছেসে ধীরে ধীরে এসে কিনারামের কাছে দাঁড়ালোসে রত্নমালাকে কলাগাছ খাওয়াচ্ছিলকিনারামের শরীরের রং পাকা পেয়ারার মতোচোখ জোড়া ছোট ছোটহাসলে চোখের জায়গাতে রেখা একটাই দেখা যায়মণিগুলো যেন পাগলা নদীটির বুকের কালো পাথরের দুটো টুকরোঅল্প একটু হাসলেই পাথরের টুকরোগুলো ঘোলা জলে ঢেকে যাবার মতো যায়
         সে তরুণী রত্নমালার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল চোখের কালো পাথরের টুকরো কটার উপর রয়েছে মাছে ঘোলা করা খানিক জলসে হাতিটিকে আদর করছে, খা রত্নমালা খা’’ নিজের নামটি তার মুখে শুনে মানুষ রত্নমালার হাসি পেয়ে গেলসে হাতিকে বসিয়ে তার উপরে চড়তে যেতেই রত্নমালা আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলে কোথাও যাবে বুঝি ?’’ আসলে তার কারো সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলবার ইচ্ছে হচ্ছিল
শিকার দেখতে সে হাতিকে দাঁড় করিয়েই দিল
কার শিকার?তরুণী রত্নমালার স্বর কাঁদো কাঁদো
লেবারদের হরিণ শিকার
আমাকে নেবে?সে চট করে জিজ্ঞেস করে ফেলল
         কিনারাম আবারো হাতিকে বসালোমেয়ে তাতে উঠে গেলঅনেকদিন পরে সে রত্নমালার পিঠে চড়েছেকিনারামের সঙ্গে চড়েছেচেনা ছন্দে হাতি যেতে শুরু করলকিনারাম একটি সাঁকোর কাছে গিয়ে হাতিকে দাঁড় করালোসাঁকোটি ব্রিটিশ সরকারের তৈরিমজবুত লোহার সাঁকোসাঁকোর নিচে শুধুই ভেজা বালি আর পাথরএই সেই পাগলা নদীসাঁকোর নিচে তির ধনুক নিয়ে একদল মজদুর দাঁড়িয়ে আছেসামনের থেকে আরো এক দল হুর হুর করে হরিণ তাড়িয়ে আনছেরত্নমালা চোখে স্পষ্ট দেখতে পেল দুটো ছাগলের মতো হরিণমুগার মতো রং , তাতে সাদা গোল গোল ফোটার মতো দাগ সারা বাগান জুড়ে এই ছোট ছোট হরিণগুলো সে বহুবার দেখেছেতির বিদ্ধ হরিণগুলো কাঁধে ঝুলিয়ে মজদুরের দল চলে গেলএই হরিণের মাংসও সে অনেকদিন খেয়েছেবাড়ির পেছনের উঠোনে মাটিতে পোঁতা একটা গোল কাঠের টুকরো মাংস কাটতে কাটতে একদিকে বাঁকা হয়ে গেছে
হরিণ শিকার দেখেই রত্নমালার দিনটা কেটে গেল
         পর দিন, তার পরদিনও, খুড়ো ফিরে আসার পরেও তার দিনগুলো কিনারামের সঙ্গে রত্নমালার পিঠে পিঠে পাগলা নদীর পারে পারে, সবুজ সাগরের ঢেউগুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়ল
         একদিন রাত ভোর না হতেই কিনারাম রত্নমালাকে নিয়ে এসে হাজির হলোরম্ভা দিদি শুয়ে আছে, খুড়া বাড়িতে গেছেসে রত্নমালার পিঠে চড়ে সবুজ সাগরের মাঝে মিলিয়ে গেলআজ কিনারাম পাগলা নদীতে জাউরিয়া মাছের ঝাঁক দেখাবেমাছগুলোর চামড়া কালো আর রূপালি মেশামুখটা কর্কশ মনে হয়ে যেন কেউ সুচ দিয়ে খুঁচিয়ে কিছু ফুটো করে রেখেছেচামড়া আর পাতিগুলো বড্ড আঠা আঠাএ মাছের খোসা ছাড়াতে রম্ভাদিদির বেশ কষ্ট হয়ছাইতে ভালো করে মাখিয়ে না নিলে তাতে বটি দা লাগাতেই পারে নাস্বাদের জন্যেই মাছগুলো কষ্ট করে কাটে সেকিনারামের মুখে সে শুনেছে এই মাছ ধরতে পাহাড়ের উপরের দিকে যেতে হয়সেখানে পাগলা নদীতে কিছু গর্ত আছে, যেখানে জল জমে থাকেআকাশ গোলাপি হতেই সে ডোবাগুলোতে জাউরিয়া মাছের ঝাঁকগুলো আসেউপরের দিকে নদীতে মাঝে মাঝেই হাঁটু সমান গর্তে স্ফটিকের মতো জল দেখা যায়বাকি সবটাই ভেজা ভেজা পাথর আর বালিভেজা পাথর আর বালির মাঝে মাঝে এক একেকটা গর্তআকাশ রাঙা হতেই সেই গর্তগুলোতে কালো রূপালী মাছগুলো এসে খেলতে শুরু করে চুপ চাপে জাল ফেলে দিলেই মাছগুলো ধরা যায়খিরিক করে একটা শব্দ হলেই মাছগুলো তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যায়আকাশে গোলাপি রং থাকা অব্দিই মাছগুলো থাকে, আলো খানিকটা উজ্জ্বল হতেই ওরা চলে যায়কিনারাম কদম গাছ একটার নিচে হাতিকে বসালোরত্নমালা বড় শান্ত হাতিওকে বাঁধতে হয় নামাহুত কিনারামের আদেশ না পেলে সে এক পাও এদিক ওদিক করে নাশীত আসতে এখনো দেরিকিন্তু এই পাহাড়ের নিচে সবুজ সাগরটিতে শীত অল্প আগেই চলে আসেবিন্দু বিন্দু কুয়াশা পড়তে শুরু করেছেইবাতাসেও একটা মৃদু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাবমেয়ে রত্নমালা কিনারামের পেছনে পেছনে একটা সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলএ জায়গাটাতে অল্প চড়াই উঠতে হয়তার পরেই নদীর উঁচু পা শুরু হয়েছেবালি মাটিপা পড়লেই মাটি অল্প ঝর ঝর করে তলাতে ঝরে পড়েসে বারে বারে পেছনে পড়ে যাচ্ছেকিনারাম অল্প দাঁড়িয়ে গিয়ে ওর হাতখানা ধরলআকাশ অল্প অল্প ফর্সা হয়ে এসেছে তাকে সে মুখে রা করতে মানা করে রেখেছেশব্দ হলেই মাছ একটাও থাকবে নানদীর পা শুরু হয়েছেখাড়া বালি মাটির পারত্নমালা দাঁড়িয়ে পড়লকিনারামওরত্নমালা নামবে কী করে? কিনারাম হাত দুখানা বাড়িয়ে তাকে ধরে নিলদুজনে ধরাধরি করে নেমে গেলকোথাও একটা পাখি দীর্ঘ সুর ধরে ডাকছেবালিতে নেমেই রত্নমালা আকাশের দিকে তাকালোশাদা মেঘগুলো গোলাপি হয়ে গেছে নদীর হাঁটু জলে কেউ যেন গোলাপি রঙের পাটের চাদর একখানা মেলে দিয়েছেকিনারাম তাকে আঙুলে দেখিয়ে দিলসত্যিই জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট গর্তে জাউরিয়া মাছের ঝাঁক ঝিলমিল করছেকিনারাম নদীতে নেমে গিয়ে জাল মেলে ধরলরত্নমালাও অল্প দাঁড়িয়ে থেকে শেষে নদীতে নেমে গেলপায়ের পাতা সমান জলে ওর ঘি রঙের পা দুটো দুটো ফোটা চাঁপা ফুলের মতো ঝলমল করে উঠলসামনের গোলাপি রঙে রাঙ্গা গর্তে সাঁতরাচ্ছে এক ঝাঁক কালো রূপালি জাউরিয়া মাছ, আর কাছেই ঝলমল করছে খোলা চুলের আরো এক কালো আর ঘি রঙ মেশানো জাউরিয়া মাছকিনারাম জাল ধরে অল্প দাঁড়িয়ে রইলহঠাৎই একটা শব্দ শুনতে পেলপাগলা নদীতে জোয়ার এসেছেগড়িয়ে দেয়া বিশাল এক পাথরের মত জোয়ার আসছেসাদা সাদা ফেনাগুলোতে গোলাপি রঙ ছড়ানোকিনারাম ঘোপ করে রত্নমালাকে তুলে ধরলনিল , জলে এই ওদের ভাসিয়ে নিল বলেনিমেষে রত্নমালাকে বুকে নিয়ে সে গিয়ে পা পেলদুজনের গায়েই রূপালি বালুকণা লাগলপাগলা নদীর জোয়ারের ছিটেয় দুজনের শরীর ভিজে গেলওদের চোখে আর কিছুই ছিল নাছিল শুধু গোলাপি জলের ডোবাতে খেলায় ব্যস্ত এক ঝাঁক কালো রূপালি মাছএকটাও শব্দ উচ্চারণ করা যাবে নামাছগুলো যে খিরিক করে শব্দ একতা হলেই হারিয়ে যায়
         বাগানের সীমা পার হলেই পাহাড়ের নিচে সারি সারি চন্দনের গাছএ জমিতে গাছের গুটি খেয়ে পাখিতেই নিশ্চয় এই চন্দন গাছের চারা গজিয়েছিলএখন পাহাড়ের নিচে আঁকা বাঁকা করে চন্দন কাঠের একখানা সম্পূর্ণ সুরভিত অরণ্যমিঠে, লাল লাল চন্দন গুটি খাবার জন্যে গাছে গাছে, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিকিনারাম ওকে জাউরিয়া মাছের ঝাঁকই নয়, চন্দন কাঠের সুরভিত অরণ্যও দেখালোসেদিন রত্নমালা মুখে কথা বলতে পারছিল নাকথা কিছু শুনলেই যে নির্জন অরণ্যে চন্দনের বীজ খেতে ব্যস্ত পাখির ঝাঁকগুলো নিমেষে উড়ে চলে যায়
        কী করেই বা কথা বলে রত্নমালা ? ওর যে গোলাপি নদীর জলে নাচতে থাকা কালো-রূপালি মাছের ঝাঁক , চন্দন গাছে বসে গান গাওয়া পাখিগুলো, পেখম তোলা ময়ূরের পালকের রঙ বড় ভালো লাগেনীল রঙে হাজার হাজার তাঁতে বোনা ফুলের কাজরঙ আর ফুলগুলো নাচছিলসে মেয়ে একটাও কথা বলতে পারছিল না
          রত্নমালাকে নিয়ে যেতে মা, বাবা আর কাকিমা এলেনতাকে দেখে মানুষগুলো অবাক হয়ে গেলবাগানের জল-হাওয়া গায়ে লাগানো ভালোতাই বলে মেয়েটা কি অমন পদ্ম ফুলের ফুলের মতো ফোটে উঠবে ? মায়েরা আসার পরদিন সবাই দেখল রত্নমালাকে বেঁধে রাখা জায়গাটিতে একটি বিরাট বড় হাতি দাড়িয়ে আছেঅন্ধকারেও তার পাকানো দাঁত জোড়া সবাই দেখতে পেলএক দুদিন নয়, অন্ধকার হবার সঙ্গে সঙ্গে রোজ দাঁতাল হাতিটা এসে রত্নমালার কাছে দাঁড়ায়, রাত ভোরে আবার চলেও যায়প্রত্যেক দিন লোকে ভাবে আজ আর রত্নমালাকে দেখতে পাবে না, হাতিটা নিয়ে যাবেকিন্তু তাকে দেখা যায়, সে একই রকম শান্ত হয়ে গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকে রাতে বাড়ির ভেতর থেকে সবাই টের পেল দাঁতাল এসেছেসবাই স্থির হয়ে যায়কখনো বা কেউ একজন কৌতূহলে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে তাকায়, দেখে একজোড়া হাতিনিঃশব্দে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে
         এ কদিন মা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে শুয়েছেনএকদিন রাতে মা মেয়েকে কাছে না দেখে চমকে উঠলেনদোয়ারখানা আজানো ছিলঠেলা দিয়ে খুলে সেখানেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেনএক জোড়া হাতি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেতার থেকে অল্প দূরেই এক জোড়া ছেলে মেয়েছেলেটার শরীরের পাকা পেয়ারার রং দাঁতালের ঘি রঙের দাঁতজোড়ার মতো অন্ধকারেও ঝলমল করছেতিনি কথাটা কাউকে বললেন নাশুধু আর একরাতে এখানে থেকে বাড়ি যাবার কথা তুললেনদুজন মেয়ে মানুষ বেরিয়ে এসেছে, বাড়িখানা এমনিতেই ছাড়া বাড়ি হয়ে আছে নিশ্চয়মা রত্নমালাকে পুরোটা দিন চোখে চোখে রাখলেনএদের সব কথাই স্পষ্ট হয়ে গেলএকবার সে এসে মেয়েকে কলাপাতায় মোড়া কিছু বকুল ফুল দিয়ে গেল , একবার অল্প পাকা হীরাচেরা মেয়ে মাথা নুয়ে এখানে ওখানে বসে থাকে আর চোখের জল ফেলেবাড়ির লোকে ভাবে সেতো কাঁদবেই, এ এমন কী নতুন কথা? মা বুঝতে পেরেছেন মেয়ের এ অন্য চোখের জল সে রাতেই হাতি রত্নমালা আর মানুষ রত্নমালা হারিয়ে গেলহাতি রত্নমালা ঘুরে এলো, মানুষ রত্নমালা আর এলো না
তার পরের কথাগুলো বড় সংক্ষিপ্তমেয়ে একটা জন্ম দিতে গিয়ে রত্নমালা মারা গেলমৌজাদারের ভয়ে পাহাড়ে গিয়ে লুকোনো রত্নমালা আর বেঁচে থাকতে পারল নাবাচ্চাটাকে নিয়ে কিনারাম বাগানের কাছে নিজের গাঁয়ে ঘুরে আসার কদিন পর তার গুলিবিদ্ধ দেহ নদীতে দেখা গেছিলজাউরিয়া মাছের ঝাঁক যখন নদীতে খেলতে আসে তখন লোকে সে দেহ নদীতে ভাসতে দেখেছিলসেই দাঁতাল হাতিটা এসে যে তারা গাছে ভরা ডোবাতে লুকোয় সেখানে কিনারামের রক্ত বয়ে গেছিলকেউ টু শব্দটিও করে নি
           রত্নামালা আর কিনারামের মেয়েটিকে বহুদিন ধানের ডুলিতে ঢেকে রেখেছিলপাহাড়ের তলায় গ্রামটিতে সে বড় হয়েছিলকিনারাম মায়ের কামরাঙ্গা হারটিও মেয়ের সঙ্গে নিজের বাড়িতে সমঝে দিয়েছিল কামরাঙ্গাহারটি বুঝি কিনারামের বাড়ির লোকেরা মাটিতে পুঁতে রেখেছিলকেউ বুঝি সেখান থেকে মাঝরাতে কেমন এক আলো বেরোতে দেখেছিল ওঝা ডেকে এনে ঝাড় ফুঁক করে মণিটা চুলোর উপরে সরিষার ডুলিতে ভরিয়ে রেখেছিল
             তার পরের কথাগুলো আর ছোটযুতিমালাকে গোটা গ্রাম যেন ধানের ডুলিতে ঢেকে রাখার মতো রেখেছিলতেমনি করে থেকেই সেও একদিন যৌবনে পা দেয়যুতিমালা নিজেই জানত সে অন্য মেয়েদের মতো যেখানে সেখানে বেড়াতে বেরোতে পারে নাসে এক সময় একে ওকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করে দাঁতাল হাতিটা এসে যে তারা গাছে ভরা ডোবাতে লুকিয়ে থাকত সে জায়গাটা কোথায়? বাগানের কোন কোয়ার্টারে ঢোকার পথে হাতিটা এসে মাদি হাতির কাছে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকতসে রকম সময়েই যুতিমালা একদিন ক্ষিতীশ ঘোষ নামের জোয়ান ছেলেটির সঙ্গে পরিচিত হয়ক্ষিতীশ নামী মিঠাইর কারিগরঅসুরের মতো খাটতে পারেছেলেটি বড় কম বয়সে ভালো পশার জমিয়েছিলপাহাড়ের নিচের বাগানটির থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ কি: মিঃ দূরের শহরমুখো যে গ্রামটিকে রেললাইন ছুঁয়ে গেছে সেখানে তার এক মিষ্টির দোকান বেশ বড় হয়ে উঠেছিলমৌজাদের পরিবারটি যে শহরে থাকে সেখানে বিয়ে-শ্রাদ্ধেতে সেই মিষ্টি যোগান দেবার দায়িত্ব নেয়পয়সা কড়িও হাতে এসেছেভুটান পাহাড়ের নিচে এই গ্রামে বছরে এক বড় মেলা বসেক্ষিতীশ এই মেলাগুলোতে জনা তিনেক কর্মচারী নিয়ে প্রতিবছরেই একটা দোকান দিয়ে এসেছেশুরুর দিনগুলোতে শিলিগুড়ি থেকে এসে এই মেলাগুলোতে দোকান দিয়েই সে পায়ের নিচের জমি পাকা করেছিলসাইকেলে মালপত্র বেঁধে সাঁকো ছাড়া ভাঙ্গা ছেঁড়া রাস্তাগুলো দিয়ে সে মেলায় মেলায়, বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াতোযেখানে রাত সেখানেই কাতআজকাল মেলাগুলোতে সে আর নিজে যায় না, কর্মচারী পাঠিয়ে দেয়এই মেলাতে সে এসেছে অন্য এক কারণেএই মেলাতে ভুটিয়া লোকেরা কুকুরের বাচ্চা বিক্রি করবার জন্যে নিয়ে আসেএরা যে বাচ্চাগুলো আনে সেগুলো ছাগলের বাচ্চা থেকেও ছোট পুতুলের মতো দেখতে হয়কিন্তু বড় হলে হয় ঘোড়ার সমানসেগুলো ওরা অন্য জিনিসের সঙ্গে বিক্রি করতে নিয়ে আসেসে এসেছে ঐ পুতুলের মতো ছোট্ট কুকুরের খোঁজেনতুন সাজানো ঘরে রাতে গিয়ে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে তার কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগেকুকুর একটা থাকলে তার সঙ্গী হবেসাত জায়গাতে থেকে সাত ধাক্কা খেয়ে বড় হয়েছে সে, তার এ জগতে কেউ নেইটাকা পয়সা হতে দেখে শিলিগুড়ির কোনও কোনও নিজের মানুষ বেরিয়েছেমাঝে মধ্যে খবর আত্তি করতে , টাকা পয়সা চাইতে আসেসেও দেয়এলে ঘরে রাখে, খাইয়ে বসিয়ে পাঠায়কিন্তু এইটুকুন মানুষে তার ঘরের নির্জনতা ঘোচে না
         
           
  এই মেলাতে সে যুতিমালাকে দেখতে পেলদখনা পরলেও ওর চেহারা কারো সঙ্গে মেলে নারাজহাঁসের মতো ঝিল মিল করে যে মেয়ে তার খবর বের করা এমন কী কঠিন কাজ? সে ঐ কোয়ার্টারও দেখে এলোঘরটা ভেঙ্গে চুরে গেছেকেউ থাকে না সেখানেঘরটার সামনে আগের সেই তারা গাছে ভরা ডোবাও আছেতার পর সে সোজা যুতিমালার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছুলোভয় ডর নেই ছেলের, এমন জোয়ান মানুষশরীরের জো আছে, পয়সার জোর আছেযুতিমালার বাবা কিনারামের সমাজের সমস্ত নিয়ম মেনেই সে তাকে নিয়ে গেলসে অবশ্য কুকুরের বাচ্চা একটাও নিয়ে গেলএক ভুটিয়া ছেলে হলৌচোলারজেবে ভরে দুটো কুকুরেরে বাচ্চা এনেছিলহাতের তালুতে নেয়া যায় এমন ছোট্ট কুকুর বাচ্চা দুটোকে তার হাতে দেবার সময় সেই ভুটিয়া দুটো চুমো খেয়ে দিয়েছিল
তার পরের কথাগুলো যেন তারা গাছে ঢাকা ডোবাতে গুলি খেয়ে পড়ে রয়েছিল ছিল যে সেই পেয়ারা রঙের জোয়ান ছেলেটির জীবনটির মতো, চোরাই ব্যাপারীতে উজাড় করা পাহাড়ের নিচের সুরভিত চন্দন কাঠের অরণ্যের মতো, মেরে মেরে মাংস খেয়ে শেষ করে ফেলা সেই ময়ূর পাখিদের মতো, ফুটফুটে হরিণগুলোর মত ---সবই আরম্ভ হয়েছিল, সবই ছিল, কিন্তু এখন কিছু নেইআছে শুধু হাহাকার, শূন্যতা, অপূর্ণতাজোয়ান ছেলের বুকের থেকে বেরুনো ছলাৎ ছলাৎ রক্তের মতো, কেটে গড়িয়ে ফেলা চন্দন গাছের অরণ্যে বাসা বাঁধা আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকারের মতো, পালক টেনে টেনে মেরে লাল মাংস বের করে ফেলা ময়ূর পাখিগুলোর মসৃণ উলঙ্গ শরীরের মতো, কেটে কেটে বাজারে ভাগ করে রাখা ফুট ফুটে হরিণগুলোর রক্ত লেগে থাকা মাংসের মতোকেবল শূন্যতা,ধ্বংস এবং হাহাকার
ভয়ডর নেই ছেলেটার, ভেবেছিল পৃথিবীর সমস্ত বিপদের সঙ্গে লড়াই করা যায়জেতা যায় যুদ্ধ করেকোঁকাচ্ছিল যুতিমালা ঘরেওকে তেমনি রেখে ক্ষিতীশ বেরিয়ে গেছিলচারদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল, বন্দুক ছুটছিলবহু মানুষ মরাপাটের ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে ছিলসেই যে গেল সে আর ঘুরে এলো নাযুতিমালা মেয়ে একটির জন্ম দিয়ে উঠোনেই পড়েছিলপ্রাণ বাঁচিয়ে ক্ষিতীশের দূর সম্পর্কের ভাতিজা রতন এসে এ বাড়িতে পৌঁছেছিলসে তাকাচ্ছিলআগুন ধরিয়ে দেয়া ঘরের চালখানা এসে অচেতন যুতিমালার গায়ে পড়ছিল বলেসে পুকুরে ঝপাং করে একটা শব্দ শুনেছিলকেউ কচি শিশুটিকে জলে ফেলে দিয়েছিললোকগুলো চলে গেছিলরতন বেরিয়ে এসে পুকুরে এসেছিলদল ঘাসের মাঝে শিশুটি পড়ে রয়েছিলরতন ঘোষ তাকে দলবনের মধ্যি থেকে এনে কোলে তুলে নিল
এই মেয়েটি ফেলানি ওর নামটির সঙ্গে থেকে গেল জলে ঝপাং করে হওয়া সেই শব্দজলে ফেলে দেয়া মেয়ে ফেলানি হলো
লম্বোদর ওকে বাড়ি নিয়ে আসার পরেও নামের সঙ্গে শব্দটি জড়িয়ে রইললম্বোদরের ঘর উঠোন করেই সে এখন ছেলের মা, সাত মাসের পোয়াতিএক হাতে চুলে তেল মেখে মেখে আর হাতে ঝলমলে ফোটা লাল গোলাপ ছুঁয়ে আছে যে সেই ফেলানি, রত্নমালার নাতনি, যুতিমালার মেয়েআশ্বিনের ধানের মাঠের মতো সাত মাসের পোয়াতি তরুণী, বঁধুটিই ফেলানিলম্বোদরের ঘরনি, মণির মা




টীকা:
) খঞ্জনা: অসমিয়াতে পাখিটির নাম বালিমাহীএর প্রতিশব্দ আছে খঞ্জনাখঞ্জনা বাংলাতে পরিচিত নামযদিও স্থানীয় নাম পেলে শোধরানো হবে
) মেজিঃ ছই দিয়ে তৈরি একরাতের অস্থায়ী ঘরযা পৌষ সংক্রান্তির পরদিন মাঘের প্রথম ভোরে জ্বালিয়ে দেয়া হয়অসমের বরাক উপত্যকার বাংলাতে একে বলে ভেড়াভেড়ি বা মেড়ামেড়ির ঘরযদ্দূর জানি, বাংলা শব্দটি ব্রহ্মপুত্রের বাঙালিদের মধ্যে পরিচিত নয় তাই মূল নাম রেখে দিলাম
) জাউরিয়াঃ  দল বেঁধে পাহাড়ের উপরের ডোবাতে ভেসে বেড়ায় বলে অসমিয়াতে এমন নামকেউ বাংলা নাম বলে দিলে উপকৃত হব
) হীরা চেরা: মূলে শব্দটি জেতুলি। সিলেটিতে হীরাচেরা বলে। এক ধরণের লতানে গাছের ফল, যে গাছে কাঁটা থাকেRosaceae পরিবারের গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Rubus hexagynous
) তারা গাছে ভরা ডোবাতে: অসমিয়াতে শব্দটি তরাণিডরাঅসমের বরাক উপত্যকাতেও ডোবা জমি বোঝাতে ডরবা ডহর ব্যবহৃত হয়যেমন, নারায়ণডর, মালিনীডরহ্রদথেকে ডরএসেছেকিন্তু তরাণিডরার মতো নামকরণের নজির বাংলাতে নেইবেতের মতো সবুজ এক ধরণের আধা জলজ উদ্ভিদকে তারাগাছ বলে যার থেকে সাদা ফুল হয়বাংলাতে কেউ এর বিকল্প নাম, যা অসমে চলে , জানালে শোধরানো হবে Zingi beraceae পরিবারের গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Alpinia alughas
) কামরাঙ্গা হারঃ মূলে শব্দটি কর্দৈমণি। কর্দৈশব্দের অর্থ কামরাঙা বাংলাতে হারটির নাম কামরাঙ্গা হার
) দখনাঃ বডো মেয়েদের ঐতিহ্যগত পোশাকমেখলা চাদরের মতো
)হলৌ চোলাঃ পশু-চামড়াতে (সম্ভবত হলৌ বাঁদরের) তৈরি এক ধরণের পুরো শরীর ঢাকা আলখাল্লা

10 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India