ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন




ফেলানি 
(জানুয়ারি , '১ সংখ্যা ব্যতিক্রমে প্রকাশিত হয়েছে এই অধ্যায়।)
ভোরেই আর্মি এসে সব কটি শিবির থেকে মানুষ তুলে নিলোপ্রায় সবারই কেউ না কেউ নিখোঁজ হয়েছে বৈশ্য বাবুর সঙ্গে ফেলানিও বেরুলোওকে আরো দুজন মহিলার সঙ্গে সামনে বসতে দিল
গাড়ি চলতে শুরু করলে কিছু পরেই সে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লঠিক ঘুম নয়, এক ধরণের তন্দ্রা যখন তখন কোথাও একটু হেলান দিলেই, শুয়ে পড়লে তো কোনও কথাই নেই, চোখে কালো ছাই রঙের এক চাদর নেমে আসেহালকা সেই অন্ধকারের মধ্যি দিয়ে সে খুব ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েআজও গাড়ির সিটে হেলান দেবার সঙ্গে ওর চোখে নেমে এলো পাতলা চাদরখানাক্রমেই সেই পাতলা কুয়াশা রঙের চাদরখানা একটা ডাঁট কালো পর্দা হয়ে এলোপর্দাটি মাঝে মাঝে ঝাঁকুনি খেয়ে আবারও স্থির হয়ে পড়েএবারে ঐ কালো পর্দাটি এক গর্ত ভরা শুকনো কলাপাতার ডাঁটার সমান হয়ে ওকে পোঁতে ফেলল ওর গালে মুখে সর্বত্র খসখসে কলার শুকনো পাতামাছ আটকাবার পর জাল টেনে আনলে তার ভেতরে যেমন মাছগুলো ধড়ফড় করতে থাকে সেও ঐ কলাপাতার ডাঁটার মধ্যে ধড়ফড় করতে শুরু করেছিলযতই সে হাত পা ছুঁড়ছে কলার পাতাগুলো ওকে যেন আরো চেপে ধরছে. সে শ্বাস নিতে পারছিল নাচারদিকে অন্ধকার দেখছিল শুধু যে ঐ কলার পাতাগুলো--- তাই নয়, এই অন্ধকারও যেন ওকে পোঁতে ফেলতে চাইছেআঁধারের মধ্যে সে ওর হাতে একটা চেনা হাতের ছোঁয়া অনুভব করলস্পর্শটি কোমল বা মিহি নয়, শক্ত আর খসখসেখসখসে হাতটি ওকে কলাপাতার ডাঁটাগুলোর মধ্যি থেকে তুলে ধরল আলোতে সে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে দেখে ঐ মানুষটির হাতখানা ওকে জোর করে ধরে রেখেছেসে স্পষ্ট দেখতে পেল মানুষটির শক্ত হাতের টান টান আঙুলগুলো সে খিলখিলেয়ে উঠেছে, এ মা! এটাই কি হাত, না সেগুনের পাত! কী যে বড়!শক্ত হাতের মানুষটির সেগুন পাতার মতো হাতে ওর হাতটি লুকিয়ে পড়ল, হবে হয়তোভগবান তোকে টগর ফুলের মতো হাত দিয়েছে, আমার না হলে সেগুন পাতার মতোই হলো!কেবলই আলো আর আলোআলোতে সে মানুষটিকে ভালো করে ঠাহর করতে পারেনিচারদিকের রোদে যেন ওর মানুষটিকে ঢেকে রেখেছেসে চোখ কচলে তাকাবার চেষ্টা করলকিচ্ছু দেখা যায় নাএক অদ্ভুত ধারালো রোদ ছ্যাঁত করে গিয়ে ওর চোখে পড়েছে


মিলিটারি ট্রাকটি দাঁড়িয়ে পড়েছেসে কালো পর্দাটির তলার থেকে বেরিয়ে এলোবাইরে চোখ ধাঁধানো রোদআগে আগে মিলিটারি পেছনে মানুষ, মানুষের পেছনেও মিলিটারিগ্রামটিতে ঢুকতেই পড়ে নামঘরঅনেকদিনের পুরোনোনামঘরের উঠোন জুড়ে ডালপালা মেলে ছায়া ফেলে রেখেছে অজস্র গাছ গাছালিগাছগুলোতে পায়রার ঝাঁকঠিক বন্যও নয়, ঘরে পোষাও নয়পায়রারা রাতে নামঘরের সিলিঙে থাকে, দিনে গাছের ডালগুলোতে পড়ে থাকেনামঘরের কাছে গিয়ে পায়রাগুলোর বহু চেনা বাক-বাকুম, বাক-বাকুম শব্দটি না শুনতে পেয়ে ও একটু অবাক হলোকোথায় গেল এই পায়রাগুলো ? সত্যি সত্যি একটাও পায়রা নেইআর নামঘরটি? সেখানে যেন একটা যুদ্ধই হয়ে গেছে গাঁয়ের লোকে লেপে মুছে যেখানে একে পরিপাটি করে রাখে সেখানে পুরো নামঘরটার এক তৃতীয়াংশ শুয়ে পড়েছেদুএকজন লোকের সঙ্গে সেও নামঘরের দোয়ারের সামনে অল্প দাঁড়ালোঠিক গেটের মুখটাতে কিছু একটা ভেঙ্গে টুকরো টাকরা হয়ে আছেসে ভাঙা টুকরোগুলো কিসের তা চিনতে পেলবিয়ের আগে গা ধুয়ে গাঁয়ের অন্য মেয়েদের সঙ্গে সেও নামঘর মোছার জন্যে আসতমণিকুটেরভেতরে ঢোকা নিষেধ ছিলনামঘরের প্রতিটি জিনিসের প্রতি ওদের ছিল অপার কৌতূহল নামঘরের লোকেরা অন্য কোনও জিনিসে হাত দিতে না দিলেও আসতে যেতে দবাটিতেদুএক ঘা বসাতে দিয়েছিলভেঙে টুকরো টুকরো সেই দবাটি সে ঠিক চিনতে পারলওর কানে ভেসে এলো দবার গুম গুম শব্দ এই শব্দটিই একদিন গাঁয়ে বিপদের আগাম সংকেত হবে বলে কি কেউ ভেবেছিল? সে যখন ছোটো ছিল, কতদিন যে সন্ধ্যে হলেই নামঘরের এই দবার শব্দে সেও বড়দের সঙ্গে হাতজোড় করেছিলগালিও খেয়েছিলনামঘরে দবা বেজে উঠার আগেই ছোটদের হাত পা ধুয়ে নিতে হতোতখন কেউ ভাবেনি যে নামঘরে নামঘরে মানুষ জড়ো হবে, দবা বাজবে আর দবার শব্দে মানুষ প্রণাম করবে নাএ হবে রণভেরীকেউ ভাবেনিদবার শব্দে জুড়ে যাবে রক্ত , মৃতদেহ, আগুন আর হত্যা

সে বাকি মানুষগুলোর সঙ্গে বড় নামঘর পেরিয়ে এগুতে থাকলচতুর্দিকে আধপোড়া ঘরবাগিচার ফল ধরা গাছগুলো মাটিতে শুয়ে আছে ধানের ভাঁড়ারগুলোর জায়গাতে ছাইয়ের দমছাইয়ের মধ্যে কয়েকটি কুকুর শুয়ে আছেওরা তেমাথার মোড়ে এসে পৌঁছুলোতেমাথার এই মোড়ে রয়েছে এক বিশাল বটগাছবটগাছটিতে নানা রকমের পাখির বাসাএ গাছটির কাছে এলেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির কিচির মিচির শোনা যায়আজ নামঘরের গাছগুলোর মতো এই বটগাছটিও যেন নিস্তব্ধসে এমনিই মাথা তুলে তাকালোতাকিয়েই সে চেঁচিয়ে উঠলদুর্গন্ধে নাক চাপা দিয়ে অন্যেরাও সেদিকে মাথা তুলে তাকালোগাছটির ডালে ঝুলিয়ে রাখা আছে কাটা হাত পা, দুটো মুণ্ডহীন শিশু আর...ওর মতোই অনেকেই আর ওদিকে তাকাতে পারল না
ওদের সেই মরাপাটের খেতের দিকে নিয়ে যাওয়া হলোমরাপাটের খেতের প্রায় চিহ্নই নেই আরচিঁড়ামুড়ি , নারকেল গুটিয়ে নিয়ে গিয়ে যেখানে লুকোনোর জায়গা করা হয়েছিল সেখানে এখন সার দিয়ে পড়ে আছে অজস্র মৃতদেহশিশু আর মেয়ে মানুষই বেশিমৃতদেহগুলোতে কাদা লেগে আছেকাদা আর রক্ত মাখা এই দেহগুলো থেকে মানুষগুলোর শরীর থেকে একটা দুর্গন্ধ বেরুচ্ছেঢেকে রাখা মৃতদেহগুলোর আবরণ সরিয়ে দেয়া হলোবেশ কিছু মানুষতিনজন মহিলা গিয়ে ঐ মৃত দেহগুলোর উপর আছড়ে পড়লমামণির বাবাও বুকে জড়িয়ে ধরেছে মাথা কাটা যাওয়া একটি ছেলের শরীরমানুষটি হাউমাউ করে কাঁদছেমালতীর বুকে যেন কেউ একটা পাথর বেঁধে দিয়েছেসে শ্বাস নিতে পারছিল নাকাঁদতে পারছিল নাওর চোখ দুটো যেন পুড়ছিলসে মৃতদেহগুলো দেখার চেষ্টা করছেপোড়া চোখে সে কিছুই দেখছিল নাচতুর্দিকে চাকা চাকা রক্ত আর কাদাতে লেপ্টানো কতকগুলো মৃতদেহসে ওই পড়ে থাকা পাটগাছগুলোর উপর হাঁটু মোড়ে তাতে মাথা গুঁজে বসে পড়লআবারো ওর চোখে নেমে এলো পাতলা কুয়াশা রঙের চাদরখানাচাদরটি কালো হতে যাবে কি তখনই ওকে কেউ ট্রাকে উঠতে আদেশে দিলট্রাকটি এবারে গাঁয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছেস্কুলের কাছেই মিলিটারি মানুষগুলোকে ছেড়ে দিলসবাই যার যার বাড়ি ঘরের খোঁজে এগুলোসেও বৈশ্যবাবুর সঙ্গে হাঁটা দিল


মাত্র দুটা রাতমানুষজনে ভরা একটা পুরো গমগমে গ্রাম শ্মশানপুরী হয়ে পড়লবেশির ভাগ বাড়িই আগুনে ছাই হয়ে গেছেধানের ভাঁড়ারগুলোর জায়গাতে ছাইয়ের দমতিন চার বছর চালানো যায় এমন ধানের কিছু ভাঁড়ার থেকে এখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছেসাদা সাদা পাকিয়ে পাকিয়ে উপরের দিকে উঠা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ওর চোখে ভেসে উঠল ওদের নিজেদের ধানের গোলাটিএকটা পুরো বছর চলে এমন ধানের ভাঁড়ারটিকে সে আর মণি ওই কলাপাতার ডোবা থেকে দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখছিলগোলাটির থেকে কি এখনো তেমনি আগুন বেরুচ্ছে না, কবেই জ্বলে ছাইয়ের দম হয়ে গেছেবৈশ্যবাবুর পেছনে পেছনে সে চেনা পথটিতে পা দিলআধপোড়া বাড়িগুলোর মধ্যি দিয়ে এগুতে থাকল
ওদের পাড়াটার শুরুতেই প্রশস্ত উঠোনের সাহাদের বাড়িপান সুপারির ভরা বাগানের ছায়াতে ঢাকা বাড়িটির একাংশ পুড়ে গেছেবাগানের ফল ধরতে শুরু করা গাছগুলোকে যেন এক তুমুল ঘূর্ণি বাতাসে দুমড়ে মোচড়ে ফেলে দিয়েছেমাটিতে শুয়ে পড়া গাছগুলোর মধ্যি দিয়ে ঘরটাকে দেখে সে অল্প দাঁড়ালো, দাঁড়ালো বৈশ্যবাবুওহাতে একটা পোটলা নিয়ে একটি আধবয়সী লোক ঘরটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলোবুড়া বুড়ির ছেলে, মেজোটিওর গায়ের একটা ধুতি প্যাঁচানো, হাতে কুশের ধাড়া দেখে মালতীর মুখের থেকে একটাই কথা বেরুলো,দাদু-দিদাওর মুখের উপরেই বৈশ্যবাবু জিজ্ঞেস করে ফেলল, বুড়া বুড়ির...জবাবে মানুষটি মাটিতে বসে পড়ে হুঁ হুঁ করে কাঁদতে শুরু করলমালতীর আবারো সেই তন্দ্রা এসেছেচারদিকের রোদ যেন নিস্তেজ হয়ে এসেছেওর চোখের সামনে একটা হাত ভেসে উঠেছে যার সর্বত্র কালো কালো ফুট ফুট দাগ, কুঁচকে যাওয়া ঢিলে ছাল দিয়ে যেন প্যাঁচিয়ে রাখা হয়েছেহাতটি ওর মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেপুরো সাদা চুলের মাঝখানে লাল সিঁদুরকান জুড়ে বসে পেখম তুলে বসে আছে এক ময়ূর পাখিসে যেন বহু দূর থেকে দুটো মানুষকে কথা বলতে শুনতে পাচ্ছেসেই শব্দগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সে দিনে দুপুরে, এই অসময়ে নামঘরে নামঘরে দবা বাজানোর শব্দ শুনতে পেলমানুষের হুড়োহুড়ি লেগেছেঅলক্ষুণে ছেলেটি বাতের বেমারি বুড়ো বুড়ি দুজনকে হাতে ধরে ছ্যাঁচড়ে ছ্যাঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেমানুষগুলো পালাচ্ছে যেন হরিণের পেছনে শিকারি পড়েছে বাতের বেমারি বুড়ো বুড়ি দৌড়োনো তো দূরের কথা , ভালো করে হাঁটতেই পারছে নাতিন টুকরো করে কেটে ফেলল বুড়ো বুড়িকেমানুষটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ঐখানটায়...ফল আসা যে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে সেগুলোর মাঝখানে শিমুল গাছটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছেমানুষটি আজই চলে যাবেএখানে আর থাকবে নাসে পোটলাখানা খুলে মেলে দিল, মা-বাবার চিহ্ন বলে এগুলো নিয়ে যেতে এলামমালতী পোটলাটার দিকে এক লহমার জন্যে তাকিয়ে বুঝতে পারল দিদা-দাদু রোজ যাকে পুজো করতেন সেই কৃষ্ণের মূর্তিটাসে একটা প্রণাম করল

লোকটি উঠে বাড়ির গেটে যেতেই আরেকটা লোক পেছন দিক থেকে দৌড়ে এলোচেনা মুখরঘুমালতী ওকে লম্বোদরের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই চেনেরঘুর কেউ কোথাও নেইসে যদিও একটু ভেদার মতো কিন্তু বুদ্ধিহীন নয় মোটেওলেলিয়ে লেলিয়ে কথা বলা, একটু ছড়ানো বাঁকানো পা দুটোতে হেলে দুলে হাঁটা -- এসব নিয়ে প্রথম দৃষ্টিতে রঘুকে দেখলে পুরো একটা ভেদা মানুষ বলেই মনে হবে কিন্তু ওকে যেই একবার কোনও কাজে লাগায় সেই বুঝতে পায় এই ভেদাই চেহারাটার আড়ালে এক ধরণের বিশেষ বুদ্ধি রয়েছেমণির বাবা ওকে প্রায়ই দিন হাজিরা করতে ডাকতএকবার দুটো কাঠ দিয়ে ইট ভরে ভরে একটা সিমেন্টের ফিল্টার সে একাই এমন করে বসিয়ে দিলে যে মণির বাবা বহুদিন ধরে কথাটা কাউকে বা কাউকে সুযোগ পেলেই বলত রঘু যেখানেই ইচ্ছে সেখানেই পড়ে থাকেকুকুর একটার যতটুকু ঠাঁই চাই, ওরও সেটুকুই চাইজনশূন্য গ্রামটিতে রঘু এখন একচ্ছত্র সম্রাটএই কদিন ধরে সে সাহাদের আধপোড়া ঠাকুর ঘরটাতেই থাকতে শুরু করেছে
সে এসে সাহার পায়ে পড়ে কোঁকাতে শুরু করলতার পর হাতে একটা ছোট্ট পোটলা তুলে দিলপোটলাটা ভালো করে বাঁধা ছিল না, সব জিনিস মাটিতে পড়ে গেলহাতি দাঁতের মূর্তি,তামার কোষা-অর্ঘ, রূপোর বাসনসে লেলিয়ে লেলিয়ে বুঝিয়ে দিলে, এসব জিনিস বাঁচাবার জন্যেই সে এ কদিন ঠাকুর ঘরে শুয়ে আছেজিনিসগুলো হাত পেতে নিয়ে মানুষটি কোনও দিকে না তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করল
মালতী ঘাসের উপর বসে পড়লরঘু একটা কলাপাতাতে চার পাঁচটা পাকা মালভোগ কলা এনে দিলবাটি একটাতে সামান্য জলকলার কাঁদিটা ওর চেনা মণির বাবা বীজ এনেছিলদিদা ওর থেকে চারা একটা এনেছিলখাব না, খাব না বলতে বলতে সে দুটো কলা খেয়ে ফেললরঘু ওদের কাছে বসে কেঁদে ফেললসব সময় যে মুখে একটা বোকা বোকা হাসি নিয়ে কাজ করতে থাকে সেই রঘুর মুখের কান্নাটা ওর কেমন কিজানি লাগল রঘুর ঐ লেলিয়ে লেলিয়ে বলা কথাগুলো শুনতে ওর তখন অসহ্য লাগছিলতবুও সে বলেই যাচ্ছে, মাঝ মাঝে অদ্ভুত এক কান্নাতে ওর মুখখানা বাঁকা হয়ে যায় রঘু উচ্চারণ করতে পারে না, হয়ে যায়কখনো বা গিয়ে হয়ে যায় আর তুই- তুমি- আপনির কোনও ঠিক ঠিকানা নেইএখন সেটি আরো বেশি হচ্ছেওর চিন্তা, শব্দ সব এলোমেলো হয়ে গেছেসে মণির মায়ের শরীরে শরীর লাগিয়ে বসতে চাইছেবহুদিন পর বাড়ির মালিককে দেখতে পাওয়া কুকুর একটার মতো করছে সে

 মলি মা! মলি বাবা!...আমি ইশকুলে ছিলামলাতে এতো এতো মানুষ, মুখ নেই...

মুখ ছাড়া মানুষ দেখেছিলি তুই?বৈশ্যবাবু কোমরের তাবিজটা ধরে টানাটানি করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন
নেই , চোখ নেই, মাথা নেই, কালো কালো কাপল...নামঘলে দবা, লাতে দবা, দুম দুম দুম , নামঘলেও মানুষ...মাথা নেই, চোখ নেই, আমি পুকুলে, বল নামঘলেল পুকুলেমাথাল উপল কচুলি পানাআগুন দিল , মলি মা, কিবানি আর কিবানিল বাবা, তোদেল ঘলে আগুনসকালে কুকুল আর শিয়ালপুলো গলৈ মাছ, কালাসে হাঁউ মাউ করে কাঁদছেঠিক কান্না নয়, এক ধরণের গোঙানো, দাদু...দিদাল শিমুল গাছের তলায়, বুলো বুলিল মাথা...ছাগলের মাথা, বীনেন কছাইল দোকান...লাল লাল লক্তভোঁৎকা একটা গন্ধ বেরুচ্ছে ওর গা থেকেসেই ওকেই জলে ডুবতে যাওয়া মানুষ যেমন বাঁচতে গেলে খড়কুটোকেও আঁকড়ে ধরে তেমনি জড়িয়ে ধরতে চাইছিল মালতীএ সব দেখেছেরঘু তুই মণির বাবাকে দেখেছিলি কি, দেখেছিলি কি ?
রঘু চুপ করে গেলসে মাথা নিচু করে কিছু একটা মনে করবার চেষ্টা করল
মলিল বাবা...
হ্যাঁ রঘু , মণির বাবাঅ্যাঁ মলিল বাবাসে টেরই পেল না কখন রঘুর স্বরেই বলে ফেলল
মলি বাবা সুভাষ মাচতল পাহলা পাটিতে...
হ্যাঁ রঘু, মণির বাবা, সুভাষ মাষ্টার সেদিন পাহারাতে ছিল
পাহলা পাটি পুলের কাছে, পুলের উপল দিয়ে মানুষ, মাথা নেই, চোখ নেই
তার পর রঘু, তারপর কী হলো?

 মাষ্টলকে টিশনের ছেলেলা নামঘলে নিয়ে গেলসাল! সাল! আমলা আপনাকে মলতে দেব না, টিশনেল ছেলেলা মলিল বাবাকেও নিয়ে গেলমাষ্টলকে নামঘলে কেলাশিন,আগুনটিশন ছেলেকে মলি বাবা গালি, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গালিপুলে মানুষ...মাথা নেই...চোখ নেই...মলি বাবাকে আগুন...রঘু এবারে মাটিতে গড়িয়ে মুখ ঢেকে গোঙাতে শুরু করল, মলি বাবা, মাষ্টল...নামঘলে আগুন...পুলে মানুষ...মাথা নেই...চোখ নেই...এমনিতেই অস্বাভাবিক রঘুর মুখখানা আরো বাঁকা হয়ে গেছেসে মণির মাকে নিজে দেখা সব কথা বলতে চাইছিলএকই কথাগুলো বারে বারে বলে মণির মাকে সে অনেক কথাই বলবার চেষ্টা করছিলতোদেল বাড়িতে আগুন...দাদু দিদাল মাথা...ছাগলেল মাথা...লাল লাল লক্তওর চোখ দুটো এক অদ্ভুত ভয়ে বিস্ফোরিত, মানুষ , বহু মানুষ...মাথা নেই, চোখ নেই, মুখ নেই...কালো কাপল

বৈশ্যবাবু এসে মালতীর কাছে দাঁড়ালো, চল, জোরে চলএটি এক প্রেতের গ্রাম হয়ে গেছে গো মণির মাএখানে কেউ থাকে নাশুনলি না রঘু কী বলছে, মুণ্ডহীন মানুষবেরুবে বুঝলি, রাত হলেই বেরুবেওকে এতো করে বললাম গামছা একটা রাখ শুনল নাবাঙালিদের বাঁচাতে যায়গামছা রেখেই বা আমার কী হলো? আগুনে কী চেনেপুড়ে ফেলল, সব পুড়ে ফেললদুটো ছেলে মেয়েকে এই শ্মশান পুরিতে রেখে গেলামবাকি কটাকে...মালতী বৈশ্যবাবুর সঙ্গে পা মেলাতে পারেনিএবারে মানুষটা দাঁড়িয়েছেওদের বাড়িটা লম্বোদরের হাতের কাজে ফুলটাতে ফলটাতে সেজে গ্রামের ভেতরে চোখে পড়বার মতো সেই বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেলসে আধপোড়া সদর দরজাতে হাত দিতে চাইলমামণির বাবা ওর হাত ধরল, ঢুকবি না, ঢুকবি না বলেছি নাতার উপর দু-দুটো মানুষবাড়ির ভিটে ছেড়ে যায় না ওরাঢুকবি না বলেছি, গায়ে লেগে এসে পড়বেওকে মানুষটি ছ্যাঁচড়ে নেবার মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছিলচল না , বলছি জোরে চলআর্মির গাড়ি এখন ফিরে যাবেওদিকে তাকাবি নাগায়ে করে লেগে আসবে
মালতীর এমনটি মন হলো যেন এই রঘু আর মানণির বাবার কথাগুলো একইকেবল রঘু বলতে পারেনা,মণির বাবা পারে


টীকা:
)মণিকূটঃ নামঘরের পূর্ব বা উত্তর দিকে বিগ্রহ ভাগবত ইত্যাদি স্থাপন করবার জন্যে ছোট ঘর
) দবাঃ নাগরার আকারে গড়া একধরণের বাদ্য , যাকে ছোট লাঠির ঘায়ে বাজাতে হয়

7 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India