ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন


ফেলানি
  
(ফেব্রুয়ারি , '১ সংখ্যা ব্যতিক্রমে প্রকাশিত হয়েছে এই অধ্যায়।)     

 শিবিরে মুখ্যমন্ত্রী আসবেনপায়খানা, পেচ্ছাব পরিষ্কার করা হচ্ছেএখানে ওখানে চুন দেয়া হচ্ছেফেনাইল ছেটানো হচ্ছেভাতের সঙ্গে এসেছে মাছ! চিকিৎসার জন্যে ডাক্তার , ঔষধমোটের উপর শিবিরে এক উৎসবমুখর পরিবেশমণি মাথা আঁচড়ে কাপড় চোপড় পরে এদিক ওদিক দৌড়ো দৌড়ি করছেমানুষে এখানে ওখানে জটলা পাকিয়ে এ কথাই বলাবলি করছেমুখ্যমন্ত্রী হাত খুলে দেবেপ্রত্যেক পরিবারকে এক বান্ডিল করে টিন আর পাঁচ হাজার করে টাকা দেবেআজই দেবে মুখ্যমন্ত্রী সবাইকে হাতে হাতে দেবেসত্যি সত্যি ট্রাকে করে চিকচিকে সাদা টিন এসে গেললোকগুলো যে যার ঘরে ফিরে যাবার কথা ভাবছিল টিনই যখন এলো পাঁচ হাজার টাকা কি আর না এসে থাকবে? শিবিরগুলোর থেকে অল্প দূরে খোলা মাঠে লোকগুলো জড়ো হয়েছেঅল্প পরে হেলিকপ্টার আসবেপ্লাস্টিকের কাপড়ের ঘরগুলোর সবকটাই খালি হয়ে গেল
    
    
              ফেলানি হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছেশরীরটা অস্বস্তি করছেথেকে থেকেই একটা ব্যথা চাগিয়ে উঠছেসে পেটে হাত দিয়ে দেখল, বেশ কদিন ধরে একই আছেসাড়া শব্দ নেইবাঁশের একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে সে বসে রইলখানিক বসে থাকার পর কোঁকাতে শুরু করলওর চারদিকে আবারো এক কুয়াশা রঙের কাপড়অনেক দূর থেকে সে শুনতে পেল, মালতী , তুই এমনটি করবি না তো...একটা রোগা হাত ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিলকান জুড়ে পেখম তোলা ময়ূর শাখা কগাছাতে লেগে আছে নারকেল তেলের গন্ধ একটা মানুষের অদ্ভুত গোঙানো শোনা যাচ্ছেকাছে চলে আসছে দবার শব্দ ...কেউ যেন ফেলানিকে তুলে ধরেছে
যখন সে চোখ খুলল, ওর নাকে লাগল তীব্র ঔষধের গন্ধশিবিরের অস্থায়ী চিকিৎসালয়ে ওর এক মরা মেয়ে হলোসে উঠে বসলশরীরটা হালকা হালকা লাগছেএকটি মেয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল, মরা বাচ্চাটা দেখবেন কি ? জমাদার নিয়ে যাবে যেসে বড় আস্তে আস্তে বলল, ছেলে না মেয়ে ছিল?
              “মেয়ে বেবিটা বেশ মেচিওরই হয়েছিল
            “একবার দেখব ওকেনার্স একটা গামলাতে করে বাচ্চা একটা নিয়ে এলোপুরোটা শরীর ভেজা,এক মাথা কালো চুলএই টুকুন হাত পা নিয়ে এইটুকুন ছোট্ট একটি মেয়েগায়ে কিছু নেইগায়ের রঙটা নীল হয়ে গেছেঅবশ হাত পায়ের ছাল চামড়াগুলো কুঁচকে গেছেসে হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে একবার ছুঁয়ে দেখল, ঠাণ্ডাঠিক যেন একটা পাথরের মতোএকটা লোক এসে মেয়েটি শুদ্ধ গামলাটাকে বাইরে নিয়ে গেলসে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে রইলওর চোখদুটো শুকনোলালবালি পড়লে যেমন করে তেমনি খচমচ করছিল
            তিনদিন থেকে অস্থায়ী হাসপাতাল থেকে ও বেরিয়ে এলোএসে মাথা ভিজিয়ে স্নান করল অনেক দিন সে অমন করে স্নান করে নিস্নান করে ওর নিজেকে বেশ হাল্কা বোধ হলোচুল আঁচড়ে সিঁথিতে দেবার জন্যে একটু সিঁদুর আনবে বলে মামণির মায়ের কাছে যেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লওর কানে বেজে উঠল রঘু ভোঁদাইর বাদ পড়া শব্দগুলো...মলি বাবা পুকুলেল থেকে নামঘল...মাথা নেই, চোখ নেই, মলি বাবাকে...ওর শরীরের ভেতরেই যেন ওই ভোদা মানুষটার অদ্ভুত গোঙানো পাক দিয়ে উঠছেমাথার থেকে পা অব্দি গোঙানিটা নেমে যায় , আবারো পায়ের থেকে উঠে আসেসে সিঁথি ঢেকে চুলগুলো পেছনে খোপা করে বেঁধে ফেলল ঘন কালো চুলের ভেতরে খালি সিঁথিটা ঢেকে গেলকাপড় ধোঁয়া সাবানের জল চোখে ঢুকেছে বলেই বোধ হয় ওর চোখ জোড়া জ্বলছিলচাদরের পাড়ে মুখের থেকে নিয়ে অল্প গরম ভাপ লাগিয়ে তবে যেন সে অল্প আরাম পেল
            বাইরে হুলস্থূল লেগে গেছেএ রকম হুলস্থূল লেগেই থাকেকালও লেগেছিল ঐ পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব বুড়ি দিদিমা আর ওর নাতনি রুণুকে নিয়েরুণু সতেরো বছরের উঠতি মেয়েসে বিকেলে লম্বা চুল খুলে সামনে নিয়ে শিবিরের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে ওর বয়সই এমনএই মুহূর্তে কাঁদলে পর মুহূর্তে আবার হাসতে পারেসে শিবিরের পচা চালের ভাত খেয়েও ফুলের মতো ফুটতে পারেকারো থেকে একটু মিঠা তেল চেয়ে নিয়ে কৌটা একটার ঢাকনিতে প্রদীপ বানাতে পারে। তাতে আবার ছেঁড়া ন্যাকড়ার সলতে জ্বালিয়ে কাজল বানাতে পারেসেই কাজলে নিজের চোখও সাজাতে পারেএই রুণুকে নিয়েই হুল্লোড়টা বেঁড়ে চলেছেগতকাল ও শিবিরে দিদিমাকে নিয়ে শুয়েছিলপ্লাস্টিকের ফাটা বেড়া দিয়ে মাঝ রাতে দুটো ছেলে ঢুকে পড়ে ওকে বাইরে তুলে নিয়ে গেছিলছেলে দুটো কারা ও চিনতে পারে নিচীৎকার চেঁচামেচিতে ওকে ওরা ফেলে রেখে চলে যায়আজো তারই জের চলছে
ক্রমেই শিবিরে সার্বজনীন রান্নাঘরগুলো উঠে গেলসে জায়গাতে এখন এক থপথপে উন্মুক্ত পায়খানারোদ দিলে উপরে এক কালো প্রলেপ পড়েবৃষ্টি দিলে কাদার মতো আবার বিষ্ঠাগুলো বেরিয়ে পড়েচারদিকে সেই বিষ্ঠার গন্ধ ছড়িয়ে থাকে সেখানে সাদা সাদা একধরণের পোকা হয়েছেএকটু বৃষ্টি দিলেই দলে দলে পোকাগুলো ছড়িয়ে পড়ে কিলবিল করতে থাকেঝুপড়িগুলোর প্লাস্টিকগুলো ফুটো হয়ে গেছেরোদ বৃষ্টি কোনোটা থেকেই বাঁচাতে পারে নাশিবিরের অর্ধেক মানুষ চলে গেছেযারা আছে ওদের অসুখে ধরেছেএকবার যদি রক্ত পায়খানা হয় তো অন্যবারে বমি পায়খানা তো পরের বারে জ্বর
     
           মামণির বাবারা পুরোনো ভিটেতে গিয়ে উঠেছেএকেবারে শুয়ালকুচির পিতৃ-ভিটাদাদু-দিদা মারা যাবার পর সাহা পরিবার বাংলাতে চলে গেছেসুভাষ মাষ্টারের পরিবার গেছে কোচ বিহারেমাস্টারণীর বাপের বাড়ি ওখানেসে শুনতে পেয়েছে , এমন কি গাঁওবুড়াও সেই গ্রাম ছেড়ে গেছে, শহরে বাড়ি ঘর করেছেশিবানীদের পরিবার শিলিগুড়িতে, ওখানে নতুন করে ব্যবসা ধরেছেপুরো গ্রামটিতে যে কজন থেকে গেছে ওদের আঙুলে গোনা যায়এখন ওই আধপোড়া গ্রামটিতে শুধু বলতে পারে না যে লোকটা সেই গোঙাতে গোঙাতে ঘুরে বেড়ায়সে সব খবর পাচ্ছে, বাতাসে খবর ঘুরে বেড়ায়ভাবছিল সে যায় কইওর বরের যে বাড়িটি কোনোদিন দেখেনি ওখানে সে কী দাবিতে যায়? বেজাতের মেয়ে, তায় বিধবাওকে রাখবে কে? মামণির মা বাবা শুয়ালকুচিতে যাবার কথা বলছেমানুষটার নিজেরই মাথার উপর কিছু নেইতবু যে বলছে ! সেকি যাবে একবার মণির হাতে ধরে মৌজাদারের বাড়িতে? পড়ে থাকবার জন্যে একটা কো আর থাকবার জন্যে উচ্ছিষ্টের ভাগটুকুও কি সে পাবে না? কী বলে পরিচয় দেবে?
 
         
          ক্যাম্পের চাল মুঠো সেদ্ধ করে মণিকে খেতে দিয়ে বাকি সময় সে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে থাকেশব্দ একটা শুনবে বলে খানিক ক্ষণ এমনি বসে থেকে রোজ সে ঘুমে ঢুলতে থাকেতার পরেই শুরু হয় চোখের সামনে সেই ছবিগুলোর যাওয়া আসাহাতির পিঠে উঠে যাচ্ছে এক ভর যৌবনের তরুণী তারা গাছের ডোবাতে পড়ে থাকা একটি তরুণসারা গায়ে দখনা পরে সারাক্ষণ হাসে একটি মেয়েআর একটি পুরুষ যে জানে না ভয় কাকে বলে বিছানাতে পড়ে কোঁকাচ্ছে ওর বৌ আর সে যায় ওকে একা রেখে ধাইয়ের খোঁজে যতই ওর চোখ দুটো বুজে আসে ততই স্পষ্ট সেই ছবিগুলো সে দেখতে শুরু করেকুশিয়ার খেতের হাল্কা আঁধারে পায়ে লেগে ছিটকে পড়া শিশুর এক ফালি কোমল দেহ । দুটো অদ্ভুত সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর কেউটে। রক্তমাখা দুটো মুরগীর বাচ্চা। গামলা একটাতে একটি অবশ নীল মেয়ে সন্তান । প্রায়ই সে মহিলাটির থেকে গামলাটি কেড়ে নেয় । দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে শক্ত বাহুর পুরুষ একজনের গায়ে । স্পষ্ট শুনতে পায় সে শুকনো গলার স্বর , এমনটি করবি না তো মালতী, এমনটি করবি না তুই!গামলার থেকে মেয়েটি উঠে আসে , বাতাসে কেঁপে উঠে এক মাথা কালো চুল। প্রায়ই এমন হয়, মণি ওর মাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে উঠিয়ে দেয়—“ মা! ও মা! তুমি হাসছ কেন?” “ ও মা অমন করে কাঁদছ কেন?” “ ও মা! চেঁচাচ্ছ কেন?সে কিছু বলতে পারে না। মণি টের পায়, মাকে সবাই আধ পাগলী বলে বলতে শুরু করেছে। সে আজকাল খেলাধুলো করে বেড়ায় না, মায়ের কাছে কাছে থাকে।
 
         সেদিন মণির ভীষণ খিদে পেয়েছিল। ঠেলা ধাক্কার মধ্যে মা চাল তুলে আনতে পারে নি। সে কিছু লাকড়ি আর পায় যদি, তবে কিছু বন্য কচুর খোঁজে গেছিল। কখনো কখনোবা কাজের খোঁজেও বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে। সে দোকান দাকানে গিয়ে কাজের কথা বললেই , ভাগ ব্যাটা বাচ্চা , কোথাকার ! কী কাজ করবিরে তুই!বলে লোকে তাড়িয়ে আসে। তবুও সে একদিন এক হোটেলে গ্লাস বাটি ধুয়ে এক বেলার ভাত আরেক দিন এক দোকানে পচা পেঁয়াজ বেছে পাঁচ টাকা রোজগার করেছিল। খিদেতে থাকতে না পেরে শিবিরের একেবারে শেষের দিকে থাকে যে মেয়েগুলো, ওদের ওখানে গিয়েছিল। ওদিকে ওকে যেতে মানা করা হয়েছিল। একদিন কৌতূহলের বশে ওদিকে যাবার দায়ে সে আর রন্টু মামণিদির বাবার হাতে মার খেয়েছিল। মণি জানে এই মেয়েদের কাজ করে দিয়ে বিজয়, কুলু, যোগেনরা পয়সা রোজগার করছে। ওদের গায়ের জামা ছেঁড়া নয়, ওরা খালি পেটেও থাকে না। মণি এক পা দুপা করে ওখানে চলে গেছিল। তখন সন্ধ্যে হয় হয়ে। সে দাঁড়িয়ে ছিল। একটি লোক নীল প্লাস্টিকের চাল আর চাটাইতে তৈরি বেড়ার একটি ঘরের থেকে বেরিয়ে এসে ওর হাতে তিনটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে সোজা সামনে আঙুলে কিছু দেখিয়ে দিল। মণি কিছুই না বুঝতে পেরে দাঁড়িয়ে রইল । বিজয় এসে ওর কাছে দাঁড়ালো, কী হলো বে ? বাবুর মাল এনে দে জলদি!
                “মাল ? কী মাল?মণি একটু অবাকই হলো। ইতিমধ্যে কুলু আর যোগেনও এখানে এসে গেছে।
                “ বুদ্ধু।কুলু ওকে গালি দেবার মতো করে বলল।
                “ নতুন লাইনে এসেছে, আস্তে আস্তে শিখে যাবে।বিজয় বড় মানুষের মতো গাম্ভীর্য নিয়ে কথাটা  বলল।
                “ যা মণি ভায়া! ঐ দোকানের থেকে এক পেকেট পেপেসি  এনে লতাদির ঘরে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিবি।
             “ খবরদার বাচ্চা ছেলে! বেড়া দিয়ে ভেতরে তাকাবি না। বাবুদের মৌজ করবার  সময় এটা।যোগেন স্বর আরো বেশি বড় মানুষের মতো ।
                “ পেপসি?মণির কথাতে বিজয়ের রাগ উঠে গেল।
              “ তুই লতাদির হাতে মার খাবি, বুঝলি?বিজয় মণির হাতে ধরে শিবিরের মাঠটা পার করে রাস্তাতে নিয়ে গেল। রাস্তার কাছে একটা পান সুপারির দোকান।
           “ দেখ, ঔ দিকে দেখ।বিজয় মণিকে দোকানের পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিল। বিজয়ের নির্দেশ মেনে পান সুপারির দোকানের পেছনে তাকিয়ে দেখল একটি গর্ত ভরে ফেলেও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে সাদা কালো নীল সবুজ এক গাদা প্লাস্টিকের বেগ ।
               “ এগুলো পেপসির পেকেট , বুঝলি?
             বিজয় মণিকে দুটো তরল পদার্থে ভরা পলিথিনের পেকেট কিনে দিল। সে যেমনটি শিখিয়ে দিয়েছিল মণি সেই রকমই প্লাস্টিকের নীল কাপড়ে তৈরি দরজার নিচে ছিঁড়ে যাওয়া টুকরোর ফাঁক দিয়ে পেকেটগুলো রেখে এলো। ওর হাতে রইল পুরো একটি দশ টাকার নোট। বিজয় তাকে ছোট ছোট চালাগুলো একটা একটা করে চিনিয়ে দিল। এক নম্বর লতাদি, দুই নম্বর মেনকা, তিন রুমি, চার রানি, পাঁচ জবা, ছয় সীতা, সাত গীতা। বিজয় ওর শিক্ষার প্রমাণ নেবার জন্যে জিজ্ঞেস করল, তুই এখন কাকে পেপসির প্যাকেট দিয়ে এলি, বল দেখি?
                মণি ঘরগুলো গুনে গেল, এক দুই তিন...পাঁচ নম্বর চালাটির দরজার তলাটা ছেঁড়া। তার পরেই হেসে ফেলে বলল,
               “লতাদি।
              “ ঠিক। এ লাইনে তুই আমাদের থেকেও ওস্তাদ হবি।
              মণি আর বিজয় দেখতে পেল ছোট চুলের একটা মোটা লম্বা লোক এসে দাঁড়িয়েছে । বিজয় মণির কানে ফুসফুসিয়ে বলল, এ ফৌজের লোক। এ লাইনের সবচেভালো কাস্টমার।লোকটিকে সে তিন নম্বর চালাটিতে নিয়ে গেল। ঢোকার আগে লোকটি ওকে টাকা দশটা দিল। আরেকটি কালো মোটা পাজামা পাঞ্জাবি পরা লোক এসে দাঁড়ালো । বিজয় মণিকে ঠেলে দিল, যা মণি, এক নম্বরে নিয়ে যা।মণি মুখে কিছু না বলে লোকটিকে ডাক দিল। এক নম্বরের লতাদি বেরিয়ে এসে মণিকে আদর করে টাকা দুটো ধরিয়ে দিল। লোকটিও টাকা পাঁচটা দিল। সতেরো টাকা হাতে নিয়ে মণির মনে পড়ল চাল বেছে সে পেয়েছিল মাত্র পাঁচ টাকা। মণি দেখল যতই রাত বাড়ছিল বিজয়দের কাজ আর দৌড়া দৌড়িও বেড়ে যাচ্ছিল। সেও ওদের সঙ্গে দৌড় ঝাঁপ শুরু করে দিল। শীঘ্রই ওর সতেরো টাকা বেড়ে বাইশ টাকা হলো।
       
          বিজয় মণিকে জিজ্ঞেস করল, তুই এই বাইশ টাকাতে কী কিনবি?
  
               “চাল।মণির সোজা উত্তর।
            “ ক্যাম্পে চাল দেয়া প্রায় বন্ধই হলো। চাল যখন দিচ্ছিল এ লাইনে তখন কোনও বিজনেসই ছিল না।। চাল যতই কমিয়ে দিয়েছে, এ লাইনে ততই বিজনেস বেড়ে গেছে।
              “ তোদের কি রোজই এমন রোজগার হয়?
             “ নসিব থাকলে হয় বে।
             “ তুই কি স্কুলে গেছিলি?বিজয় , যোগেনদের দেখে মণির নিজের স্কুলটাকে মনে পড়েছে
            “ গেছিলাম। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত উঠেছি। তারপরেই তো গোলমালটা হলো
           “ তোর বাবা আছে?
           “ আছে। বরং আমার মাই নেই। গোলমালে মা আর দিদি মারা গেল। বাবার পায়ে গুলি লেগেছিল। এখানকার ডাক্তার গুলিটা বের করে দিয়েছে। কিন্তু পা-টা পচতে শুরু করেছে। কিছুই করতে পারে না। বোন একটি আছে।বিজয় অল্প আগে পেপসি কিনে আনতে গিয়ে দুটো মর্টন কিনে এনেছিল। তারই একটা মণিকে দিল।
         “ গোলমালে তোর কে মারা গেল?
        “ বাবাকে হারিয়েছি।মণির চোখে জল এসে পড়েছিল।
          “ মা আছে?বিজয় মণির কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
          “ সবাই বলছে, মা বুঝি আধা পাগল হয়ে গেছে।
         “ কী করবি? গোলমালের পর সব মানুষেই আধ পাগলা হয়ে গেছে। আমার ছোট্ট বোনেরও তোর মায়ের মতো অবস্থা।
          সেও এটা ওটা দেখিয়ে অনবরত কী সব বকতে থাকে। সে মা আর দিদিকে...বিজয়ে গলার স্বর বসে গেল।
          মণি দেখল মা ওর দিকে আসছে। মা এসে ওর হাতে ধরল , চল।সে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা দিল।


*                                                          *                                                                   *


            সেদিন রাতে মণির রোজাগারের টাকাতে ভাত খেতে খেতে সে একটা সিদ্ধান্ত নিলোছেলেটিকে নিয়ে এই নর্দমার থেকে সে বেরিয়ে যাবে। ভাত খেয়ে মুখ ধোবার পরেই বৃষ্টি দিয়েছিল। বৃষ্টিতে ছোট ছোট লেজের সাদা সাদা পোকাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।মামণির বাবার ফেলে যাওয়া ক্যাম্প-খাটটিতে মণি বেঘোরে ঘুমচ্ছিলকিচ্ছুটি বলতে পারে না। ফেলানি সারা রাত, মণি কোত্থেকে জোগাড় করে নিয়ে এসেছে একটা সাবানের বাক্স , তাতে বসে জেগে কাটিয়ে দিল। ওর মনে হঠাৎই একটা ভয় ঢুকল, এই কিলিবিলিয়ে আছে যে পোকাগুলো ওদের একটাও যদি ওর ছেলের শরীরে ঢুকে পড়ে ! বেয়ে বেয়ে নাকে, কানে, শ্বাস নেবার জন্যে সামান্য মেলানো মুখ দিয়ে যদি পোকাগুলোর একটাও ওর শরীরে ঢুকে যায়! কী হবে তখন? একটা মোম জ্বালিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল পোকাগুলোকে। পলিথিনের একটা থলে হাতে পরে নিয়ে পিষে পিষে মেরেছিল সারাটা রাত। মাছের পেটির মতো পোকাগুলোর শরীর থেকে দলা দলা যে জিনিসগুলো বেরুচ্ছিল তাতে ভিজে জবজবে হয়ে গেছিল ওর হাতের পলিথিনের থলেটা। একটি বারের জন্যেও চোখের পাতা ফেলেনি। একটিবারের জন্যেও সেই ছবিগুলো ওর চোখের সামনে আসে নি।
 


                                 

4 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India