ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন



ফেলানি
          
           
            

          আগে এই ছোট্ট শহরের সীমা ছিল ছেলে-মিশনটিছেলে-মিশন মানে হোস্টেলের সঙ্গে ডনবস্কো স্কুলখানাস্বাধীনতার বছর বিশেক আগেই এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিলবেশ কবিঘা জমিতে বিশাল এলাকা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নখৃষ্টান মিশনারিরা মূলত এই শহরের লাগোয়া কয়েকটি বাগানের শ্রমিকের ছেলেমেয়েদের দিকে চোখ রেখেই এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলঅন্য ডনবস্কো স্কুলের সঙ্গে সুদৃশ্য এই স্কুলের বিল্ডিঙের মিল থাকলেও এর চরিত্রের সঙ্গে অন্যগুলোর কোনও মিল নেইহাইস্কুলটি অসমিয়া মাধ্যমের,ছাত্রেরা প্রায় সবাই বাগানের আদিবাসী ছেলেমেয়ে ছেলে-মিশনের সঙ্গে সঙ্গে শহরের মানুষের খুব একটা সম্পর্ক নেই শুধু ওই শনিবার বিকেলে যখন ফাদার লাইন ধরিয়ে ছেলেগুলোকে শহরের রাস্তা দিয়ে বেড়াতে নিয়ে যান তখন সে দৃশ্য লোকে বেশ একটা আগ্রহ নিয়ে দেখতে থাকেদৃশ্যটি অনেক বছরের পুরোনো, কিন্তু মনে হয় যেন চির নতুনছেলে-মিশনশব্দটিও শহরের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত নাম
           ছেলে-মিশনের আশে পাশে লোক জনের বসতি খুব নেইআসলে এটি রিজার্ভের মাটিকেউ ঘর তুলতে চায় নাকেননা, কখন এসে উচ্ছেদ করে তার কোনও ঠিক নেইদুএক জন কোনও উপায় না পেয়ে ঝুপড়ি কখানা তৈরি করে বসতে হবে বলে বসেছেযাকে বলে সংসার পাতা , তেমন কিছু করেনিছেলে-মিশনের থেকেই শুরু হয়েছে রিজার্ভের জঙ্গলএই জঙ্গলের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট পাহাড়ি নদী রাধিকাজঙ্গলের একেবারে শেষ প্রান্ত, যেখানে গ্রামের মানুষের ধানের খেতে গিয়ে জঙ্গলটি শেষ হয়েছে সেখানেই রয়েছে কৃষ্ণাই নদীরাধিকার মতো এক হাঁটু জলের ক্ষীণকায়া নদী নয়শীত বরষাতে জল থাকে এরকম গভীর নদীনদী দুটো নেমেছে ভুটান পাহাড় থেকেসেখান থেকেই নেমেছে তিনটে নদীকৃষ্ণাই আর রাধিকা কিছু দূর পাশাপাশি বইতে বইতে একসময় আলাদা হয়ে গেছে আরেকটি নদী সোনজিরি কিছু দূর রাধিকা কৃষ্ণাইর কাছে কাছে বইতে বইতে একসময় পুরো অন্যদিকে বয়ে চলে গেছেনদী তিনটির উৎসে একটি বাঁধ আছেলোহার জাল আর পাথরে বাঁধানো মজবুত বাঁধনদী তিনটির জল যাতে একটা শৃঙ্খলা মেনে বয়, বাঁধটি তাতে সাহায্য করে এসেছেনদী মুখে ঐ জালে তৈরি বাঁধের জন্যেই বোধ হয় জায়গাটির নাম জালিমুখ
     
 রিজার্ভ ফরেস্ট যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই রাধিকা নদীর পাড়ে পাড়ে শুরু হয়েছে একটা বস্তিরিজার্ভেরই সরকারি জমি ছিলগাছ লাগানো হয়নিএমনি পড়ে ছিলখালি জমিটার একদিকে একখানা গ্রামধান, নারকেল, সুপারি গাছে সাজানো বডো আর রাভা মানুষের গ্রামনেপালি, বাঙালি আর কঘর অসমিয়া মানুষও রয়েছে
 
           সরকারি জমিতে অসংখ্য ছোট ছোট ঝুপড়িঝুপড়িগুলোর সংখ্যা কিছুদিন থেকে হঠাৎই অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে গেছেএকই রকম একচালার ঘর সবটিনগুলো চিকচিক করতে থাকেপ্রায় সব কটা ঘরে টিনের সংখ্যা একইসরকারে দেয়া টিনের বাণ্ডিল গুলোতেই সাহস করে লোক গুলো ঘর তুলেছেএকই রকম টিনের চালের উপর বাঁশ আর ইটের টুকরোভেতরের মানুষগুলোর অবস্থাও একই ।  তুফানে বাসা ভেঙ্গে ফেলার পর পিঁপড়েগুলো আবারও বাসা বাঁধবার আয়োজন করছে
      
     ক্যাম্পের মানুষজনের অনেকেই সরকারি টিনগুলো নিয়ে এখানে এসে উঠেছেকোনও দিক থেকে বাধা আসে নিবস্তি তো ছিলইসবাই এখানে তাড়া খাওয়া মানুষকাউকে জলে তাড়িয়েছে, কাউকে হাতিতে , কাউকে আবার খিদেজায়গাটি সুবিধের, হাত বাড়ালেই নদীটি রয়েইছেরিজার্ভের জঙ্গলটাও আছেঢেঁকি শাক, লাকড়ি এসব এমনি মিলে যায়গামারি, সেগুন, শিশু, লালি গাছের অজস্র ডাল পালা না কাটতেই এমনিতে এখানে ওখানে পড়ে থাকেগাছগুলোতে কেউ হাত দেয় নারিজার্ভ পেরুলেই ছেলে-মিশন পেরিয়ে শহরদুমুঠো ভাত জোগাড় করবার জন্যে এই বাড়ন্ত শহরে সুযোগের কোনও অভাব নেই
 
         বুলেন একটা ঠেলা ভাড়া করে এনে তাতে সামান্য যেটুকু মালপত্র আছে তাই তুলে দিয়ে মালতী আর মণিকেও সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পের থেকে বেরিয়ে রাস্তাতে পা বাড়ালফেলানি বুলেনের ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলোমণি এর আগেও বুলেনের সঙ্গে সে বস্তিতে বেশ কবার গেছেমণির পেছনে পেছনে ফেলানি এগুতে থাকলকাল এক পশলা বৃষ্টি দিয়েছিলআজ গরম অনেকটাই কমে গেছেহাসির শব্দ শুনে সে পেছনে ফিরে তাকালোঠেলাতে বসে সুমলা হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাসছিলঠেলাতে সে হাত পা মেলে বসেছেবারে বারে গায়ের থেকে কাপড় চোপড় ফেলে দেয়, বুলেন তুলে তুলে দেয়হঠাৎই মণির মায়ের চোখে পড়ল সুমলার চাদরটির এই বারে বারে পড়ে যাওয়ার দিকে পথের কিছু মানুষ তাকিয়ে আছেসে নিজের ব্লাউজের থেকে সেফটিপিন একটা খুলে সুমলার চাদরে ব্লাউজে আটকে দিলকিছুক্ষণ টানাটানি করে সে চাদর টানা বাদ দিয়ে খোঁপা খুলে চুলগুলোকেই এলোমেলো করতে শুরু করলবুলেন ঠেলাটাকে অল্প দাঁড় করিয়ে ওর লম্বা চুলে আবারো খোঁপা বেঁধে দিলআশে পাশের দুএকটা মানুষ তাই দেখে হেসে ফেললবুলেন সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার ঠেলা চালাতে থাকলসুমলা এবারে শান্ত হয়ে গেল
         বুলেন সরকারি টিনে একটা ঘর তুলে নিয়েছেমণিদের জন্যে কালীবুড়ির বাড়িতে এক কোঠার ঘর একটার ব্যবস্থা করেছেবুড়িকে মাসে পঞ্চাশ টাকা দিলেই হবেবুড়ি মাসে নব্বুই টাকা করে চেয়েছিলকিন্তু মণিদের দেয়া ঘরটার শুধু বেড়া কটিই আছে, চাল নেই বললেই চলেবুলেন ফেলানির ভাগের টিন কখানা লাগিয়ে দেবার পরেই শুধু ঘরটি ঘর হয়ে উঠেবুড়িও মাসে পঞ্চাশ টাকাতে রাজি হয়ে গেল
       কালী বুড়ির গলার স্বরটি বেশ রুক্ষ খানিকটা ভাঙা ভাঙা আর চড়াদূর থেকে শুনলে এমন মনে হয় যেন এই স্বরের অধিকারিণী এক মোটা গাট্টা মেদবহুল,শক্ত সমর্থ মহিলাকাছে চাপলে দেখা যায় ধারণাটি একেবারেই ভুলবরং ইনি এক হালকা পাতলা মহিলা, গায়ের চামড়াও হালকা , শিরা ধমনিগুলো স্পষ্ট দেখা যায়রঙটি একসময় হলদেটে সাদা ছিলএখন এমন মনে হয় যেন ভদ্রমহিলা নিজের শরীর ধুয়ে ধুয়ে পুরোনো হয়ে ছিঁড়তে বসা একটি এড়ি চাদর প্যাঁচিয়ে রেখেছেনমহিলার মুখোমুখি হলেই প্রথম যে প্রশ্নটি মনে দেখা দেয় তা এই যে এমন স্বর কী করে এসে এমন এক মহিলার মুখে জুড়ে বসল? একটু অবাক লাগলেও উঁচু আওয়াজের এই ভাঙা ভাঙা গলা নিয়ে দুর্বল মহিলাটি নিজের স্থিতি ঘোষণা করে চলেছেন
       এই বস্তিতে যারা প্রথম এসেছে কালীবুড়ি তাদেরই একজন, তাড়া খাওয়া মানুষজলে নয়, রায়টে নয়, খিদেতেও নয়, তার তাড়া খাবার গল্প অন্যযৌবনে বুঝি কালীবুড়ি বেশ রূপসী ছিলেনগরীব ঘরের রূপসী তরুণীদের সাধারণত যা হয় তাঁরও তাই হয়েছিলসতেরো বা আঠারো বছর বয়সে মোটামোটি ভালো অবস্থার একটি মানুষ ওকে বিয়ের সমস্ত খা-খরচ দিয়ে নিয়ে গেছিললোকটি আগের বিয়ের বৌ চলে গেছেচার পাঁচটি ছেলে মেয়ে দেখার জন্যে মেয়ে মানুষ চাইতাই তাকে নিয়ে যাওয়াব্যবসায়ী আর ধার্মিক মানুষ ছিলেন তাঁর স্বামীবাড়িতে নিত্য পুজো পার্বণ কীর্তনাদি লেগেই থাকতকেউ টের না পেতেই কালী এক নধর কান্তি জোয়ান গোঁসাইর সঙ্গে চলে গেলসে গোঁসাইর স্বভাব ছিল ফুলে ফুলে মধু খুঁজে ফেরা একটি ফুলে ওর নৈবেদ্যের থালা ভরে নারোজ নতুন নতুন মহিলা ভক্তরা ওর দেহে চন্দন লেপে দেয়, স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দেয়ভোর রাত অব্দি কীর্তনের সুরে ভক্তদের ভক্তিমার্গ দর্শন করিয়ে ক্লান্ত হলে তার সেবা আত্তি করেতার নৈবেদ্যের থালা ভরে থাকেনতুন বস্ত্র, অলংকার, চন্দনে সেজে থাকে তার দুধের আলতার মতো নধরকান্তি শরীর পেটে সন্তান দিয়ে সেই গোঁসাই তাকে বাসি ফুলের মত ফেলে দিয়ে চলে গেলএক মাসের পেটে খসিয়ে কালী এক চেনা পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে এখানে এসে পৌঁছুল ধার্মিক ব্যবসায়ী আবারো বিয়ে করল, নইলে তার ঘর দেখবে কে ? বাপের বাড়ির লোকেরা মেয়ে মরে গেছে ভেবে ভুলেই বসলব্যবসায়ী জামাইর থেকে ওরা কম সুবিধে আদায় করেন নিমেয়ের এই কাণ্ড সবাইকে অসহায় করে ফেললবাকি আর কিছু বিশেষ পরিবর্তন হয়নিহারিয়ে যাওয়া মেয়েকে কেউ খুঁজতে বেরুলো না, খবরা খবর করাতো দূরেই থাক

 সেই মেয়ে এই বস্তিতে এসে ধীরে ধীরে কালী বুড়ি হয়ে গেলমা বাবার দেয়া এক নাম ছিল তাঁরআরতিসে নাম অন্যে তো বাদই থাক, কালীবুড়ির নিজেরও হয়তো মনে নেইআরতি নাম নিয়ে যখন তিনি এ বস্তিতে আসেন আলাদা আলাদা চেহারাতে এখানেও গোঁসাই আর ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার দেখা হয়ঠিক সেরকম সময়ে তাঁকে একদিন কালী ঠাকুর ভর করেনযারা তার কাছে প্রায় রোজ আসত কালী পাবার পর তারা এখানে আসা ছেড়ে দেয়দিনে সে মুড়ি ভাজত, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতরাতে তার গায়ে রোজ কালী ভর করতএকবছর এভাবে চলার পর মুড়ি বেচার পয়সা দিয়ে সে বড় করে কালী পুজো দিয়েছিলবছর না ঘুরতেই লোকে দেখল রাতে যখন ঠাকুর ভর করেন তখন তার মাথাতে এক লম্বা জটা বেরিয়ে আসেসকাল হতেই আবার মিলিয়ে যায়আরতি ধীরে ধীরে কালী বুড়ি হয়ে যায়প্রতি বছরের কালীবুড়ির দেয়া পুজো এখন বস্তির সমস্ত মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছেএই কালি বুড়ির দুটো ঘরের বাড়ির একটাতে ফেলানি এসে উঠল সকাল দশটা নাগাদ এসে পৌঁছেছিলঠিক ঠাক করে রাখবার মতো আর কীই বা এমন জিনিসপত্র রয়েছে? ঘরটির এক কোনে চুলো একটা ছিলই সে একটু লেপে টেপে নিলোকেঁচোর মাটিতে সারা ঘর ভরা ছিল মণির সঙ্গে সেগুলো পরিষ্কার করে ফেললকোদালে শেওলাগুলো চেঁচে নিয়ে লাল মাটিতে মুছে ফেলার পর ঘরে শ্রী ফিরে গেলমণি ইতিমধ্যে নদীতে স্নান করতে গেছেবুলেন এসে ডাক দিল
   
           “ও বৌদি, কী করছ?’ হাতে দা কোদাল নিয়ে এসেছে ও"
         “এখন এই ভর দুপুরে তোকে কে কাজে রাখবে রে?”
         এই শহরের এক মাষ্টার বাবুর ঘরে বেড়া একটার কাজ আদ্ধেক করে রেখে এসেছিলামভাবছি, সেটাই পুরো করে দিয়ে আসি গেআগাম টাকা নিয়ে এসেছি যে
       “ তোর জন্যে কি আর বেড়া পড়ে রয়েছে? দেখগেঅন্য কামলা লাগিয়ে কাজটা করিয়ে ফেলেছে
      “ আমার হাতে কাজ না হলে মাষ্টার মাস্টারণী কারোরই মন ভরে না , বুঝলে!বুলেন হাসছিলওর ভুরুর উপর কোঁচকানো রেখাগুলো আজ নেইওই নর্দমার থেকে বেরিয়ে হয়ত ফেলানির মতোই ওরও মনটা আজ খোলামেলা লাগছে
হঠাৎই আবার ওর কপালের গাঁট কুঁচকে গেলখানিকের হাসিমুখখানা আবারও আঁধার হয়ে এলো
     “ বৌদি , ওকে একটু দেখবিনতুন জায়গা বলেই বোধহয় ওর আজ আবার সেই পাগলামোতে পেয়েছেসে ওর পরনের গামছাখানা অল্প তুলে দেখালোউরুতে জন্তুতে আঁচড়ানোর মতো লাল লাল ফোলা দাগ
        “ ওষুধ দিলি ওকে?”
        “হ্যাঁ, দিয়ে শুইয়ে রেখেছিআমি আসা অব্দি উঠবে নাবৌদি, তুই বরং এটা কাজ করভাত রান্নাটা তুই আমাদের ওখানে কর গেযাছেলেটাকেও খাওয়াবিআর ও যদি উঠে যায় তবে ওকেও...মানুষটির রা বন্ধ হয়ে গেলফেলানির এমন মনে হলো যেন উরুতে আঁচড়ানোর দাগ বুলেনের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে
       বুলেনের গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছিল যেন কফে বসে গেছে, “ ওকে কিচ্ছু খাওয়াতে পারি নিহঠাৎই সে কোনও দিকে না তাকিয়ে চলে গেল
         ফেলানি ভেতরে এসে দেখে কালী বুড়ি বসে আছেবুড়ি ওকে ডাকল, “আয়বুড়ির ডাকটা কেমন যেন লাগল ওরআস্তে কথা বললে মনে হয় বুড়ি ফিসফিসিয়ে বলছে, শব্দগুলো একের গায় আরেকটা জুড়ে বসেযখন জোরে বলে শব্দগুলোর যেন তেজ বেড়ে যায়, কানে এলে বেশ ভয় করেফেলানিও বুড়িকে এক ধরণের ভয় পায়কিন্তু আস্তে আস্তে ফিসফিসিয়ে কথা বললে দুর্বল এই মহিলাকে ভয় পাওয়া তো দূর, কেমন যেন মায়াই হয়মণির মা বুড়ির ঘরে গিয়ে ঢুকে গেলধূপ আর ধূনার গন্ধ একটা নাকে লাগলঘরটির চারদিকে নানা রকম কালী মায়ের মুখোশজিহ্বা মেলে কালো মুখগুলো বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছেও চাদরের আঁচল খুটতে খুটতে মাথা নুয়ে বসে রইলবুড়ি মুড়ি আর চা নিয়ে এলোমুড়িগুলোর থেকে তেল পেঁয়াজের গন্ধ একটা বেরুচ্ছে
          “আপনি খাবেন না?” ফেলানি বাংলাতে বলে বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলবুড়ির অবাক হবার পালা
         “ তুই বাংলা বলছিস!
         “আমার বাবা ছিলেন ক্ষিতীশ ঘোষ, দাদু ছিলেন কিনারাম বডো, আমাকে বড় করেছেন রতন ঘোষ
          বুড়ি মুখে কিছু না বলে বাটি একটাতে অল্প মুড়ি আর এক কাপ লাল চা নিয়ে এসে ওর কাছে বসল
       “তোর আর কে কে আছে?”
       তাইতো, ওর আর কে কে আছে? ওকে লম্বোদরের কাছে সমঝে দিয়ে রতন আর বিন্দু একেবারে চলে গেলরতনের ছেলেমেয়ে নেইনিজের কাছের মানুষ রয়েছেওদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকবে বলে আলিপুর দুয়ারের কাছের এক গ্রামে চলে গেলপাহাড়ের তলার গ্রামটির কিনারামের বাড়িতে? লম্বোদরের বাড়িতে? সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াশার মতো
সে মনে মনে হাতের তালুতে মুড়ি দুএকটা নিয়ে এমনি নাড়াচাড়া করতে থাকল
          “তুই এখন কী করবি?”
           সে এ প্রশ্নের জবাবেও চুপ করে বসে রইল
          বুড়ি কাপ আর বাটিগুলো সরিয়ে রাখল
          “ কালী মাকে প্রণাম করমা সব ঠিক করে দেবেবুড়ি কালীর মুখোশের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করলে, অও তাই করল
          “আপনি কী করে...সে কালী বুড়ি কী করে ঘর চালায় জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কেমন এক সংকোচে কথাটা স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করতে পারল নাএকা এক মহিলাবাড়ি ঘর করেছেনিজেও চলছেওকেও কিছু একটা মুখে দিতে উপরোধ করছে
বুড়ি আবারও কালীর মুখোশগুলোকে প্রণাম করছেসে উঠতে গেলে বুড়ি ওকে দরজা অব্দি এগিয়ে দিলদরজা পেরোতেই বুড়ি ওর হাত ধরলএবার বুড়ি জিজ্ঞেস করল, “তুই মুড়ি ভাজতে জানিস?” সে অবাক হয়ে মাথা নাড়ল, “জানি
          “জানবিই তো! বাঙালি মেয়ে
         “আমি বাঙালি নইআমার ছেলের বাবা...বুড়ি ওর কথাতে কান দিল না
          “মুড়ি ভাজলে চাল অল্প বেশি করে নিইকাল একসঙ্গে শহরে যাব
         সম্মতি দিয়ে সে বুলেনের ঘরের দিকে রওয়ানা দিল
       
        একচালা ঘরটা বুলেন বেশ গুছিয়ে সাজিয়েছেআধ কাঠার মতো মাটি বের করে নিয়েছেনদীর পারের জমিতার উপর বুলেনের খেটে খাওয়া হাতদুদিনেই এই মাটি ফুলে ফলে ভরে উঠবেসে ভেতরে ঢুকে গেলসুমলা বাঁশের চাঙে ঘুমিয়ে আছেলম্বা চুলগুলো বেণি বাঁধা, সিঁথিটা বাঁকাদেখলেই বোঝা যায় ছেলে মানুষের হাত পড়েছেএভাবে এক ঘুমিয়ে থাকা মেয়ে মানুষকে দেখে কে বলবে সে খানিক আগেই ওর বরের উরুতে খামচে রক্ত বের করে দিয়েছেছেলেটি নেইনিশ্চয়ই মণি কোলে নিয়ে কোথাও গেছেঘুমন্ত সুমলাকে একটা মৌমাছি বিরক্ত করছিলসে আস্তে করে পায়ের কাছে রাখা পাতলা কাপড়খানা তুলে ওর গায়ে দিয়ে দিলমৌমাছিটা চলে গেলসুমলাও শান্তিতে শুয়ে রইল

         বুলেনের ছেলেকে নিয়ে মণি এসে ঘরে ঢুকল
         “মা তোকে ঘরে খুঁজে পেলাম না
         “খিদে পেয়েছে?”
       “ পেয়েছিলকিন্তু কালীবুড়ি চা মুড়ি খাইয়ে দিল
       “ কালী বুড়ি বলবি নাআইতা ...খানিক থেমে গিয়ে বলল, “ ‘দিদাবলে ডাকবি... তুই স্নান করলি?”
        “হ্যাঁসে হাতের পলিথিনের থলে একটা মাটিতে উলটে দিলএকটি সাদা চকচিকে পুটা মাছছেলে উচ্ছ্বসিত আনন্দে জানান দিল, “ মা! আমি যখন স্নান করছিলাম, এ আমার পিঠে এসে ঠেকেছিলআমি গামছা দিয়ে ধরে ফেলেছি!
     “তোকে ভেজে দেব, যাবাবুকে পিঠে তুলে মণি দৌড় দিল, সে মুখ ফুটিয়ে বলেই ফেলল, ‘ঐ হাগা মুতার নর্দমার থেকে বেরুতে পেরে সবারই দেখি মনটা ভালো হয়ে গেছে!
         বুলেন চুলোর কাছে এক আঁটি লাকড়ি রেখে গেছেরিজার্ভ থেকে গুটিয়ে নিয়ে আসা শুকিয়ে কনকনে হয়ে আছে ডালগুলোচুলোতে তুষের আগুন একটু জ্বলছেকাঁচা চুলো বলে তুষ জ্বালিয়ে রেখেছেতাতে খড়ি কটা দিতেই খানিক চেষ্টাতে আগুন জ্বলে উঠলচুলোর উপরে চাল , ডাল, মিষ্টি লাউ একটা, আলু দুএকটা তেল নুন গুটিয়ে রাখা আছেকী করে যে মানুষটা মেয়ে মানুষের মতো সব করে রেখেছে! সে ডালের মধ্যেই দুটো আলু আর মিষ্টি লাউ টুকরো দুটো দিয়ে দিল, ভাতও ওদিকে হয়ে গেলমণির আনা মাছটা আঙটাতে পুড়ে অল্প তেল নুন দিয়ে ভর্তা বানিয়ে দিলছেলে দুটোকে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খেয়ে নিলোমিষ্টি লাউ যেমন লাল তেমনি মিষ্টিগরম মসুর ডাল দিয়ে অনেক দিন পর সে পরম তৃপ্তিতে ভাত কটা খেলবুলেন আর সুমলার জন্যে আলাদা করে রেখে সুমলাকে জাগাতে পারে কিনা তার চেষ্টা করে দেখলওঁ ওঁ শব্দ করে ও আবার এক কাতে ঘুমিয়ে পড়লওষুধ খাওয়া ঘুম, কই আর এতো তাড়াতাড়ি ভাঙবে? মণি আর বাবু ভাত খেয়েই বেরিয়ে গেলগাছের থেকে শালিকের বাচ্চা একটা পড়ে গেছেসেটিকে নিয়েই দুজনে ব্যস্ত হয়ে গেছেবাকি দুনিয়ার খবর ভুলেই গেছেফেলানি সুমলার কাছেই একটু গড়িয়ে নেবে বলে শুয়ে পড়লসুমলা জেগে উঠলেই দুমুঠো খাইয়ে দেবেঘরের গায়ে লেগে আছে একটি লিচু গাছ পাখি এনে ফেলা বীজ থেকে গজানো গাছ হবেখয়েরি রঙের কিন্তু বড়ইর মতো ফল ধরে বলে বুলেনের মায়া পড়ে গেল সে ওটি আর কাটে নিঘড়টিকেও ঢেকে রাখে গাছটিসে দেখল সুমলা গা থেকে চাদরটা ফেলে দিয়েছেবোতাম খোলা শরীরটার দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল নাকী মানুষের কী হয়েছেওর চোখদুটো ভিজে এলো
         বুলেনের ডাকে ফেলানি জেগে গেলকখন যে ঘুম পেয়ে গেছে সে টেরই পায়নিউঠে দেখে সুমলা বিছানাতে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছেবুলেনকে সে ভাতগুলো দেখিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হলোবুলেন একটি থালাতে দুজনের মাপে ভাত নিয়ে বাচ্চাকে কোলে তুলে আনার মতো করে স্ত্রীকে কোলে তুলে নিলোকোলে করে ওকে এক গ্রাস দুগ্রাস করে ভাত খাওয়াতে শুরু করলওর নগ্ন শরীর বুলেনের বুক ছুঁয়ে আছেসুমলা এক হাতে বুলেনকে জড়িয়ে ধরে রেখেছেশান্ত কচি খুকীর মতো ভাতগুলো খেয়ে নিচ্ছেদুজনকে এভাবে এক লহমার জন্যে দেখে নিয়ে ফেলানি বেরিয়ে গেলযাবার আগে দরজাটা আঁজিয়ে গেলতার চোখে পড়ল--তাই দেখে পাশের কিছু লোক জটলা পাকিয়ে ফিশিং ফিশাং শুরু করেছে
        ফেলানি ঘরে গিয়ে ঢুকলদরজা আঁজিয়ে সে ভেতর থেকে কাঠ দিয়ে দিলতার পরেই খানিক আগেই লেপে মোছে রেখে যাওয়া ভেজা মেঝেতে বসে পড়লওর বুকখানা যেন ভেঙে পড়বেকেউ যেন ওর কাঁধে খসখসে শুকনো হাত একখানা রেখেছে,” কাঁদছ কেন? মালতী...ও মালতী...এমন করবি নাতো... আমি মানুষটা মরিনি, না!হাত খানা সে ছুঁয়ে দেখতে চাইলএকবার বলতে চাইল, “এ্যা মা! এ কি সেগুনের পাত না মানুষের হাত, কী বড়রে বাবা!সেগুন পাতার মতো হাতে টগর ফুলের মত হাতখানা লুকিয়ে গেলতাই হোক, ভগবান তোকে তো টগর ফুলের মতো হাত দিয়েছে! তাতেই হবে...কথাটা পুরো হতে পারল না, গা থেকে ভোঁৎকা একটা গন্ধ বেরুচ্ছে যে লোকটার সে এসে লেলিয়ে লেলিয়ে বলে কিনা , “ মলি বাবা পুকুলেল থেকে নামঘল... মাথা নেই ...চোখ নেই...কান্নাটা শব্দ হারিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলশব্দহীন কান্নাটি মেয়ে মানুষটিকে একেবারে ঝাঁজরা করে দিয়ে গেল
  
      মা, মা ও মা! কিছু একটা দে তোপাখির বাচ্চাটা দেখ, কেমন করে মুখ মেলে চিঁ চিঁ করে যাচ্ছে!
  “
         সে চোখ মুখ মোছে দরজাটা খুলে দিলবাইরে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার
        “বৌদি!কচু পাতা একটাতে মাছ কতকগুলো নিয়ে বুলেন এসে হাজির
          “ মণির মা...হাতে সন্ধ্যা পূজার প্রসাদ নিয়ে কালীবুড়ি
        সে বাইরে গিয়ে হাত দুটো অঞ্জলির মতো মেলে দিলমণির পাখিটির জন্যেবুলেনের মাছগুলোর জন্যেকালীবুড়ির প্রসাদের জন্যেমণির পাখিকে কিছু খেতে দিতে হবেবুলেনের মাছগুলো কাটতে হবেকালীবুড়ির প্রসাদের থালা ঘুরিয়ে দিতে হবেভেতরে ঢুকে পড়া কান্না এবারে চোখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইলপারে নিসে হাতদিয়ে মুছে ফেলল


টীকা:
         ) লালিঃ এক রকম আরণ্যক গাছ
         ) আইতাঃ দিদিমা


0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India