ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন

ফেলানি






মিনতি , জোনের মা আর সে বাজার সেরে ঘরে ফিরে যাবার জন্যে তৈরি হলোআজ তিনজনেই মুড়ির সঙ্গে মোড়াও নিয়ে এসেছিলদুজোড়া দুজোড়া করে মোড়া সহজেই বিক্রি হয়ে গেলতিনজনেই মোড়াতে আলাদা আলাদা ডিজাইন তুলেছিলতিনজনেই ওরা চা খাবার জন্যে জগুর দোকানে বসলগে'লাল চায়ের সঙ্গে নারকেলের সন্দেশ দুটো দুটো নিয়ে তিনজনে হাত পা মেলে বসলমালতী মণির জন্যে সন্দেশ একটা নিতে গিয়ে দেখে বৈয়াম খালি
        “কি রে দোকানি, সব সন্দেশ বিক্রি করে ফেললি?”
        “আজকাল ও বেশি করে তৈরি করে দেয় , তবু ফুরিয়ে যায়
       “ওর শরীর ভালো আছে?” জোনের মা-ই পয়সা ক'টা দিলমানুষটি পয়সাগুলো দিতে বড় ভালোবাসে পয়সা দিয়ে ও রোজ বলে, “ মাথার উপর মরদ থাকা মেয়ে মানুষ আমি...ঠিকই তো জোনের মায়েরই মাথার উপর মরদ আছে, নিজের একটি চালা আছে
        জোনের মায়ের প্রশ্নে জগু চুপ করে রইল
        “ বৌয়ের কথা জিজ্ঞেস করছে, বল না কেন?” মিনতির প্রশ্নটিও জগু এড়িয়ে যেতে চাইছে
         “তোর নিজের চেহারাটা দিনে দিনে ভালো হয়ে আসছে
        “ সে আর করেটা কী? বৌ সারাটা দিন ,সারাটা রাত খেটে ঐ জিনিসগুলো বানায়সে ওগুলো নিয়ে বাজারে আসে, আর বসে বসে চা বিলোয়
        “পয়সা ক'টা গুনে, চাল ডালটা বাড়ি নিয়ে যায় আর রামুর দোকানে বসে তাস খেলে
       “বাড়ি গিয়ে বৌ পেটায়
         জোনের মা আর মিনতির ওকে চেপে ধরা মালতী বহুবার দেখেছেমুচকি হেসে সে ওদের ঠাট্টা ইয়ার্কি দেখছিল
হঠাৎ জগু ফোঁসে উঠল, “ওর কথা আমাকে জিজ্ঞেস করবি নানোংরা বেমারি মেয়েমানুষটাকে আমি বলেই ঘরে রেখেছি অন্যে হলে সেই কবে লাঠিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে দিত
         “নোংরা বেমারি?” মালতীর মুখের থেকে শব্দগুলো আপনাতেই বেরিয়ে এলো
    
  হঠাৎ বাজারে হুলস্থূল লেগে গেলএকদল ছেলে হুড়মুড় করে তেড়ে এলো জগুর চায়ের দোকানের গায়ে লেগে আছে মাছ মাংসের বাজারটা ছেলেগুলো এসে বাজারের বাকি যে ক'টা হাঁস মুরগি পায়রা আছে, এখানে ওখানে আধা ঝুলানো ছাগলগুলোর উপর এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ল যেন পচা আমের গায়ে মাছি পড়েছেওদের ভাবগতিক দেখলেই বোঝা যায় ওরা পয়সা দেবে না, হাঁস মুরগি ছাগলগুলোর উপর যেন ওদের মালিকানা রয়েছেদে --বললে , দিতেই হবেসবক'টা দোকানদার মনে মনে এদিনের লোকসানের হিসেব করলেও ওদেরকে হাসিমুখেই মাংসগুলো এগিয়ে দিল'জয় আই অসম', 'প্রফুল্ল মহন্ত জিন্দাবাদ', 'অসম চুক্তি জিন্দাবাদ', রাজীব গান্ধী জিন্দাবাদ' 'ভৃগু ফুকন জিন্দাবাদ' 'প্রফুল্ল মহন্ত, ভৃগু ফুকন অমর রহে' ধ্বনি দিতে দিতে ওরা আলু পেঁয়াজ ডাল লেবু যা পারে তুলে নিতে থাকলজগুর চায়ের দোকানের কাছে চলে এলো ছেলেগুলো বৈয়াম খুলে যে ক'টা মুড়ির নাড়ু , চিঁড়ার নাড়ু বাকি ছিল তুলে নিয়ে চলে গেলওদের হাতে হাতে একজন গোল টেকো, দাড়িমুখের আর একজন অল্প লম্বাটে মুখের চশমা পরা মানুষের ছবিমুহূর্তে বাজার খালি করে ছেলেগুলো বেরিয়ে গেলওদের দেখে মেয়ে মানুষ তিনটি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলধীরে ধীরে উঠলজগুও দোকান গোটালো মুহূর্তের মধ্যে লোকে জমজমাট বাজারখানা জনহীন হয়ে পড়লগোটা বাজার মাঝরাত্তিরের মতো তৎক্ষণাৎ খালি হয়ে গেলমিনতিরাও বাজার থেকে বেরিয়ে পড়ল
         পুরো শহর যেন দেওয়ালিতে মেতেছেসাধারণত মিনতি বা জোনের মায়েরা সন্ধ্যার আগে আগে বাড়ি চলে আসে প্রায়ই বিকেল থাকতে এসে পৌঁছে যায়কিছু কেনাকাটার থাকলেই দেরি হয়আজই ঐ পোড়ামুখোগুলোর জন্যে ভয়ে সিঁটকে থাকতেই অন্ধকার হয়ে এলো শহরে চারদিকে বাজি ফুটছে, বাড়ি বাড়ি প্রদীপ জ্বলছে, বহু জায়গাতে ভোজের আয়োজনমাঘের বিহু, দেওয়ালি, পুজো সব উৎসব যেন একসঙ্গে পালন করে ফেলছে এই শহরবাজারে শোনা শব্দগুলো বাজি, মাংস, ভাত, মদের সঙ্গে চারদিকে ছিটকে বেড়াচ্ছে 'অসম চুক্তি জিন্দাবাদ', 'প্রফুল্ল মহন্ত অমর হোন', 'ভৃগু ফুকন অমর রহে,' 'রাজীব গান্ধী জিন্দাবাদ, 'জয় আই অসম'এরই মাঝে ওরা ক'জন বাড়ি ফিরছেহঠাৎই মিনতি একটি কাগজে পা ফেলল, মড়মড় করে উঠল বড় কাজগটিচারদিকের আলোর রোশনাইতে বড়মাপের কাগজের ছবিটি দেখতে সামান্যও অসুবিধে হলো না সেই গোল,দাড়িমুখো, টেকো মানুষটির ছবিমিনতি 'আহ!' বলে লাফ দিয়ে উঠলসে যেন নিজের ছেলেটির গায়েই পা দিয়ে ফেলেছে হাঁটু ভেঙে কাগজখানা তুলতে গিয়ে সে পরম ভক্তিতে চোখ মুদে প্রণাম একটাও করে ফেললতারপর হাত দিয়ে কাগজখানা সমান করে আলতো করে হাতে তুলে নিলোমুখে ওর একটা লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়েছে চোখজোড়া কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়েছে, অথচ ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়েছে একটা চাপা হাসিসে এখন ওর কথা বলবে বাকি দুজন বুঝে ফেলল
           “ এই মানুষটি ওর ভগবান ছিলসে আমাকে বলেছিল, এই মানুষটিই অসম থেকে সব বিদেশি তাড়াবেএখানে রামরাজ্য হবে আর সে আমাকে প্রায়ই বলত সেই নতুন দেশে ওর আমার একখানা সংসার হবে
দুজনে চুপচাপ ওর কথা শুনছিলকলেজে পড়া আন্দোলনের লিডার সেই ফিল্মের হিরোর মতো দেখতে ছেলেটির থেকে সে বহু কথা শিখেছিল
        “ সে তোকে বলেছিল গোলমাল হবে বলে?”
        “বলেছিলদিদি জামাইবাবু অফিসে বেরিয়ে যাবার পর প্রায়ই সে এসে আমার বাক্সে বন্ধুক লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিল
         “ তুই জিজ্ঞেস করিসনি ওগুলো দিয়ে কী করবে?”
        “ করেছিলামসে বলেছিল অসমের সব শত্রু খতম করবে
        
 কথা বলতে বলতে একটা হুলস্থূলুর শব্দে ওরা তিনজন চমকে উঠলপথের এককোনে একদল ছেলের সঙ্গে একটি মানুষের তর্ক বেঁধেছে মানুষটিকে সে চিনতে পেলকালীবুড়ি মুড়ির যে কয়টি বাঁধা গ্রাহকের বাড়িতে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল তাদেরই একটি বাড়ির লোকছোট পরিবার, ছোট মেয়ে আর বৌ নিয়ে তিনি শিক্ষকমানুষটি রোজ বারান্দাতে বসে পত্র পত্রিকা বই পত্রে চোখ বুলাতে থাকেনসে মুড়ির বস্তা নিয়ে ঢুকলে হাসি একটা দিয়ে রোজ একটাই কথা বলেন, “যা, দিদি ভেতরে আছেনমানুষটি একদিনই ওর সঙ্গে একটু বাড়িয়ে আলাপ করেছিলেনকালীবুড়ি গোলমালে তার বাড়ি আর স্বামী হারানোর গল্প করেছিলেনশুনে মানুষটি চটে লাল হয়ে গেছিলসেই মানুষটির সঙ্গেই চ্যাংড়া ছেলে কয়েকটার তর্ক বেঁধেছে লোকটিকে ওরা ঘিরে ফেলেছে
         “উঠিয়ে নিন আপনার ভবিষ্যৎ বাণী
        “ না উঠাব না, একশ বার উঠাব নাএই চুক্তিতে কোনও সোনা ফলবে না
        “ কেন ফলবে না? আপনার মতো দেশদ্রোহী এরকম বলবেনই
        “ তোমাদের লিডার টাকার পাহাড় জমাবে আর অসমকে শ্মশানপুরী করে তুলবে
       “ ও মুরগি একটা না দেবে না দিক, তাই বলে আমদের নেতার নামে কথা শোনাবে কেন?”
       “ মার একে
       “ দে দুই চড় কষে
       “ প্রফেসর হয়েছে
      “ প্রফুল্ল মহন্ত মুখ্যমন্ত্রী হয়ে টাকা খাবে! এমন পোড়া মুখ! দে ভেঙ্গে দাঁতগুলোঅমন কথা বলে যে ওর মুখ চেপ্টা করে দে
ছেলেগুলো মানুষটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লএকজন মহিলা আর একটি মেয়ে আর্তনাদ করে উঠলজটলার মধ্যি থেকে ভেসে আসছে কোঁকানোর শব্দ কোঁকানোর শব্দটি একবার বড় হয় , একবার খাটো
   
   মালতী পা চালাতে না পেরে দাঁড়িয়ে গেছিলচোখে ধোঁয়াশা দেখতে শুরু করেছে পাগুলো কাঁপছে সে যেন কলাপাতাতে ঠাসা একটা পুকুরে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে দু দুটো জোক ওর দুই চোখকে যেন সেলাই করে জুড়ে ফেলছে সামান্য নড়াচড়া করলেই একদল ছেলে কলাগাছগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেবে চতুর্দিকে মাংস পোড়ার গন্ধ সে একটুও নড়াচড়া না করে রাস্তার কাছেই বসে পড়ল
  
       “ কী হলো হে ওর?” বলে জোনের মা তার শক্তি সমর্থ শরীরে মালতীর নড়বড়ে শরীরটাকে তুলে ধরল, “ ধর , একে ধরগৃহস্থ ঘরের বৌ, সোয়ামীর আদরে দিন কাটিয়েছেকপাল পুড়ে আজ বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে
        “ জল একটু যদি ছিটিয়ে দিতে পারা যেত
        “ জলের কথা বাদ দে, আগে রিজার্ভ পাই গে'চারদিকে কেমন হাল্লা চীৎকার হচ্ছে দেখছিস না, কখন বা কী বা হয় !
         ওকে মাঝে ধরে ওরা বস্তির দিকে এগুলোওর দেহের ভারের বেশিটাই নিয়েছে জোনের মা শহর থেকে যতই দূরে চলে এসেছে ততই হুলস্থূলগুলো কমে আসছে রিজার্ভের এলাকা পেয়ে যেন ওদের বুক থেকে পাথর নামলএই এলাকা শান্ত কোথাও বা দু একটা পাখির ডাকজঙ্গলের মধ্যি দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ঝির ঝির শব্দচেনা শব্দ চারদিকে
         “ শরীরটা ভাল লাগছে মণির মা?” মিনতি ওর মুখে খানিক জল ছিটিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল
         “ আজ ঐ বদমাশগুলোর জন্যে অনেক দেরি হয়ে গেলতোর হয়তো খিদে পেয়েছে
         জোনের মা বাড়ির জন্যে কেনা ব্রেডের আদ্ধেকটা ওর দিকে এগিয়ে দিলব্রেডের টুকরো ও হাতে নিয়েছে কিন্তু মুখে দেয় নি খানিকক্ষণ জোনের মা আর মিনতির দিকে তাকিয়ে রইলতারপর সামান্য হাসবার চেষ্টা করে বলল, “কিচ্ছু হয় নিমাথাটা অল্প খারাপ লাগছিলএবারে সে কাউকে না ধরে হাঁটা দিল
       বস্তিতে ঢুকেই দেখল শহরের সমান নাহলেও এখানেও ধূমধাম হয়ে গেছেসবারই বাড়ির সামনে ছোট হলেও একটা করে মোম জ্বলেছে খাবারের আয়োজন হচ্ছে ভাঙুয়ার ছেলে সবার আগে সবার ঘরে ঘরে মোম জ্বলাতে বলে বেড়াচ্ছে তার পেছনে পেছনে একই বয়সের আর কতকগুলো ছেলে ছেলেগুলো কালীবুড়ির উঠোনে এসে পড়েছে, মুরগি লাগেভেতরে মণি কাঁপছে সে বাজারবারে মাকে বলে কয়ে টাকায় একটা করে মুরগি বাচ্চা আনিয়েছিলতুলো দিয়ে সাজানো যেন বাচ্চাগুলো তারই দুটো মরে গেছে, তিনটা সামান্য বড় হয়েছেভাঙুয়ার ছেলে আর তার দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুরগি , ছাগল খুঁজছে দেখে সেই বিকেলে এসেই সে বাচ্চাগুলোকে ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছেপরের শুক্রবারের কালী পুজোর জন্যে ভোগের জন্যে কেউ এক জোড়া কালো পায়রা দিয়ে গেছিলওদের দেখে কালীবুড়ি সেগুলোই ওদের দিয়ে দিলপায়রা পেয়ে নিজেদের ভাষাতে কথা বলতে বলতে ছেলেগুলো চলে গেলকালীবুড়ির উঠোন থেকেই ড্রাইভারণী হাতের ইশারাতে ওদের ডেকে নিয়ে গেলছেলেগুলোর সঙ্গে ড্রাইভারণীর হাসি তামাসা ভালোই শোনা গেলড্রাইভারণী ওদের চা মিষ্টি খাওয়াচ্ছে আধঘণ্টাখানিক পরে যখন ওরা ওখান থেকে বেরিয়ে গেল ওদের পা তখন আর সোজা চলছে না জন্মের থেকে চেনে বলেই বোধহয় নেশা বেশি চড়তে দেয়নি কালীবুড়ি আর মালতী বাতি নিভিয়ে ড্রাইভারণী আর ছেলেদের কীর্তি দেখতে থাকলছেলেগুলো চলে গেলে বুড়ি ওকে ফিসফিসিয়ে বলল, “ এই মহিলার থেকে সাবধানে থাকবিএ বড়ো সাংঘাতিক মেয়েমানুষ!
               “কেন ?” ওর স্বরও বসে গেছে
             “ , যে পার্টির শক্তি বেশি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করে রাখেসব বাজে কাজের সিদ্ধান্ত ওর ঘরে বসে ঠিক হয়ওর নিজের বলতে আছেটা কী? তুই মোট কথা সাবধানে থাকবি
             রোগা পটকা এক মহিলা বাড়িতে ঢুকলকাছে এলে সে চিনতে পারল জগুর বৌ মানুষটি আরো শুকিয়ে গেছে
          “ আয় বসকালীবুড়ি পিড়ি পেতে দিলসে লক্ষ্য করল মহিলা বসবার গে কাপড়ের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কী যেন ঠেলে দিল
        “ বসব না বেশিক্ষণ, ঘরে ছেলে চেঁচাচ্ছেভাত লাগে ওদের ভাত খাইয়ে নারকেল কোরাতে হবে চিঁড়ার নাড়ু, মুড়ির নাড়ু বানিয়েছিএইটুকুন বলতেই ও হাঁপিয়ে উঠছিলখানিক শ্বাস নিলোএতো দুর্বল মহিলাটি বসতে যেন ওর বেশ অসুবিধে হচ্ছে ।    একবার পা মেলে বসে, একবার কুঁচকেএকবার সোজা হয় তো আরেকবার ঝুঁকে
           “ তোমার হাতের সন্দেশ খাই , কী যে ভালোআমাকে শিখিয়ে দেবে?”
          “ তুই আর কোন কাজটা না শিখবি , শুনি?” কালীবুড়ি হেসে ফেলল
         “ হবে, শিখিয়ে দেবকীইবা আর কঠিন কাজ, সামান্য খাটা খাটুনিমহিলাটি এবারে পা মেলে বসেছে বড় করে শ্বাস একটা নিয়ে ও জিজ্ঞেস করল, “ মণির মা, ওদের বাবাকে বাজারে দেখেছিলি আজ? এতো হুলস্থূল হচ্ছেএখনো ঘরে আসে নি
        “ দেখেছিলামআমাদের সঙ্গেইতো দোকান বন্ধ করলফেরেনি এখনো?”
মহিলাটি ঘোপ করে দাঁড়িয়ে পড়লকাউকে কিছু না বলে সে চলে যাবার জন্যে পা বাড়াল
       “ তোমার কী অসুখ হয়েছিল , বলছিল জোনের মাএখন কেমন?” জগুর বৌ দাঁড়িয়ে পড়ল
        “ কই আর ভালো হবে এসব অসুখ?” সে বুঝতে পারল মানুষটির বুক ভার হয়ে এসেছেশুকনো এই দেহে রয়েছে অনেক কথা ।        ঔষধ খেলে কি আর অসুখ ভালো হয় ?”
       যেতে গিয়ে সে গেল না, দাঁড়িয়ে রইলকী যেন একটা বলতে চাইছে ওর স্বর খাটো হয়ে এসেছেদোকান বন্ধ করে মানুষটাকে কোনদিকে যেতে দেখলি?” চাপা স্বরটিতে যেন অনেক রাগ, শোক আর অভিমান জমা হয়ে আছেরোগা পটকা মানুষটি অল্প অল্প কাঁপছিল দাঁড়িয়ে এক গ্লাস জল খেতে পেলে যেন রক্ষে পায়
      “ চলো , আমার ঘরে বসবেসে এমনি করে বলে দেখলমহিলা এমন ভাবে ঘুরে এলো যেন এই কথাটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলসে পেতে দেয়া বস্তাতে বসতে গিয়ে আবারো মানুষটি কাপড়ের উপর দিয়ে যেন কী একটা ভেতরে ঠেলে দিল
      “ কি করলে?” হঠাৎ ওর মুখ দিয়ে প্রশ্নটা বেরিয়েই এলো
      “এটাই তো আমার অসুখ, আমার ভাগ্য
 
    কিছুই বুঝতে না পেরে সে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলতার পরেই শৌচ করবার মতো বসে কাপড় অল্প তুলে দিলসে স্পষ্ট দেখতে পেল একটু মাংসের মতো কী যেন ঝুলে পড়েছে আবার কাপড়টা নামিয়ে পা মেলে সে বস্তাতে বসে পড়ল
         “ দেখলি মণির মা, মেয়েমানুষের জ্বালা
         “ ডাক্তারকে দেখিয়েছিসনিজের অজান্তেই সে মহিলাটিকে তুই বলে বলতে শুরু করে দিল
        “ প্রথমদিকে অসুবিধে দেখে সেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল
        “কোথাকার ডাক্তার?”
        “ কোথাকার আবার, সরকারি হাসপাতালের
       “ কী বলল, ডাক্তার?”
       “ এই অসুখের কোনও ঔষধ নেই
       “ ঔষধ নেই? কেন হয় এই অসুখ?”
        “ ডাক্তার আমাকে খুব করে গালি দিল
        “ কিসের জন্যে?”
      “তিনবার শরীর খসাবার জন্যেএমনিতেই পেটে পাঁচটা ছেলে ধরেছি তার উপর আবার তিনবার গা খসিয়েছি সে জন্যেই এই অসুখে পেল
       “কোনও চিকিৎসা নেই বুঝি?” সে মহিলাটিকে দুই টুকরো ব্রেড আর এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলবিনা আপত্তিতেই ব্রেড টুকরো মুখে দিল সে মালতী দুটো মুড়িও এগিয়ে দিল
        “ যন্তর দিয়ে জরায়ুটা ভেতরে ঠেলে দিয়েছিলআবার বেরিয়ে এলো ডাক্তার বলেছিল, মশলা বাটবে না, জলের কল মারবে না, ভারী জিনিস তুলবে না, নারকেল কোরাবে নাবল মণির মা, এইগুলো না করলে আমাদের চলবে? দিনে আমি বিশ ত্রিশটা নারকেল কোরাই, কোরানো নারকেল পাটাতে বাটিএ নইলে ভাত দুমুঠো আসবে কী করে?
       সে জগুর বৌয়ের শুকনো পিঠে হাত রাখলতার নিজের কথা বলবার ইচ্ছে হলো সেই মানুষটির কথা , সেগুন পাতার মতো ছড়ানো হাত যার, সেই ভোৎকা গন্ধের মানুষটার কথা, মুণ্ডহীন ধড়গুলোর কথা, চোখ খসে পরা পিশাচগুলোর কথা
        “বড় জ্বালা, বেঁচে থাকার বড় জ্বালাসে কালীবুড়ির কথাগুলোই আওড়ালো
       “দেহের জ্বালা সইতে পারি, কিন্তু মনের জ্বালা সইতে পারা বড় কঠিন রে মণির মা
        “তোর মাথার উপর ছেলে মানুষ আছে, ছেলে মেয়ে আছেদুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছিসকিসের জ্বালা তোর? আমার মতো তো আর সব পুড়ে শেষ হয় নি
       “তোর মানুষটা তোর মনে আছেতাকে মনে নিয়ে সব করতে পারিসআমার মতো জ্যান্ত স্বামী...কী একটা বলতে গিয়ে রোগা মানুষটি কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো
        “ কী করে জগু তোকে?”
       “ কী করবে? নিজের বিছানাতে সুখ না পেলে পুরুষ মানুষ কী করে?”
         “ জগুর জন্যে তুই এতো করিস আর সে অন্য মেয়ে মানুষ...
      
    সে বাজার থেকে বাইরে বাইরে মাঠ দিয়ে এসে কই ঢুকে জানিস? ঐ ড্রাইভারণীর ওখানেরুগ্ন মেয়েমানুষটির হাতের হাড়মাস বেরিয়ে গেছে, শিরা ধমনির রেখাগুলো স্পষ্ট চোখে পড়েসেই হাতে মাটিতে আঘাত করতে করতে বলে যায়, “ আমি যখন নারকেল কোরাই, পরদিনের বাজারের জন্যে পাতাতে সেগুলো বেটে সন্দেশ নাড়ু বানাতে থাকি আমার মানুষটি তখন রেণ্ডীর ওখানে গিয়ে মৌজ করেগোটা দিনের রোজগার ওর হাতে দিয়ে আমার ঘরে এসে লাঠি হাঁকায় ভাত ভাত করে বাচ্চাগুলো কাঁদতে থাকে আর ও ওদের ধরে ধরে পেটায়মহিলাটি আবারো শৌচ করবার মতো বসে এবারে কাপড়টা একটু বেশিই তুলে দিলগোটা একটুকরা মাংস ঝুলে দুলতে থাকল, এই অবস্থাতে কি আমার শরীরে আর কোনও কষ্ট সইতে পারে? বল্ আমি এখন কী করি?” শুকনো মহিলাটি থরথর করে কাঁপছে
  “
        সে আস্তে করে ওর পিঠে হাত রাখলজগুর বৌর চোখজোড়াতে এক ফোটাও জল নেইজ্যেষ্ঠ মাসের ফেটে চৌচির ধান খেতের থেকে তুলে আনা দু টুকরো শুকনো মাটির দলার মতো ওর চোখজোড়া তাকিয়ে আছে
         বাইরে তখন ভাঙুয়া বুড়োর ছেলে আর ওর সঙ্গীদের চুক্তি সম্পন্ন হবার খানাপিনা পুর দমে চলছেগান বাজছেওদের হাসির শব্দে গাছের কাকগুলোও ভয়ে ওদের বাসা থেকে বেরিয়ে কা কা করতে শুরু করেছেমাঝে মাঝে বিকট সম্মিলিত কণ্ঠে বেজে উঠছে জয়ের নিনাদজয় জয় আর জয়
        জগুর বৌ যাবার জন্যে উঠতে উঠতে এক হাতে জরায়ুটা ভেতর দিকে ঠেলে দিলমালতীর মুখে কোনও কথা নেইবহুদিন বৃষ্টি না পড়া মাঠের দু দলা মাটির মতো চোখজোড়া যেন শুকনো খড়ের আবর্জনার মতো সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ল
ওর সামনে সামনেও দাঁড়িয়ে রইল আরো একজন বৃষ্টি না পড়া মাটির মতো শুকনো মানুষ

টীকাঃ
          ) আইমা; জয় আই অসম অর্থ জয় মা অসম
         ) অসম চুক্তি- ১৯৮৫র ১৫ আগস্ট রাজীব গান্ধী নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার এবং প্রফুল্ল মহন্ত , ভৃগু ফুকন নেতৃত্বাধীন সারা অসম ছাত্র সংস্থার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি


    

Assam from agitation to accord
Challenge to India's unity: Assam students' agitation and government 

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India