ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন

ফেলানি

            ঠিক যে সময়টিতে মালতী নিজের শরীরকে নিয়ে ভয়ে মণিকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে জাগাচ্ছিল ওদিকে তখন ঠিক সেই সময়টিতেই মিনতির চাটাই দিয়ে বাঁধা দরজাতে টোকা পড়েছিল। মিনতি দরজাটা খোলেনই। কেই বা এসময় এসেছে! বেশ কয়েকজনেরে টোকা পড়েছিল। উঠে বসেছিল সে।
    “কে বাইরে?”
    “আমি।”
    “ কে?” এবারে সে ভয় পেয়ে গেছিল।
    “ আমি হরি ভাঙুয়ার ছেলে।”
    “এতো রাতে তোর কী চাই?”
    “স্যার খবর পাঠিয়েছেন, দরজা খোল বলছি না।”
    “কোন স্যার?” সে কি ঠিক ভাবছে? দরজা খুলবার জন্যে উঠতে গিয়ে মিনতির শরীর কেঁপে উঠল। তার মানে সে মিনতিকে দেখেছে। মিনতির ভুল হয়নি তবে। একবার সে খানিকক্ষণ মিনতির দিকে তাকিয়েছিল। চোখে চোখ পড়েছিল। সে দরজাটা খুলে দিল। ছেলেটি ওকে বলল,
    “চল, আমার সঙ্গে চল। স্যার ডাকছেন।”
    “কই যাব?”
    “ডাক বাংলোতে।”
    “কী করে?”
    “আমি গাড়ি এনেছি, স্যার পাঠিয়েছেন।”
    “ওকে জাগিয়ে দিই , দাঁড়া।”
    “ছেলেকে নিতে হবে না।”
    “কেন?”
    ছোট্ট করে চোখ মুদে সে এক নোংরা হাসি দিল, “লাগবে না।”
    “ওকে তবে জোনের মার ওখানে রেখে যাই।”
    “খবরদার তুই কোথাও যেতে পারবিনে, ছেলেকে আমার মায়ের কাছে রেখে যাবি।” কিছু একটা ভেবে খানিক থামল সে, “দাঁড়া, মা-ই আসবে এখানে।”
    সে দিনের বেলা পরা কাপড়টাই আবার পরেছিল। লম্বা চুলে খোঁপা বাঁধেনি শুধু, একবেণী বেঁধে সামনের দিকে ফেলে রেখেছিল। ডাক বাংলোর একটা ঘরে ছেলেটি একটি বিছানাতে বসে ছিল।
    “বস মিনতি।”
  

  মিনতি বসবার জন্যে মোড়া বা টুল কিছু একটার খোঁজে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছিল। সবসময়েই সে উপরে বসত মিনতি নিচে। স্যার-দিদিদের বাড়িতেও সে এভাবে ওঠ বস করবার শিক্ষাই পেয়েছিল সবার থেকে।
    “বস, এখানেই বস”, সে বিছানাটা দেখিয়ে দিল।
    “ভালো আছিস?”
    “হ্যাঁ।”
    “তুই ওভাবে আমাকে কিছু না বলে চলে এলি কেন?”
    মিনতি কিচ্ছু বলল না।
    “ছেলেটা কবে হলো?”
    “আসার তিন মাস পর।”
    “চলছিস কী করে?”
    “মুড়ি ভাজি আর...”, ওর স্বর কাঁপছিল, “মোড়া বানাই।”
    “থাকিস কই?”
    “ভাড়া নিয়েছি।”
    সে বালিশের নিচে থেকে একটা টাকার তোড়া মিনতির দিকে ছুঁড়ে দিল, “এটা রাখ।” বোতলের থেকে মদ ঢালতে শুরু করল তারপর।
    “আপনি এগুলো কবে থেকে খেতে শুরু করেছেন?” সে শক্ত সমর্থ, লাল চোখের কঠিন মুখের মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল। সেই কোমল মুখের ছেলেটি, বাড়িতে যখন কেউ থাকত না তখন এসে ‘আমার সোনামণি’ বলে মিনতিকে জড়িয়ে চুমো খেতে যে ছেলেটি, হঠাৎ একদিন বিহ্বল হয়ে ভুল করে ফেলা ছেলেটি, ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল যে ছেলেটি... সেই ছেলেটি আর এই মানুষটি।
    “ কী! এতো দূরে দূরে বসে আছিস? এদিকে আয়, কতদিন পর দেখা পেলাম!” লোকটার কথাগুলো জড়িয়ে এসেছে, ঠোঁটগুলো শুকিয়ে গেছে, মিনতিকে ধরেছে যে হাতে সেটি বেশ গরম। মিনতি হাত গুটিয়ে নিলো।
    “ছেলেটিকে ঘরে একা রেখে এসেছি?”
    “ওর নামে জমা রাখবার জন্যে কিছু টাকা দেব।”
    সে আবারো আধা গ্লাস মদ খেল।
    “ওগুলো এভাবে খাচ্ছ কেন?”
    “আমার অনেক দুঃখ, অনেক চিন্তা মিনতি!”
    সে মিনতিকে কাছে টেনে নিয়ে আলোটা নিভিয়ে দিল।
    বাইরের জ্বলন্ত টিউবের আলো ভেতরে চলে এসেছে। আলোতে মানুষটার মুখখানা ও দেখতে পাচ্ছিল। সামান্য মাত্র আবেগ নেই। যে মানুষটি গায়ে হাত দিলেই মিনতি কেঁপে উঠত এই অভিজ্ঞ মানুষটির মধ্যে সেই ছেলেটিকে খোঁজে বেড়ালো। মিনতি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে নিজেকে সুরক্ষিত করে ফেলল। এই রাতে এগুলো কোথায় পেলে? সঙ্গে রাখো? মিনতি ভয় পেয়ে গেল। রোদে বর্ষাতে পিটে গড়া মিনতির সুঠাম শরীর থেকে চরম তৃপ্তিটুকু হাসিল করবার আগের মুহূর্তটিতে মানুষটি ঠিকই ধরতে পারল ওর পায়ের তলায় কুকুরের মতো নেতিয়ে পড়া মেয়েমানুষটি সন্দেহ আর অবিশ্বাসে নিথর হয়ে পড়েছে। “আর তোকে বিপদে ফেলব না, মিনতি।” কথাটিতে যেন যাদু ছিল। মুহূর্তে সে আবার ফিরে পেল কুকুরের মতো নেতানো মেয়ে মানুষটিকে। দামি মদের নেশা থেকেও বেশি উত্তেজনায় সে মাতাল হয়ে উঠল। সে ভাবতেই পারেনি, এই বাজে রাস্তাঘাট, ভাঙ্গা সাঁকোর ছোট শহরে এই নেশা মেটাতে পারবে বলে। আশা না করেই হাতে আসা মিঠাইর মত যে মিনতিকে পরম তৃপ্তিতে গিলতে শুরু করল।
    বাকি নেতারা চলে যাবার পরেও লোকটা আরো দিন পাঁচেক এই ছোট শহরে রইল। পুরো পাঁচ দিন পর মিনতিকে আজ বস্তির মানুষ দেখতে পেল। সে বাজারে যাবার জন্যে বেরিয়েছে। শুধু জোনের মা আর গোপাল জানে সেই পাঁচ রাতে ও ছিল কোথায়, করেছিল কী।
মণির মায়ের হাতে মোড়া, মাথায় মুড়ি।জোনের মায়ের হাতেও মোড়া আর মুড়ি। মিনতির খালি হাত। মণির মা একটু অবাক হলো। কিছু না থাকলে মিনতি ঠোঙার বোঝা হলেও একটা আনে।
    “আজ তুই খালি হাতে যে?”
    “ আজ ওই এক আধটু কিছু কেনা কাটা করব।”
    “কী কিনবি?”
    “ একটা খাট, বিছানার কাপড় আর...।”
    “এতো জিনিস!”
    জোনের মা আর মণির মায়ের বিস্ময়বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে সে অল্প হাসল, “ সে অল্প টাকা দিয়ে গেছে।”
    “ কী বলল সে তোকে?”
    “ছেলেটার খবর নিয়েছে।”
  

  উতলে উঠা স্তন নিয়ে গাভি যেমন করে, মিনতি তাই করল। বাছুরে আস্তে করে খোঁচা একটা দিতেই দুধ বেরিয়ে এলো। ওর ভালোবাসা...ওর দুঃখ...মিনতির জন্যে ওর চিন্তা...ওকে নিজের বাড়ি ঘর করে দেবার প্রতিশ্রুতি... এমনকি মিনতিকে বিপদে না ফেলে দেয় তার জন্যে তার যত প্রয়াস। দুধে যেন সে একেবারে গলে গেল।
    মিনতির কথাতেই ওরা দু’জনে দুটো কম পয়সাতে মোড়া আর মুড়িগুলো ব্যাপারীকে দিয়ে দিল। সত্যি সত্যি মিনতির হাতে একশ টাকার নোট। একটা নয়, বেশ ক’টি।
    আজ ওরা দুটো রিক্সা নিলো। একটিতে খাট নিয়ে মিনতি আরটিতে ডেকচি, কড়াই, একটা কেরোসিনের স্টোভ, আরো নানা জিনিস নিয়ে ওরা বাকি দু’জন। মিনতি আজ দু’জনকেই একটা করে ব্লাউজও দিয়েছে। ঘরে ফিরতে ওদের বিকেল হয়ে গেল। মিনতির চালাতে ছোটখাটো একখানা উৎসবই হয়ে গেল। জগুর বৌ, রত্নার মা, কালী বুড়ি, জোনের মা, মালতী ধরাধরি করে মিনতির জিনিসগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে দিল। ছোট্ট ঘরটা ভরে গেল। এমনকি ড্রাইভারণী এসেও একবার দেখে গেল। ও একটা টিভি এনেছে। সবাইকে ফিল্ম দেখবার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেল। মিনতির আনা বিস্কিটে সবাই নতুন কাপে করে চা খেয়ে গেল।
    মিনতির সুখী মুখখানা মনে করে করেই মালতী মুড়ি ভাজছিল। যাই হোক, মেয়েটি খানিক সুখ পেয়েছে। এতো করেছে! কী জানি যদি, মানুষটা ওকে আর ছেলেটাকে নিয়েই যায়! মালতীর চোখের সামনে ভেসে উঠল দিন দুপুরে বন্ধ চাটাইর বেড়া। এ যেন আর না হয়। ছেলেটার অসুখের জন্যে মেয়েটিকে কীই না করতে হয়েছিল! হোক, ওর জীবন সুখের হোক!
    “মণির মা! মণির মা! এদিকে আয় না!”
    মিনতির আকুল ডাক ভেসে আসা শুনে সে ঝাঁপ দিয়ে উঠল। মিনতি ঢুকেই গেছে ঘরে। ছেলেটার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। মিনতি কালীবুড়ির কাছে এসেছে। কালী বুড়ি ছোটখাটো কাটাছেঁড়ার ওষুধ দেয়। যেখানকার মুড়ি সেখানে রেখে মালতী ছেলেটার কপাল জলে ধুয়ে দিল। ইতিমধ্যে কালীবুড়ি কালীমন্দিরের কাছের ঝোপঝাড় থেকে জংলি ওষুধের গাছগাছালি থেকে একটার পাতা ছিঁড়ে ছেলেটার কপালে রসটুকু লাগিয়ে দিল। রক্ত থেকে গেল। মিনতি স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ওর চেঁচামেচিতে বস্তির বেশিরভাগ লোক জড়ো হয়ে গেছে। জগুর বৌ মিনতির ছেলেটিকে কোলে নিতে চাইছিল। “ ছেলে ফেলে কই ট ট করে বেড়াস? ছেলে মা হলে...।” পাঁচটা ছেলেমেয়েকে বড় করবার অভিজ্ঞতা নিয়ে জগুর বৌ এক ছেলের মা মিনতিকে কিছু একটা উপদেশ দিতে চাইছিল। মিনতি বাঘিনির মতো গর্জে উঠল। রুগ্ন মানুষটিকে যেন ঠেলে ফেলে দেবে।
    “তোর পোলার বাপকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, কী করেছে সে আমার ছেলেকে!”
    “কী করেছে তোর হারামজাদাকে?” জগুর বৌ এক্কেবারে কাজিয়াতে লেগে গেল। হালকা পাতলা মানুষটি একেবারে নলখাগের মতো কাঁপতে শুরু করল।
    মিনতির শরীরে যেন কেউ ঝাল লংকা মেখে দিয়েছে। দৈবে ভর করা কালী বুড়ির মতো সে ভয়ঙ্কর হয়ে পড়ল, “কাকে বলছিস হারামজাদা? মুখ সামলে কথা বলবি। তোর জামাই মেয়েমানুষের পা চাটবার জন্যে সারা দুনিয়া চষে বেরায়, সে আসবে কেন আমার বাড়ি? আমার হাতে ধরবে কেন? শুনে রাখ তোর পা চাটাটাকে তাড়াতে গিয়েই আমার ছেলে পড়ে গেল। নিজে না পারিস তবে, কেউ একজনকে ধরে ওই কুকুরটাকে দিয়ে দিবি।”
    লাউমাচা বেয়ে উঠে সবুজ সাপ লাঠির ঘায়ে আধমরা হয়ে পড়ে থাকলে যেমন লিকলিকে লাউডগাতে মিশে একাকার দেখায় জগুর বৌ তেমনি মিইয়ে গেল। শুধু বাতাসে লাউ পাতা কাঁপে যেমন তেমনি মাথা তুলে কাঁপছিল। । গৃহস্থ বাড়ির কেউ যখন মাচার থেকে লাউ পাড়তে যায় তার হাতের লাঠির থেকে গা বাঁচাতে গিয়ে এই লাউ থেকে ওই লাউর ডগাতে ঝাঁপিয়ে উড়ছিল সেই সাপ। এক ঘায়ে ছিঁড়ে ফেলা লাউডগার মতো সাপটাও নিথর হয়ে গেল। সবুজ নরম থ্যাতলানো লাউডগা পড়ে রইল।
    জগুর বৌ মাথা নুয়ে ভিড়ের মধ্যি থেকে চলে গেল। মালতী জগুর বৌয়ের মুখখানা দেখতে চাইছিল। দেখা যায় না। হালকা আঁধারে লুকিয়ে পড়েছে। ভেতরে যেতে গিয়ে সে যেন একবার দেখতে পেল রোগা বৌটি ছেঁড়া কাপড়ের আঁচলে বারে বারে চোখ মুছছিল। কালীবুড়ির বাড়ির থেকে মিনতি বেরিয়ে যেতে চাইছিল। মালতীর চোখে জল এসে গেল। মিনতি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার মুখে সে ভেজা গলাতে গিয়েওর হাতে ধরল। মালতীর সত্যি রাগ চড়েছে।
    “মিনতি শুন!”
    “ কী হলো মণির মা?”
    “কেন বললি , ওভাবে ওকে?”
    “কেন বলব না? আমার ছেলেকে ও হারামজাদা বলবে কেন? ওর খায় না পরে? এই দেখ, আমার ছেলে ওর বাবার দেয়া জামা পরে রয়েছে।”
    “দেমাক দেখাচ্ছিস? সে এসে দু’রাত তোকে মাংস খেয়ে হাড় ফেলে দেবার মতো ফেলে দিয়ে গেছে, দুটো টাকা দিয়ে গেছে আর তুই ঐ অসুখী মেয়েমানুষটির কাছে বরের দেমাক দেখাবার যুগ্যি হয়ে গেলি!” ছেলের কাপড় দেখাতে এসেছিস? ওর অসুখের ওষুধ কিনবার জন্যে যখন ঘরে পুরুষ তুলেছিলি তখন কই ছিল তোর স্বামী?” ওর গলার স্বর জোনের মায়ের মতো বড় হয়ে গেছিল আর দূর অব্দি শোনা যাচ্ছিল।
    মিনতির মুখখানাও ঘা খেয়ে থ্যাতলানো সবুজ লাউডগার সাপের মতো নেতিয়ে পড়ল। সে মাথা নুইয়ে দিল।
    “তুইও মেয়ে মানুষ, তোরও ওর মতো অসুখ হতে পারে। ওর বর তো ওকে দুমুঠো ভাত দিচ্ছে। ওর অসুখে পেলে তোকে পোকায় কেটে খাবে।”
    “ জগু কই বৌকে ভাত দিচ্ছে? বৌ ঐ হারামজাদাকে ভাত দিচ্ছে। তুই দেখবি জগুর বৌকে ঐ পচা পোকে খাবে। সে আরেকটা বৌ নিয়ে আসবে। পুরুষমানুষে আর কী করতে পারে, মাংস খেয়ে হাড় ফেলে দিতে পারে!” মিনতি থু ছিটিয়ে ফেলল।
    “আর তুই মেয়ে হয়ে কী করলি?”
    মিনতি জায়গাতে বসে পড়ল।“ জগুতো দেখাই যায় ওর বৌকে ঘেন্না করে, ও আমাকে বলেছে ওর অসুখের কথা। কিন্তু বৌ ভালো হলে সেও আর অন্য জায়গাতে যায় না।”
    “ সে ওদের স্বামী স্ত্রীর কথা । কিন্তু তুই আমাকে বল, তুই কেন ওর বৌকেই বললি একটা মেয়েমানুষ নিয়ে আসতে?”
    মিনতি এবারে ফিসফিসিয়ে কাঁদতে শুরু করল, “ আমি জানি ও আমার বিপদের কথা ভাবেনি, সে আমাকে ঘেন্না করে। আমি জানিরে মণির মা!”
    মালতীর রাগটাও ঘায়ে আহত সাপের মতো নেতিয়ে এলো। এই মানুষটির উপর রাগ করেই কী করে? নাকে মুখে জল ঝরছে যে মেয়েটির ওর উপর কি আর রাগ করা যায়?”
    “তোর মাথা গরম হয়েছে, যা ভাত খেয়ে শুয়ে পড়গে' যা।” মালতী মুড়ির চুলোতে এলো। কড়াইর মুড়িগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।” সে বালিগুলো বদলে দিল। ভেতর থেকেই দেখতে পেল মিনতি চলে গেছে।
    

       
  মিনতি মালতীর ওখান থেকে জগুর বাড়িতে গেল। ঢুকবে কি ঢুকবে না করতে করতে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটা সেই কখন খিদেয় উপোসে আর ভয়ে মিইয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে কাঁধ বদল করে নিয়ে মিনতি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে জগু পাটাতে নারকেল বাটছিল, বৌ কড়াইতে চিনি গলাচ্ছিল। পাঁচ ছেলে মেয়েতে বসে বসে মায়ের তৈরি করে দেয়া নারকেলের মণ্ডগুলো থালাতে নিয়ে চেপে চেপে বরফির আকারে কেটে একটা ডালাতে মেলে সাজিয়ে রাখছিল। দেখাই যাচ্ছিল, জগু নারকেলগুলো পাটাতে বেটে মিহি করতে পারছে না। সে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ততক্ষণে এক থালা সন্দেশ হয়ে যাবার কথা ছিল, হয়নি। জগুর বৌ এবারে নারকেল কুরোনো বাদ দিয়ে বাটাতে হাত লাগালো। পাটাতে বসবার আগে ও কী একটা যেন কাপড়ের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ঠেলে দিল।
    মিনতি একটা হাঁচি দিল। কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে কাজ করতে করতে এ বাড়ির মানুষগুলোর সবাই হঠাৎ ওর দিকে ফিরে তাকালো। সে নীরব রইল।
    জগুই প্রথম ডাক দিল, “আয় মিনতি, বস।” সে একটা মোড়া এগিয়ে দিল।
    মিনতি যেখানে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। জগুর বৌ বলে উঠল, “মিনতি আয়, ছেলেটা এখন একটু ভালো?”
    “কী হলো ? আবার গালি দিবি বুঝি?” কথাগুলো বলেই রোগা মেয়েমানুষটি ওর কালো দাঁতের মাড়ি দেখিয়ে হাসল। ধীর ধীরে জগুর এগিয়ে দেয়া মোড়াতে গিয়ে বসল মিনতি। জগু তার কাছ চেপে বসেছে, “তুই আমার বোনের মতো, খারাপ পাবি না। আসলে আমি অল্প নেশা করে ফেলেছিলাম। আজকাল এমনিতেও মাথার ঠিক থাকে না। আমি তোকে জিজ্ঞেস করতে গেছিলাম কোনও সরকারি টাকা পয়সা পেলি কিনা তুই।”
    “সবাই বলে তোর বড় বড় মানুষের সঙ্গে ওঠা বসা। তোর ছেলের বাবা...।” কথাগুলো বলে জগুর বৌ ভয়ে ভয়ে থেমে গেল।
    মিনতি চুপ করে রইল।
    “বৌটাকে ভালো করবার জন্যে টাকা পয়সার কথা বলতে আমি তোর কাছে গেছিলাম, তোর হাতে ধরে আমি তোকে তাই বলতে চাইছিলাম। কিন্তু তুই ক্ষেপে গেলি।”
    “আমাকেও কত কথা বললি , এতো মানুষজন ছিল।”
    “আমারও মাথার ঠিক নেই। ছেলেটাকে নিয়ে একা...” মিনতি কথাগুলো শেষ করতে পারেনি।
    “কেন ওর বাবা...।” মিনতির ছেলেটাকে কোলে নিয়ে জগুর বৌ কী একটা বলতে গিয়ে আবারো চুপ করে রইল।
    মিনতি কিচ্ছু বলল না। সবাই চুপ করে রইল। সন্দেশ বানানো শেষ করে ছেলেমেয়েগুলো বড়সড় বাঁশের চাঙে আথালে-পাথালি শুয়ে পড়ল। মিনতির ছেলেটি জগুর বৌর কোলে  জেগে গিয়ে কেঁদে উঠল।
    “ও কি ভাত খেয়েছে?”
    মিনতি চুপ করে রইল।
    “পোলা রেখে ট ট করে বেড়াস বললে রেগে যাবি। এতো রাত অব্দি ওকে ভাত দিস নি! দেখ তো ছেলেটা কেমন দুর্বল হয়ে গেছে!”
    “খেয়ে যা এখানেই দুমুঠো”, জগু বলল। সে সন্দেশগুলো সাবধানে বাজারে নিয়ে যাবার বাক্সে ভরাচ্ছিল। কাজটা  বেশ ভালো করেই করছে! একটাও সন্দেশ ভাঙেনি।
    জগুর বৌ মিনতির ছেলেটার সঙ্গে নিজেরগুলোকেও ভাত খাইয়ে দিল। ভাত আর শসা- আলুভাজা। ডেকচিতে ভাত কম হয়েছিল। মিনতি চাল বেছে দিল। জগুর বৌ ভাতগুলো বসিয়ে দিল। রেশনের চাল, গুড়ো পাথর, পোকা, ধান ---সব আছে। তবুও চালগুলো খারাপ নয়, পরিষ্কার করতে সামান্য কষ্ট করতে হয় শুধু। জগুর বৌ ঘরের পেছনে গিয়ে কী একটা পাতা ছিঁড়ে আনল গিয়ে। গন্ধটা ও চিনতে পারল। ভাদালি লতার পাতা। পাতাগুলো কালোজিরা, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে পাটাতে বেটে কড়াইতে সামান্য তেল দিয়ে খানিক নেড়ে টেরে দিল। ভাত বেড়ে থালার কিনারে সেগুলো দিয়ে জগুর বৌ মিনতিকে খেতে দিল।
 


    “খা মিনতি, কী আর খাবি। চায়ের দোকান দিয়ে কোনোমতে রেশনের চাল ক’টা কিনে আনি। বাকি আর কিছুর জন্যেই পয়সা থাকে না। কখনো বা থাকলেও অসুখ বিসুখে সব নিয়ে যায়। ধারে টিকে আছি , বুঝলি।” জগুর গলা শুনে বুড়ো মানুষের মতো লাগছিল।
    মিনতি ওই ভাদালি পাতার বাটা দিয়েই  তৃপ্তিতে ভাতগুলো খেতে শুরু করল।
    “ডাক্তারের কাছে গেছিলি কি না?” মিনতি রোগে ক্লান্ত মানুষটির চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারেনি।
    “কী হবে আর গিয়ে? সেই একই কথা—ভারি কাজ করবে না, পাটার কাজ করবে না, কল মারবে না। যন্ত্র দিয়ে ঠেলে দেবে , দু’দিন পরেই বেরিয়ে আসবে। বলে কিনা অপারেশন করতে হবে।”বলে বলে সে বেশ মন দিয়ে আঙুলে থালাখানা চেঁছে পরিষ্কার করে খেয়ে নিলো।
    জগুও ঐ একইরকম থাল পরিষ্কার করতে শুরু করেছে,” পাঁচটা বড়ি একবারে কিনতে পারি নাম আবার হাজার হাজার টাকা খরচ করে অপারেশন!”
    মিনতিও আন্মনে কখন আঙুলে থালা চাঁচতে শুরু করল নিজেই বলতে পারে না।
    এই মুহূর্তে দেখলে মনে হবে যেন এই মহিলা দুজন আর মানুষটির জীবনে একটাই কাজ বাকি আছে, আঙুলে ভাতের থালা চাঁছা, আঙুলগুলো মুখে নিয়ে যাওয়া, আবার থালা চাঁছা, আবার আঙুল মুখে, আবার থালা...।

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India