ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন


ফেলানি

               
ত্না আজকাল ড্রাইভারণীর বাড়িতে রোজ বিকেলে যাতায়াত করে। ওর আকর্ষণ হলো লাল রঙের ছোট টিভিটা। বিকেল হলেই ওর মনটা আনচান করতে শুরু করে! গুচ্ছ গুচ্ছ ছবিতে ওকে চেপে ধরে একেবারে! চারকোনা কাঁচে যে ঝাঁকে ঝাঁকে যে মানুষগুলো বেরোয় ওরা তাকে হাত দিয়ে ডাকে। সে উতলা হয় । আজও বেরিয়ে এলো। দিদির মালিকনীর মেয়ের শোকার্ত আর টপ একটা বের করে পরে নিলো। আজ সে চুলগুলো অন্যরকম করে বেঁধেছে। আজ শুক্রবার, রাত আটটায় সেই সিরিয়েলটা দেবে। একটা ছেলে ফরসা, লম্বা, চুলগুলো অল্প বাদামি। আর চোখগুলো বাদামি রঙের চোখগুলো, কী করে যেন তাকায় সেই চোখে, কিচ্ছুটি বলতে হয় না। বাদামি রঙের চোখের ছেলেটি একটা বেড়ার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা ফুল। আর সেই মেয়েটি? শরীরে লেপ্টে ধরা লাল টপ, একটা নীল স্কার্ট । শরীরে চামড়ার সঙ্গে মিশে যাওয়া টপটা যেন এখনি ফেটে যাবে। সেখানে ঢুকিয়ে রাখা যেন দুটো পাকা গোল গোল বেল। ও হাঁটলে মনে হয় যেন ফল দুটো এখন বেরিয়ে এসে মাটিতে গড়িয়ে পড়বে। গোলাপ ফুল নিয়ে দাঁড়ানো ছেলেটার কাছ দিয়ে মেয়েটি পেরিয়ে গেছে। বেড়ার আড়াল থেকেই ছেলেটি খপ করে মেয়েটির হাত ধরল। সে আছাড় খেয়ে গিয়ে পড়ল ছেলেটির গায়ে। গোলাপ ফুলও ছিটকে পড়ল। ছেলেটির মুখ এগিয়ে যাচ্ছে কম্পমান দুটো পাকা বেলের দিকে। ব্যস, সেখানেই ফুরিয়ে গিয়ে চেনা গানটা শুরু হলো। আজ কী করবে ছেলেটি? মেয়েটিকে ছুঁয়ে দেখবে কি ছেলেটি? কী সুন্দরী মেয়েটি! ফরসা, ঠিক যেন পূর্ণিমার চাঁদ। বাদামি চোখের ছেলেটি আর পূর্ণিমার চাঁদের মতো মেয়েটি। রত্না পাউডারের কৌটোটি হাতে নিয়ে নাড়িয়ে দেখল, কিচ্ছু নেই। খালি হাতই মুখে বুলালো।
    “সব মেয়েদেরই এতো কিছু আছে, আমারই কিচ্ছু নেই।” মা রত্নাকে কিছু একটা বলতে চাইছিল। ওর বাঁকা ঠোঁট দেখে কিছুই বলতে পারল না। বাবা ওর বেরিয়ে যাওয়া দেখে কপাল চাপড়ে উঠল, “ আমার একটা ছেলে থাকত আজ, বাড়িতে বসে মেয়ে টিভি দেখত।” রত্নার মাও মেয়ের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল। বাবা বকেই যাচ্ছে, “আমার ছেলেটা বেঁচে থাকলে জোয়ান হয়ে রোজগার করে আনত। কতদিন সামান্য মাছের গন্ধ পাইনি। আমার কপালেই এমন অলক্ষ্মী বেটি, পেটে ছেলে ধরেও মেরে ফেলে।”
    রত্নার মা মাথা নুয়ে একমনে মোড়া বুনবার চেষ্টা করছে। ওর ভেতরে মোড়া বোনার জন্যে চেঁছে রাখা শলাগুলো যেন কথা কিছু কিছু বের করে আনবার জন্যে খোঁচাখুঁচি করে যাচ্ছে। বারে বারে আঘাতে, যন্ত্রণাতে মানুষটি মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছে, রক্তে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। কথাগুলো রক্তে ডুবিয়ে তুলে ছুঁড়ে দিতে যাচ্ছিল, “কেন, তোর মেয়ে তোকে রোজগার করে খাওয়ায় না? নিজের হাত দুটো নেই? কাজ করিসনে কেন? ফুটানিটা কিসের! তোর মতো পানের বরজে কাজের লোক এই বস্তিতে আর একটাও নেই। মেয়ের পয়সাতে বিড়ি খায় আবার অলক্ষ্মী বেটির কথা বলে!” কিন্তু শব্দগুলো বেরোয়নি? বেরুচ্ছে...। অসুখে দুর্বল শরীরে এমন খাড়া কোপ আর সহ্য হয় না। শব্দগুলো সে খুঁজছিল, “ এতো কোপ মারতে পারে যে মানুষটা তার গায়ে কাজ করবার দম নেই? হারামজাদা, মেয়েমানুষের ঘাড়ে বসে খাবি আর সেই মেয়েমানুষকেই পিটবি, শালা কুত্তা!” সে পিক করে থু একদলা ফেলে দিল।
    ড্রাইভারণীর বাড়িতে টিভি দেখতে যাবার পথে মেয়েকে একবার মাথা তুলে দেখল মা। দিদির দেয়া কাপড়টা কেটেকুটে সে একেবারে কী একটা যেন করে ফেলেছে। গলাটা কেটে ফেলেছে। ঢিলে কাপড়টা গলা কেটে ফেলাতে কেমন যেন দেখাচ্ছে। কিছু একটা তুলতে গিয়ে সে যখন উবুড় হয় পুরো বুকটা বেরিয়ে পড়ে। কী খেয়ে ওর এই শরীর হয়েছে! মা শিউরে উঠল। ঘরের কাজের নামে কুটা একটা তুলে যে দু' টুকরো করতে চায় না সেই মেয়ে ফেল করে স্কুল ছাড়বার পর থেকে কেবলি নিজের ঐ শরীরটার পেছনেই লেগে থাকে। ড্রাইভারণীর বাড়িতে টিভি দেখতে যাওয়া শুরু করার থেকেই ওর এই এক ঢং হয়েছে । মায়ের একটা কথাও যদি সে শুনত। আজ সে ভাত খাবেই না, ড্রাইভারণী খাওয়াবে। ড্রাইভারণীর গাড়ি চালাবার পয়সা আছে। লোকে বলে সেই পয়সাতেই ড্রাইভারের মদের পয়সাও বেরোয় না। আসল টাকা হলো ড্রাইভারণীর। এই বস্তিতে শুধু ড্রাইভারণীর ঘরেই রঙিন টিভি আছে। মেয়ে পুরোনো কাপড় কেটে, টান করে পরে রোজ সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় সেই মহিলার বাড়িতে যায়, রাত নটায় ঘুরে আসে। মা হাতের শলা , প্লাস্টিকের রশি হাতে নিয়ে বসে রইল। এমন সময়ে গুয়াহাটির বড় মেয়েটিকে মনে পড়ে। ও থাকলে বোনকে কিছু একটা বলতে পারত। ড্রাইভারণীর বাড়ি যাবার কথা উঠলেই মেয়েটা চেঁচামেচি শুরু করে দেয়, “ দে একটা টিভি কিনে , যাব না। টিভি না দেখলে হয় বুঝি!” কী করে জিজ্ঞেস করে মা এসব কথা, কী করেই বা? উত্তর কী আসবে জানা আছে, “ অলক্ষ্মী বেটি! ছেলে জন্ম দিয়ে মেরে ফেলবে। থাকত আমার দাদা , গাড়ি চালিয়ে হলেও একটা টিভি ঘরে নিয়ে আসত।” চেঁছে রাখা শলাগুলোতে হাত রেখে মানুষটি মাথা নুয়ে বসে রইল। জলে খেয়ে শেষ করা হাত দুটো যদি পিঠে এসে হাত বুলিয়ে দিত, ভয়ে ক্ষীণ, চাপা স্বরে একবার যদি ডেকে বলত, “ মা , তোর গা খারাপ?”
    বিড়ির গন্ধ একটা নাকে এসে লাগাতে মেয়েমানুষটি খপ করে উঠল। খরকরে শব্দগুলো যাতে কানে না পড়ে তার জন্যে ভেতরে উঠে গেল যদিও শব্দগুলো ওকে ভেতর অব্দি তাড়া করে গেল, “ কাকেই বা বলব এক কাপ চা করে দিতে? মেয়ের বাবা আমি, কেই বা চিনি চাপাতার যোগান দেবে?”
    
        
রত্নার মা টাকা পাঁচটা হাতে নিয়ে চা-পাতা, চিনি আনতে যেতে ড্রাইভারণীর বাড়ির সামনে নিয়ে একটু ঘুরে গেল। ঢুকবে কি ওখানে? হাত ধরে টেনে আনবে কি মেয়েকে? গলা ফুলিয়ে ফুলিয়ে কি বলবে, “টি ভি দেখতে হবেনা, আয় আমার সঙ্গে মোড়া তৈরি করবি। জলে খাওয়া হাত দুটোতে তো সংসারটা টানছেই, তাতে আরো দুটো হাত যোগ হোক। আয় দেখি বাপকে দেখাই, পেটের মেয়ে চা-পাতা চিনির যোগাড় করতে করতে পারে কি পারেনা।” ...? ড্রাইভারণীর ঘর থেকে টিভির আওয়াজ বেরুচ্ছে। মা বাড়ি ঢুকবার মুখে দাঁড়াল। বুক ধড়ফড়িয়ে উঠল। আজকাল প্রায়ই অমন হয়। অল্প চিন্তা করলে, দুটো কাজ বেশি করলে, রাগে ভেতর জ্বলতে থাকলে বুক ধড়ফড়িয়ে উঠে, মাথা ঘুরতে শুরু করে। এরকম হলেই তার সেই জলে খাওয়া দুটো হাতের ছোঁয়ার জন্যে আনচান করতে থাকে। সে মেয়েকে বাপে আর বোনে নিংড়ে নিঃশেষ করে ফেলবে। কেউ জানেনা, রত্নার মা যে বিছানাতে শোয় সেটির ফাটা তোষকের ভেতরে ফাটা গামছাতে বাঁধা পোটলাতে এক জোড়া সোনার দুল আছে। সে দিনেরাতে স্বপ্ন দেখে সেই দুলজোড়া পরে শান্ত মেয়েটি একটা হাতের কাজ জানা ছেলের সঙ্গে ঘর করতে চলে গেছে। মেয়ের মাইনের টাকা থেকেই জমিয়ে জমিয়ে এই দুলজোড়া বানিয়ে রেখেছে। শুধু এই ইচ্ছেটা পূরণ হলেই ওর মা হাসি মুখে বুক ধড়ফড়িয়ে বুক ধড়ফড়িয়ে পড়ে মরে থাকবে।

    মা যখন বাড়ির ড্রাইভারণীর বাড়ির গেটের থেকে চলে আসছিল রত্না তখন ডুবে গিয়েছিল বাদামি চোখের ছেলেটি আর ঘোড়ার শাবকের মতো ছটফটে মেয়েটির মধ্যে। ছেলেমেয়ে দুটো এখন এক নদীর পাড়ে। নদীর পাড় এতো দারুণ থাকে বুঝি! নদী পাড়ের গাছগুলোর মাঝে মাঝে কিছু সাদা চামড়ার, সোনালি চুলের মানুষ। এখন ছেলেমেয়ে দুটিতে একটি রাস্তার উপর। ছটা গাড়ি একসঙ্গে যেতে পারে এমন মিহি রাস্তাটি সে শ্বাস বন্ধ করে দেখছে। পথের মাঝে মাঝেই ফুল। ফুলগুলোর মাঝে মাঝে ওরা দুজনায়। রত্নার বাহ্যিক জ্ঞান কমে এসেছে। ছেলেটা প্রেমাচ্ছন্ন বাদামি দুটি চোখে মেয়েটিকে দেখছে। একটা ঢালু ঝোপের ভেতরে ছেলেটি শুয়ে আছে। তার একহাত মেয়েটির কোমরে, আর হাত চুলে। মেয়েটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটার হাত মেয়েটির পিঠে চরে বেড়াচ্ছে। হাতটা মেয়েটার শরীরে ঠিক কোন জায়গাতে আছে? রত্নার কান গরম হয়ে আসছে। হঠাৎই সবুজ বাগিচাটি ছড়িয়ে বড় হয়ে গেল। সবুজ বাগিচাতে ছেলেমেয়েদুটি যেন প্রজাপতি হয়ে গেল, মিষ্টি নরম সুরের একটি গান। আবারো ছেলেমেয়ে দুটি স্পষ্ট হয়ে এলো। শিশু যেমন মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে ছেলেটির মুখ তেমনি মেয়েটির বুকে লুকিয়ে যেতে চাইছে। খিলখিলিয়ে হেসে মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। রত্না অবাক হয়ে গেল। বাদামি চোখের ছেলেটির বাহুতে শুয়ে ঐ মেয়েটি কে? খালি পাউডারের কৌটোর থেকে পাউডারের সামান্য কিছু গুড়ো মুখে মেখে চলে আসা এই মেয়েটি কে? ওর বুক ঠেলে বারে বারে ঢুকে যাচ্ছে এক জোড়া বাদামি চোখ। সে চোখ বোজে হেলে পড়ল। পুরো শরীর থেকে থেকে কাঁপছে। এক অচেনা তীব্র অনুভূতি গায়ে নিয়ে রত্না চেয়ারে চোখ বোজে পড়ে রইল। চেনা গানের সুরটা বাজছিল।
    “কী রে রত্না , শুয়ে পড়লি বুঝি?”
    ড্রাইভারণীর ডাকে সে চোখ মেলে তাকালো। মহিলাটি এক জোড়া লাল, তাতে হলদে কাজ করা চুড়িদার কামিজ পরেছে। ঠোঁট গাল লাল, হাতে একটা লাল খাড়ু।
    “কোথাও যাবে বৌদি?”
    “কোথাও যাব না। আমার অতিথি আসবে এখন।”
    “দাদার সঙ্গে আসবে?”
    “তোর দাদা আজ এক বিয়ের ভাড়া নিয়ে গেছে।”
    “ অতিথি থাকবেন?”
    “কি জানি, থাকলে থাকবে।”
    একটা পাজামা পাঞ্জাবি পরা লোক ভেতরে এলো। লোকটা একটা কাপড়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে এসেছে। তার থেকে বের করে হলদে রঙের একটা শাড়ি ড্রাইভারণীর হাতে দিল।
    “এগুলো আর কেন নিয়ে আসো মামা?” লোকটা যে চেয়ারে বসেছে তারই হাতলে বসে ড্রাইভারণী ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। লাল চুন্নি পিছলে যাচ্ছে। লোকটা ড্রাইভারণীর কোমরটা একহাতে জড়িয়ে ধরল।
    “রত্না , তোর জন্যে আমি সাদা বাটিটাতে মাংস রেখেছি, নিয়ে যা।”
    “এহ! লাগবে না বৌদি!” ওর আরেকটা সিরিয়েল দেখে যাবার ইচ্ছে। ওটিতেও বাদামি চোখের ছেলেটি আছে।
    “ কেটে বেছে দিলি, মশলা করে দিলি। অল্প নিয়ে যাবিনে? এখানে ভাত খেয়ে যেতে বলতাম। কিন্তু এখন যে মামাকে ভাত দেব।” কথাগুলো বলে ড্রাইভারণী অমন করে হাসল যেন লোকটার গায়েই পড়ে যাবে ঢলে। লোকটাও এবারে প্রায় ওর শরীরে হেলে পরা ড্রাইভারণীর কোমরে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে।
    রত্না অবাক হয়ে মানুষ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।
    “টিভিটা অফ করে রেখে যা রত্না।”
    সে অনিচ্ছেতে টিভিটা বন্ধ করে মাংসের বাটিটা নিয়ে রওয়ানা দিল।
    “রত্না!” সে ফিরে তাকালো। ড্রাইভারণী চুন্নিতে গা ঢাকবার সঙ্গে সঙ্গে লোকটার হাত দুখানাও ঢেকে ফেলেছে। রত্না দেখতে পেল লা চুন্নির নিচে হাত দু’খানা নড়চড় করছে। ড্রাইভারণী ওর দিকে তালা-চাবি ছুঁড়ে দিল, “বাইরে থেকে তালা দিয়ে রেখে যাবি।”
    “চাবি?”
    “দরজার তলা দিয়ে ঢুকিয়ে রেখে যাবি।”
    চাবিটা দরজার নিচে দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে রত্না হেসে হেসে ড্রাইভারণীকে বলতে শুনল একটাই শব্দ, “বদমাইশ!”
    বাড়ি পৌঁছে দেখল মা বাবা বসে আছে। মা গলা শক্ত করে বলল, “কী করছিলি ওখানে?”
    
    
         
সে টু শব্দটি করল না। দড়ি থেকে ছেঁড়া ফ্রক একখানা এনে পরনের কাটে কুটে অদ্ভুত করে ফেলা মাপের থেকে বড় কাপড়টি খুলে  বড় যত্নে তুলে রাখল। এটা ছিঁড়লে ওর আর কাপড় নেই। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল মুখে ঘষবার ক্রিম। এক অপ্সরা মেয়ে সাগরের নিচে গিয়ে মুক্তো হয়ে পড়া শামুকের একটা খোলার ভেতরে ক্রিমটা পেয়েছিল। ক্রিমটা মাখার সঙ্গে সঙ্গে কালো কুচকুচে মেয়েও সেই অপ্সরা মেয়েটির মতো হয়ে গেছিল। কালোর থেকে ফরসা হয়ে পড়া মেয়েটিকে একটি ছেলে ফুল দিচ্ছে, বড় চাকরি করা ছেলে। রত্নার চোখে ঝিলমিলিয়ে উঠল একটা ছেলের মুগ্ধ একজোড়া বাদামি চোখ। চোখজোড়া ক্রিম মেখে অপ্সরা হয়ে পড়া সেই মেয়েটি, যে খালি পাউডারের কৌটা থেকে যা কিছু পেত তাই মাখত , ওর দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। রত্নার ভাগ্য পালটে গেছে। বদলে গেছে ভাঙা ঘর, ছেঁড়া কাপড়। সে হয়ে গেছে নীল জলে ভেসে থাকা পূর্ণিমার চাঁদ। রত্নার সেরকম একটা ক্রিম কেনার ইচ্ছে হলো।

    সে রান্নাঘরে গেছে, পেছনে পেছনে ওর মা।
    “ভাত রাঁধা হয়নি, দিনের বেলার ঠাণ্ডা ভাত আছে। আলু একটাও যে ভাজব...।”
    “লাগবে না।” সে চালের টিনটা দেখছে, একবেলার মাপে চাল আছে। সে বিড়বিড়িয়ে উঠল, “ এই বাড়িতে দুবেলার মাপে চাল থাকবে বুঝি?” ঘটং করে টিনটা তুলে সে চালগুলো ধুচুনিতে নিয়ে ধুয়ে ফেলল।
    “ভাত রাঁধবি?”
    মায়ের কথার কোনও জবাব দিল না সে।
    “ভাতের সঙ্গে কী খাবি? ঘরে তেল নেই, ডাল নেই।”
    চরম বিরক্তিতে মুখ বিটকে মেয়ে মাকে ধমকে দিল,
    “ যা তো , এক পোয়া আলু নিয়ে আয়, জবান চালাতে এসেছে!”
    মা মেয়ের এই মুখ ভেংচানি সহ্য করতে পারেনি।
    “মাংসের তরকারি এনেছি , দেখ! ঘি , গরম মশলা দিয়ে রান্না করা মাংস। পারবি খাওয়াতে?” সে সাদা বাটির মুখ তুলে দিলে। সত্য, ঘি, গরম মশলার গন্ধে ঘর ভরে উঠল।
    ভাত বেড়ে সে বাবাকে ডাকল, মাকেও ডাকল। বাবা পরম তৃপ্তিতে ভাত খাচ্ছে। গরম ভাত আর ঘি গরম মশলাতে রাঁধা মাংস। রত্নার মাও সামান্য ভাত মাংসের আলু একটা ভেঙে মেখে নিয়েছে। মুখে ভরাতে গিয়ে নিজের মনে মনে বলল, “ ঠাণ্ডা ভাত ছিল, গরমের দিন, সেই দুপুরের ভাত, নষ্ট হবে, কাল কী রাঁধব? বাজারবারও নয়, মোড়া...।”
    “মেয়ে ভালো মানুষের সঙ্গে ওঠ বস করছে, আদর করে কিছু একটা দিয়েছে। তুই মা হয়ে সহ্য করতে পারিসনি। আমার একটা ছেলে থাকত তবে রোজ এরকম খাওয়াতো।”
    রত্নার মা জানে এর পর কী বলবে। ভাত ফেলে উঠে যাবার ইচ্ছে হলো। কিন্তু জিহ্বে মাংসের স্বাদ লেগেছে, নাকে ঘি, গরম মশলার গন্ধ। কখনো বা এই ইন্দ্রিয়গুলোতে মন কাবু করে ফেলে। রত্নার মাও বলতেই পারে না কখন ভাতগুলো খেয়ে ফেলল, গরম ভাত আর ঘি , মশলা দিয়ে রাঁধা মাংস। মেয়ের দিকে তাকালো মা, ছেঁড়া ফ্রকে শরীরটা ঢাকতে পারেনি। ছোট্ট মেয়ের মতো সরল মুখ। উঠতি বয়স। এ সময়ে ওরা ভালো কিছু খেতে চায়, ভালো কিছু পরতে চায়। ড্রাইভারণী আজ ওকে মাংস খাওয়াচ্ছে , কাল খাবে ওর মাংস। লোকে কত কি বলে ওর সম্পর্কে। মা মন থেকে সমস্ত শঙ্কা ঝেড়ে ফেলতে চাইল। লোকে কত কি বলে, শাখা সিঁদুর পরা মেয়ে মানুষ। ড্রাইভার দস্তুরমতে গাড়ি চালিয়ে ইনকাম করে। শুনেছে পুরোনো হলেও এম্বেসেডার গাড়িটা ওর নিজের। মালিককে দিতে হয় না। হাতের টাকা হাতেই থাকে। লোকে বলে ড্রাইভারণী কিনে দিয়েছে গাড়িটা। ভাঙা এম্বেসেডারে ড্রাইভারের সংসার চলে না। অনেক গাড়ি হলো শহরে। ছাল বাকল নেই গাড়িটার, কেইবা নেবে ভাড়াতে। যেটুকু পায় সে ওর মতো মাতালের কাছে হাতের ময়লা মাত্র। দু’কাঠা মাটিতে বাঁশ কাঠের হলেও নিজের ঘর, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে ছেলে, গ্যাসের চুলা—এই পয়সাগুলো কোত্থেকে আসে? লোকে বলাবলি করে। রত্নার মায়ের চোখের সামনে ভেসে উঠল সকালে ফুলের কাজ করা ম্যাক্সি পরে টিফিনের বাক্স, জলের বোতল দিয়ে ছেলেকে যখন স্কুলে পাঠায় মহিলাটি, তার তখনকার মুখখানা। ছেলেকে রিক্সাতে তুলে দিয়ে কখনো বা রত্নাকে দেখলে ডেকে পাঠায়, “আসবি তো রত্না, আজ পিঙ্কুর জন্মদিন। ওর বন্ধুবান্ধবদের ডেকেছি।”, “আচার অল্প করব ভাবছি, আসবি তো একটু সাহায্য করবি।”, “আজ সিনেমা আছে, আসবি।” কখনোবা রত্নার কাছে ওর মাকে দেখলে বলে, “আজ রত্না আমার ঘরে ভাত খাবে।” রত্না বলেছে ছেলেটা লেখায় পড়ায় ভালো। ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় হয়। দারুণ ছবিও আঁকে, প্রাইজও বুঝি পেয়েছে। এই সেই মহিলা। কিন্তু লোকে যে কিসব বলাবলি করে! সেদিন দু’একজন বলেইছিল, “কী রে , মেয়েকে বুঝি ড্রাইভারণীর লাইনেই দিলি? মানুষের বাড়ি চাকরের কাজ করার থেকে এই লাইনটাই ভালো। খাবে , পরবে মৌজ করবে।”
    রত্নার মায়ের বুকখানা আবার ধড়ফড়াতে শুরু করে। শ্বাসটা যেন বন্ধ হয়ে আসবে। বুকটা হাতে দিয়ে দলাই মলাই করতে করতে মানুষটি যন্ত্রণাতে কুঁকড়ে পড়ে রইল। ধড়ফড় করতে করতে বুকখানা যেন ভেতর থেকে অনুনয় বিনয় করছে ফেটে চৌচির দু’খানা হাতের জন্যে, আদরের দুটো কথার জন্যে, “মা, তোর শরীর ভালো? এতো শুকিয়ে গেছিস কেন?” বাইরের চেঁচামেচিতে সে চমকে উঠল। কেউ একজন ভোটে জিতেছে। জীপ গাড়ি, মটর সাইকেল বস্তির ভেতরেও ঘোরাঘুরি করছে। কান দুটো বন্ধ করে সে ঘুমোবার চেষ্টা করল।

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India