ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন


জ মণির গরমের বন্ধ খুলেছে। বন্ধ দিতেই স্কুলের জামাকাপড় ধুয়ে ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিল। আজ পরাতে গিয়ে হাসবে কি কাঁদবে অমন অবস্থা হলো। গায়ে আঁটে না আর। এমনিতেও ছোট হয়ে এসেছিল, এ ক’দিনে এক্কেবারেই ছোট হয়ে গেল। মা ছেলের দিকে তাকালো, সত্যি ছেলে বড় হয়ে এসেছে। বাপের গড়ন স্পষ্ট হয়ে এসেছে। ফেলানির চোখ ভিজে এলো।
     “ হবে তো মা! দিন দুই পরতে পারব। তুই জামার দামটা দিতে পারবি? প্যান্টের দাম আমার ডিম বেচা টাকাতে বেরিয়ে যাবে।”
     কী বোঝদার হয়েছে ছেলেটা। ও যদি কষ্ট করতে না পারত তবে ওরা দু’ই প্রাণীতে দুমুঠো ভাত খেয়ে টিকে থাকতে পারত না।” আজকাল মালতীর দেরি হলে মণি ভাত বসিয়ে দেয়। লাকড়ি, শাক দু’একটা, কখনো বা মাছও দুই একটা যোগাড় করে রাখে। বন্ধের ভেতরে সে কত সুন্দর করে মোড়া বানানো শিখে ফেলেছে। ওর গরমের বন্ধে এতোদিন পর মালতী দুটো পয়সা জমাতে পেরেছে।
     “ ডিম বেচার পয়সাতে বই খাতা নিবি, জামাপ্যান্টের কথা তোকে ভাবতে হবে না।”
    আঁটোসাটো জামাপ্যান্ট পরে ছেলে যখন বেরিয়ে গেল যতক্ষণ দেখা যায় সে তাকিয়ে রইল। আজই ওর পোশাক কিনে আনতে হবে। আসলে সে ভাবতেই পারেনি কাপড় গুলো এতোটা ছোট হয়ে যাবে। টাকা কটা সে রেখেছিল একটা বালতি আনবে বলে। পারলে কালীবুড়িকে একটা চশমা এনে দেবে বলে সে প্রায় ঠিক করেই রেখেছিল। কীইবা ভর করেছে বুড়িটার গায়? কড়ি একটা খরচ করতে হাজারবার ভাবে। এ বয়সেও বুড়ি উপার্জন কম করে না। মালতীকে মুড়ি ভাজার যোগাড়যন্ত্রও ঠিকই করে দিচ্ছে। চাল, লাকড়ি, এমনকি সেদিন একটা নতুন কড়াইও কিনে দিল। সেও বিক্রির আধা পয়সা ঠিকঠাকই দিয়ে যাচ্ছে। কাঁথাও সেলাই করে যাচ্ছে বুড়ি ঝোঁকে ঝোঁকে। আজকাল একশ টাকার নিচে বুড়ি কাঁথা সেলাই করে দেয় না। মুড়ির বাঁধা গ্রাহক থেকেই কাঁথা সেলাই করে বুড়ি শ কয়েক টাকা পেয়ে গেছে। আজকাল সপ্তাহে একবার মাথাতে জটা গজাবেই, সেদিনও কালীভক্তরা টাকা পয়সা না দিয়ে থাকে না। জটা গজিয়ে ভর করবার পর বুড়ির যে কী এক অবস্থা হয়। মালতীর বুক ভেদ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঠোঁট নীল হয়ে যায়, হালকা পাতলা শরীরটা ছেঁড়া কাপড়ের মতো এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পুরো একটা দিন আর রাত মুখে এক ফোঁটাও জল না দিয়ে কাটিয়ে দেয় বুড়ি। মালতী প্রায়ই ভাবে আর বাঁচবে না বুড়ি। কিন্তু বুড়ি ঠিক আবার উঠে বসে। ভালো হয়ে রোজ একটা কথাই বলে বারেবার, মায়ের আমাকে নেবার সময় হয়নি। কী করে বুড়ি পয়সা দিয়ে? চশমার নালটাই ঠিক করে না। সে মন বেঁধে ফেলল, বুড়িকে নতুন চশমার ফ্রেমই একটা কিনে দেবে।
   
 
অন্যদিনের থেকে বেশি তাড়াতাড়ি করে সব কাজ সেরে ফেলল সে। মিনতির ঘরে ঢুকে যেতে হবে। ও আজ বাজারে যাবে কি যাবে না। না গেলেও নিয়ে যেতে হবে। জামাপ্যান্ট কিনতে ওকে না হলে হবে না। দোকানীর ওখানে ওই পারে দরদাম করতে। বুড়ো দোকানীর ওখানেই কিনতে হবে।বুড়ো হরেক কিসিমের কাপড় রাখে। দামও অন্য দোকান থেকে অনেক কম। রোজ দেখে দেখেই বোধহয় বুড়োকে নিজের নিজের বলে মনে হয় । বেশ হাসিঠাট্টা করে, কথাবার্তাতে জড়তাও কেটে গেছে। ওকে বৌ বলে ডাকে । মাড়োয়াড়ি বুড়োর মুখে বৌ শব্দটি বেশ ভালো লাগে। বেজাতের মেয়ে বিয়ে করার ফলে বাড়ির লোকেরা ছেলেকে ত্যাজ্য করে দিল। সে শ্বশুরবাড়িটা পেলে ওখানে নিশ্চয় বৌ বলে ডাকবার জন্যে অনেককেই পাওয়া যেত। কিছুদিন থেকে বুড়োর মুখখানা শুকিয়ে গেছে, হাসিঠাট্টা তো দূর, ভালো করে দামদরও করতে চায় না। দোকানখানাও কেমন যেন শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। বেশ ক’টি থাক শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। নতুন মাল নেই বললেই চলে।
    
     
দরজাটা তালা দিয়ে সে মোড়াগুলো হাতে নিয়ে নিলো। মোড়াগুলো হয়েছে দেখবার মতো, বেশ মজবুতও হয়েছে।ছেলের হাতের মোড়াগুলো পথেই বিক্রি হয়ে যায়, বাবার হাত পেয়েছে। মুড়ির টিনটা মাথাতে তুলে নিলো। বুলেনদের বাড়িতেও একবার দেখা দিয়ে যেতে হবে। সুমলাকে আজকাল ঔষধ খাইয়ে দিতে হয় না। দু’একটা কাজও করে। গাও ধোয়। মাথাও আঁচড়ায়। কাজের থেকে ফিরে বুলেন আজকাল পরিষ্কার ঘর, বাড়া ভাতও পেয়ে যায়। ছেলেটাও স্কুলে যাবার মতো হয়েছে।
     মণির মা প্রথমে জোনের মায়ের ওখানে গেল, মোড়াগুলো আর মুড়ির টিন নামিয়ে রাখল।
    “ কিরে মণির মা , এলিই বুঝি! আমার হয়ই নি!”
    “ হ্যাঁ, একটু তাড়াতাড়িই এলাম, মিনতি যায় কি না যায়।”
    “ যাবে বোধহয়, কাল মাঝরাত অব্দিতো আমার এখানেই বসে বসে মোড়া আর ঠোঙা বানাচ্ছিল।”
     “ কেন , তোর এখানে ছিল কেন?”
    “তোকে বলেনি?” জোনের মা চোখ বড় হয়ে এলো, স্বর নেমে এসেছে।
    “ দু'রাত ধরে ও এসেছিল যে!”
    “ ও আসতে দিয়েছে বলেই এসেছে, তাতে তোর এখানে রাত কাটাবার কী হলো?” মিনতির রাজকুমারটার কথা উঠলেই ওর রাগ চড়ে।
    “ও আলফা হয়ে গেছে , না!”
    “আলফা?” জোনের মায়ের ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলোতে সে একটু অবাক হলো।
    “ চুপ কর বোকা!”
    “নতুন আন্দোলন করা পার্টি বুঝি?” ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা থপথপে হাগা-মুতার নর্দমা; গাছ একটাতে ঝুলিয়ে রাখা মানুষের হাত ,পা , মাথা; শিশুর কাটা কোমল দেহ। ওর পুরো শরীর শিউরে উঠছে।
     “কী করছিস মণির মা?” হাতে একটা ঠোঙার থলে আর তিন জোড়া মোড়া নিয়ে মিনতি জোনের মায়ের ঘরে এসে ঢুকল।
     “এলি?” জোনের মাও মুড়ির টিন নিয়ে বেরিয়ে এলো। ওর হাতের একটা থলেতে সামান্য এলাচ লেবু। জোনের বাবা আগে গাছের কলম, চারা, বীজের ব্যবসা করত। এখন ঘুরে বেড়াতে পারে না বলে, মাছি মারা, ইঁদুর মারার ঔষধের ব্যবসা ধরেছে। তখনই আরো কিছু ফলের গাছের সঙ্গে এই লেবুর গাছও লাগিয়েছিল। এক ফোঁটা রস পড়লেই পুরো ঘরটা ম ম করে। এই সময়ে ডাল ভরে ভরে ধরে, জোনের মাও পয়সা দুটো পায়। লেবুগুলো বের করলেই বাজারে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। চারটা লেবু বের করে ও মণির মাকে দিল।
     “এগুলো রেখে দে, বাজারে বের করবার পর আর থাকবে না।”
    “এই, লাগবে না এতোগুলো” দুই হাতে নিতে নিতে বলল।
    “আর হবে, তোকে এই লেবু চারটা দিতে পারবখন। ভাঙা হলেও মাথার উপর চাল একটা আছে, বেমারি হলেও মাথার উপর মানুষ একটা আছে।”
  
  “দে, তবে।” লেবু এগিয়ে দেয়া মেয়েলোকটির পাকা জামের মতো মুখে আধলির মতো জিলকোচ্ছে সিঁদুরের ফোঁটা, তারই তৃপ্তি দেখে ওর একটু ঈর্ষাই হলো।
     “ঐ মোড়াওয়ালি, এই দিকে আয়তো!” একটা মেয়ের ডাকে সে মাথার থেকে মুড়ির টিনটা নামিয়ে দাঁড়ালো। পথের পাশের বাড়ি একটার থেকে ডেকেছে। তিনজনেই গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মণির মায়ের দুজোড়া মোড়া তৎক্ষণাৎ বিক্রি হয়ে গেল। পথে হাঁটতে গিয়ে ওর ইচ্ছে হলো বলে উঠে, “ বাবা নেই তো কী হলো, মাথার উপর লাউর ডগার মতো বাড়ন্ত ছেলেটা রয়েছে যে।” মিনতির কালো মুখখানার দিকে তাকিয়ে বলল না।
     “ কী হলো , মিনতি? খাঁচায় বাঁধা হাঁসটির মতো হয়ে আছিস কেন?”
    “আমার বড় ভয় করছে গো মণির মা।”
    “কিসের ভয়?”
    “ওর জন্যে।”
    “তোকে নিংড়ে নিংড়ে খেয়েছে, আবার ওকে বিছানাতে তুললি !”
     “কে বললে , ওকে বিছানাতে তুলেছি?”
    “ তোর ওখানে আসেনি ও?”
    “মিনতি আমার ঘরে ছিল তো।” জোনের মায়ের মুখ ভার হয়ে এসেছে, “ ও এলে তোকে আর আমি রাখতে পারব না, আমারও একখানা সংসার আছে।”
     “ও এলে তুই ওকে বের করে দিবি, কী দিয়েছে ও তোকে? জ্বালার পর জ্বালা। ওর টাকাতে যা কিছু কিনেছিস, ফেলে দিবি ছুঁড়ে।”
    “মণির মা, এবারে যখন ও এলো গায়ে প্রচুর জ্বর ছিল, হুঁশ ছিল না। পুরো শরীরে জোঁকে খেয়ে ঘা।”
     “কোত্থেকে এসেছিল সে?”
    “পাহাড়ে ট্রেনিং নিয়ে এসেছিল।”
    “ কিসের ট্রেনিং?”
    “মানুষ মারবার। মানুষ মারবার হাজারটা উপায় ও শিখে এসেছে। ও বোমা বানিয়ে মানুষ মারবে, বন্ধুক চালিয়ে মারবে। মানুষ মারবার একশটা বুদ্ধি শিখে এসেছে যে তাকে আমার ভয় করবে না?”
    মিনতির কথা শুনে মনে হচ্ছিল ওই ছেলেটি নয়, ওরই জ্বর উঠেছে।
    “মানুষ মেরে ও করবেটা কী? আন্দোলন করে, ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ মেরে ওরা রাজপাটে তো উঠল, এরা আবার মানুষ মেরে কী করবে?
    “আমি জানি না , মণির মা! আমি শুধু এই জেনেছি ওর পার্টির লোকের লাগে রক্ত আর টাকা। আমার বড় ভয় করছে।”
    “তুই কি এবারেও ওকে বিছানাতে তুলেছিলি?” জোনের মা জিজ্ঞেস করল।
    “আমি দেখি তোর বাড়িতেই ছিলাম। ও মানুষ মেরে এসেছিল। ওর বেগে রাখা কাপড়ে আমি রক্তের দাগ দেখেছি। মানুষ মারা হাতে...” ও যেন এখনো রক্তের ছিটে লেগে থাকা কাপড় ধরে আছে হাতে, রক্তের ছিটে পড়া কাপড় পরে একটা লোক ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মিনতির মুখ ম্লান হয়ে পড়েছিল।
     “ও কি তোর গায়ে হাত দিতে চেয়েছিল?” সেবারে ভোটের সময় যখন এসেছিল ও তোকে বেশ কয়েকরাতের জন্যে নিয়ে যায় নি?”
     “ নিয়ে গেছিল, আমিও গেছিলাম। আমি ভুল করেছিলাম জোনের মা।”
    “ আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার জবাব দিচ্ছিস না যে?”
    “না চায়নি। ওরা বাকি যা কিছু বিছানার তলায় ভরিয়ে হাতে বন্ধুক নিয়ে মদ খেয়ে পুরো রাত ঢল হয়ে পড়েছিল। বমি করে করে পুরো ঘর ভরিয়ে দিয়েছিল।”
     “দিনে কই গেছিল ও?”
     “ জানি না, বলতে পারি না।”
    “ মানুষ মারতে যে জিনিষগুলো নিয়ে এসেছিল, সেগুলো কই রেখেছিল?”
    “বিছানার তলার বেগে।”
    “দিনে ও...।“ মণির মায়ের মনেও মিনতির ভয় সেঁধিয়ে গেছিল।
    “বলতে পারি না, মণির মা। রাতে কয়েকটা ছেলে এসে ওকে নিয়ে গেছিল। আমি একটা কথাই বুঝেছিলাম ওরা টাকা আর মানুষ মারবার কথা বলাবলি করছিল।”
     বাজারের কাছে চলে আসতেই ওদের তিনজনের মুখেই যেন খানিক প্রাণ ফিরে এলো। চেনা পরিবেশ, শুক্রবারের বাজার লোকে গমগম করছে। তার উপর আগের মঙ্গলবারের বাজারের দিন সকাল আটটা সাড়ে আটটাতেই আকাশ কালো করে যে ভাবে বৃষ্টি নেমেছিল, বাজার বসতেই পারেনি সেদিন।
     তিনজনেই নিজের নিজের জায়গাতে গিয়ে বসল। দরদাম, বিক্রিবাটা, লোকজনের ভিড়ে সামান্য আগে ওদের যে ভয়ে পেয়েছিল ক্রমেই তা গলে গেল।
    বিক্রিবাটা সেরে তিনজনেই বুড়োর দোকানের দিকে এলো। মণির মায়ের বুক ধপধপ করছে। আজ সে প্রথম এতো বেশি টাকার জিনিস একসঙ্গে কিনতে যাচ্ছে। বুড়োর দোকানটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। গদির এক কোনে বসে আছে বুড়ো। ওরা তিনজনে বুড়োর কাছে বসল গিয়ে। কেমন যেন কোনও সাড়া শব্দ নেই দোকানে। অথচ আজ অন্যদিনের থেকে দোকানে বিক্রিবাটা একটু বেশিই হচ্ছে। রোজ যাদের দেখা যায় ওরা ছাড়াও আর কিছু অচেনা মুখও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কাপড় দেখাবার আগ্রহ কারোরই নেই। ওরা তিনজন কিছু সময় বসে রইল। কেউ একজন সেই চেনা প্রশ্নটা করল না যে ,” কী চাই?”
     “একজোড়া সার্ট-পেন্ট দেখি তো।” জোনের মা বলল। তবু কেউ এগিয়ে এলো না। আগে ব্লাউজ একটা কিনতে গেলেও কত প্রশ্ন—-“কী রঙ নেবে, কেমন কাপড়? সাইজ কী? কী ধরণের হাত হলে ভালো?” আজ কী হলো এদের?
     “আজ বিক্রিবাটা নেই।” ভারি গলাতে এক কোনের থেকে কেউ বলল।
    “কেন? দোকান খোলা রেখেছেন কেন? না, ভেবেছো পয়সা না দিয়ে নিয়ে যাব?” জোনের মা যেন দরকার থেকে একটু বেশিই বলল।
  

  “কী চাই,  তাড়াতাড়ি দিয়ে দে।” গদির কোনায় বসে বুড়ো বলল। বুড়োটাকেও যেন কেমন অন্যরকম মনে হচ্ছে। অন্যদিনের মতো ওদের বৌ, ভাতিজি বলে ডেকে হাসি ঠাট্টা করছে না। বিক্রির জন্যে বের করবার আগেই জোনের মা বুড়োকে দেবে বলে তিনটা লেবু আলাদা করে রেখেছিল। ওর বিপদে আপদে বুড়ো অনেক সহায় সাহায্য করেছে, টাকা দিতে না পারলে বাকিতেও কাপড় দিয়েছে। বুড়োর গুমড়া মুখ দেখে ওর লেবুগুলো বের করবার সাহস হলো না, আর ইচ্ছেও হলো না। থমথমে দোকানটা ওদের কারোরই ভালো লাগল না। তবুও দেখেশুনে জামাপ্যান্ট একজোড়া বেঁধে নিয়ে ওরা যাবার জন্যে উঠল।
     উঠতেই ওরা দেখল দুটো মটর সাইকেলে চারটা ছেলে এসে দোকানের সামনে দাঁড়ালো ওরা তিনজনের চোখের সামনে দা, লাঠি, লোহার রড নিয়ে বুড়োর দোকান থেকে প্রায় দশ পনেরটা লোক বেরিয়ে এসে ছেলে চারটাকে তাড়া করে গেল। মণির মায়েরা কাপড়ের একটা আলমিরার কাছের দরজা দিয়ে গিয়ে গুদাম একটাতে গিয়ে ঢুকল, খোলা দরজাটা যে বন্ধ করে নেবে সেই সাহস কারো হলো না।
     বুড়োর লোকেরা দা-কুঠার নিয়ে তাড়া করে যেতে দেখে ছেলেগুলো বন্দুক বের করল। দুটো ইতিমধ্যে মটর সাইকেলে উঠে সেখান থেকে চলে গেল।বাকি দুটোর বন্দুকের গুলিতে বুড়োর দুটো ছেলে আর তিনজন কর্মচারী পড়ে গেল। সামান্য আগে যেখানে ওরা তিনজনে বসেছিল সেখানে রক্তের নালা বইতে শুরু করল।
    ‘ডাকাত ! ডাকাত!’ বলে ক’জন লোক গুদামের ভেতর দিয়ে দৌড়ে গেল। ব্লাউজ আর পেটিকোটের একটা স্তুপ গড়িয়ে পড়ল ওদের উপর। কাপড়গুলোও গেল ছিঁড়ে টিরে। তিনজনে  থরথর করে কাঁপছিল। কারো মুখে রা নেই। হাতে কাপড়গুলো সরাতে গেলে আরো খসে খসে পড়ছে। আজ অনেক দিন পর মনির মাকে সেই আলো আঁধারে ঘিরে ধরেছে। একবার সামান্য আলো দেখে , আবার অন্ধকার। মানুষটি একটা কলাগাছের পুকুরে ডুবে যাচ্ছে। এই পুকুরে কেউ আগুন লাগিয়ে দেবে। ঐ লোকগুলো পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেল। কেউ কেউ শুকনো কলা গাছের খোসা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, একটা বন্ধ ঘরে দুটো মানুষের মরণ কান্না। আঁধার একবার গাঢ় হচ্ছে, একবার হালকা । মণি, মণি কোথায় আছে? হাতের জামাপ্যান্টই সে খামচে ধরল জোরে।
     বুড়োর দোকানের লোকগুলোকে গুলি করে ছেলেগুলো মটর সাইকেলে উঠছে। বাকি লোকগুলো পেছনে তাড়া করে করে যাচ্ছে। ওরা ভাঙা গলাতে যত পারে জোরে চেঁচাচ্ছে।
     ‘ডাকাত! ডাকাত!’ বাইরের সব  দোকান টোকান  থেকেও মানুষজন বেরিয়ে আসছে। কাকের বাসাতে সাপ বা বেড়াল উঠলে কাক যেমন করে, মানুষগুলো তেমনি চেঁচামেচি করছে। একটা পানের দোকানের সামনে দিয়ে মটর সাইকেলগুলো চলে যাচ্ছে। পান-দোকানি পান ভেজাবার জলের বালতিটাই ছুঁড়ে মারল, যে ছেলেটা চালাচ্ছে তাকে তাক করে। এই হঠাৎ আক্রমণে মটর সাইকেলের ছেলেটা পড়ে গেল। পড়ন্ত মটর সাইকেল থেকেই পেছনেরটা ঝাঁপ দিয়ে নেমে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। চালকের আসনে যে ছেলেটি ছিল সে কিছু বলতেই পেছনেরটি চলে গেল। পাগল হাতিকে যেমন করে তেমনি লোকে ওই বন্দুকধারী ছেলেটিকে রাস্তা ছেড়ে দিল। মাটিতে যেটি পড়েছিল ও উঠতে যেতেই একজন কেউ ওই পানের বালতি দিয়ে জোরে গিয়ে ওর মাথাতে মারল । ইতিমধ্যে বুড়োর এক ছেলে আর কর্মচারী মারা যাবার কথা এবং বাকিদের ঘায়েল হবার কথা লোক জানাজানি হয়ে গেছে। লোকের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ঐ পড়ে থাকা ছেলেটির উপর। বিচিত্র সব আঘাতে পাঁচ মিনিট হলো কি হলো না , ছেলেটি মরে গেল।
  
       
  আধ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ এসে পৌঁছুলো। তিনটা লাশ পুলিশ ভেনে তুলে নিলো, লোকজনে বোবার মতো দেখে গেল। ছেলেটার হাতে গ্রেনেড ছিল। ব্যবহার করতে সুবিধে পায়নি। এদিকে ওদিকে জড়ো হয়ে আতংকিত মানুষজনে বলাবলি করতে শুরু করল। মুহূর্তে জানাজানি হয়ে গেল যে এটি এক নতুন সংগঠন। বুড়োর কাছে টাকা দাবি করেছিল। কোনোদিন এমন অন্যায় দাবি ধমকের কাছে বুড়ো মাথা নত করেনি, তাই ডাকাতগুলোকে মারতে দোকানে লোক জড়ো করে রেখেছিল। সবাই বুঝতে পারল এই কাজ বুড়ো ভালোর জন্যে করেনি। দূরে দুটো মটর সাইকেল দেখে লোকজন যে যেদিকে পারল ছিটকে গেল। ‘আবার এসেছে!’, ‘এসেই গেল!’ এমন আরো কিছু চিৎকারে চেঁচামেচির পর রাস্তাটা একেবারে শূন্য হয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে পুলিশে মিলিটারিতে জায়গাটা একেবারে ঘিরে ফেলল।
     বুড়োর আনন্দ-মহলে কান্নার রোল উঠল। ওরা তিনজনের শরীরের উপর গড়িয়ে পড়া কাপড়গুলো কেউ সরিয়ে দিয়েছে, ওরা নিজেরাও সরিয়েছে কিছু। জোনের মাকে মাঝে নিয়ে  রক্তনদী ডিঙিয়ে বুড়োর দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। শাড়ির তলাগুলো ভিজে জবজবে হয়ে গেল। রাস্তার কলে সরকারি জল এসেছে। জোনের মা, মণির মা, আর মিনতির মুখে মাথায় জল ছিটিয়ে দিল,  নাকে চোখে জল দিল। মণির মা চোখ মেলেছে। জামাপ্যান্ট জোড়া খামচে ধরে আছে । শাড়ির তলাটাও ওরা ধুয়ে নিলো। তারপর যেমন তেমন ওখান থেকে চলে আসতে শুরু করতেই পুলিশ একটা এসে ওদের মুড়ির টিন থেকে শুরু করে হাতের টাকা কড়ি সব তন্ন তন্ন করে দেখে ছেড়ে দিল।
     দ্রুত পা চালাল ওরা। আজ রাস্তাগুলো শূন্য। প্রায় মানুষই বাড়িতে চলে গেছে। এক নতুন আতঙ্কে মানুষ বুদ্ধি হারিয়ে ফেলছে। সবাই বুঝতে পারছে এ মাত্র শুরু। কিছু লোক বুড়োকে দোষারোপ করছে। যে টাকা চেয়েছিল দিয়ে দিলেই হতো, এখন কী হলো? কিছু লোক বলছে ভালোই হয়েছে, ভবিষ্যতে আর কারো কাছে গিয়ে চাইবে না। লাখের উপর টাকা চায় , উপার্জন করুক দেখি টাকা একশ। রিজার্ভের কাছে গিয়ে গাছের ছায়াতে দাঁড়ালো খানিক ওরা। প্রায় দৌড়ে আসার মতোই আসছিল। বুক ধুকপুক করছে, ঘামে গা ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।
     “এটা ওর সঙ্গের লোকেদের কাজ।” মিনতি যেন ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। দেখবি তোরা ওরা আরো কত কী করে, মানুষ মারার নানান ফন্দিফিকির শিখেছে ওরা। এক ঘায়ে মানুষ মেরে ফেলে! মানুষ মারবার কী বুদ্ধি!”
     “বুড়োর থেকে টাকা চাইছিল কেন? কী করবে এতো টাকা দিয়ে?” জোনের মায়ের মুখখানা কালি দেখাচ্ছিল।
     “কী করবে? লোক মারবার জন্যেই ওদের টাকা চাই। চল চল , যাই।” মিনতিকে যেন কিসে কামড়ছে , এমনি ঝাঁপ দিয়ে বলল, “ চল না, যাই।” মিনতি দৌড়তে শুরু করল। বাকি দুজনে ওর সঙ্গে পেরে উঠা মুস্কিল হলো। সামান্য দূরে গিয়ে দেখে বস্তির দিক থেকে অনেক মানুষ এদিকে আসছে। বুলেন, জোনের বাবা, মণি, নবীন, জগু, কালীবুড়ি। সব্বার মুখ কালো। ওদের দেখে কালীবুড়ি হাতজোড় করে প্রণাম করলে, “ মা, ওদের তুই রক্ষা করলি, মা!” জোনের মা আর মিনতিও হাত জোড় করল। মালতীর হাত আপনি জোড়া হয়ে গেল। মণি এসে মায়ের কাছে দাঁড়ালো। সে আজকাল মাকে আহ্লাদে জড়িয়ে ধরে না। মা জানে ওকে আজকাল লোকের সামনে গালে মুখে হাত বুলিয়ে দেয়া সে পছন্দ করে না। সে নীরবে ছেলের হাতে জামাপ্যান্ট তুলে দিল। সমস্ত মানুষজন কালীবুড়ির উঠোনে গিয়ে বসল। জোনের মা কালীর সামনের প্রদীপ কটা জ্বালিয়ে দিল। কিছু পরেই সবাই দেখল মাথাতে মস্ত এক জটা নিয়ে কালীবুড়ি বেরিয়ে এসেছে। বুড়ি এসে কালী মায়ের মূর্তির সামনে দণ্ডবৎ করল।
    দণ্ডবৎ করে লোকগুলো উঠে বসতে পারল কি পারল না চারদিকে এক হৈ হল্লা শুরু হয়ে গেল। আর্মি আসছে। সত্যি সবাই দেখল নদীর পাড়ের বটগাছে হেলানো ঘরখানা ঘিরে ফেলেছে মিলিটারিতে। হরি ভাঙুয়ার অসৎ ছেলেটাকে ওরা গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। ভালো মন্দ কিচ্ছু বলেনি। শুধু জোনের মা সামান্য জোর গলাতে ওকে বলল, “মণির মা, ভগবান আছে বুঝলি! ভগবান আছে!”
    “ যা! তোরাই যে বেঁচে এলি , এই ঢের!”
    “ পাপ করলে শাস্তি আছেই রে জোনের মা” সে কথাগুলো বড় আস্তে করে বলল।

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India