ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন


ফেলানি
   
         রিজার্ভের দিকে বস্তিটা বাড়বার আর জায়গা নেই। বাড়ছে এদিকটাতে । মাঠগুলো এক কাঠা, আধা কাঠা মাটি নিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে ভরে গেছে। সেইখানেই এক কাঠা একসালা মাটিতে বুড়া দর্জির ঘর। লোকটার জোয়ান বয়সেও ঐ একই নাম ছিল। বুড়ো নামটা পেল কেন, জানি না । দুটো কারণ হতে পারে । সে বুড়ো মানুষের কাপড়ই সেলাই করে । শহরের চারআলিতে যখন দোকান ছিল তখন বয়স্ক মানুষের পাঞ্জাবি, ফতোয়া বা পেছনে লম্বা লম্বা ভাঁজ দেয়া ধুতির সঙ্গে পরবার সার্ট, বয়স্কা মহিলাদের লম্বা রশি বা বোতাম লাগানো ব্লাউজের দেদার অর্ডার পেত। সেই সময়েই বুড়োর বিয়েও হয়েছিল। মেয়েটি দর্জির থেকে বারো তেরো বছরের ছোট,দেখতেও বেশ সুন্দরী রসেটসে ভরা মেয়ে। কাপড় সেলাই করে করেই বোধহয় গলার খানিকটা নিচে দর্জির মেরুদণ্ডে একটা ভাঁজ পড়ে গেছে। সেজন্যে বয়সের থেকে একটু বুড়োই দেখায় তাকে । বুড়ো দর্জির হাতে তৈরি কাপড় নয়, বাজারের ফুল পাতা আঁকা, চুমকি বসানো, বড় গলার, ছোট হাতা ব্লাউজের থেকে লাল শাড়ির আঁচল পিছলে পিছলে ওর বৌ যখন বেটাছেলেদের সঙ্গে আলাপ জমায় তখন যেন বুড়ো দর্জির বয়সটা আরেকটু বেড়ে যায়। সে সময় বুড়ো দর্জির আয় উপার্জন ভালো ছিল। বৌকে তিনবেলা ভালো খাইয়েছিল। প্রতি বাজারবারে বৌ ব্লাউজ, শাড়ি, পাউডার , স্নো কিনেছিল। নিজে পিছলে ফেলে না দিলেও ওর ভরপুর শরীর থেকে শাড়ির আঁচল এমনিতেই পিছলে যেত।রূপোর পায়েল পরে ওকে হেঁটে যেতে দেখলে মেয়েলোকেরা বলত, “বাঁজা মেয়েমানুষ না? শরীর অমনটি হবেই।” পুরুষমানুষেরা চোখ দিয়ে প্রায় চেটে ফেলতে চাইত বাচ্চার মুখের ছোঁয়া না লাগা, গায়ে কাপড় রাখতে অনিচ্ছুক এই শরীর।
     সে বাজারে যাবার বেলা দর্জির দোকানে বসে যেত। আসবার সময় সঙ্গের সবাইকে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে চা-জিলিপি খেত, কিন্তু পয়সা নিত এই বুড়ো দর্জির থেকে। বাজারে থেকে নিয়ে আসা মাছগুলো দেখিয়ে স্বামীটিকে তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে ভাত খাবার কথা বলে আসত। সবাই দেখত পুরো দিনটা সেজে গুঁজে এবাড়ি ওবাড়ি করে ঘুরে বেড়ালেও সন্ধ্যে হতেই মেয়েলোকটি বাড়ি চলে আসত। গরম ভাত রেঁধে, জল গরম করে সে আস্তে আস্তে পথ চলতে অভ্যস্ত একজন বাঁকা মানুষের ঘরে ফেরার পথে তাকিয়ে থাকত। লোকটা বেরিয়ে না যাওয়া অব্দি হাজার ডাকলেও সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসত না । কেউ কেউ বলে ও কখনো দর্জিকে স্নান করিয়ে দেয়, ভাত খাইয়ে দেয়। কখনো কখনো কেউবা দেখেওছে শীতকালে সে রোদে বসিয়ে বুড়ো দর্জিকে তেল মালিশ করে দিচ্ছে, নখ কেটে দিচ্ছে; গরমের দিনে বাড়ি ফিরে আসা মানুষটাকে পাখাতে বাতাস করে দিচ্ছে। হাসি-চাপা এই মেয়েটি শুধু একটা কথাতেই রেগে কালভৈরবীর রূপ ধরে । যদি কেউ বলে যে, পেটে বাচ্চা দিতে পারেনা যে লোকটা তার সঙ্গে ও ঘর করছে কেন? কত আছে, ওকে কাছে পেলে ধন্য হয়ে যাবে, তারও কোল ভরবে। এইসব কথা শুনলেই ও ক্ষেপে যায়, চুল মেলে একেবারে পাগল হয়ে যায়। কথাটা শুনলেই ও যেখানে আছে সেখানেই বসে পড়ে, যে বলে তার চুল টেনে টেনে আক্রমণ করতে শুরু করে। কথার কোনও ঠিক থাকে না, চোখ লাল হয়ে আসে। চুল এলো মেলো হয়ে যায়।
      
       
  “আমার জামাই জোয়ান নয়! ও যেমন করে রেখেছে, তোদের ক’টা জামাই তোদের রাখতে পেরেছে...! তোদের ঘরে তো দেখি একবেলা ভাত জুটে না, আমার ঘরে তিনবেলা মাছ-ভাত...! দেখগে’ আমার বাক্সে ক’টা নতুন কাপড়...আমার বুড়ো জামাই আমাকে বাচ্চা দিতে পারে না, তোদের জোয়ান জামাইদের বিছানায় তুলে তুলে যত ইচ্ছে বাচ্চা বিইয়ে থাক না, আমাকে দেখে জ্বলে মরিস কেন?”
     সেই দর্জির বৌ ফুল আজকাল ঘরেই মদ তৈরি করে বিক্রি বেচে। মদ খেতে যাবার থেকে বেশিরভাগ লোকই ওর ঘরে তামাশা করতেই যায়। ফুলকে কেন দর্জি মদ বেচার কাজে লাগাতে গেল সেও এক কাহিনি । তখন ফেলানি, বুলেনরা নিজের নিজের বাড়িতে ছিল। শুরু হয়েছিল অসম আন্দোলন। লোকে বুঝে না বুঝে ছেলেছোকরাদের হাবভাব দেখে যাচ্ছিল। সে সময়ে যারা আন্দোলনে নেমেছিল তারা স্বাবলম্বিতার শপথ নিয়েছিল। বুড়ো দর্জির দোকানের সামনে একটা দর্জির দোকান বসল। দোকান মানে দুটো মেশিন আর একদল ছেলেছোকরা । মেশিন নিয়ে যে ছেলেটি বসেছিল সেই ছেলেটিকে ফুলেরা চিনত। বস্তিতে থাকে, স্কুল ছেড়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। কিছু দিন থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গ নিয়েছে । ওর মা ওকে বুড়ো দর্জির দোকানে দিয়েছিল। একমাসের মতো থাকল। কাজ শেখার কোনও আগ্রহ নেই। শেষে দর্জি তাকে অর্ডার আনা, কাপড় দিয়ে আসা ইত্যাদি কাজে লাগালো। সেখানেও সে গোল পাকালো । সেটুকুন অভিজ্ঞতা নিয়ে সে মেশিনে বসেছে । বুড়ো দর্জি ওদের কীর্তি কলাপ দেখতে থাকল। ছেলেগুলো কাপড় সেলাই করবার অর্ডার পেল ঢের। বিচিত্র কাপড়ে ওদের আলমিরা ভরে গেল। একদিন ছেলেগুলো এক দলা রঙিন কাপড় দর্জির দোকানে দিয়ে গেল। সেলাই করবার সময়ও দিল। কাপড়গুলো নিয়ে মানুষটি আরো বেশি বাঁকা হয়ে গেল। কী করে কী করে? যে মানুষ কিনা বুড়ো মানুষের জন্যে কাপড় সেলাই করে, সে এইসব রংচঙে ভরা পিচ্ছিল কাপড়গুলো নিয়ে কী করে? এই ভারি বোঝাটা নিয়ে কী করে? কীই বা করে? সময় পেরিয়ে গেল। গাল-ধমক খেয়েও মানুষটি কাজে হাত দিল না। একদিন সবক’টা ছেলে এসে, দোকান পাট ভেঙে, মেশিনগুলো লণ্ডভণ্ড করে দিল। বুড়োর গায়েও হাত দিল। মানুষটাকে মূর্ছা যেতে দেখে ভাবল বুঝি মরেই গেছে, ওরা চলে গেল। পুরো দুটো দিন একটা রাত পর বুড়োর জ্ঞান ফিরল। জ্ঞানই ফিরল, মেরুদণ্ডের ব্যথাতে নড়াচড়া করা মুস্কিল হয়ে পড়ল। জল এক গ্লাসও তুলে খাবার মতো অবস্থা রইল না । হাত থরথর করে কাঁপে । তারপর থেকেই ফুল বাড়িতে মদ বানিয়ে বেচে । ওর মদ বেচার সময় হলো সন্ধ্যে বেলা । বুড়ো দর্জির বাড়িতে রাত অব্দি লোকে ভর্তি থাকে । শেষ লোকটা না যাওয়া অব্দি দর্জি বসে থাকে । কাঁপা কাঁপা হাতে ফুলকে সাহায্য করে । একটা কাজই মূলত দর্জি বেশি করে, টাকা পয়সা নেই আর খুচরো পয়সা ঘুরিয়ে দেয়।
        
     
আজ ফুল ফেলানিদের সঙ্গে বাজারে এসেছে। দর্জির জন্যে ওষুধ নেবে আর নিজের জন্যেও টুকটাক কিছু কিনবে । মণির মা, ফুল, কালীবুড়ি, মিনতি, জোনের মা সবাই হাতের পোঁটলাপুটলি সামলে সামলে জোরে পা চালিয়ে এসে বড় রাস্তাতে উঠল। মণির মায়ের হাতে মোড়া, মাথাতে মুড়ির টিন, কালীবুড়ির হাতেও কাঁখে বাচ্চা নেবার মতো করে নেয়া মুড়ির টিন, মিনতির মাথাতে ছোট টুকরিতে ভাদালি পাতা, থানকুনি পাতা, ভাতুয়া শাক, আমরুলের শাকের মুঠো ,জোনের মায়ের হাতের পোটলাতে গরম মশলার প্যাকেট। এই কাজ জোনের মা নতুন নিয়েছে।বেশি করে এলাচ, দারচিনি কিনে ছোট ছোট প্যাকেট করে বেচে। জোনের বাবার হাঁপানির টানটাও বেড়েছে আজকাল। বাজারে যেতেই পারে না । জোনের মা চারদিক সামলেও পেরে উঠছে না ।
    সবাই নিজের নিজের ভাবনায় বিভোর। গেল বাজারে টানা বৃষ্টি দিয়েছিল। এদের সব্বার লোকসান হয়ে গেল। মিনতিকে এক টুকরো শাক ফেলে দিতে হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি বাড়ি নিয়ে গিয়েও বিক্রি করতেও নিয়ে যেতে পারে নি। কাকে গিয়ে দেবে? বস্তির বাড়ি বাড়িতে এই সব শাক তোলা থাকে। এক বোতল তেলে সাত দিনের কাজ চালায় যারা তারা কি আর সাধ করে এই শাক ওই শাক ভেজে খাবে? ওর চোখে ভেসে উঠল টুকরির শাকগুলো। রিজার্ভে কত কষ্ট করে তুলে আনা শাক ওভাবে ফেলে দিতে হওয়াতে তার মনটাই কেমন হয়ে গেছিল। আজকাল আগের মতো রিজার্ভে যেতেও ভয় করে । কখনো বা এক দল ছেলে পাহাড় থেকে নেমে এসে এক দু রাত এখানে থেকে যায়। ওরা সাধারণত রিজার্ভের ভেতরে থাকে, নদীর পাড়ে এক দু রাত থেকে চলে যায়। সে গেল বাজারবারের আগের দিন ঢেঁকি শাকের খোঁজ করতে করতে নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছেছিল। সেখানে থেকে সাধারণত আর আগে যায় না কেউ। পাহাড় অব্দি ছড়িয়ে পড়া এই অরণ্য এখান থেকেই নিঝুম হতে শুরু করেছে । পাহাড় থেকে নেমে এসে ওরা ওপারেই থাকে । রিজার্ভে ঢুকলেই ওর যেন কী হয়ে যায়, নদীর পাড় ওকে সুর সুর করে টেনে নিয়ে যায়। একবার নদীখানা দেখে না গেলে ও শান্তি পায় না । সেদিনও গেছিল। দুটো লোকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না এত্তো বড় কয়েকটা শিমূল গাছের তলায় প্রচুর ঢেঁকি শাক। ভয়ে ভয়ে ও এগিয়ে গেছিল।
    লোকে বলে শিমূল গাছগুলোর তলায় একটা জায়গা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কেউ কেউ ওখান থেকে রাজহাঁসের মতো ডাক শুনতে পায়। কালীবুড়ি প্রায়ই বলে বস্তিরই বুঝি রাউতা বলে একটা লোক ছিল, তাকে সেই জায়গাতে নীল করে ফেলেছিল। কাউকে কাউকে বুঝি ওখানে প্রকাণ্ড সাপে তাড়া করেছিল। রাজহাঁসের মতো ডাকে, বাসার চারপাশটা পরিষ্কার করে রাখে –এটি বুঝি বিশাল কালনাগ । ঢেঁকি শাকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মিনতির মনে পড়ছিল, মানুষের সাড়াশব্দ পেলেই ঐ কালনাগ তেড়ে আসে। ওর হাত খালি । ছেলেটা ডিম খাবার বায়না ধরেছে । সে ঘোপ করে ঢেঁকি শাকের ঝোপে ঢুকে গেল। একটা না দুটো বড়ই গাছকে স্বর্ণলতাতে ঘিরে ফেলে বেড়ার মতো করে ফেলেছে । বেড়ার পাশটা পরিষ্কার। সে দৌড়ে ওখান থেকে সরে এসেছিল। কেউটে টেউটে নয়, ছেলে একটা হাতে বন্দুক নিয়ে তেড়ে এসেছিল। সে চেঁচিয়ে নয়, কিন্তু স্পষ্ট করে গলা চড়া করে আস্তে আস্তে বলেছিল, “আমরা কাল চলে যাব। সাবধান! যদি কাউকে কিছু বলো।” মিনতি দৌড়োচ্ছিল। লোকে যেখানে নতুন বসতি গড়ছে, জঙ্গল যেখানে পাতলা হয়ে এসেছে সেই খানে এসে ও থেমেছিল। পরের দিন বস্তিতে রটে গেল মিনতি কালনাগটাকে দেখেছে । কালীবুড়ি ওর হয়ে বাতি দিয়েছিল।
  
 “মিনতি , তোকে কাল কালনাগে তাড়া করেছিল?”
    “না, তাড়া করেনি তো।”
    “ বেরিয়ে এসেছিল?”
    “কত লম্বা?”
    “কালো না হলদে ?”
    “তুই ভয় পেয়েছিলি?
    “ একটা না এক জোড়া?”
    “ফণা তুলেছিল?”
    “রাতে তুই স্বপ্নে দেখেছিলি?”
    সবাই মিলে মিনতিকে প্রশ্নের উপর প্রশ্নে জেরা  করতে শুরু করল। মিনতি চুপ করে রইল। ভয়ে ওর চোখের মণি দুটো গোলগাল হয়ে গেছে ।
    “ও ভয় পেয়েছে।”
    “কাল নাগ যদি, তবে জোড়ায় দেখেছে, হবে।”
    “ওর মুখটা দেখ।”
    “হ্যাঁ,কেউ যেন এই ফরসা সুন্দর মেয়েটির মুখখানার উপর ছাই মেখে দিয়েছে।”
    “ ও যদি স্নান না করা শরীরে...”
    “ জোড়াতে দেখলে মেয়েদের শরীরের...”
    মিনতিকে প্রশ্ন করা ছেড়ে কথা বলতে বলতে ওরা একজন অন্যজনের গায়ে গা লাগিয়ে কাছে চেপে এলো। মিনতির মতো ওদের মুখেও যেন কেউ ছাই মেখে দিয়েছে ।
     প্রথমে শুনেছিল মণির মা। মাথার থেকে মুড়ির টিনটা নামিয়ে খানিক দাঁড়ালো । ওকে দেখে অন্যরাও দাঁড়ালো । তারপর কালীবুড়ি শুনতে পেল। তারপরে বাকি সবাই শুনতে পেল শহর থেকে লাগাতার বোম ফোটার মতো শব্দ । গিঁট না খুলেই যেন কেউ একপাতা মরিচ বোমের সলতেতে আগুন দিয়ে দিয়েছে । শব্দটা শুধু তার থেকেও অনেক বেশি । কিসের শব্দ কিছু বুঝবার আগেই ওরা দেখে শহরের দিক থেকে এক দল লোক হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে এদিকটাতে আসছে । কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না, লোকগুলো হাত তুলে তুলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আসছে।
    “একেবারে শেষ।”
    “মরার পরেও গুলি করে যাচ্ছিল।”
    “আমেরিকার স্টেনগান।”
    “পুলিশ বাড়িটা ঘিরেই রেখেছিল।”
    “ডিমান্ড ছিল যে।”
    “ টাউনের ব্যাপারীদের মুখিয়াল ছিল।”
    “ সভাপতি ছিল।”
    “ এখন সব ব্যাপারী হয় ব্যাপার করা ছাড়বে, নইলে গিয়ে ওদের পায়ে ধরবে।”
    “গাড়ি গাড়ি আর্মি নেমেছে।”
    “কার্ফিউ দেবে।”
    নবীন এলো ওর বইপত্রের ওপচানো সাইকেল নিয়ে, পোটলাগুলো থেকে টপ টপ করে একটা একটা করে জিনিস পড়ে পড়ে যাচ্ছে। সে গিয়ে মাত্র জিনিসগুলো বাজারে নামিয়েছিল।
    জগু এলো লাল চা, আর নারকেলের নাড়ুর ঘুমটি গুটিয়ে। রমাকান্ত এলো সবুজ মটরের টুকরিটা নিয়ে । টুকরিটা ভেঙে রাস্তাতে মটর পড়ে পড়ে যাচ্ছে আর সেই সঙ্গে যেন ওর চলার পথের চিহ্ন রেখে রেখে যাচ্ছে ।
  
বাজারে যারাই গেছিল সব্বাই একে একে ফিরে এলো। বাসা ভাঙলে কাক যেমন করে তেমনি হৈ হট্টগোল করছিল ওরা ।
    মালতীরা রাস্তার উপরের দল বেঁধে দাঁড়িয়ে । হঠাৎ মিনতির কী হলো । এতোক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ যেন ওর বাই উঠল। যেখানকার টুকরি সেখানে ফেলে কাপড় কুঁচকে বস্তির দিকে দৌড় দিল। দুহাত তুলে কাকের ভিড়ের মতো ছুটোছুটি ভিড়ে ও হারিয়ে গেল।
    “আমি সব জানতাম, দেখতে থাক। আরো হবে , সবাই মরবি। কেউ বেঁচে থাকবি না ।”
    সবাই মিলে মিনতির পিছু নিলো। এতোক্ষণ বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েলোকটির মুখে এই ক’টা ভয়ঙ্কর শব্দ শুনে সবার মনে পাক খেয়ে ফণা মেলে দুলে উঠল এক একটা কালনাগ। সবাই যেন পাগল হয়ে গেল নিজের নিজের সন্তান , স্বামী আর বাড়িঘরের ভাবনায়।
    বাসা ভেঙ্গে দিশে হারা কাকের ভিড়ে ছটফট করতে করতে ওরাও এক একজন কাক হয়ে ভিড়ে গেল।
       

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India