ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন

    
   
  
রাতে হু হু করে তুফান দিয়েছিল। মাঝরাতে গিয়ে বন্ধ হয়েছিল। কালীবুড়ি পুরো রাত হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বসে ছিল। কিসে যে পেয়েছে এই বুড়িকে , একটা কড়ি পয়সাও খরচ করতে চায় না। মাথাতে সেই এক চিন্তা, দুবছর মায়ের পুজো করতে পারে নি, এবারে করতেই হবে। এমনিতেই বুড়ি কম খায়, আজকাল চড়াইর সমান খায় বোধহয়। দুমুঠো ভাত বসাবে, একটা আলুতেও যে পয়সা খরচ করবে-- কষ্ট পায়। রিজার্ভের জঙ্গলে যায় যদি তবে কচু ঢেঁকী দু'মুঠো নিয়ে আসবে, নাহলে খার শাকের পাতা, নরসিংহ বা ভাদালি পাতা সামান্য বেটে ভাত-মুঠো খাবে। তাও একবেলা রাঁধবে । ঘরে খুটা পাল্টায় না বুড়ি। পচা খুটাতে হেলে পড়া ঘরটাতে সামান্য বাতাস দিলেই হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বসে থাকে বুড়ি। সেই বুড়িকে দেখে কেউ ঘুমোতে পারে? ফেলানিও পারে নি। ওদের ঘরের খুটাগুলো মণি একদিন বুলেনকে বলে ঠিক করিয়ে নিয়েছিল। বুড়িকেও বলেছিল সে। আলু একটা, ডাল এক পোয়াতে পয়সা খরচ করতে কষ্ট হয় যে বুড়ির সে বাঁশ খুটাতে পয়সা ঢালবে?
    সে সময় তুফান ধরে এসেছিল। সে আর মণি গিয়ে বুড়িকে ডেকে শোবার জন্যে চাপাচাপি করেছিল। মণি বিছানাতে পড়বামাত্রই কাঠ হয়ে যায়। কালীবুড়ির বোধহয় একটু তন্দ্রা এসেছিল। সেই শুধু বিছানাতে পড়ে ছিল মাত্র। ভাত ঘুমটা ভালো করে হলেই সে এক ঘুমে রাত পার করে দেয়। মাঝে ঘুম ভাঙলেই রাজ্যের চিন্তা এসে ওকে চেপে ধরে। সেদিনও ধরেছিল। রাত বোধহয় একটা দেড়টা বেজেছিল। মিনতি এসে দরজাতে টোকা দিল।
    “ ও মণির মা, উঠ না একটু। দরজাটা খোল তো। । ঘুমিয়ে আছিস বুঝি? উঠ তো মণির মা।”
     মিনতির  ডাকে ক্রমেই ধৈর্যচ্যুতির আভাস। সে জেগেই ছিল। চাদরটাও গায়ে চাপাতে দিচ্ছেনা ।
     “মণির মা, ও মনির মা! উঠ না একটু।”
    ওর একটু রাগই চড়ল। “যাচ্ছি দাঁড়া, কি এতো হুড়োহুড়ি শুরু করেছিস!” ওর চিন্তাও হলো, কীইবা হলো এই মাঝরাতে? মিনতির ঘরের সামনে একটা কদম গাছ রয়েছে। সেইটেই বাতাসে উল্টেপাল্টে পড়েনি তো ওর ঘরে? না ছেলের অসুখ কোনও? দরজা খুলে দেখল ছেলের হাত ধরে মিনতি দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে ছেলেটার ধবধবে সাদা মুখখানা ঝিলিক দিচ্ছে। রোজ যেমন মনে হয়, আজো তার মনে হলো ছেলেটার মুখে যদি একটু হাসি থাকত। একেবারেই হাসে না ছেলেটা। মিনতির মুখ ম্লান হয়ে আছে। সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। দরজা খুলে ভেতরে ডাকল, “আয়।” মিনতি ঢুকে এলো।
     “ভাত খেলি?”
    “না।”
    “ওকে কী দিলি?”
    “কিছুই দিই নি।”
    সে সকাল বেলার জন্যে ডেকচিতে সব সময় সামান্য ভাত রাখে। আজো আছে। প্যাঁজ একটা কেটে তেল নুন দিয়ে একটা থালাতে ভাত বেড়ে সে মিনতির দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা দু-গ্রাসের মতো খেয়ে ঘুমে ঢলে পড়ল। মিনতি থালা চেঁছে ভাতগুলো খেলো। শুয়ে পড়া ছেলেটাকে সে মণির পাশে শুইয়ে দিল। কাত পাল্টে মণি আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
    মিনতি বেড়াতে হেলান দিয়ে বস্তাতে বসে আছে। মালতী কাছ চেপে গেল। দু’জনেই নীরবে কিছু সময় বসে রইল। হঠাৎ হুট করে উঠে দাঁড়ালো।
     “আয়”। মুড়ি ভাজবার চালার দিকে এগুচ্ছে মিনতি। মালতীও কালির বোতলে তৈরি বাতিটা নিয়ে ওর পেছনে এগুলো। সেখানে গিয়ে আবার মিনতি বেড়াতে হেলান দিয়ে বসল। বাতিটা রেখে সেও বসল। কেমন যেন করছে মেয়েটি। কীই বা হলো! ওরও বুকে কাঁপন ধরল। বাতিটা নিভিয়ে দিল মিনতি। বাইরে তুফানের পরে জোৎস্না উঠেছে। মুড়ি ভাজবার চালার ভাঙ্গা বেড়া দিয়ে অল্প অল্প জোৎস্নার আলো ভেতরে আসছে।
     “সে এসেছে?”
    “আসেনি।”
    “ তবে আর এই রাতে ঘর ছেড়ে এসেছিস কেন? ঘরের উপরে গাছ পড়েছে?”
    “ না, পড়ে নি।”
    “ ঘরে এখন কে রয়েছে?”
    “ ওর  চার বন্ধু এসেছে।”
     “ কখন এলো?”
    “ওই তুফান আসতেই।”
    “ক’টা এসেছে বললি?”
    “চারটা”
    “ কী করছে?”
    “ শুয়ে আছে।”
    “ভাত রেঁধে খাইয়েছিস?”
    “না, ভাত যে খাবে সে অবস্থাই নেই ওদের।”
    “কেন?”
    “সবক’টার বেমার। দু’টোর রক্ত আমাশা, রক্ত পায়খানা করছে। দু’টোর গায়ে জ্বর!...এই মণির মা, এরা বস্তির ছেলে নয়, গাঁয়ের কাদামাটি ছেনে বড় হয় নি। ভালো জিনিস খেয়ে সুখে আরামে বড় হয়েছে। এরা বড় চাকরি করে আরামে থাকতে পারত। কিসের সন্ধানে বেড়াচ্ছে ওরা?”
    “কখনো বা মানুষকে আগুনে ডাকে, জলে ডাকে, পাহাড় ডাকে। এদেরকেও ডেকেছে। না গিয়ে থাকতে পারে না।”
    “ছেলেগুলোকে জোঁকে খেয়েছে, পুরো শরীরে বসন্ত গুটির মতো ফুলে ফুলে উঠেছে। পা ফুলে ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। এসেই আমার দেয়া লাল চা আর মুড়ি খেয়ে শরীর এলিয়ে সটান পড়ে আছে।”
    “এসেছে কোত্থেকে এরা?”
    “ বলতে পারব না, কিন্তু এটা ঠিক যে বহু দূর থেকে এসেছে।”
    “তোর ঘরেই আসে কেন ওরা? ওর জন্যে?”
    “শুধু ওর জন্যেই নয়। একবার এলো, ভাত এক মুঠো পেলো, শুতে পেলো, আসতে থাকে আর কি। রিজার্ভের গা-ঘেঁষা বলে এখানে এসে ঢুকতেও সুবিধে পায়। পাহাড় থেকে নেমেই রিজার্ভের ভেতর দিয়ে আমার ঘরে এসে ঢোকতে পারে।”
    “তুই কেন ওদের আসতে দিস? মিলিটারিতে পেলে চ্যাপ্টা বানিয়ে দেবে।”
    মিনতি চুপ করে রইল।
    “ কথা বলিস না কেন? তোর ঘরে ওদের ঢোকতে দিস কেন?”
    সে একই রকম ভ্যামচা মেরে বসে রইল।
    “ওর সঙ্গের বলে। ওর খবর নিয়ে আসবে বলে? কিসের এতো টানলো তোর তার জন্যে? কী পেয়েছিস ওর থেকে? মরবি তুই, তার জন্যেই একদিন মরবি।”
    মিনতির সেই পরিচিত ভঙ্গিমা, কোপ খাওয়া সাপের মতো ফোঁস করে উঠল,
    “তার কথা আনছিস কেন? সে কী করেছে আমাকে? তোদের হিংসে, সবার হিংসা, ওর মতো একটা মানুষ তোদের দিকে চোখ তুলেই তাকাবে না। সে আমাকে ভালোবাসে, তার ছেলে আমার কোলে। তোদের হিংসা।”
    মিনতির এসব কথা বহু চেনা কথা। সে কিছু উত্তর দিল না। অল্প শান্ত হলো মিনতি। মুখে তার গভীর চিন্তার ছাপ।
    “বুজলি মণির মা, ওদের বড় কিছু একটা বিপদ হয়েছে।”
    “পুলিশ-মিলিটারিতে তাড়া করেছে?”
    “ওরা পুলিশ-মিলিটারিকে ভয় করে না।”
    “তবে, কী হয়েছে?”
    “ আমি কথাগুলো ভালো করে ধরতে পারি নি।”
    “কী করে বুঝলি তবে বিপদ হয়েছে?”
    “ ওরা এসে ঢোকবার পরে আমি ওদের গরম জল করে দিলাম। ওরা মুখ হাত ধুলো।”
    “গরম জল করে দিলি কেন? বৈশাখ শেষ হয়ে আসছে।”
    “ও এসে সবসময় বলে ‘একটু গরম জল করে দে তো মিনতি।’ আগেও বলত। আমি শহরের বাড়িটাতে কাজ করবার সময়েও ও এসেই সব সময় গরম জল চাইত।”
    “তার জন্যে ওর সঙ্গীগুলোকেও দিলি।” মিনতির মুখে ওর কথা শুনলে সবসময় যেমন শরীর গা রি রি করে উঠে, আজও উঠল। বলে লাভ নেই। মিনতি ওর জন্যে আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারবে।
    “তার পর লবণ চা আর মুড়ি দিলাম। আমাশাতে ভুগছে যে দু’টো ওদের ডালিমের কলি দু’টো পুড়ে রস করে অল্প অল্প দিলাম। ওরা বলল, ‘আপনি শুয়ে থাকুন। আমরা রাত না পোহাতেই চলে যাবো।’ আমার বিছানাটা ওদের ছেড়ে দিয়ে আমি চুলোর সামনে বসে ছিলাম। ছেলেটাকে একটা বস্তাতে শুইয়ে দিয়েছিলাম। আমার ছেলেটাকে দেখে ওদের একজন কী বলেছিল, জানিস?”এখন ওর কথা বলবে। ঠিকই ওর মুখখানা লাল হয়ে এলো, “ও একেবারে জিতদার মতো হয়েছে দেখতে।” মিনতি খানিক চুপ করে রইল। ওর বুকে বুঝিবা রাতের তুফানটাই হু হু করে ছুটছে।
    “তার পরে কি হলো? তুই কিছু বিপদের কথা বলছিলি।”
    “ওদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়েছিল।”
    “কী নিয়ে হয়েছিল?”
    “ আমি সব কথা বুঝি নি।”
    “তবু...।”

   “প্রথমে ওরা কোনও এক বিদেশী পার্টিকে গালি পাড়ল। সেই বিদেশের পার্টিটা বুঝি ওদের বন্দুক-বোমা চালাতে শেখায়। পার্টিটা বুঝি অনেক টাকা চেয়েছে। সেই টাকা দিতে এরা বুঝি চা-বাগান থেকে টাকা পয়সা তুলেছে।”
    “সে আর কি এমন বিপদের কথা হলো? বন্দুক বোমা চালায় এমন সব পার্টিই টাকা পয়সা তোলে। দেখিস নি বুড়ো দোকানীকে কী করে মারল?”
    “আমি বললাম না, যে সব কথা বুঝি নি। কী যেন গণ্ডারের খড়্গের কথা বলছিল, বিদেশি পার্টিটা বুঝি গণ্ডারের খড়্গ চেয়েছিল। ওদের একজন কহঁরা বলে এক জায়গা থেকে দু’টো গণ্ডার মেরে বুঝি ওদের লিডারকে দিয়েওছিল। সেই কথা নিয়েই এখন দু’ই পার্টির ছেলেদের মধ্যে বেশ রাগারাগি। ওরা বিদেশি পার্টির জন্যে কী যেন ডেগার না কি একটা জিনিস আনা নেয়া করেছিল। সেই নিয়েও রাগারাগি। বন্দুক চালানো শেখাবে বলে কথা দিয়ে ওদের দিয়ে বুঝি ব্যাঙ্ক ডাকাতিও করিয়েছিল। এতো কিছু করবার পরেও বুঝি ঐ পার্টিটা এমন বন্দুক –বারুদ দিল যে সেগুলো ফুটেই না।”
    “বিদেশি দলটি ওদের মারবে বুঝি?”
    “ সে হয়তো নয়। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে ওদের নিজেদের ভেতরে ভাগ হয়ে গেছে। একটা অংশ পার্টি ছেড়ে দেবে।”
    “পার্টি ছেড়ে দিলে পুলিশ –মিলিটারিতে কিছু করবে না?”
    “কী জানি, বলতে পারব না।”
    “ সে কী করবে?”
    মিনতি চুপ করে রইল।
    “তুই জিজ্ঞেস করিস নি?”
    “করেছিলাম।”
    “কী বলল?”
    “সেও পার্টি ছেড়ে আসবে।”
    “এলে কী হবে?”
    “জানি না।”
    “ সে আসবে বলে জেনে তোর ভালো লাগছে?”
    সে চুপ করে আছে।
    “সে ঘুরে এলে তোকে আর ছেলেকে নিয়ে যাবে?”
    মিনতি চুপচাপ।
    “তুই তাকে আবার বিছানাতে তুলবি?”
    সে সেই যে চুপ করেছে, চুপই রইল।
    “ও তোকে টাকা পয়সা দেবে?”
    না, ওর কোনও রা নেই।
    “তুই কী আশা করে আছিস?”
    ওর মুখে টু শব্দটি নেই।
    এবারে মণির মা ক্ষেপে গেল। “মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছিস যে! এই আমি বলে রাখলাম। তোকে কুশিয়ারের মতো আচ্ছা করে চিবুবে, ছিবড়েটা ফেলে রেখে চলে যাবে। তুই পড়ে থাকবি ঐ কুশিয়ারের চিবোনো ছিবড়ের মতো। আমি বলে রাখলাম।”
    ওর মুখ থেকে এবারেও কোনও শব্দ বেরুলো না।
    বাইরে আলো ফুটছে। পাখি ডাকছে। একটা কাক কা কা করে পাশ দিয়ে উড়ে চলে গেল।
    “যা গে যা, ওরা চলে গেছে। আমিও একটু গড়িয়ে নিই।”
    শুয়ানো ছেলেটাকে কোলে তুলে মিনতি চলে গেল, একই রকম মনে মনে, মুখে কোনও শব্দ না করে। মালতীও মণির পাশে কাত হলো, নিঃশব্দে।

  
         
  মণির মায়ের ব্যাপার আজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। মোড়া যে কয় জোড়া ছিল একটি লোকেই নিয়ে চলে গেল। মুড়িগুলোও চলে গেল। ‘কলমদানি’ ধানের গোটা গোটা মুড়ি যারই নজরে পড়ল সেই নিয়ে গেল। আজকাল মণি বাঁশ বেতের ছোটখাটো জিনিস মোড়ার সঙ্গে বানিয়ে দেয়। এই কলম পেন্সিল রাখার বাঁশের চোঙা, ছোট ছোট বাঁশের ধুচুনি, ছোট ফুল তোলা চারকোণা ফুলের সাজি। সেগুলোও গেল,
শুধু ঐ ধুচুনি দু’টো বাদে। আজ জোনের মা, মিনতি একজনও আসেনি। ওর আর এই ধুচুনি দুটো নিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে গেল না। মিনতির সঙ্গে বসে বসে গোটা রাতে ঘুমের ক্ষতি হয়েছে। শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে। সে যাবার জন্যে তৈরি হলো। মাথাটাও কামড়াচ্ছে যেন। লাল চা এক কাপ খেতে পারলে ভালো হতো। সঙ্গের ওরা ক’জন থাকলে জগুর দোকানে চাপ এক কাপ খেতে পারত। নবীন বাজারের উলটো দিকে পথের পাশে বসে। তাকে দেখে ডাক দিল---
    “মামী, বাজার আঁটালেন বুঝি?”
    “সেই মনে কর।”
    “ধুনুচিগুলো বেশ সুন্দর হয়েছে তো, দেখি তো।”
    সে নবীনের বই-খাতার দমের উপরেই ধুনুচিগুলো রাখল।
    “কে বানালো? মণি?”
    “ আর কে বানাবে?”
    “ বুনোনটা দেখো তো, কেমন ফুল তুলে তুলে বেঁধেছে। আমাকে একটা দিয়েই যাও।”
    সে বসল। আজকাল সে যেখানে সেখানে জোনের মায়েদের মতো হাত-পা মেলে বসতে পারে। চা খেতে পারে, বড় গলাতে দরদাম করতে পারে। কোনও রকমের সংকোচ নেই।
     “ নে তবে।” ওর মুখের থেকে তুমি-তামি চলে গেছে। জিভের ডগাতে শুধু তুই-তোকারিই নেচে থাকে।
    “দিন তবে মামী, দু’টাই দিন। বাড়িতে আলু-প্যাঁজ মাটিতে গড়াগড়ি করে থাকে।”
    “বড় সংসারী হয়েছিস! ব্যাপারখানা কী?”
    নবীন হাসল।
    “এক কাজ কর, ধুচুনি বাবদ পয়সা লাগবে না। মণির জন্যে খাতা দিয়ে দে, হিসেবে মিললে
    রাবারে পেন্সিলেও দিয়ে দিবি।”
    “চা এক কাপ খান, মামী।”
    নবীনের এই আপনি টাপনি, তুমি তামি গুলো ওর কানে বাজছে।
    “ এই নবীন শহরের বাবুদের মতো কথাগুলো বলিস কেন?”
    ওর কথা অনেকটাই জোনের মায়ের মতো শোনাচ্ছে।
    “ আর হবে, মামী!”
    মালতীর মুখের হাসিটা বড় খোলামেলা।
    “ চা খাওয়াবি যদি জলদি দে। ঘরে গিয়ে শুতে হবে, চোখজোড়া টান টান করছে।”
    “রাতে শোন নি? গোটা রাত বসে বসে মুড়ি ভেজেছেন কি মামী?”
    ছোট ছেলে একটা চা দিয়ে গেলো। পা মেলে সে চায়ে চুমুক দিল।
    “মিনতি এলো মরবার জন্যে। ঠিক তুফানটার পরেই।”
    “ ও কেন এসেছিল এতো রাতে? তুফানে ঘরে সুপুরি গাছ পড়েছিল কি? আমি ওকে বলেছিলাম,
    একটা না দুটো সুপারি গাছে ফাট দিয়েছে। ঝড় একটা এলেই ভাঙ্গবে।”
    “ ঘরে ওর আসল ‘তামোল’ই১ ভেঙ্গেছিল। একটা দু’টা নয় , গোটা গোটা চারটা।”
    নবীনের স্বর ছোট হয়ে এলো, “আবার এসেছে?”
    সে চুপ করে রইল।
    “ ও মরবে দেখবেন।”
    “বললে ও মা-কালীর মূর্তি ধরে।”
    “গেল কি না?”
    “ভোরবেলাই গেছে।”
             
       
মালতীর ইচ্ছে হলো মিনতির বলা কথাগুলো একটা একটা করে নবীনকে বলে। জিজ্ঞেস করবার ইচ্ছে হলো। করে কী করে? একটা ছেলে এলো, পেন একটা কিনল। ছোট ছেলেটা আর সঙ্গের মহিলাটি বসেই আছে, খাতা চাই। বুড়ো মানুষ একজন এসেছে, সার্টের পকেট থেকে কাগজ একটা বের করে কাগজ একটা বের করে চশমাটা নাকের কিছু নিচে নামিয়ে পড়ে দেখছে। নিশ্চয় বই কিনবে। মালতীকে যে খাতাগুলো দিতেই নবীনের অবসর জোটেনি। খবরের কাগজ দেবার ছেলেটা এসে একটা কাগজ বের করে ছুঁড়ে ফেলে গেলো। এই ছেলেটিকে দেখে মালতী রোজ বেশ একটা আমোদ পায়। সাইকেল থেকে নামে না ছেলেটা। উঠে উঠে সামনের বাক্স থেকে কী যে এক কায়দা করে খবরের কাগজ বের করে যেখানে দেবার ঠিক সেখানে দিয়ে যায়, দেখে ভালোই লাগে। ও রোজ ভাবে এই মোড়ানো কাগজ দোকানে এসে পড়বে না, আবর্জনার স্তূপে এসে পড়বে বা ষাঁড় কিম্বা গরুর গায়ে পড়বে। না, ঠিক দোকানের গদিতে গিয়েই পড়ে। নবীন কাগজখানা মেলে ধরেছে। মণি প্রায়ই মাকে বলে খবরের কাগজ এনে দিতে। কোন সাহসেই বা মাসের বাঁধা খরচ আরেকটা গলায় ঝুলিয়ে নেয়? বাজারটা চলতে থাকলে তাও যেমন তেমন। যা দিন কাল পড়েছে। কোনদিন কী হবে কেউ জানে না। কখনো বা পুরোনো কাগজ দুই একটা পেলে সে মণির জন্যে নিয়ে যায়। বড় আগ্রহে সে কাগজগুলো পড়ে। এবারে একটা খবরের কাগজ মণির জন্যে রাখতেই হবে।
    নবীন কাগজটা মেলে ধরল। প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় বড় অক্ষরে চা বাগানের কোনও একজন পাল উপাধির কাউকে হত্যার সংবাদ। চা বাগানের ক্লাবে গুলি চালনার, গুলিতে জৈন বলে কারুবার মৃত্যু। মালতীর বুকে ছ্যাঁত করে উঠল। মিনতির বলা কথাগুলো মনে পড়ল। তাহলে টাকার জন্যেই এরা মানুষ মারছে।
    নবীনের গ্রাহক ক’জন চলে গেছে। ওকে খাতা দু’খানা বেঁধে দিল। তোড়াটা নিয়ে সে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়ালো।
    “যাই রে!”
    “যাচ্ছো মামী?”
    “ খবরের কাগজগুলোতে দেখি মানুষ মরারই কথা শুধু।”
    “ বুজলে মামী, এবারে এরা বাজে জায়গাতে হাত দিয়েছে।” কথা বলতে বলতে আপনি টাপনি বাদ দেয়াতে নবীনকে ওর বেশ আপন আপন মনে হতে শুরু করল। এই মানুষটাকে যেন সব বলা যায়, সব জিজ্ঞেস করা যায়।
    “কিছু হবে কি?” ভেদা লোক একটা ওর আশে পাশে ভোৎকা গন্ধ নিয়ে ঘোরা ঘুরি করতে শুরু করল, মানুষটা তেড়ে এলো, “মলি মা, মাথা নেই , চোখ নেই...।”
    “হবে মামী, কিন্তু এগুলো উপরে উপরে পালটে যাবে। আমাদের বেশি দিগদারি দেবে না।
    নবীন হাসছে। “আমাদের আর কী? বাজারটা শুধু বসলেই হলো...”
    “ঠিকই, বাজারটা বসতে থাকলেই আমাদের ভালো, না বসলেই বাজে...”
    সে খাতার টোপলাটা মুড়ির টিনে ঢুকিয়ে নিলো। তারপর হনহন করে পা চালালো।
    আজ আবহাওয়াটা পরিষ্কার বলে মনে হয় দূরের পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। সবচে’ উঁচু পাহাড়টার সাদা চূড়াটাই শুধু দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়টা দেখতে দেখতে সে হাঁটছিল। খুব একটা তাড়া নেই। আজ আগেভাগেই বাজার আঁটাতে পেরেছে। ওর মনটা হাল্কা লাগছিল। আশ্চর্য, এই হালকা মনটাতে আর কেউ এসে ঢোকতে পারে নি। সামান্য আগে দেখা হলো , সেই নবীন, বাজারের এতোসব মানুষ, মণি, মিনতি, জোনের মা , কালী বুড়ি—কেউ না। এমন কি সেগুন পাতার মতো চ্যাপ্টা হাতের মানুষটাও না। ওর মন জুড়ে শুধু এক সারি নীল পাহাড় উঁচু নিচু।
  
        
পাহাড়গুলোতে মনে হয় ধানের খেত আছে, মানুষে ভরা গ্রাম শহর আছে। বন জঙ্গল আছে। সেই জঙ্গলগুলোতে থাকে কি মিনতির রাজকুমার? আর সেই ছেলেগুলো? কই থাকে এরা? এই পাহাড় থেকেই তো নেমে আসে। রিজার্ভের ভেতর দিয়ে এসে মিনতির ঘরে ঢোকে, জোঁকে খেয়ে শরীর বসন্তের গুটির মতো ফুলিয়ে দেয়, রক্ত পায়খানা হয়, জ্বরে বেহুশ পড়ে থাকে। ভালো ঘরের ভালো জিনিস খেয়ে বড় সব ছেলেরা, বড় বড় চাকরি করে থাকতে পারত যেসব ছেলেরা ওই পাহাড় পেরিয়ে ওরা অন্য পাহাড়ে যায়। সেখানে বিদেশি পার্টিটি ওদের বন্দুক-বোমা চালানো শেখায়। সেই পার্টিটির সঙ্গে সেখানে তাদের কাজিয়া ঝগড়া হয়। অনেক টাকা চেয়ে বসে, খড়্গ দাবি করে আর বেআইনি জিনিস এপার ওপার করতে দেয়। ঐ পাহাড়টার কোনদিক দিয়ে যে এরা নেমে আসে, ঐ নিচু পাহাড়টা দিয়েই কি চোখা উঁচু ঐ পাহাড়ের মাথাতে উঠে? না লম্বাটেটা দিয়ে চড়ে ঐ গোল চূড়াটা দিয়ে নেমে আসে? ওরা খবরের কাগজে যাদের কথা লেখে তাদের মারে । আবার ফিরে চলে যায়।
    বেলা পড়ে আসছে। চোখা চূড়ার পাহাড়টাতে রোদ পড়েছে। নিচেরটাতে কালো ছায়া। লম্বা সারিটিতে আলো আছে। আলোর রং বদল হচ্ছে। সাদার থেকে হলদেটে হচ্ছে। ছায়া পড়েছে যেগুলোতে সেগুলো আরো কালো হচ্ছে। ঠিক কালো নয়, এক পশলা বৃষ্টি আসার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ যেমন রং ধরে, কাজলা বললেও চলে।
    পাহাড়টা দেখতে দেখতে সে এগুতেই থাকল। খানিক দূরে গিয়ে ওর হঠাৎ খেয়াল হলো , কখন রিজার্ভ পেরোলো, কখন বস্তিতে ঢুকবার রাস্তা পেরোলো সে টেরই পায় নি। তাকে পাহাড় ডাক পাঠিয়েছিল। পাহাড় সত্যি মানুষকে ডাকে? ওদের ডেকেছে। বুলেনদেরকে ডেকেছে।
    আজ তাকেও পাহাড়ে ডেকেছে। অদ্ভুত এক ভয়ে সে শিউরে উঠল। সে চোখ ফেরালো আর যত জোরে পারে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে বাসাতে গিয়ে পৌঁছুতেই হবে।


    টীকাঃ
    ১) তামোলঃ সুপারি। কিন্তু অসমিয়া তামোল যেহেতু বাংলাতে পরিচিত শুকনো বা নিতান্ত কাঁচা সুপারি নয়, বিশেষ করে পচিয়ে ভিজিয়ে তৈরি সুপারি শব্দটি তাই মূলেই রেখে দেয়া গেল।
     সৌজন্যঃ শেষ দুই ছবিঃhttp://www.watercoloursubhajit.blogspot.in

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India