ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন



  (আগস্ট, ২০১খ্যা মাসিক সাময়িক ব্যতিক্রমে বেরুলো এই অধ্যায়)  



ফেলানি


             কালী বুড়ি পুজোর আয়োজন করেছে। প্রত্যেক বছর করে আসা এই পুজো মাঝে করতে না পেরে বুড়ি আধপাগলী হয়ে পড়েছিল। পাই পাই করে পয়সা গুটিয়েছে বুড়ি। বস্তির মানুষও উৎসাহী হয়ে পড়ল। জগুরা বিকেল হতে না হতেও কাম কাজ সেরে কালী পুজোর জন্যে সাহায্য চেয়ে ঘুরছে। জগু মহাদেব সাজে, গায়ে ভস্ম মেখে হাতে ডম্বরু নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করে ফেরে। সে একটা জটা জোগাড় করেছে, আর একটা বাঘের ছালের মতো ছাপ মারা লুঙ্গি। লুঙ্গিটা অল্প ছিঁড়েছে। সে সেটি সামলে সুমলে রেখে দেয় মহাদেবের নাচ নাচবে বলে। আজ দুবছরের মাথাতে লুঙ্গিটা বের করেছে। ফাটা জায়গাটা ওর বেমারি বৌ ঝুঁকে ঝুঁকে সেলাই করে দিয়েছে। গায়ে ছাই মেখে, মাথায় জটা পরে, বাঘছালের লুঙ্গি পরে মহাদেব হয়ে বরের এই বেরিয়ে যাওয়াটা দেখে সে বড় আনন্দ পেয়েছে। মানুষটার সব গালি-গালাজ ভুলে গেছে, ভুলে গেছে তাকে বলা সমস্ত কটু কথাগুলো, তার সমস্ত দোষ। বাড়ি থেকে বেরোবোর আগে সে বউর সামনে ডম্বরুটা বাজিয়ে সামান্য নেচে গেল। বরের মুখে বহুদিন পরে সে হাসি দেখতে পেল।
কালী হয়েছে বুড়ি নিজেই। পেট্রমাক্সসহ দরকারি জিনিসগুলো বুড়ির আছেই। বস্তির ভেতরে ঘুরছে, বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে, দোয়ার-মুখে দাঁড়াচ্ছে। তারপরে ঢাক বাজে, কাঁসি বাজে, তালে তালে নাচে মহাদেব। তারপরে কালী মাটিতে, উপরে মহাদেবের পা। বাড়ি বাড়িতে  গৃহস্থ লোকে যা পারে দিচ্ছে, চাল , ডাল, আলু-বেগুন-লাউ, টাকা-পয়সা। টাকা-পয়সা কম , চাল-ডাল-সবজিই বেশি।
        মালতী দেখছিল। পাতলা শরীরটা টেনে টেনে কালী বুড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘুম নেই, খাওয়া নেই। সে সব দেখছে। একটা কালী পুজো করতে গিয়ে এতো আয়োজন করতে হয়! প্রসাদের জন্যে বুট-মুগ-কলা-নারকেল, ভোগের জন্যে চাল-ডাল-তেল। এগুলো না হয় লাগেই। কিন্তু এই যে পাঁচ রকমের গুড়ি দরকার পড়ে, পাঁচ রঙের গুড়ি, সাদা রঙের তন্তুল চূর্ণ , লাল লাল কুসুম ফুল চূর্ণ, পীত বর্ণের হরিদ্রা-চূর্ণ, শ্যাম বর্ণ, কৃষ্ণ বর্ণ। বুড়ির মুখে সে এসবের কথা শুনেছে। যেখানে পারে সেখান থেকে বুড়ি এগুলো গুটিয়েছে। পাঁচ রকমের শস্য সে বাজার থেকে জোগাড় করে বুড়িকে দিয়েছে। ধান, যব, সাদা সর্ষে, তিল, মুগ। মণি জোগাড় করে দিয়েছে পাঁচ রকম গাছের পাতাআম, বট, পাকরি বকুল, জরি নবীন যোগাড় করে দিল পাঁচ রকমের গাছের ছাল জাম, শিমুল, বকুল, কুল, বেল। জোগাড় দেখে দেখে ও অবাক না হয়ে পারে নি। বুড়ির প্রচুর কষ্ট হচ্ছে, সত্যি যেন ওর শরীরে মা কালী ভর করেছে। সামান্য হাঁটলেই যে হাঁপিয়ে উঠে সেই বুড়ি যে কোত্থেকে এতো শক্তি পেয়েছে। ভেবে ভেবে সে কিনারা করতে পারে না। সে একটা কাজ সামলে নিয়েছে। ভোরে উঠেই ডেকে এনে নিজেদের সঙ্গে বুড়িকেও ভাত এক মুঠো খাইয়ে দিয়েছে। না খেয়ে না খেয়ে বুড়ির পেট শুকিয়ে গেছে। বাচ্চা একটাও এর থেকে বেশি ভাত খায়
      
  কালী পূজার আর মাত্র একটা দিন বাকি। সেদিনই শহর জুড়ে আরম্ভ হলো এক বিশাল মিছিল। অসমকে দুভাগ করবার দাবি নিজে হাজার হাজার দখনা আর আরনাইতে শহর ভরে গেল। হাইস্কুলের ফিল্ডে বিশাল সভা হলো। এতো বড় মিছিল, এতো এতো মানুষ, এতো বড়ো মিটিং শহরের মানুষ আর দেখে নি। একটা বাজারবার মারা গেলো। সে অবশ্যি মুড়ি ভাজে নি। বুড়ির পুজোর কাজে লেগেছিল। বেশি কিছু লোকসান হয় নি। মণির মোড়াগুলোও পুরো হয় নি।
          রাতে পুজো আরম্ভ হলো। বুড়ি নিজেই খিচুড়ি রাঁধতে বসল। মুগ ডাল ভেজে তাতে সবজি দিয়ে কাঁচা লংকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে বুড়ি বড় গামলাতে তিন গামলা খিচুড়ি রাঁধল।মালতী, মিনতি, জোনের মায়েরা কাটাকুটি বাছাবাছি করে যোগাড় যন্ত্র করে দিল। মাঝ রাতে বুড়ির গায়ে মা ভর করল। কালী মায়ের সামনে বুড়ি দাঁতে তিনটা কবুতরের মাথা ছিঁড়ে রক্ত দিল। সবাই বুড়িকে প্রণাম করল। মালতী বুড়ির এই মূর্তি কোনোদিনই তাকিয়ে দেখতে পারে নি। আজও পারে নি। সে ঘরের দাওয়াতে বসে পড়ল। হুলস্থূল শুনে গিয়ে দেখল কালীর পায়ের নিচে বুড়ি পড়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে ভোগ বিলোনো শুরু হয়েছে। বুড়ি সেই উপুড় হয়ে কালীর পায়ে পড়েই রয়েছে। সবসময়েই ভর করলে বুড়ি এরকম কালী মায়ের সামনে পড়ে থাকে। অল্প পরে উঠে বসে। ভোগ নিয়ে চতুর্দিকে হৈ হল্লা শুরু হয়েছে। গামলার খিচুড়ি প্রায় শেষের পথে। হঠাৎ মালতীর মনে হলো বুড়ি আজ একটু বেশি সময় ধরেই কালী মূর্তির সামনে পড়ে আছে। সেই অন্যসময় এই ভর নামলে আধমরা বুড়িকে নিয়ে মুখে জল ছিটিয়ে হাত মুখ ধুয়ে জল এক গ্লাস, মুখের সামনে তুলে ধরে খাইয়ে দেয়। এক টুকরো ব্রেড বা এক মুঠো মুড়ি দিয়ে এক কাপ চাও খাইয়ে দেয়। সে কাছে এগিয়ে গেল। গায়ে হাত দিয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল। বুড়ি নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। সবাই বুড়িকে প্রণাম করললোকগুলোর কাছে সেসময় বুড়ি আর কালী মা-র মূর্তি অদ্ভুতভাবে একাকার হয়ে পড়ল। বুড়ির নিস্তেজ শরীরটা একবার ছুঁয়ে দেখবার জন্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। মানুষগুলো অস্থির হয়ে পড়েছে। জোনের মা ওর শ্বাসের রোগী বরকে টেনে নিয়ে এলো গিয়ে। বরের হাত বুড়ির শবে ছুঁইয়ে কেঁদে ফেলল। জগু দুই হাতে তুলে কোলে করে নিয়ে এলো ওর বৌকে। চতুর্দিকে একটা পচা পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। পুঁজে-রক্তে ভরা শরীরটা বুড়ির পুরো শরীর ঢেকে ফেলে দিল। কেউ একজন খ্যাঁচিয়ে উঠল, “ এই পচা মহিলাটিকে সরিয়ে নে!” ফুল এলো বুড়ো দর্জিকে নিয়ে। বুড়ো দর্জি মাটিতে শুয়ে পড়ল। নইলে যে ওর বাঁকা শরীরে বুড়িকে ছুঁতে পারছে না। দলে দলে লোক এসে বুড়ির শরীর ছুঁলো, প্রণাম করল। কেউবা মালতীকে ঠেলা দিল, “যা প্রণাম করগে, সকাল হলেই তো জ্বালিয়ে দেবে।
         সে বিমূঢ় হয়ে কলতলাতে বসে বুড়ির শরীর নিয়ে মানুষের এই টানাটানি , কাড়াকাড়ি দেখতে থাকল।
        “মামী!” সে ফিরে তাকালো, নবীন।
         “মামী!” ওর গলার স্বর ভয়ে চাপা।
        “কী হলো?” তার নিজের স্বরই যেন অচেনা ঠেকল।
         “একটা বাজে খবর আছে।
         “বাজে খবর?”
          “বলেছিলাম না, ওরা বাজে জায়গাতে হাত দিয়েছে।
          “ কারা?”
        নবীন নীরব।
       “ আজ রাতে সরকার পড়ে গেছে।
        সে নবীনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, এ কোন সময়ে লোকটা কী কথা বলে?
       “কালী বুড়ির...” সে কালীবুড়ির এভাবে মরাটা, মানুষগুলোর এভাবে অস্থির চেহারা...এসব কিছু একটা বলতে চাইছিল। থেমে গেল। আসলে সে কী বলতে চাইছে নিজেই বলতে পারে না।
        “মিলিটারি নেমেছে দলে দলে। এখানে এই মানুষগুলোকে এভাবে পেলে ওরা...
       নবীনও থেমে গেল। সেও কী বলতে চাইছে ঠিক করতে পারল না।
        “কালী বুড়িকে দাহ করবে...
        মালতীও কী বলতে যেয়ে কী বলছে। আসলে সে মানুষের ভিড় থেকে বুড়িকে বের করে আনতে চাইছে। নীল হয়ে পড়া ঠোঁটের মেয়েমানুষটি যেন এখনি ওকে বলবে, “ মণির মা, এক কাপ লাল চা, নুন দিবি।যতই অসুখ করুক না কেন বুড়ির স্বর বসে যায় না, টনটনে থাকে।
        সকালের দিকে মানুষগুলো শান্ত হলো। বাঁশ-কাঠ জোগাড় করে বুড়ির হালকা শরীরটা চার কাঁধে তুলতে যেতেই কেউ এক মহিলা কেঁদে উঠল। তারপরেই শুধু সবার মনে পড়ল বুড়ি একজন মানুষ ছিল। কত না সাহায্য করেছিল সবাইকে। কান্নাকাটির মধ্যে বুড়ি চিতাতে উঠল।
       বুড়িকে নদী পাড়ে নিয়ে যাবার জন্যে বেরিয়ে সবাই বেশ অবাক হলো, পুরো জায়গাটা মিলিটারিতে গিজগিজ করছে। রিজার্ভের ভেতর দিয়ে সরু রাস্তাটা দিয়ে গেলে নদীর পাড়ে মুখে আগুন দেবার জায়গাতে তাড়াতাড়ি পৌঁছুনো যায়। নইলে রাস্তা দিয়ে গেলে বড়ো রকমের একটা পাক দিতে হয়। বুড়ির মৃতদেহ নিয়ে রিজার্ভে ঢুকতে গিয়ে লোকগুলো থেমে গেল। মিলিটারিই মিলিটারি। শাল, সেগুন, গামারি, বনচোম গাছের সারিগুলোর মাঝে মাঝে আকাশীলতা যেমন ছেয়ে আছে, তেমনি ছেয়ে আছে জলপাই রং। শবদেহ নামিয়ে রাখল তারা। নবীন এগিয়ে গেল। যতটা পারে সহজে বোঝাবার চেষ্টা করল, এই সরু রাস্তা দিয়েই বস্তির মানুষ শবদেহ পোড়াতে নিয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে ঘুরে গেলে...না, ওরা বুঝবে না। কীই আর করা , তারা রাস্তা দিয়ে ঘোরানো পথে বুড়িকে নিয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল এখনকার কথাই অন্য হবে।
      বেশ কদিন হলো লোকজনের আনাগোনা বন্ধ হয়েছে। মালতী লক্ষ্য করেছে, এই বস্তির মানুষের অসুখ হোক, কেউ করুকএকদিন বা দুদিনই, তার বেশি সময় দিতে পারে না কেউ। কারো ঘরেই দুদিনের বেশি চাল মজুত থাকে না। কথাগুলো তাই ভুলে তাড়াতাড়ি। দুঃখ, ক্রোধ, বিবাদ কিম্বা মৃত্যু---সবাই বড় কম সময়েই ভুলে যায়। ভাতের গ্রাসের পেছনে ছোটা মানুষের মাথাতে কিছুই বেশিদিন থাকে না। কালী বুড়ির মরার কথাও লোকে ভুলে গেল। ভুলে গেল সেই রাতে বুড়িকে দেবী বানাবার কথা। নিজের নিজের অসুখী মানুষজনকে বুড়ির সামান্য স্পর্শ দেবার কথা। সেই স্পর্শ পেয়ে কে ভাল হলো, কে হলো না সেসব খেয়ালও রইল না। তাদের নতুন এক বিপদ হয়েছে। চতুর্দিকে ছড়িয়ে গিজগিজ করছে মিলিটারি।
   
        সেদিন রিজার্ভে ঢেঁকি শাক তুলতে গেছিল জগুর ছেলে। সঙ্গে আরো কয়েকটি ছেলে ছিল। ওদের ধরে মিলিটারি আচ্ছা মার দিল। রিজার্ভের দিকে না গিয়ে বস্তির মানুষের চলে কী করে? লাকড়ি কোথায় পায়? বাজারে বিক্রি করবার ঢেঁকি, ভাদালি পাতার মুঠো পায় কোথায়? শাক-পাতা নাহয় তুললই না, লাকড়ি কোথায় পায়? রিজার্ভের বড় বড় গাছের ভাঙা ডাল-পালাতেই তো ওদের চুলো জ্বলে। এই লোকগুলো আরশোলার মতো কিছুতেই হার মানে না, কিছু না কিছু রাস্তা একটা বের করেই নেয়। বেঁচে থাকে। মিনতির বাড়ি থেকে সামান্য দূরে গেলে একটা শিশু গাছ আছে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড ডাল-পালাতে গাছগুলো চিরল চিরল পাতাতে ভরে আছে। তারই একটা আগে থেকে মরে যাচ্ছিল, তারই একটার গুড়িতে হিং দিয়ে কেউ মেরে ফেলল। একদিন কেটে ফেলেও দিল। তারপরে সেই আরশোলার মতো বস্তির মানুষগুলো গিয়ে গাছটাকে ঘিরে ফেলল। এতো বড় গাছ, সবারই হয়ে গেলএকবেলা রেঁধে খাওয়া মানুষগুলোর আর কতটা বা লাকড়ি দরকার পড়ে? যার লাগে সেই একটা কোপ মেরে কেটে নিয়ে যায়। মণিও গিয়ে শিশু গাছের ডাল-পালা এনে চুলোর কাছে স্তূপাকৃতি করে রাখল।

      কালীবুড়ির ঘরটা সে দিন কয় বাইরের থেকে তালা দিয়ে রাখল। বুড়ির বাড়িটা আজ বহুদিন ধরে বস্তিরই কালী মন্দির হয়ে ছিল। এখনো তাই রইল। বুড়ির কালী মূর্তির সামনে আগের মতোই লোকে প্রণাম করে। কেউ মালতীকে জিজ্ঞেসও করল না, বুড়ির বাড়িতে সে ভাড়াটে হয়েই আছে। বাড়িটি তো তার নয়। কারোরই জমিজমার কাগজ পত্র নেই। কালী বুড়িরও ছিল না। টের না পেতেই বুড়ির কালী ঠাকুর, ঘর দোয়ারের দায়িত্ব ওর ঘাড়ে এসে পড়ল। ওর নতুন কাজ একটা হলো। দেবীর সামনের জায়গাটা লেপে রাখতে হয়, প্রদীপ জ্বালতে হয়, লোকের দেয়া টাকা-পয়সা তুলে সামলে রাখতে হয়। সেই সব খুচরো পয়সাতেই সে প্রদীপ জ্বালবার কাজগুলো করে।
             এক রাতে বুড়ির ঘরে যেন কিছু একটা খসখসে শব্দ করছে, সে শুনতে পেল। শব্দটা সে পরের পুরো দিনেও শুনতে পেল। ইঁদুর বাসা বেঁধেছে। একদিন সে ঘরের তালা খুলল। ভেতরে সোঁদা গন্ধ। খিড়কি দোয়ার খুলে দিলে গন্ধটা সামান্য কমল। খসখসে শব্দটা বিছানার তলা থেকেই আসছে। সে কুঁজো হয়ে বিছানার তলাটা দেখল। বাক্স-পত্রে ঠাসা। ছ্যাঁত করে পাশ দিয়ে পাত-আলদ সাপ একটা বেরিয়ে গেল। ইঁদুর ধরতে এসেছে। টেনে টেনে বাক্সগুলো বাইরে বের করল সে। তালা নেই যে বাক্সগুলোর সেগুলোতে রাখা হাবি-জাবি কাপড়গুলো ইঁদুরে খেয়ে সব ফালা ফালা করে ফেলেছে। তালা দেয়াটাতে হাত ওর থেমে গেল। চাবি কৈ থাকে সে জানে । বাক্সটি খুলতেই চমকে উঠল, এক দীর্ঘ জটা। কালী বুড়ির এই জটা শুধু সে নয় , পুরো বস্তি চেনে। কালী মা ভর করলেই বুড়ির মাথাতে এই জটা গজিয়ে উঠত। কোত্থেকে বুড়ি জোগাড় করেছিলে এই জটা? এই জটা নিয়েই বুড়ি আরতির থেকে কালী বুড়ি হয়েছিল। নাগা-মরিচের মতো ঝাল নিয়ে জীবনপাত করেছিল, মহাদেবের পায়ে পদাঘাত করে মা কালী হয়ে।
 
      নাকে একটা গন্ধ এসে লাগল। মাছ-ভাত আর কাঠালবিচি পোড়ার গন্ধ, বুড়ি এসে ওর পাশে দাঁড়ালো, হাতে একটা নাগা লংকা। ওর কানে গমগম করে উঠল বুড়ির তেজী গলার স্বর, “মেয়ে মানুষকে এই লংকার মতো হতে হয়। দেখতে ছোট, কিন্তু মুখে দিলে পুড়িয়ে ফেলতে পারে।বুড়ির রোগা পাতলা শরীর থরথর করে কাঁপছে। ক্রন্দনরতা কোমল মুখের এক রমণীকে সে চড়া গলাতে ভর্ৎসনা করছে, “ মেয়ে মানুষের এই কথাটাই আমার খারাপ লাগে ।... কার জন্যে কাঁদছিস?...কোন মরদকে দেখাতে চাইছিস?...তবে হে ভাতার একটা আসবে, শরীর দলাই মলাই করে বলবে, আহা হা বেচারি। তোরা আহ্লাদে আটখানা। দলাই মলাইর পরেই না আসল সুখ। তারপরে পেট।মেয়েটি কাঁদছে , প্রচণ্ড রাগ উঠছে। আরো জোরে চেঁচাচ্ছে বুড়ি, “ পেট যদি লাগে আরো কান্না জোড়...যত আছে, সব এসে পড়বে, তোর শরীরের বাঁধন ভালো, ভালো রকমই দলাই মলাই করতে পারবে।মেয়েটির আরো বেশি করে রাগ চড়েছে।
জটাতে হাত রেখে সে কেঁদে ফেলল, “ না না, আমি আর কাঁদিনি। আমি মরিনি, নাগা লংকা না হই, আমার শরীরেও ঝাল হয়েছে।
অনেকক্ষণ সে জটা ছুঁয়ে বসে রইল। বাইরে কারো পায়ের শব্দ শোনে বাক্সটা বন্ধ করে দিল। কেউ আসে নি। কালীর বেদীতে প্রণাম করে চলে গেছে। সে বাক্সটিতে আবার তালা দিয়ে রাখল। আবার ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে ঘরটি পরিষ্কার করে রাখল। বুড়ির যা কিছু টুকটাক সম্পত্তি ছিল ইঁদুরে খাওয়া কাপড় গুলো গেলে বাক্স একটা খালি করে তাতে ভরিয়ে রেখে স্নান করতে চলে গেল।
স্নান সেরে কালী মায়ের বেদীতে প্রদীপ জ্বালতে গিয়ে ওর চোখে পড়ল চার-পাঁচটা মিলিটারি ড্রাইভারণীর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আর্মিরা এই সময় থেকেই ড্রাইভারণীর বাড়িতে আসা-যাওয়া শুরু করে। বস্তির মানুষ ড্রাইভারণীকে আজকাল বড্ড ভয় করে। কথায় কথায় আর্মির ভয় দেখায়। প্রদীপ জ্বালিয়ে রোজকার মতো তার কালী বুড়ির মুখখানা মনে পড়ল।


টীকাঃ
. তন্তুল চূর্ণ: তুঁত বীজের চূর্ণ হলেও হতে পারে। নিশ্চিত নই।
. কুসুমঃ কুসুম শব্দের অর্থ ফুল। এখানে জবা অর্থে ব্যবহৃত বলে মনে হচ্ছে।
. পাকরিঃ বট জাতীয় গাছ।
.জরিঃ আসলে পাকরিই প্রতিশব্দ। কাণ্ড থেকে শেকড় মাটির দিকে ঝুলে পড়ে বলে এই নাম। চন্দ্রকান্ত অভিধান লিখছে, “পাকৰী [সং. পৰ্কটী] বি. জৰি-গছ।
. দখনাঃ বড়ো মেয়েদের পোশাক
. আরনাইঃ অসমিয়া ফুলাম গামোছার মতো বডো গামোছা। অনুষ্ঠানাদিতে গলাতে পরা হয়। কিম্বা পরিয়ে কাউকে সম্মান জানানো হয়।
.বনচোমঃ উঁচু আরণ্যক গাছ, আসবাবের জন্যে ভালো বলে বিবেচিত হয়।
. আকাশী লতাঃ স্বর্ণলতা জাতীয় এক রকম পরজীবি তৃণ। এর ইংরেজি নাম Dodderকিম্বা Cuscuta,
. পাতা-আলদঃ মূলে আছে অসমিয়া কারশলা সাপ। একে  কার্শলাও বলে তেমনি, বাংলাতে লতার মতো দেখতে বলে পাতালতসাপও বলে। ইংরেজিতে একে বলে Painted Bronzebackবৈজ্ঞানিক নাম Dendrelaphis pictus

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India