ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন



ফেলানি


    ন্ধ খুলেছে। বাজারগুলোও খুলেছে। দূরে যারা গিয়েছিল তারাও ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে এলো। আগের মতোই সব যেন ঠিকঠাক চলছে আবার ।
    শুধু আলাদা শোনাতে শুরু করল মীরার মায়ের কথা। মীরার বাবা রাজমিস্ত্রি। বস্তিতে কমল মিস্ত্রি বলেই জানে সবাই। কখনো বা সামান্য নেশা করে। সময় থাকলে টুকটাক জুয়াও খেলে। মানুষটা খারাপ বলে কেউ বলে না। বন্ধে সেও শহরে, মানে গুয়াহাটি গিয়েছিল। সেখানে কোনও ঠিকাদারের তলায় রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়েছিল। এই শহরে মেলা রাজমিস্ত্রির সম্মান সে ঠিকাদারের তলাতে পায় নি, ছেনি চালাতেও পায় নি। আসলে যোগালিই ছিল। তবু এই শহরে ছেনি চালিয়ে যে টাকা পায় গুয়াহাটিতে ঠিকাদারের তলাতে যোগালির কাজ করে এর থেকে বেশি টাকা রোজগার করল। শুরু শুরুতে সব ঠিকই ছিল। তারপরে সব উল্টোপাল্টা হতে শুরু করল।
    কমল মিস্ত্রি গুয়াহাটিতে ছিল সঙ্গের আরো পাঁচজন মিস্ত্রির সঙ্গে একটাই বাড়িতে কোঠা ভাড়া করে। এক সারি লম্বা ঘর, ছোট ছোট পায়রার খোপের মতো কোঠা, এক চাটাইর বেড়াতে স্নানের ঘর, দু’টো গর্ত পায়খানা, এক দল মানুষ। এক একটা কোঠাতে পাঁচ-ছ’জন মানুষ। কমল মিস্ত্রিদের চারটা কোঠা পার করে বীণা, ভারতী, আঁউসী, কৃষ্ণা, রানিরা থাকে। আঁউসীর গায়ের রং আঁউসী, মানে অমানিশার রাতের মতোই অন্ধকার। আন্ধার-বিন্ধার মুখের হাসিটা অমাবস্যার রাতের তারার মতোই উজ্জ্বল। চোখজোড়াও জ্বল জ্বল করতে থাকে। ভরপুর শরীর । ওরা সবাই লোকের বাড়িতে কাজ করে। অনেক বাড়িতেই কাজ করে। সেই সকালে বেরোয় আর রাতে ঘরে ফেরে। বীণা আর রানির বিয়ে হয়েছে। স্বামীরা খাওয়াতে পারে না, তাদের বাড়িতে রেখে নিজেরা কাজে বেরিয়েছে। কৃষ্ণা আর ভারতীর বিয়ে হয় নি। আঁউসীকে স্বামী ছেড়ে দিয়েছে। এই আঁউসী আর কমল মিস্ত্রিতে কিছু একটা হয়েছে। দু’জনে একটা ঘর নিয়ে থাকতে শুরু করেছে।
    খবরগুলো ঠিকঠাক এসে মীরার মায়ের কানে পড়ল । সে লোকটাকে ডাক পাঠালো, পাঠাতেই থাকল। খবর পাঠাতে থাকল। কিন্তু ওদিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই। সে নিজেই একবার মেয়েকে নিয়ে বেরুলো। অবশ্যি হাবাগোবা মীরার মায়ের সাহস হলো ঐ বস্তির রানির জন্যে। রানি রাত্রে নিয়ে গিয়ে তাকে কমল মিস্ত্রির ঘরে ঢুকিয়ে দিল। সবাই একবার একবার এসে ওকে দেখে গেল। কোঠা জুড়ে পাতানো একটাই বিছানাতে সে মাথা নুইয়ে বসে রইল। মিস্ত্রি তাদের হোটেল থেকে এনে জিলিপি, সিঙ্গারা খাওয়ালো। সন্ধেবেলা আঁউসী এলে ভাত রান্না করল, মাংস রান্না করল। সে একটুকরো জায়গা জুড়ে একই ভঙ্গিতে বসে বসে সব দেখে গেল। মেয়েকে রানি নিয়ে গেছে। রাতে আঁউসী, সবাই ওকে ডাকে ‘আঁউচি’ বলে, আঁউচি ওকে ভাত দিয়ে মশারি টানিয়ে শুতে দিল, “এখানে বড্ড মশা।” সে কিচ্ছু বলল না। রাতে কমল মিস্ত্রি এলো। সে উঁকি দিয়ে দেখল মীরার মা শুয়েছে কি না। কোঠার একমাত্র লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে ওরা মাংস আর মিস্ত্রির আনা মদের বোতল খুলে গ্লাসে নিয়ে খেলো। ভাঙ্গা-ছেঁড়া বেড়ার ফাঁক দিয়ে মায়াবী মহানগরের ঝিলমিল আলোর টুকরো ভেতরে আসছিল। এতো আর সেই ছোট শহর নয়, যেখানে ফুল যদি বেশি করে হেসে কারো সঙ্গে কথা বলল তো গোটা বস্তি জেনে যায়; মিনতি যদি গায়ে একখানা নতুন কাপড় তুলে তবে সবাই জিজ্ঞেস করে, ‘কই এতো কাপড় পায়?’; নবীন যদি কাউকে ডাক একটা দিল, তবে পরের দিন কথা উঠে ‘ সে ওকে বিয়ে করবে কি?’; এখানে বাড়িতে ছেলে-বৌ রেখে এসে পুরুষ আরেকজন বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে একই ঘরে থাকতে পারে। ঘোরাঘুরি করতে পারে, কেউ চোখ তুলেও দেখে না। সেই মায়াবী শহরের চারদিকে ছড়ানো হীরে-মুক্তোর মতো লাইটের আলো এই মানুষ দু’টোর গায়ে পড়েছে। দু’জনে বিছানাতে উঠেছে। একাৎ ওকাৎ না করে মীরার মা বেড়ার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে, সে শ্বাস ছাড়তেও ভয় পাচ্ছে। “ বুর্বক বেটিটা শুয়ে পড়েছে” আঁউসীর নেশা ধরা গলা। তের চৌদ্দ বছর ধরে শোনা মানুষটা শ্বাসের শব্দ শুনতে পেলো মীরার মা। অনেক দিনের চেনা শব্দ। কখন শ্বাসগুলো ছোট ছোট হয়, খন বেশ দ্রুত বয় মীরার মা বহু বছর ধরে জানে। ছোট ছোট, দ্রুত শ্বাস ওর কানে পড়ছে এসে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল ওর চেনা মানুষটির বুকের মধ্যে একটা ডাঁড়াশ সাপ কিলবিল করছে। কুচকুচে কালো। অন্ধকার থেকেও বেশি কালো। মীরার মায়ের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সে কি জানি সেই সময়টুকুতেই জ্ঞানই হারিয়ে ফেলেছিল। তন্দ্রার থেকে সাড়া পেয়ে সে দেখেছিল মানুষটি গুয়াহাটিতে কাজ করতে আসবার আগে তেরো চৌদ্দ বছর ধরে রোজ যেমন আসত তেমনি কুচি মুচি করে গাঢ় ঘুমে মীরার মায়ের কাছে আসছে। এক মুহূর্তের জন্যে চেতন-অবচেতনের মাঝে দোলন্ত তার এতোদিনের অভ্যেসে চেনা শরীরটার দিকে হাত একটা বাড়িয়েই দিচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে পেল মাথার দিকে লাল লাল গোল গোল আঁকা বাঁকা রেখাতে সাজানো একটি কালো আলদ, ওর চেনা মানুষটিকে জড়িয়ে ধরেছে। জ্ঞান ফিরে এলো মীরার মায়ের। চোখে তখন ভেসে উঠল আরেকখানা দুঃখী মুখ, ছোট বোন অনুর। উত্তর বাংলার বাঙালি ছেলে একটিকে বিয়ে করেছিল। দু’টো ছেলে মেয়ে হবার পর থেকে ছেলেটি নিখোঁজ। লোকের বাড়িতে কাজ করে করে বড় কষ্টে চালাচ্ছে সে। লোকে বলে বরটি ভালো, দোষ অনুরই। তাই যদি না হবে , তবে ঘরের বৌ রেখে নতুন মেয়ে মানুষের সঙ্গে যাবে কেন? এখন মীরার মায়ের সম্পর্কেও লোকে একই কথা বলবে, নইলে ঘরের বৌ রেখে অন্য মহিলার সঙ্গে যাবে কেন বর? লোকে আরও একটা কথা যোগ দেবে তাতে, দু’জন দিদি-বোনেরই একই দোষ, পুরুষের সঙ্গে সংসার করতে পারে না। ভোর হতেই মীরার মা চলে এসেছিল।
   
 লম্বা বন্ধটার পরে পরে মীরার মায়ের কথাবার্তা সব আলাদা হয়ে গেল। গুয়াহাটির থেকে এসে সে শহরের এক বাড়িতে কাজ নিলো। ছেলের পড়া ছাড়িয়ে ভুসিমালের একটা দোকানে ঢুকিয়ে দিল। হাবা মুখে সব সময় সামান্য মেলা মুখের ঠোঁট দু’টির থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। আজকাল ওর ঠোঁট দু’খানা সব সময় টান হয়ে লেগে থাকে। ওর পয়সা, ছেলের পয়সাতে ঘরে টিন লাগালো, টিউব কল বসালো। লোকজনকে বলতে শুরু করল , গুয়াহাটি থেকে স্বামী টাকা পাঠাচ্ছে। মীরার মায়ের কথাগুলো সব অন্যরকম হয়ে গেল।
    আলাদা হয়ে গেল জোনের মায়ের কথাও।
    একেবারে অন্য রকম হয়ে গেল জোনের মায়ের বাড়ি। কোনোদিকে তাকানো যায় না, আবর্জনার স্তূপ। ঘর জোড়ে কেঁচোর গর্ত, ছানি পড়ে গেছে, এলো মেলো পড়ে আছে আসবাব পত্র, বাসন বর্তন। নোংরা ঘরেই জোন আগুন জ্বালিয়ে সামান্য ভাত রান্নার চেষ্টা করে। শুরু শুরুতে পারত না, এখন পারে। ছোটটি মাকেও একমুঠো খাইয়ে দেয়।
    আর জোনের মা? মাথাতে এক থোক সিঁদুর, কপালে বিশাল ফোটা একটা দিয়ে দাওয়ায় বসে থাকে। মাঝে মধ্যে হুঙ্কার দেয়,
    “ নিয়ে আয়, কাঁচা দুধ নিয়ে আয়।”
    “এক জোড়া কালো পায়রা আন।”
    “মা আসছে, ওই দেখ মা আসছে।”
    “ মা এসে আমার পেটে ঢুকেছে।”
    শরীর টরীর না ধুয়ে চুল মেলে বসে থাকা মানুষটির স্বাস্থ্য পড়ে যাচ্ছে। চুলে জটা হচ্ছে। চোখ জোড়া লাল হয়ে থাকে। বস্তির থেকেই নয় শুধু দূর দূর থেকে কালী ভর করা মহিলাটিকে দেখতে লোক আসে। লোকজনের নিয়ে আসা জিনিসগুলো সামনে পড়ে থাকে। সে হাত দিয়েও দেখে না। বিকেলে জোন বা ওর ভাই জিনিসগুলো তুলে নিয়ে রাখে। না খেয়ে না খেয়ে মানুষটি রোগা হয়ে যাচ্ছে। চোখে মনে হয় দেখেও না, কেউ গেলে আর আগের মতো চিনতে পায় না।
    বাজার থেকে ফেরার পথে মণির মা জোনের মায়ের বাড়িতে গিয়ে এলো। সঙ্গে মিনতিও গেল। মদমত্ত মানুষটি শুকিয়ে হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েছে। হাড়ের গড়ন বড় বলে এতোটা রোগা এখনো লাগছে না। মাথার জটাগুলো নজরে পড়ে। একটা আসনে বসে আছে, মাথার উপরে একখানা চাঁদোয়া টানানো আছে। সামনে কয়েকটা বাতি জ্বালিয়ে রাখা আছে, একটু আগে জ্বালানো ধূপদান থেকে এখনো ধোঁয়া বেরুচ্ছে। একটা কলাপাতাতে চিনি, সাগু, কলার নৈবেদ্য, আর একটা খাঁচাতে একজোড়া কবুতর।
    মিনতি আর ওকে দেখে সামান্য চোখ তুলে তাকালো জোনের মা। অনবরত হাসিতে ঝিলমিল করে যে চোখ সেটি এখন মরা মাছের মতো ঘোলা। গলাটা সোজা করতে পারছে না। ওদের দিকে সামান্য তাকিয়েই গলাটা বাঁকা করে আমার মাথা ফেলে দিল সেল। বড় চোখ জোড়ার থেকে কালো মণিদু’টো বাঁকা করে একই জায়গায় থেমে গেল। মণির মা আর মিনতি দু’জনেই হা-হুতাশ করতে শুরু করল। মাথাতে তেল, চোখে মুখে জল দিয়েও কিছু হয় না। চোখের মণি স্থির করে গলা বাঁকা করে সেই যে ফেলল , ফেললই।
    মিনতি সামান্য তেল ঝেড়ে আনতে কারো কাছে গেল। বিকেলটা ধীরে ধীরে ভারি হয়ে আসছে। দু’জন কেউ আসছে বাড়িতে। জোন আর ওর ভাই। জোনের মাথাতে এক বোঝা লাকড়ি। ভাইয়ের হাতে একটা পোটলা। দু’জনে এসে মায়ের কাছে দাঁড়ালো। সামনে পড়ে থাকা নৈবেদ্য আর টাকাগুলো তুলে নিলো।
    “ মা কিছু খেয়েছি কি খায়নি?”
    “খায় নি।”
    “তোরা!”
    “এখন খাবো।”
    ছেলে দু’জনে ভেতরে চলে গেল। মালতী প্রায় বেহুঁশ মানুষটিকে জড়িয়ে বসে রইল। চুলে হাত বুলোতে গিয়ে দেখল নোংরা। তেল পানি না পড়ে জট বেঁধেছে। সেই একই জটা? কালী বুড়ি নিজেকে আরতির থেকে কালীবুড়ি করে নিতে যে জটা মাথাতে লাগিয়ে নিয়েছিল, সেটিই কি? কালী ভর করলে বুড়ি পুরো রাত নাচত। পরদিন ঠোট নীল করে পড়ে ছিল। একই রকম কালী এর গায়েও ভর করেছে কি? কালী বুড়ি দু’দিন পড়ে থেকে আবার উঠত, মুড়ি ভাঁজত, কাঁথা সেলাই করত। জোনের মা সেই যে পা দু’টো ফাঁক করে দেখিয়েছিল, সেদিন থেকে এক ফোঁটা জলও মুখে দেয় নি। কালী বুড়ি হয়ে আরতি বেঁচে ছিল। এ যে কালী মাকে পেটে নিয়ে মরতে চাইছে। মানুষটি মালতীর কাঁধে মাথা ফেলে দিল। মদমত্ত মানুষটির ভর সহ্য করা বড় কঠিন হয়ে পড়েছে। মিনতি হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে।
    “কী হলো রে মণির মা?”
    “ এ আর বাঁচবে না।”
    দু’জনে কান্নাকাটি শুরু করল। কেউ কেউ কাছে এগিয়ে এলো। একটা লোক প্রদীপ ধূনা নিয়ে ওর আরতি করতে যাচ্ছিল। মালতী মিনতি দু’জনে জড়বৎ মহিলাটিকে জড়িয়ে ধরল। মণির মা বাতি ধূনাগুলো সরিয়ে নিতে বলল। এই আসবে, লোকগুলো বাড়ি বাড়ি থেকে বেমারি মানুষগুলোকে নিয়ে দলে দলে আসবে। বাসি গু-তে মাছি পড়বার মতো ঘিরে ফেলবে মহিলাটিকে। মালতী জোনের মাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরল।
    “আসবি না, কেউ আসবি না। মরবে এখন, চোখের সামনে মানুষটি মরবে। কিছু একটা কর। বুড়ো ডাক্তারকে ডাক। মিনতি, এই লোকগুলোকে তাড়া।” মণির মা হল্লা লাগিয়ে দিল।ওর হাত পা নাড়ানো চেহারাটা দেখে কেউ বলল, সঙ্গেরটিকে কালী ভর করেছে।
    মিনতি আর সে মিলে জোনের মাকে আড়াল করল। কাছেই মীরার মায়ের বাড়ি। সেও এসে ব্যবস্থা করতে লেগে গেল। বুড়ো ডাক্তার এসে দেখে গেল। বুড়ো ডাক্তার ঠিকই বলেছে, মহিলার অসুখটি মনে। তাকে বোঝাতে হবে কালী বুড়ির কালি ভর করা আর এই কালী ভর করাতে তফাৎ অনেক। একজন জেনে বুঝে বেঁচে ছিল, অন্যজন না জেনে মরতে চলেছে।
    কথাটা মণির মা-ই বলল। আধমরা মানুষটির ঠোঁট খুলে খুলে খাইয়ে এরা বাঁচিয়ে রেখেছে, আর লোকজন আসছে তাদের নিজেদের অসুখ ভালো করতে। অনবরত এরা মানুষটিকে দেখে রাখতে পারে না, নিজের নিজের কাজকর্ম আছে। মীরার মায়ের কাজে যেতে হয়, মিনতি আর মালতীকে যেতে হয় বাজারে। জোনের মা দুই একটা কথা বলতে পারছে। ওর এখন প্রিয় কাজটি হচ্ছে অসুখ ভালো করতে আসা লোকজনের মাথাতে হাত দিয়ে আশীর্বাদ করা। ওর মনে এই ভাবটি দৃঢ় হয়েছে যে সে সত্যি অসুখ ভালো করতে পারে। মীরার মা ওদের বলল, “একে জগুর বৌয়ের ওখানে নিয়ে যাই। পারে যদি সে তাকে ভালো করুক।” মিনতিরাও ভেবে দেখল।
    “জগুর বৌকে ও চিনতে পারবে কি?”
    “ জগুর বৌকে ও আশীর্বাদ করবে তো?”
    “ সেই পচা মহিলাটি আর কি ভালো হবে?”
    “ পচা মানুষটিকে আনবি কী করে?”
    “ বেমারি মানুষটিকেই বা জগুর বাড়িতে নিয়ে যাবি কী করে?”তিনজনেই ভেবে কুল পায় না।
    মীরার মা-ই ঠিক করল। একেই জগুর বাড়ি নিয়ে যাবে। পচা মহিলাটিকে কে গিয়ে আনবে? এ শক্তপোক্ত মহিলা, এদের তিনজনের যত্ন আত্তিতে বেশ একটু ভালোও হয়েছে। যেতে পারবে।
    বাজার বসেনি এমন একটা দিনে তিনজনে মিলে জোনের মাকে জগুর বৌয়ের ওখানে নিয়ে গেল।
    ফাটা কাঁথার স্তূপের ভেতরে জগুর বৌ পড়ে আছে। চোখগুলো ঢুকে গেছে, দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছে। পচা মাছের মতো জরায়ু বেরিয়ে ঝুলে পড়েছে। উৎকট গন্ধ। কাপড়ের দলাতে রক্ত আর পুঁজের দাগ। এক পাশে বোতল একটাতে জল আর একটা খোলা ব্রেড।
    জোনের মা এক দৃষ্টিতে জগুর বৌর দিকে তাকিয়ে রইল।
    “চিনতে পারলি ওকে?” মণির মা জিজ্ঞেস করল। জোনের মা মাথা নাড়ল।
    “পারিস যদি একে ভালো কর।” মণির মায়ের কথা কালী বুড়ির মতো সোজা। জোনের মা জগুর বৌর মাথাতে হাত রেখে আশীর্বাদ করল। তারপরে জোরে পা চালিয়ে বেরিয়ে এলো। দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কাপড়ের দলার থেকে বেরিয়ে এলো জগুর বৌ। ছ্যাঁচড়ে ছ্যাঁচড়ে সে জোনের মায়ের পায়ের দিকে এগিয়ে গেলো। সবার নজরে পড়ল পচা মাছের মতো ঝুলন্ত জরায়ু, মাছি ভনভন করছে। জোনের মায়ের পায়ে ধরে প্রণাম করল সে। হঠাৎ জোনের মা হা হা করে হেসে উঠল।
  
  মণির মা দায়িত্বটা নিলো। সকাল বিকেল জোনের মাকে জগুর বৌ-র ওখানে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে ঔষধ আর ইঞ্জেকশনে এর শরীরে বল হয়েছে, ধরে ধরে না নিলেও চলে।
    মীরার মা, মিনতি আর সে—তিনজনে রাতেই জোনের মাকে জগুর বৌয়ের ওখানে নিয়ে গেল। রাতে মানুষটি মারা গিয়েছিল। ওরা যেতে যেতে শব বের করে ফেলা হয়েছে। ফাটা কাঁথার দলাতে শুয়ে থাকা মানুষটির থেকে এই শবের তফাৎ শুধু একটাই। ফাটা কাঁথার দমে পড়ে থেকে মানুষটি কংকালসার হাত একটা দিয়ে মুখের মাছি তাড়িয়ে যেতো, এখন বাইরে ফেলে রাখা মানুষটির মুখেও মাছি ভন ভন করছে। কংকালসার হাত একটা আর সেগুলো তাড়াবার জন্যে বেরিয়ে আসেনি।
    মিনতিরা জোনের মাকে সেখানেই নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো। মরা শব নিয়ে যাবার জন্যে জোগাড় যন্ত্র হচ্ছে। চাং সাজানো হয়ে গেছে।
    “দেখ জোনের মা, জগুর বৌ মারা গেল।” মণির মা ওর কানে কানে বলল।
    “যা জোনের মা, ওকে মা কালীর আশীর্বাদ দে গিয়ে।”
    “ ওকে বাঁচাতে পারবি কি?”
    “পারিস যদি তোর পেটে ঢোকা মা একে ঠিক করুক।”
    “ তোর গায়ে কালী মা আছে, একে মারবি না।”
    “ ওর অসুখও ভালো কর।”
    “যা, ওকে এখনই নিয়ে যাবে যে!”
    তিনজনে জোনের মাকে ঠেলতে শুরু করল। সে এক পা মাত্র এগিয়েছিল। বেশ ক’জন চেঁচিয়ে উঠল, “রাম নাম সত্য! জয় হরি বোল!” জগুর বৌকে চাঙে তোলা হলো। আবার এক সম্মিলিত চিৎকার, “জয় হরি বোল!, রাম নাম সত্য!...হরি বোল!...” জোনের মা চমকে উঠল। চাঙ নিয়ে মানুষগুলো চলে গেল। অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল জোনের মা। তারপরে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে চলে গেল। কেউ তাকে ধরতে হলো না। ঠিক আগের মতোই সে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছে। “দাঁড়া না, জোনের মা।” বলে মিনতিরা ওর পিছু নিলো। রোজকার মতো সে ফিরে তাকিয়েছে। মীরার মা ওর জটাগুলো কেটে দিয়েছিল, ছোট চুলগুলোর মধ্যি দিয়ে সেই একই হাসি বেরিয়ে আসছে। ঠিক আগের মতোই বলছে, “ভাত খাবি ভালো করে, তবে না পায়ে জোর থাকবে...।”
  
        
জোনের মা ঠিক নিজের বাড়িতে গিয়ে ঢুকল।
    “আয় মিনতি, আয় মালতী, মীরার মা যে আজ আমার বাড়িতে এসেছে। সাদা টিনের ঘর, টিউব কল...” মানুষটি হাসছে। বাড়িতে ঢুকেছে, “ এই জোন, তোর ছোট ভাই কই? পুরোটা বাড়ি এতো নোংরা কেন? জোন, তোর বাবা কই?” কোমরে শাড়ি প্যাঁচিয়ে হাতে ঝাড়ু তুলে নিলো। রোজকার মতো চুলগুলো ভালো করে বাঁধতে গিয়েছিল। পারে নি। ভেতরে গিয়ে বেড়াতে গুঁজে রাখা আয়নাতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মীরার মায়েরা ওর পেছনে পেছনে গিয়ে কাছে দাঁড়ালো। আয়নাটা রেখে ও তাদের দিকে তাকালো।
    “আমার চুলের কী হলো?”
    “আমিই কেটে দিয়েছি।”
    “জট হয়ে গিয়েছিল।”
    “ উকুনে কিলবিল করছিল।”
    “আমার ফোটাটা কেন মুছে দিয়েছো?” জোনের মা আবার আয়নাটা নিয়ে বেড়াতে গুঁজে রাখা সিঁদুরের কৌটা হাতে নিলো।
    “ওটা আমাকে দে।” মীরার মা সিঁদুরের কৌটা খাপ দিয়ে নিয়ে রেখে দিল।
    জোনের মা কিছু সময় ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরেও সিঁদুরের কৌটাটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপরে হাঁটুতে মাথা গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। তিনজনেই ওর পাশে বসে রইল।
    “কাঁদবি না জোনের মা, আমার দিকে দেখ, আমি স্বামী বেঁচে থাকতেই বিধবা।” মীরার মা কাঁদছে।
    “মীরার মা , তুইতো মানুষকে দেখিয়ে হলেও সিঁদুর পরে আছিস, আমি ওর ছেলে বড় করছি...” মিনতি কথা শেষ করতে পারেনি।
    “আমি, আমি মানুষটার শবও দেখতে পেলাম না, কই মরল, কী হলো, কাক শকুনে খেলো কিনা, না শ্রাদ্ধ না একখানা বাতি...” মণির মা-ও কান্নাতে অস্থির হয়ে পড়ল।
    ছেলেমেয়েরা এসে খোঁজা না শুরু করা অব্দি চারজনে অন্ধকার, অপরিচ্ছন্ন ঘরটিতে কাঁদতে থাকল। কখনো বা নীরবে, কখনো বা ফোঁপিয়ে, কখনো বা দাঁত কামড়ে। কাঁদতে কাঁদতে , বলতে পারে না কেউ, জলে যেমন পিঁপড়ের ঝাঁক ভাসে কখনোবা-- সেরকম জড়ো হয়ে পড়ে রইল। অন্ধকারে ওদের ক’জনকে জড়ানো, গোটানো স্তূপাকৃতি অদ্ভুত প্রাণীর মতোই দেখাচ্ছিল।

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India