ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন


ফেলানি
    

ণির মা, ওই মণির মা!”
     মাঝরাতে মিনতির ডাক শুনে মালতী বুঝতে পারল, ছেলেটি বা ওর সঙ্গীগুলো এসেছে।
     “আয়।” সেই একই দৃশ্য। সে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে মুখ কালো ছেলেটি।
    “ভাত খেলি?”
    “হ্যাঁ।”
    ভাত যদি খেয়েছে তবে ছেলেটি নিজেই এসেছে। সে না এলে সে ভাত-টাত না রেঁধে ঘরটা এমনিই ওদের ছেড়ে দিয়ে চলে আসে। সে এলে গরম জলে সেবা আত্তি করে, ভাত খাইয়ে তবে আসে। আজ নিশ্চিত সে এসেছেই।
    “সে এসেছে?”
    “হ্যাঁ।”
    “ও বুঝি জেলে ছিল?”
     “ছিল, ওরা ধরে নিয়ে যাওয়া লোকগুলোকে ছেড়ে দিয়েছে তো।”
    “ছেড়ে দিয়েছে না মেরে ফেলেছে? কয়লা খনিতে কাজ করতে আসা মানুষটাকে এরা মেরে ফেলে নি? ওর স্ত্রী সেই কোন বিদেশ থেকে এসে ঝাড়-জঙ্গলে স্বামীর সন্ধান করে ফিরেছিল।  মানুষ মারে যে তার সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক?”
     “লোকটাকে ওরা মারে নি। লোকটাই বরং এদের মানুষজনকে মেরে চলে যাবার সময় নদীতে পড়ে মারা গেল।”
    “তুই তো ওর কথাই শুনবি।”
    মিনতির মুখখানা উজ্জ্বল। একটা হাসি মুখে ছেয়ে আছে। ওর এই মুখখানা দেখলেই মণির মায়ের শরীর জ্বলে উঠে। কিসের এতো দরদ ওই ভিখিরিটার প্রতি? কী পেয়েছে মিনতি তার থেকে?”
    “মণির মা তোর রাগ উঠেছে। আমি জানি। কিন্তু সে এলে আমার বড় ভালো লাগে। আজ কতদিন পরে এলো ও।”
    মিনতির মুখে আলো।
     “তুই ওকে বিছানাতে উঠিয়েছিস? সত্যি করে বল।”
    মিনতি চুপ করে রইল।
    “সে একা এসেছে না সঙ্গী আছে?”
    “একাই এসেছে। পাহাড় থেকে নেমেই এরা রিজার্ভে এসেছে। সে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এখন চলে যাবে।”
    “ওঠালি কিনা বল , ওকে বিছানাতে?”
    “এই গায়ে সামান্য হাত দিয়েছে, বিছানাতে উঠাই নি।” মিনতি আবার হাসছে।
    “সে এবারে একেবারে এসেছে। সারেন্ডারি হবে।”
    “সে কি তোকে বলেছে যে এবারে তোকে বিয়ে করবে?”
    “বলেছে।” মাথা নত করে জবার দিল মিনতি।
    “আমি তোকে বলে রাখছি তোর সব শেষ হবে। তুই জ্বলে পুড়ে মরবি। এগুলো মরলেও ভালো ছিল। মরে না কেন কোথাও গুলি খেয়ে? মেয়েটির শান্তি হতো।”
    “ওভাবে বলবি না, মণির মা।”
    “বল তুই, তোদের সবার হিংসে। এমন ফিল্মি হিরোর মতো চেহারা, সে তোকে ভালোবাসে, বিয়ে করবে, সবার হিংসা। বল, চুপ করে আছিস কেন? বলে যা, এমন মানুষদের দিকে আমরা চোখ তুলে তাকাতে সাহস করিনা। সে করবে তোকে বিয়ে! বল।”
    মিনতি চুপ করে রইল।
     “সারেন্ডার করলে ও থাকবে কই?”
    “শুরুতে ওর বাড়িতে, পরে নিজের বাড়ি করবে।”
    “নিজে বাড়ি করলে তোকে নিয়ে যাবে, বলেছে? না, বলেনি? বুঝলি মিনতি, তুই জ্বলে মরবি। আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিস তুই।”
     ছেলেকে নিয়ে এলে রোজ যে পাটিতে শোয় সেটি আরেকটু মেলে দিয়ে শুয়ে পড়ল মিনতি । মালতীও ওর পাশে শুয়ে পড়ল।
    “মিনতি, তুই সত্যিই ভাবছিস সারেন্ডার করে এলে ও তোকে বিয়ে করবে?”
    “করবে, মণির মা। সেই আশাতেই জারজ ছেলেকে বুকে বেঁধে নিয়ে এতো কষ্ট করে যাচ্ছি।” মণির মায়ের দিকে মুখ ফিরে বলল, “ ওর মনটা তোর বরের মতো সাদা রে, তোরা ওকে ভুল বুঝিস না।”
     “তোকে পয়সা পাতি দিয়েছে কি?”
    “দিয়েছে।”
    “ কিছু লুকিয়ে রাখতে দিয়েছে? কী এনেছে সঙ্গে?”
    “যা ও এনেছে, সবই জমা দেবে এবারে। অনেক টাকা আছে, সেগুলোও দেবে।”
    “ড্রাইভারণী দেখেছে কি ওকে?”
    “দেখেছে। ওই মহিলা সব জানে। সে জন্যেও ও আমাকে তোষামোদ করে চলে। নইলে কি আর আমি ওখানে থাকতে পারতাম?”
    চাদর পিছলে গিয়ে মিনতির ফর্সা শরীর বেরিয়ে পড়েছে। বেড়ার উপরের যে অংশ লেপা হয় নি সেখান দিয়ে চাঁদের আলো বাঁকা করে এসে ওর গায়ে পড়েছে। স্পষ্ট দেখা গেলো, ঠিক মাঝখানে একটা গোল লাল দাগ। ঘুমোয় নি সে। ছটফট করছে।
     “কী হলো তোর?”
    মিনতি চুপ।
    হঠাৎ কেঁদে ফেলল। নীরবেই। অনেক পরে পরে কান্নার সেই শব্দ দাঁতের কামড় ভেদ করে বেরিয়ে আসছে।
   


        হঠাৎই কালীবুড়িকে মনে পড়ল মালতীর। মিনতিকে কাঁদতে দেখলে বুড়ি কী বলত? সূর্যমুখী লংকার মতো শুকনো বুড়ির চোখে এতো বছরে এক ফোটা জলও দেখে নি সে। কান্নার শব্দ চেপে রাখতে পারে নি মিনতি। মণির মা যেন নিজের পিঠে অনুভব করছিল অশ্বত্থ পাতার মতো হালকা কালীবুড়ির স্পর্শ।
    মিনতির গায়ে হাত রাখল সে, “শুন মনটা এতো তাড়াতাড়ি নরম করবি না। এমন মনে দাঁত নখ বসানো সহজ বুঝলি? কালীবুড়ি আমাকে কী বলত, জানিস? মেয়েমানুষকে মেম লংকার মতো হতে হয়। দেখতে এইটুকুন, চোখমুখে পড়লে আগুন দিতে পারে।”
     মিনতি তাকে জড়িয়ে ধরল, “তুই কি পেরেছিস মণির মা, তোর মনে জ্বালিয়ে দেবার মতো ঝাল এনে গোটাতে?”
    “পেরেছি। না পারলে ছেলেটা আর আমি সেই কবেই শেষ হয়ে যেতাম। শুয়ে থাক, তুইও পারবি। দাঁত নখ পড়লেই মনটা ঝালে ভরে পড়বে।”
    “অমন করে বলবি না, তার দাঁত-নখের কথা বলবি না।”
    ধরাধরি করে দু’জনে সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল।

     হবে কি হবে না করতে করতে এক হাজার ঘণ্টার বন্ধ আরম্ভ হয়ে গেল। বস্তি প্রায় খালি। প্রায় সব পুরুষমানুষ যেসব এলাকাতে বন্ধের প্রভাব পড়েনি সেসব অঞ্চলে চলে গেছে। আগের বারের তিনশ ঘণ্টার বন্ধেও চলে গিয়েছিল। এবারেও মেয়েদের অনেকেও চলে গেছে। যারা আছে তারা ওই আর্মি ক্যাম্পের কাছাকাছি বসা বাজারটিকে খামচে ধরেছে। যে যা পারে সেখানেই বেচাকেনা করছে।
  

   মীরার মা এবার মন দিয়ে মিষ্টি কুমড়ো লাগিয়েছিল। সবাই দেখে সে কুমড়োগুলোর যত্নআত্তি করছে, কখনো বা বিকেলে বোলতার থেকে কলিগুলো বাঁচাবার উপায় করছে, কখনো বা চাং থেকে ঝুলে পড়াগুলোকে বাঁচাতে বাঁশের খাঁচা একটা বানিয়ে দিচ্ছে, কখনো বা হাওয়া-পানি ভালো করে ঢোকবার জন্যে গাছের গুড়িগুলো একটু খুঁচিয়ে দিচ্ছে। বাচ্চা কোলে করবার মতো মাটিতে হওয়া কুমড়োগুলোর তলাতে আলতো করে দিচ্ছে খের নতুবা কলা গাছের বাকল। এখন রোজই সে শুকিয়ে রাখা পাকা মিষ্টিকুমড়ো গুলো চিলতে করে কেটে কেটে ক্যাম্পের কাছের বাজারে বিক্রি করছে, শাকে-ভাতে ওর দিন চলে যাচ্ছে। মণি সিঙের গাড়ির ড্রাইভার হলোই বলতে পারি। গাড়িটা কোথাও যাবার আসবার হলে সেই আনা-নেয়া করে। তার উপরে গ্যারেজে পুরো মাইনেতে খাটা লোকের মতোই কাজ করে। মা বসে বসে মোড়া বানাতে থাকে। আগের মতো বাঁশ, প্লাস্টিকের রশি খুঁজে খুঁজে হয়রান হতে হয় না। সেই সব জোগাড় করে দেয়। বিকেলে তারও দুই একটা নিয়ে গিয়ে বাজারে বসে। কখনো বা বিক্রি হয়, কখনো বা হয় না। নাহলে নেই। এ কি আর মুড়ি যে নরম হয়ে যাবে? আজ নতুবা কাল বিক্রি হবেই। সে বড় নিশ্চিন্ত আজকাল। মা মোড়া বিক্রি করতে গেলে বা মুড়ি ভাজতে বসলে খারাপ পায়। এমন দেখলেই সে বলে, গাড়ি একটা নেবে, কাজ কর্ম হচ্ছে, মারুতি ভ্যান একটা নেবে। ট্যাক্সি চালাবে। মাঝে মধ্যে মায়ের খারাপ লাগে। ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হলো। চোখা বুদ্ধির ছেলে ছিল। বুদ্ধিটা আছে বলেই সে চালাতে পারছে সংসার। বস্তির কারই বা লেখাপড়া হলো? বুকটা ধড়ফড় করে উঠে তার।
     মিনতি আর জোনের মা আচার বানাতে বসেছে। মিনতি তেল মশলার পয়সা দিল। ওর হাতে বা আর পয়সা থাকে কই? পয়সা থাকলেই সে গিয়ে ছেলেকে বুড়ো ডাক্তারের কাছে দেখিয়ে আসে। না থাকলে তেল ঝাড়ার সন্ধানে বেরোয়। ছোট ছোট প্যাকেটে আচার বানিয়ে দু’জনে বিকেলে ক্যাম্পের কাছের দোকানে বসে গিয়ে। কিছু বিক্রি যে হয় না নয়।
     ফুল আবার মদের কারবার ধরেছে। সে বানায়। বুড়ো দর্জি বাইরের ঘরে বিক্রি করে। অনেক মানুষই মদ খাবার থেকে ফুলের সঙ্গে ইয়ার্কি মারতে যায়।
     রত্নার মা যে বাড়িতে যা কাজ পায়, তাই করে। বাসন ধোয়া, সুপারি তোলা, কাপড় ধোয়া যা সামনে আসে তাই করে। মানুষটি বড় রোগা হয়ে গেছে, বুকে সারাক্ষণ একটা ধুকপুক লেগেই থাকে। রত্না ড্রাইভারণীর বাড়িতে চাকরানি হবার মতোই হলো, বাড়িটাতে যাওয়া ছাড়তে বললে সে ছাড়ে না। বিছানা ছেড়েই সে ওই বাড়িতে যাবার জন্যে পাগল হয়ে যায়। যত দিন যাচ্ছে বাবার একটা ছেলের জন্যে হা-হুতাশ বেড়েই চলেছে। মেয়ে দু’টো আর মাকে আজকাল শত্রু জ্ঞান করে।
     বন্ধটা পুরো বস্তিকে অজগর সাপের মতো গিলে ফেলেছে। অজগরটা পড়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় মরা, এই গলতে শুরু করবে , গন্ধে থাকা যাবে না। কিন্তু কাছে চেপে গেলেই বোঝা যায় সাপটা মরে নি, শুধু পড়ে আছে।
     সকাল সকাল সেই অজগরটাকে কে খুঁচিয়ে দিয়েছে। সাপটি কড়মড় করে উঠল। বিছানা থেকে উঠতে না উঠতে পুরো বস্তি জুড়ে হুলস্থূল। বাড়ি যাবার পথে বুড়ো ডাক্তারকে দু’টো সাইকেল চেপে আসা ছেলে গুলি করে মেরে চলে গেছে। ডাক্তার ফার্মাসির থেকে আসছিল। একেবারে কাছে থেকে গুলি করেছে। পথের পাশে জমানো পাথরে মানুষটি গড়িয়ে পড়ল। অনেক টাকা ডিমান্ড করেছিল বুঝি। শহরে একজনও ডাক্তার নেই। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারেরা সপ্তাহে দু’তিনদিন আসে, কখনো বা আসেই না। সরকারি কোয়ার্টারগুলো সব খালি, ভেঙ্গে টেঙে গেছে। প্রত্যেকটা ঘরের উঠোন ভরে গেছে কচুরি পানা আর কচুবনে। পুরো শহর জুড়ে আজকাল এমন ঘর অনেক দেখা যায়। ফুলে ফুলে ভরে থাকা গাছগুলো ছেয়ে ফেলেছে স্বর্ণলতা , ফলের ভারে নুয়ে থাকত যে গাছগুলো সেগুলোকে চেনা অসাধ্য করে ফেলেছে কুচিলা লতা। এক সময় সৌরভ বিলিয়ে ফিরত কিন্তু এখন স্বর্ণলতার ভারে নিস্তেজ হলদে হয়ে এসেছে পুরো শহরটা। শ্বাস নেয়া কষ্ট, বাতাসে দুলতে পারে না, গ্রহণ করতে পারে না সূর্যের রং, ফুল নেই, সবুজ পাতা নেই, আছে শুধু একটা হাহাকার।
     বস্তির মানুষগুলোর ত্রাণকর্তা ছিল বুড়ো ডাক্তার। বস্তি খালি করে সমস্ত মানুষ গিয়ে পৌঁছুলো হাসপাতাল। পোষ্ট মর্টেম করার জন্যে বারান্দাতে শুইয়ে রাখা হয়েছে ডাক্তারের হলদে হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ দেহ। একই রকম আছে, সেই সাদা চুল, সাদা ভুরু, চোখের চশমা আছে। নাই শুধু মুখের হাসিটা, আশ্বাস ভরা কণ্ঠ, “অসুখ ভালো না হলে এই বুড়ো ডাক্তার চুল পাকালো কিসে?” মানুষের ভীড় বিকেল অব্দি বসে রইল। বিকেল প্রায় তিনটা থেকে শহরে গিজিগিজিয়ে থাকা পুলিশ মিলিটারির মধ্যে, সার সার বন্ধ দোকানগুলোর মাঝখানে যানবাহন শূন্য পথগুলো দিয়ে তারা বুড়ো ডাক্তারের শব দেহ নিয়ে শোভাযাত্রা করল। জোনের মা, মণির মা, মিনতি, মীরার মা, মাঝে মধ্যে বুকে ধরে ধরে রত্নার মাও পুরো রাস্তা হাঁটল। শ্মশানে যাবার সময় পুরুষ মানুষরা রইল, মহিলারা চলে এলো।
     

     
বস্তিতে ফিরে আসার পথে সবাই লক্ষ্য করল, আজ ক্যাম্পের চারদিকে আর্মি হাতে বন্ধুক নিয়ে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। ঠিক যেন বাঘ শিকার আলগে রেখেছে। সবাইকে মাঠে নামিয়ে দিচ্ছে। ক্যাম্পের সামনের রাস্তা দিয়ে কাউকে যেতে দেয় নি।
     রাতে চুপি চুপি খবর ছড়ালো যে ক্যাম্পে পড়ে আছে আগের বুলেন, এখনকার বাঘা টেররিষ্ট। কেউ একজন বলল শুধু সেই নয়, সঙ্গে আছে হরি ভাঙুয়ার ছেলে, এখনকার টাইগার। কেউ কেউ বলল, সঙ্গে আরও আছে। খবর জানা গেল, আজ রাতেই এদের সঙ্গীরা ডেডবডি নিতে আসবে। ওদের হাতে হাতে নানা অস্ত্র। কী করে যে বুড়ো ডাক্তারকে মারল! সার্টের পকেটের কাছে একটা সিগারেটের পোড়ার মতো দাগ শুধু, না আছে রক্ত, না আছে ঘা, ডাক্তারকে মারবার গুলিই অন্যরকম। শরীরে ঢোকে আধা ইঞ্চি গুলিটা রক্তধারার মতো ঘুরতে শুরু করে, যেদিকে যায় সেদিকেই জ্বালিয়ে যায়। ডাক্তার বুঝি দু’লাখ টাকা দিয়েওছিল, আরও পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিল। সংখ্যাগুলো বাড়ে কমে, তিন-সাত, এক-পাঁচ, চার-ছয়।
    

   
পুরো রাত কেউ ঘুমোয় নি। পুরো রাত আর্মির গাড়ি যাওয়া আসা করেছিল। পুরুষ মানুষদের ডেকে ডেকে পাহারাতে লাগিয়েছিল। সকাল হতেই পাক্কা খবর বেরুলো। আর্মি তাড়িয়ে তাড়িয়ে গুলি করে মেরে আনা টেররিষ্টটা বুলেনই। তার হাতে আর্মি পিস্তল, বোমা পেয়েছে। বুলেনের ডেড বডি রাতারাতি ক্যাম্প থেকে গুয়াহাটি চালান দিয়েছে।
     ক্যাম্পের সামনে বসা বাজারটাও বন্ধ হয়ে গেল। শুধু খবর আর খবর। বস্তি আজ রাতেই জ্বলবে। একটা মানুষও বাঁচবে না। বুলেন মরার প্রতিশোধ এরা বস্তির উপর নেবে। শহরে দুটো বড় বোমা পেয়েছে, ফুটত যদি পুরো শহর শেষ হয়ে যেত। সত্যি-মিথ্যা নানান কথা। আগুনের ফুলকির মতো অনেক খবর বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে আসে। কোথাও দু’দল মানুষ বিভক্ত হয়ে এমন কাটাকাটি করল যে নদীর জল লাল হয়ে গেছে, মরা লাশে ভরে পড়েছে নদীর পাড়। লোকে শোনে আর বলে, “দেখতে থাক, আমাদের এখানেও হবে।”
     বন্ধের দশদিন পেরিয়ে গেল। রিজার্ভে কোনও একটা পাতা সেদ্ধ করে খেয়ে এক বাড়ির এক জোড়া ছেলে-মেয়ে মারা গেল, আরেকটা বাড়িতে বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতা খেয়ে ছেলেটা মরল না অবশ্য, ডাক্তার বাঁচিয়ে দিল । প্রতিদিন ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকত এখানে। সামান্য গোবর, একটুকরো মিষ্টি কুমড়ো , একটা আলু নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ঝগড়া আরম্ভ হয়ে যায়। কিছু দিন থেকে এই ঝগড়া বিবাদগুলো হচ্ছে না আর। চারদিকে থমথমে নীরবতা। ক্যাম্পের বাজারটা বন্ধ হয়ে যাবার থেকে লোকগুলো সত্যি একটা অজগরের মতো পড়ে রইল।
    হঠাৎ যেন কেউ নেতিয়ে পড়ে থাকা অজগরের নরম শরীরে ধারালো কুঠার একটা বসিয়ে দিল। ফিনফিনিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্তে ভরে পড়ল মাটি আর বাতাস।
     চিঠিগুলো দিয়ে গেল ফুলের স্বামী বুড়ো দর্জির হাতে। পিস্তল দেখিয়ে বলে গেছে না দিলে খুপরি উড়িয়ে দেবে। সকাল সকাল বাঁকা পিঠের এই বুড়োকে সবাই সবার বাড়ির দোয়ারে দেখতে পেল। চিঠিগুলোতে প্রত্যেকের থেকে ত্রিশ হাজার করে টাকা দাবি করেছে, নইলে বুড়ো ডাক্তারের দশা হবে। বুড়ো ডাক্তারের নাম নেই, কিন্তু ভয় সেই একই রকম দেখিয়েছে। বস্তির লোকগুলো সব যেন পাথর হয়ে গেল। কোনও বাড়িতেই দু’বেলা চুলো জ্বালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ‘ত্রিশ হাজার টাকা’—শব্দ ক’টা এই মানুষের একেবারেই অচেনা। সবাই ঠিক করল হরি ভাঙুয়ার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। যোগাযোগ করতে গিয়ে জানা গেল টাইগারের নাগাল এরা পাবে না, কিছু একটা হয়েছে ওর। ওকে না পেলেও ওর তলার একটার সঙ্গে কথা হলো। ত্রিশের থেকে পাঁচে নামল। প্রথম কিস্তিতে দুই হাজার।
     জোনের মা বাগানের এক কোনে জমি নেবার সময় সঙ্গে পাওয়া একটা গাছ  বিক্রি করল। টাকা পাঁচশ পেল।
     মীরার মা জমানো মিষ্টি কুমড়োগুলো বিক্রি করল, হাতের বালা দু’টো ছিল, সেগুলোও বিক্রি করল।
     মিনতি একশ টাকাও জোগাড় করতে পারে নি। পারে নি রত্নার মাও।
     নবীন যার থেকে বই পত্র নেয় তার থেকে তিনশ টাকা খুঁজে এনেছে। লাতুর মা তিন জোড়া কবুতর বিক্রি করল।
    রামু দোকানীর ব্যবসা আগের বন্ধেই পড়ে গেছিল, মূলটা খেয়ে ফেলে রামু এখন লাউ হাতে ফকির। সে দু’শো মাত্র জোগাড় করতে পারল।
     মণি সিঙের থেকে চেয়ে টাকা তিনশ এনেছে।
    কেউ সুপারি বিক্রি করল, হাঁস-মুরগি, ছাগল বিক্রি করল। ফলবান গাছও বিক্রি করল। কেউবা থাল –বাটি বিক্রি করে ফেলল।
    জনপ্রতি পাঁচ হাজার করে দাবি করা বস্তিতে সবার মিলিয়ে উঠল মাত্র পাঁচ হাজার। আরও পনেরো দিনের মধ্যে বাকি টাকা দেবার হুমকি দিয়ে সেই পাঁচ হাজারই নিলো।
    পুরো বস্তিতে এরা বুড়ো ডাক্তারকে মারা সেই বিদেশি আধা ইঞ্চি গুলিটাই চালিয়ে দিল। লোকগুলোর রক্তে গুলিটা ঢোকে চলতে থাকল। যে দিকেই গেল জ্বালিয়ে গেল। বুড়ো ডাক্তারের বৃদ্ধ দেহের মতো ওদের শরীর পাথরের বোঝাতে গড়িয়ে পড়বার মতো পড়াটাই শুধু বাকি।

    
    
           
  গল্প করতে করতে  চলমান মানুষগুলোকে দেখলে এমন মনে হয় যেন এরা রোজ এভাবেই হাসি ফুর্তি করে আসা যাওয়া করছে, কোনও দুঃখ নেই, সমস্যা নেই। যাতায়াত করছেই করছে। শুধু হাতের জিনিসগুলো বদলায়। মানুষ সবাই সেই একই আছে। একই চলন, হৈ হল্লা করে এর ওকে ডাক পাড়া, কিম্বা রাগে মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়া দুটো বাজে কথা, সামান্য কথাতেই হাসির ফোয়ারা, উঁচু গলাতে তর্কাতর্কি। সব একই থাকে। একই ছন্দে বাঁধা। শুধু হাতের জিনিসগুলো আলাদা হয়। মণির মায়ের হাতে মোড়ার বদলে মুড়ির টিন থাকে, লাতুর মায়ের হাতেও মুড়ির টিন উঠে, মিনতির হাতে গরম মশলার প্যাকেট, জোনের মায়ের হাতে বড়ই আচার। জিনিস সবারই বদলে বদলে যায়, কিন্তু হাত খালি হয় না। কিছু না কিছু নিয়ে মানুষগুলো আসা যাওয়া করতে থাকে।

          রাতেই খবর হলো। টাইগারদের পার্টিকে সরকার ডেকেছে, আলোচনা হবে, সুতরাং বন্ধটা উঠিয়ে দেয়া হবে। সকাল হতেই বস্তিতে হৈ হুল্লোড় পড়ে গেল। তাতে আবার আজ বাজারবারও। সমস্ত মানুষ বাজারে যাবার জন্যে লাইন লাগালো।
     জোনের মায়ের হাতে লেবু।
    মণির মায়ের হাতে মুড়া, রত্নার মায়েরও।
    মিনতির হাতে ঢেঁকি শাক।
    লাতুর মায়ের হাতে কাগজের ঠোঙা।
    ফুলের হাতে শুকিয়ে রাখা বাগানের তেজপাতা এক আঁটি।
    নবীনের হাতে বই ।
    রামু দোকানির হাতে পানি লাউ।
   

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India