ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন




ফেলানি          



                      
ণি ভাড়া নিয়ে দূরে গেছে, আজ আসবে না। সে না থাকলে বাড়ি খা খা করে। মায়ের জন্যে কত যে ভাবনা ওর। পুরো যদিও করতে পারে নি, তবু মায়ের কথা ভেবেই এমন একটা ঘর তুলতে শুরু করেছে যার ভেতরেই থাকবে জলের ব্যবস্থা, স্নানের ঘর , পায়খানা। জমি যদি কিনতে হতো তবে আর কই ঘর তুলবার কথা ভাবতে পারত? কালী বুড়ির ওখান থেকে উঠে যাবে শুনে বস্তির সবাই এসে বাধা দিল, কালী মায়ের থান নষ্ট হয়ে যাবে। বস্তির সবাই কিছু একটা হলেই মায়ের কাছে এসে ভরসা পায়। থাকুক মণিরা ওখানেই। মণির হাতে দু’টো পয়সা আসতেই প্রথমে কালী বুড়ির খের বাঁশের মায়ের থান পাকা করে দিল। অবশ্যি কে কী করল কোনও হিসেব না রেখেই থানের কাজ শেষ হয়ে গেল। রজত মিস্ত্রির নামটা ভালোই মনে আছে। কাজের থেকে ফিরে সে রাতে রাতে বহু কাজ এগিয়ে দিল। রত্না এসে রোজ ধোয়া মোছা করে। সে মণির মায়ের ঘরের কাজেও সহায় করে দেয়। প্রায়ই এখানেই ভাত টাতও খেয়ে যায়। বাচ্চা মেয়ে, এই বয়সে হাসি মস্করা না করে কী করে থাকে? সেই পুরোনো কথা মালতীও তোলেনা, সে তো না-ই। ওর চেহারা সামান্য ভালো হয়েছে। মিনতি কি কম করল? সরকারি হাসপাতালে নিয়ে নিয়ে ঔষধ পাতি দিয়ে দিয়ে মেয়েটিকে ভালো করে তুলল। আগে মুড়ি ভেজে বাজারে আসা যাওয়া করে এসে বিছানাতে পড়তেই ঘুম আসত। আজকাল পুরো দিন শুয়ে বসে কাটানোর মতোই হলো। বাড়িতে আর কাজ কতটুকু? মণি প্রায় থাকেই না, শুধু রাতের খাবারটাই ঘরে এসে খায়। রত্না আছেই। মেয়েটিরও যেন হাত চুলকোতে থাকে। কিছু করবার না থাকলে আলনার কাপড়গুলোই নামিয়ে আবার গুছিয়ে রাখে। শুয়ে বসে থাকা মানুষের আর বিছানাতে পড়লেই ঘুম আসে কী করে? আর ঘুম না এলেই দুনিয়ার যত চিন্তা। আর মণি গাড়ি চালাতে শুরু করবার আগে ও একা থাকতে পেত কই? আজ ইচ্ছে করলেই মণি ফিরে আসতে পারত। কেন আসবে না খানিকটা হলেও ধরতে পারছে মালতী। জিজ্ঞেস করলে বলবে, ক্লান্তির কথা, রাত্রি বেলার বিপদের কথা। সে কি ক্লান্তিকে পরোয়া করবার ছেলে? না রাতের বিপদকে? ওর সঙ্গের ছেলে মিন্টুদের বাড়ি নদীর পাড়ে। বাড়িতে ঢোকার মুখে দু’ট নাহর গাছ। গুয়াহাটি থেকে ফেরার পথে ঐ বাড়িটার দিকে তাকালেই আজকাল মণিকে ক্লান্তিতে চেপে ধরে, রাতের বিপদের কথা বেশি করে মনে পড়ে। মালতীর মুখে একটা হাসি খেলে গেল। গেল মাসে হাজোর মন্দিরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল মাকে, যাবার সময় পথে বন্ধুর বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিল। মনে হয় খবর দেয়াই ছিল। ঢোকার যায়গা থেকে বাড়ির পেছনের উঠোন অব্দি লাল মাটিতে লেপা ছিল। চিকমিকে কাঁসার থালাতে করে ওকে আর মণিকে নাড়ু-পিঠে দিয়েছিল মিন্টুর বোন রীণা। তার পরনে ছিল হাতে তৈরি কাপড়, মাথা পেছন থেকে ঢাকা, কপালে বড় করে লাল ফোটা। কাজকর্ম জানা, শান্ত , মিষ্টি দেখতে মেয়েটিকে দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিল মণির মায়ের। রান্নাঘরে গিয়ে আরও এক কাপ চা চেয়ে নিয়ে খেয়েছিল  মণি। রীণার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ফুর্তিতে উপচে পড়ে করা প্রশ্ন একটা শুনেছিল মালতী, “ আমি এলে এসব পাইনে কেন?” একই ফুর্তিতে উপচানো আরও এক নারী কণ্ঠ চাপা গলায় উত্তর দিল, “ শাশুড়ি যে প্রথম এলেন!” বিছানাতে পাশ ফিরে শব্দ করে হেসে ফেলল মালতী। ক’দিন ধরে মণি বলতে শুরু করেছে, “একটা ঘরে বড় সমস্যা, আরেকটা কোঠা বাড়ানো দরকার।” মণির বিয়েটা দিতে হবে এবারে। লাল বড় ফোটা দেয়া কোঁকড়া চুলের সেই মেয়েটি অনেকক্ষণ ওর পাশে পাশে ঘুরে বেড়ালো।
     “এই মণির মা! উঠ তো, উঠ!”
    মাঝরাতে মিনতির ডাক। ওর আবার কী হলো আজ? কত দিন পরে আজ আবার সে আগের মতো এসেছে।
    “মামী, মামী!” নবীনের ডাক।
    কী বা হলো। মণি গাড়ি নিয়ে গেছে। বুক ধড়ফড় করে উঠল।
    “ কী হয়েছে?”
    হুড়মুড় করে দু’জনে ঢুকে এলো। নবীন, মিনতি, আর ওদের ছেলে—তিনজনের মুখেই স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন। নবীনের কাগজের মতো সাদা মুখখানা দেখে মালতীর শরীরটাও শিরশিরিয়ে উঠল। একটা পুরুষ মানুষ ওভাবে ভয় পেয়েছে!
    পুরো দু’গ্লাস জল খেলো নবীন। মিনতি জলটুকুও খেতে পারে নি। থকথক করে কাঁপছে।
    “ওর সঙ্গের কেউ এসেছে?”
    “ না।”
    “কোনও জিনিস রাখতে এসেছে?”
    “ না তো।”
    “কী হয়েছে, খুলে বলবি তো!”
    “ দু’টো লোক ড্রাইভারণীর বাড়ির পেছনে...।”
    কথাটা মিনতি শেষ করতে পারে নি।
    “হ্যাঁ, মামী! রাত্রি বেলা মাটি খোঁড়ার শব্দ শোনে আমরা বেরিয়ে দেখলাম। ড্রাইভারণীর পায়খানার কাছে দু’টো মানুষ ফেলে রেখেছে।”
     “একটা পুরুষ, একটা মেয়ে মানুষ।”
    “কে ফেলেছে?”
    “ বলতে পারব না, লোকগুলোর মুখ বাঁধা ছিল।”
     মিনতির ছেলে ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে।
    “কী ভাষাতে কথা বলছে?”
    “বাংলা ভাষা। ড্রাইভারণীর মতো কথা বলছে।”
    “ড্রাইভার?”
    “ সে মদ খেয়ে বেহুঁশ! পালিয়েছে যেন মনে হচ্ছে।”
    “ প্রায়ই ও এমনই করে, পালালই যেন মনে হচ্ছে।”
    “ ওর টাকা চাই।”
    “টাকা নেই ওর? বস্তিতে ওর মতো জিনিস পত্রে ঠাসা পাকা ঘর আর কার আছে?”
     “ওর ব্যবসাতে মন্দা চলছে। বিছানাতে তুলবার জন্যেও মানুষ পায় না। মদও আগের মতো বিক্রি হয় না।”
    মিনতি যখন কথা বলছিল, নবীন মাথা নুইয়ে বসে পড়ল। হঠাৎ সে বলে উঠল, “আবার একটা লাগবে। টাকার জন্যে মহিলাটি নিজের বাড়িতে লাশ দু’টো পুঁততে দেয়া ঠিক হয় নি।”
    “ মানুষ দু’টো কি অসমিয়া বলে মনে হলো?”
    “ এখনই ভোর হবে। দু’-দু’টো মানুষ পুঁতে ফেলতে পারবে? পুলিশে যদি খবর পায়...আর্মি আসবে...।”
    সবার চোখে ভেসে উঠল পুলিশ মিলিটারিতে গিজগিজিয়ে থাতা সেই আগেকার বস্তি। পুরুষেরা রিজার্ভে গিয়েছিল, দোষ থাক না থাক ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আবার হবে, সব কিছু আবার হবে।
     “আমি শুনেছি, আসবার সময় ওরা ড্রাইভারণীর ভাষাতে কথা বলছিল। লাশগুলো পায়খানার টেংকিতে রাখবে। কাপড় চোপড় আর চুড়ি বালা মাটিতে পুঁতে ফেলবে।” মিনতির গলা বসে বসে গেছে।
     “ ওরা আমাদের দেখেছে।” নবীনের গলাটাও বসে গেছে।
     “ দিন দুই তোরা আমার এখানে রাতে থাকবি। এমনিতেও মণি আজকাল রাতে থাকে না।”
    “মণিকে বলবি মামী। কোনও ড্রাইভার যেখানে রাতে গাড়ি নিয়ে যেতে চায় না সেসব জায়গাতে সে আজকাল চলে যায়। দেখ গিয়ে তো কে তার মতো রাতে ভাড়া মারে?”
     “ সে একটা ঘর তুলতে চাইছে। দু’টো পয়সার জন্যেই সে অমন করছে।”
    বাইরে আলো ফুটেছে। সে তিনকাপ চা করবার জন্যে পাকঘরে গেল। মণি গ্যাস এনেছে। ভোরের রোদ পড়ে গ্যাস জিলকে উঠল। চাদরের আঁচলে আড়াল করে সে রূপালি গ্যাসটা জ্বালিয়ে নীল আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। লাগবে না, রোজ রাতে অন্যেরা যেখানে যেতে চায় না সেখানে গাড়ি নিয়ে যেতে হবে না। ওভাবে উপার্জন করে বাড়ি তুলতে হবে না। কালী বুড়ির ঘরটা পড়ে আছে। মালতী সেখানে গিয়ে থাকবে, মণি থাকবে এখানে। বলবে সে, মণি এলেই বলবে।
    চা খেয়ে নবীনরা চলে গেল।
   
     
পরদিন সকাল হতেই বস্তিতে হৈ হল্লা শুরু হলো। শোয়ালকুচির থেকে এসে রিজার্ভে নতুন বাসা করেছে হরিদাস আর তার বৌ। দু’জনই নিখোঁজ। লোকটা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাট-মুগার কাপড় বিক্রি করত। টিনের চাল দিয়ে দু’টো মানুষ কোনও রকমে থাকত। মরা সাপও ডিঙিয়ে যায় না যে মানুষ দু’টো, এরা যাবে কই? কোথাও আত্মীয় বন্ধুর বাড়ি গেলেও লোকে ওভাবে ঘর দোয়ার খুলে রেখে যায় না। কড়াইতে মাছের ঝোল, থালে বাড়া ভাত রেখে মানুষ ওভাবে বেড়াতে যায়? আত্মীয় কুটুম বলতেও আর তেমন কেউ নেই। একেবারে একেলাই ছিল স্বামী স্ত্রী। রিজার্ভের ভেজাল মাটিতে দুই একঘর মানুষ নতুন করে বসলেও এখনো অনেকেই বসে নি। ওদের বাড়ির কাছাকাছি গাছের গুড়িগুলো কই গেল কী করে জানবে এরা? বাড়িতে আশ্রয় নেয়া দেশি কুকুরটাকেই বা কী জিজ্ঞেস করা যায়? না কি বাড়া ভাত, বিছানো বিছানাকেই জিজ্ঞেস করা যায় কই গেল এরা দু’জন? দুপুরের দিকে পুলিশ মিলিটারি এসে পুরো জায়গাটা ভরিয়ে ফেলল। আর্মি এক জোড়া কুকুর নিয়ে এলো। বস্তির আর রিজার্ভের পাতলা করে বসা দুই এক ঘরের মানুষজন, মাছের পুকুর, শুয়োর –মুর্গির ফার্মের চৌকিদার-সবাই এসে কুকুর দু’টোর সামান্য দূরে এসে ভিড় করল। কুকুর দু’টোর একটা কুচকুচে কালো, অন্যটা দুধের মতো সাদা। শরীরে কোটের মতো খাকি পোশাক। যে দু’টো শেকলে কুকুর দু’টো বেঁধে রেখেছে, তাতে হাতিও বাঁধা যাবে। শক্ত-পোক্ত লম্বা চওড়া ক’জন মিলিটারি বড় কষ্ট করে কুকুরগুলোকে ধরে রেখেছে। কুকুরে প্রথমে বাড়া ভাত ছেড়ে বাকি ঘরে ঘুরে বেড়ালো। তারপর শুঁকে শুঁকে রিজার্ভের পেছনে চিকন পথ ধরে বস্তিতে গিয়ে ঢুকল। শুঁকে শুঁকে কিছু দাঁড়ায়, বাকি মানুষও দাঁড়িয়ে পড়ে। এই পথ দিয়ে গেলে প্রথমেই পড়ে মিনতির পুরোনো বাড়ি। তারপরেই নবীনের বাড়ি। তার উত্তর দিকেই বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ড্রাইভারণীর পাকা ঘর। ভাঙা বেড়ার ভেতর দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে কুকুরগুলো ড্রাইভারণীর উঠোনে গিয়ে ঢুকলো। বাকি লোকজন ঢুকতে না পেরে এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। তারা শুনতে পেল ভেতরে কুকুরের ভীষণ ভৌ ভৌ ডাক আর সঙ্গে ড্রাইভারণীর চিৎকার, “আমাকে ছেড়ে দে রে!” তারপরে লাগাতার নাকি স্বরের কান্না, বাড়ন্ত কুকুরের গর্জন। কৌতূহলে দুই একজন বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে গিয়েছিল, যেতেই আর্মি তেড়ে এলো। সবাই চলে গেল। বস্তির এখানে ওখানে জটলা পাকানো মানুষের ভিড়ে কুকুরের ঘেউ ঘেউ চিৎকার আর তাদের দু’টোর পায়ের কাছে পড়ে থাকা রক্তাক্ত কাপড়ের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল।
     কথাগুলো একান থেকে ওকান হতে না হতেই সবাই দেখতে পেল ড্রাইভারণীর বাড়ি পুলিশে মিলিটারিতে সেই বাঁশের বেড়ার মতোই ঘন করে ঘিরে ফেলেছে। ঘন ঘনা গাড়ি আসছে আসছে। লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েই গেল। খবরের পর খবর বেরুলো।
    বাঁশ ঝাড়ের নিচে রক্তমাখা কাপড় মিলেছে।
    পায়খানার টেংকিতে পাওয়া মরা লাশের মাথাতে চুল নেই, মুখ আধখানা পোড়া।
    ড্রাইভারণীকে অনেক টাকা দিয়েছে। টাকার লোভেই সে এই কাজ করতে রাজি হয়েছে।
    এদেরকে মেরেছে যে পার্টি তার একটা ধরা পড়েছে।
    ড্রাইভারণীরই জাতি গোষ্ঠীর মানুষ।
    এখানকার লোক বেশি নেই, শিলিগুড়ির থেকে এসেছে।
    অস্ত্র-শস্ত্রও এসেছে শিলিগুড়ির থেকে।
    পরিণাম যা হতে পারে লোকে তার কথাও বলাবলি করছে।
    এরা আর সহ্য করবে না বসে বসে।
    কলকাতার থেকে বোমা বারুদ নিয়ে লোক এসেছে।
    ওদের হাতে এমন বন্দুক যে ঘুরালেই পাখি মারবার মতো মানুষ মেরে ফেলে।
    ওদের সবাই বোমা বানাতে পারে।
    জংলি পার্টি এদের সহ্য করতে পারে না।
    সব্বাইকে কচু কাটা করবে এখন।
    আর্মির সঙ্গে যে শেয়ালগুলো থাকে ওদের সঙ্গেই এদের ঘনিষ্ঠতা। লোকে এরপর বোঝবার চেষ্টা করে ঘটনাগুলো ওদের গায়ে কী চেহারায় গড়িয়ে এসে পড়বে?
     আমরা আর এখানে থাকতে পারছি না।
    রাস্তাতে পড়ে মরতে হবে।
    সব রোজগার পাতি বন্ধ হয়ে যাবে।
    শিলিগুড়ির পার্টিটা কী করে পরিবারটাকে মারল দেখলি না?
    জংলি পার্টির সঙ্গে আর কোন পার্টি আছে জানিস না?
    ঐ পার্টির কাছে এই নতুনটা আর এমন কি? কার বাবার এতো ক্ষমতা যে এদের এবারে রক্ষা করে?
     সবাই মারা পড়বে। এই পার্টির মানুষ ওই মানুষগুলোকে মারবে, ঐ পার্টির মানুষ এই মানুষগুলোকে মারবে।
     মোদ্দা কথা সবাইকে মরতে হবে।
    এক মুঠো চাল, এক মুঠো আটাও পাওয়া যাবে না।
    কেউ বেঁচে থাকবে না।
    
      
বিকেলের দিকে মানুষগুলো নিশ্চুপ হয়ে পড়ল। প্রায় সবাই দেখেছে দু’টো পায়খানার টেংকির জলে ভেজা দু’জন মানুষের মরা লাশ গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। দম বন্ধ অবস্থার থেকে বেরুতে না বেরুতেই বিকেলের আকাশ বাতাস চিরে এক বিকট চিৎকার লোকে শুনতে পেলো। ঠিক চিৎকার নয়, লাগাতার পেড়ে যাচ্ছে গালি। গালির শব্দগুলো, টনটনে গলা সবার চেনা। কিন্তু গালির অশ্রাব্য শব্দগুলোর মাঝে মাঝে যে আর্তনাদ আর কান্না ভেসে আসছে সেটি সবার অচেনা। ড্রাইভারণীকে পুলিশ গাড়িতে তুলছে। যারা ধরা পড়েছে তাদের একজন ড্রাইভারণীর হাতে টাকা দেবার কথা বলে দিয়েছে। ড্রাইভার রাতেই বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
     “শালা হারামজাদা, বৌর টাকাতে খায় হারামজাদা! ও আমার টাকা নিয়ে চলে গেছে রে! আমি ওদের স্কুলের বই দেবো, ফীজ দেবো,আমার অসুখের জন্যে ডাক্তার দেখাবো বলে রেখেছিলাম। সব নিয়ে গেছে ও। ওকে খুঁজে আন না কেন? মেয়ে মানুষের উপরে বড় যে পুরুষের দম দেখায়। ওকে ধরে আন, বৌর টাকাতে চলা বেটাটাকে ধরে আন।”
     গাড়ির শব্দ, গালি আর কান্নাতে মিলে মিশে অদ্ভুত এক চেহারা নেয়া গলাটা অনেকক্ষণ ধরে লোকে শুনতে পেলো। অন্ধকার হবার সঙ্গে সঙ্গে এই অদ্ভুত গলাটা পুরো বস্তিকে ছেলে ফেলল। বাতাস উপরে উঠে গেল। বাতাসের জায়গা নিলো একটা গন্ধ আর অদ্ভুত সেই গলা। সেইগুলোই শ্বাসের সঙ্গে বুকে ভরে নিলো বস্তির সমস্ত মানুষ।
     খিদেয় উপোসের মধ্যেই বুক ভার করে বাতাস বাতাস করে ছটফট করতে করতে লোকগুলো ছটফট করতে থাকল। সবার না জ্বলা চুলোতে গিয়ে বসে পড়ল সেই কুকুর দু’টো, কুচকুচে কালো আর দুধের মতো সাদা। শুধু ক্ষুধার্ত পেটে গিয়ে ঢুকল বিষ্ঠার জলে ভেজা জবজবে দুই মরা শবের গন্ধ, কান দিয়ে গিয়ে মাথাতে ঘুরপাক খেতে থাকল একটি মহিলার অদ্ভুত চিৎকার।
    শহরে কার্ফিউ ঘোষণা করা হলো।


0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India