ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

‘যে গাছে ফল ধরে না তাকে বলে নিষ্ফলা কিন্তু কেউ কি পরীক্ষা করে দেখেছেন মাটি? যে ডাল সহজে ভেঙ্গে যায় তাকে বলে ঠুনকো। কিন্তু তার উপর কি জমেনি অজস্র বরফ?’ ---- বার্টল ব্রেখট

স্বাগত

ফেলানি উপন্যাস পড়তে আপনাকে স্বাগত। এক্সপ্লোরার নয়, অনুগ্রহ করে মজিলা ফায়ার ফক্স খুলে বসুন

অন্যদের পড়তে বলুন





ফেলানি

      
  
কার্ফিউ চলছে। কখন খুলবে কেউ জানে না। এই বন্ধ আগের বন্ধগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। কোত্থাও একটাও বাজার বসে নি। বাড়ির বুড়ো হতে ধরা ঝিঙে বা পুরল টুকরিতে করে কেউ বিক্রি করতে নিয়ে যায় নি। অথবা বিকেলে নদীতে মাছ ধরে ঢেঁকি পাতাতে ঢেকে চালনিতে করে রাস্তার পাশে বসে নি। একটাও ছোট ছেলে রাস্তাতে ক্রিকেট খেলতে বেরোয় নি। সবাই ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ করে চুপ চাপ বসে আছে। বসে নি একটিও তাসের আড্ডা। শুধু কোথাও কোথাও কিছু মানুষ জটলা করে বসে আছে।
    এক ঘণ্টার জন্যেও খুলে নি কার্ফিউ। নারকেলের খোলা দিয়ে শেড তৈরি করে ইলেকট্রিক তারে হুক লাগিয়ে একশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বালানো হয়েছে। সবাই প্রায় হুক লাগিয়ে সামনে পেছনে লাইট জ্বালিয়েছে। কেউ বা বাঁশের বেড়াতেই ঝুলিয়ে দিয়েছে। কেউ বাঁশেই লাগিয়েছে। কেউ বারান্দার খুটাতে বেঁধে দিয়েছে। এমনই করে এরা প্রায়ই। লাইন ম্যান ধরলে দু’চার টাকা ধরিয়ে দেয়। এখন আর কোনও বাধা নিষেধ নেই। চারদিকে দিনের মতো আলো ছড়িয়ে লাইট জ্বলছে। দুর্বল পুলগুলো ঘটং ঘটং করে নাড়িয়ে দিয়ে দিনে রাতে আর্মি পুলিশের গাড়ি যাতায়াত করছে। আর্মির কড়া হুকুম বস্তির সবাই পাহারা দিতে হবে। সবাই পালা করে পাহারা দিচ্ছে।
    সর্বত্র একটা ভয়। এই আসবে। ভয়ানক সব অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আসবে। কে মরবে ঠিক নেই। সবাইকে মরতে হবে, শুধু আগে আর পরে। উত্তর থেকে আসবে, দক্ষিণ থেকে আসবে, পূব থেকে আসবে, পশ্চিম থেকে আসবে...চারদিক থেকে আসবে।
    জংলি পার্টিও আসবে ওদের বাপদের সঙ্গে।
    একটাও বাঙালি বাঁচবে না।
    আর্মির সঙ্গে যারা থাকে তারা আসবে শিলিগুড়িতে যারা বোমা ঠেসে বসে আছে তাদের সঙ্গ নিয়ে।
    একটাও অসমিয়া বাঁচবে না।
    বাগানীয়া দলটা আসবে তীর ধনুক নিয়ে। তীরে বিষ মাখানো, শরীরে লাগলেই কেঊটের ছোবলের মতো নীল হয়ে আসে ।
    একটাও বডো বাঁচবে না।
    বাঁচবে না বিহারিরাও। হিন্দুগুলোও মরবে, মুসলমান একটাও থাকবে না।
    তাহলে থাকবেটা কে?
    কেউ থাকবে না।
    সবাই মারা পড়বে?
    সবাই মারা পড়বে।
    বাঘ সিংহে ভরা একটা অরণ্যতেও সজারুরা কান মাথা ঝাঁকিয়ে খুটে খেতে সময় পায়, সাহস করে। সজারুও জানে বাঘ –সিংহেরও যখন তখন খিদে পায় না। কিন্তু এই যে ছুঁতে না পারা, ধরতে না পারা শত্রুগুলো এদের রক্তের পিপাসা প্রতি মিনিটে থাকে। এই আসবে, এই আসবে, মিনিটে সব ছারখার করে চলে যাবে।
    সত্যিই এলো। টিভিতে যখন অসমিয়া সংবাদ দিচ্ছিল ঠিক তখন সবাই দেখল আকাশে ধুম করে কী একটা ফুটে চারদিক আলো করে ফেলেছে। এতো আলো যে উঠোনের দূর্বা ঘাস অব্দি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তারপর ঠিক ফটকা নয়, তার থেকেও ভারি আওয়াজ সবার কানে বাজল। এই শব্দ সবার চেনা হয়ে গেছে। রক্ত পিপাসু ভূতের পায়ের শব্দ। তারপরে সব নিঝুম! শব্দগুলো এসেছিল ড্রাইভারের বাড়ির দিক থেকে। একটাও পুলিশ মিলিটারির গাড়ির শব্দ নেই। অন্য সময় যারা ঘটং ঘটং করে পুল নাড়িয়ে আসে যায় এদের গাড়িগুলো সব গেল কই? কই হারিয়ে গেল টহলদারি মিলিটারিরা? ওরাতো থাকেই অনবরত। ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, আসা যাওয়া করা মানুষের সাইকেল কেড়ে রাখে। তিন চারদিন, কখনো বা এক সপ্তাহ দশদিন পরেও ঘুরিয়ে দেয় না। কখনো বা সঙ্গে নেয়া বেগ, তল্পি তল্পা খুলে দেখে দুই একটা চড় থাপ্পড়ও বসিয়ে দেয়। পাহারা দেয়াতে কোনও ঢিলে ঢালা ভাব দেখলে গালি গালাজ মার পিট এসব আছেই। আজ এরা সবাই গেল কই?
    শুরুতে বস্তির কেউ নড় চড় করল না। মণিই বলল প্রথম, কী হয়েছে দেখতে তো হবে। মণির সাহসের কথা বস্তির সবাই জানে। তার কথাতে সাহস পেয়ে সবাই উঠে ড্রাইভারের বাড়ির দিকে এগুলো। ভেতরে কেউ কোঁকাচ্ছে। মণির পেছনে পেছনে সবাই গিয়ে ঢুকলো। রক্তের স্রোতে পড়ে আছে ড্রাইভার, তার শরীর ফুটো ফুটো করে ফেলেছে চালনির মতো। আরো কোঁকানির শব্দ শুনে এগিয়ে দেখে রত্নার বাবা পড়ে আছে। একবার চোখ মেলে তারপরেই মাথাটা একদিকে কাত করে ফেলে দিল। মেয়ের হাতে রান্না করিয়ে দু’মুঠো ভাত নিয়ে এসেছিল ছেলে মেয়ে দু’টোর জন্যে । এদের মাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবার পরে থেকেই এরা উপোস করেই দিন কাটাচ্ছিল। ড্রাইভারের সমান না হলেও তার শরীরেও বেশি ক’টি গুলির দাগ। কারো চাপা ফোঁপানোর শব্দ শুনে দেখল বিছানার নিয়ে ছেলে মেয়ে দু’টি। ছেলেটা পড়ে আছে, মেয়েটি তাকে ধরে কাঁদছে। বিছানার নিচে থেকে তাদের দু’জনকে বের করে আনা হলো। ছেলেটির শরীরে গুলি লেগেছে , শরীর শক্ত হয়ে গেছে। মেয়েটির গায়ে রক্তের কিছু দাগ লেগেছে মাত্র। ওর কিছু হয় নি। ওকে কেউ ধরে দাঁড় করাতে গেলেই সে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ভয়ে মুখ কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে। কে যেন ওকে বুড়ো দর্জির হাতে তুলে দিল, দর্জি ওকে বুকে করে সেখান থেকে চলে গেল।
     কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল লোকগুলো। হচ্ছেটা কী এসব? কাকে জিজ্ঞেস করবে? এতো সব পুলিশ মিলিটারি থাকতে এসব হতে পারে কী করে? আকাশের এক একটা টুকরো আলো করে তোলা পুরো শহর দেখেছে। ধম করে ফুটা শব্দ শুনেছে। আর্মি –পুলিশে দেখে নি? তবে? ভয় করে? নিজের প্রাণের ভয়?
     ব্যাপার সবাই বুঝতে পারল। বা মনে হলো যেন বুঝে উঠেছে। বোকা মানুষগুলোই ক্ষেপে গেল। ঠাট্টা হচ্ছে? ওরা যাদের যা বলে তাই করে আসছে। কানে ধরে ওঠ বস কর। করেছে। পুরোটা দিন বাজার করে আসে রাতে যদি বলেছে পাহারা দে, দিয়েছে। ভোর হতেই আবার চোখে মুখে জল দিয়ে দৌড়েছে। লাগে বললেই সাইকেল দিয়েছে। ডেকে নিয়ে বলেছে রাস্তাতে পাথর বিছিয়ে দে, দিয়েছে। ক্যাম্পে বাঁশের বেড়া দিয়েছে। সুমলা পাগলি ওদের ক্যাম্পের মুখে বলির ছাগলের মতো পড়ে রইল। ভেতরের গরুগুলো কিছু বলল? একটাও আঙুল তুলল? ওরা দেখে নি?
     ড্রাইভার, ড্রাইভারের ছেলে আর রত্নার বাবাকে নিয়ে মানুষজন বসে রইল। বস্তির কারো ঘরে চুলো জ্বলল না। চোখে ঘুম এলো না। তিনটা প্রাণীর রক্তে বস্তির সবাই ডুবে গেল। সকালে সবার চোখে দেখা গেল রক্ত জমাট।
     ভোরের আলো ফুটতে পুলিশের একটা গাড়ি এলো। বডিগার্ড সহ এক অফিসার নেমে এলো।
     কেউ একজন প্রথম ঢিলটা ছুঁড়ল। গাড়ি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। বৃষ্টির মতো পাথর পড়তে শুরু করল গাড়িতে। অফিসারটি বন্দুক বের করতে যেতেই নবীন না মণি কে যেন একটা চড় মেরে সঙ্গে লাথিও বসিয়ে দিল কয়েকটা। প্রাণ নিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে গেল।
    কিছু সময় পরে আর্মির গাড়ি এলো। পাথর জড়ো করে রাখাই ছিল। লোকজনও তৈরি হলো। ঠনর ঠনর করে পাথরের ঢিল পড়তে শুরু করল আর্মির গাড়িতে। সবাই নয়, কিন্তু অনেকেরই ছেলে বেলা গুলতি মারার অভ্যেস ছিল, হাতগুলো সোজা । ধমাধম ভাঙ্গা ইটের টুকরো পড়তে শুরু করল। আর্মির ভান ঘুরে গেল। এলো বেশ ক’খানা বোঝাই করা পুলিশের গাড়ি। ওয়াকি টকিতে কথা বলছে। আর্মির গাড়িও আরো এলো। পুরো বস্তি পুলিশের আর্মিতে ঘিরে ফেলল।
     
   বন্দুকের কুঁদা দিয়ে মেরে মেরে কানে ধরে ধরে সবাইকে সার করে বসিয়ে দিল। তারপরে অজগর সাপের মতো হা করে মুখ মেলে রাখা কালো গাড়িতে এক এক করে সবাইকে তুলতে শুরু করল। মহিলারা তাই দেখছে কালী বুড়ির থানে বসে বা দাঁড়িয়ে। মুখরা যে ক’জন মহিলা, তারা শিলাবৃষ্টিতে জর্জর কপৌ ফুলের মতো চুপ।
    মণিকে কোনও এক আর্মি বন্দুকে একটা খোঁচা দিয়ে আবার লাথও মেরে দিয়েছে, “লিডারি করত্যা হায় ক্যা?” মণি শক্ত হয়ে বসে আছে। তাকে নাড়ানো যায় নি। পুলিশ একটা এসেও তাকে গুঁতো দিল, “ কোন বাপের ব্যাটারে তুই! শালা হারামজাদা!”
    মণির মা তাই দেখছিল। সে চাদরের আঁচলখানা কোমরে বেঁধে দৌড় দিল, “কাকে তুই হারামজাদা বলছিস রে?”
    মণির মায়ের পেছনে পেছনে মিনতি, রত্না, মীরার মা, ফুল, জোনের মা সবাই দৌড় দিল। যেন ওরা মণির মায়ের গায়ে আঠা দিতে সাঁটা।
    পুলিশের একটা হাসছিল, “ মালতো বেশ বড়িয়া দেখছি! ভাগিয়ে নিয়ে যাবি কি রে?”
    “ মা তুই গেলি?” দাঁত কামড়ে বলল মণি, “ মা , তোরা ভেতরে যা গে, এই কুকুরগুলোর সামনে এসেছিস কেন?”
    “ ওই কাকে কুকুর বলছিস বে?” কেউ একজন মণিকে মার একটা দিয়ে ভেনে ভরিয়ে দিল।
    “মিনতি, তোরা যা গে’।” ভেনে ঢুকে নবীন চেঁচিয়ে বলল।
    চোখের সামনে ভ্যানখানা ঘরঘর করে চলে গেল। মণির মা এক দৃষ্টিতে ভেনের দিকে তাকিয়ে রইল। যেখানটাতে ভ্যানটা মিলিয়ে গেল সেখান থেকে একটা মানুষ আসতে সবাই দেখতে পেল। মীরার বাবা। আজ বহুদিন পরে এসেছে মানুষটা। চেহারা দেখে মনে হয় যেন কোনও কঠিন অসুখে পড়েছে। চুলগুলো ঝরে গেছে, পুরো বুড়ো দেখাচ্ছে তাকে। বোধহয় অনেক আগেই বস্তিতে ঢুকেছিল। গোলমাল দেখে কোথাও লুকিয়েছিল। পুলিশ-আর্মিকে চলে যেতে দেখে বেরিয়ে এসেছে। তাকে দেখে মীরার মা তাড়াতাড়ি হেঁটে বাড়ি চলে গেছে। কান্না-কাটি করে ভয়ে বিব্রত অন্য মহিলারা তা দেখেনি।
    প্রথমে দরজাটা বাইরে থেকে তালা দিল মীরার মা। ছেলেকে পুলিশে নিয়ে গেছে, মীরা অন্য মেয়ে মানুষদের সঙ্গে। আজ বেশ কয়েক বছর পর বাড়ি আসা স্বামীর জন্যে পথে তাকিয়ে রইল। বাড়ির মুখে অচেনা মানুষকে দেখলে কুকুর যেমন ঝাঁপিয়ে উঠে মীরার মা তেমনি ঝাঁপিয়ে পড়ল বরের উপর। শুরুতে ওর বুক ভেঙ্গে পাড়ভাঙ্গা কান্না বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে জোৎস্না আলোতে পড়ে ঝলমল দুটি সংলগ্ন শরীর। ওর চেনা মানুষটির শরীরে এক আলদ সাপ কিড়মিড় করছে, কুচকুচে কালো, অন্ধকারের থেকেও কালো। ওর কানে বেজে উঠল এক নেশাসক্ত নারী কণ্ঠ, “বুর্বক বেটিটা শুয়ে পড়েছে।” বুকের কান্না শুকিয়ে গেলো, ওর শুকনো বুকে এখন শুধু তপ্ত বালির উপর দিয়ে হোঁ হোঁ করে বয়ে যাওয়া বাতাস।
      মানুষটা ভেতরে চলে এসেছে। দরজাতে দিয়ে রাখা তালার দিকে তাকাচ্ছে।
     “আমি লোকের মুখে জানতে পারলাম। এতোসব গোলমালের মধ্যে তোরা পড়ে আছিস। ট্রাক একটাতে চড়ে চলে এলাম। বুকটা জ্বলে যাচ্ছিল।” চারদিকে তাকাচ্ছিল সে, “ বাড়িঘর ভালোই উঠালি। ছেলে দোকানে ঢুকেছে। তুই ভালো বাড়িতে কাজ করিস, খবরাখবর সব রাখি। তোদের রোজগার পাতি ভালো।” মীরার মায়ের বুকের বালিগুলো হোঁ হোঁ করে উপরে উঠে আসছে, ওর নাকে মুখে চেপে ধরেছে, সে শ্বাস নিতে পারে নি।
     “আমি এবারে চলে এসেছি, বুঝলি। ঐ বেটি আমাকে ওষুধ করেছিল। আমাকে অসুস্থ করে ফেলেছে।” লুকিয়ে একবার মীরার মায়ের কঠিন মুখটা দেখে নিলো সে। “একজন বাবা আমাকে পানি ঝাড়া খেতে দিয়েছে। জ্যান্ত কী একটা বেরিয়ে এসেছে বমি থেকে। আমি একেবারেই চলে এসেছি। তোরে এখানে থাকলে আমি বেঁচে যাবো, নইলে ও আমাকে একেবারেই মেরে ফেলবে।”
    মীরার মা দেখে যাচ্ছে লোকটাকে। লোকটাও সোজা না হলেও বাঁকা চোখে তার কঠিন মুখের দিকে নজর ফেলছে।
     “বড় খিদে পেয়েছে। কিচ্ছু না খেয়ে আমি রাতের অন্ধকারে ইটের ট্রাকে উঠেছি। এইটুকু জায়গা হেঁটে এসেছি। এখানেই যত গোলমাল। কলাইগাঁও থেকে সব খোলা। এখানে আসব বলে জেনে সবাই ভয় পেয়েছিল। এদিকে তোরা পড়ে রয়েছিস...।” সে ধরতে পারছে মীরার মা আরো শক্ত করে আনছে নিজেকে।
    “দরজাটা খোল।” মীরার মায়ের কাছে চেপে এলো। “তোর চেহারাটা ভালো হয়েছে। বড় ঘরে খাচ্ছিস দাচ্ছিস ভালো। ছেলে রোজগার করছে। আমারই এখন কষ্ট বড়...... বেমার হয়েছে থেকে কাজ কর্ম নেই।” এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে মীরার মায়ের পিঠে হাত রাখতে চাইছিল।
     “একবার যদি আমার গায়ে হাত দেবে!”
     “কী করবি? তুই আমার বিয়ে করা বৌ। আমার ছেলে মেয়েদের পেটে ধরেছিস তুই।” লোকটার কথার মোলায়েম সুরটা হঠাৎই মিলিয়ে গেল।
     “খোল বলছি দরজা। নইলে ঘর দরজা সব ভেঙ্গে ফেলব। সব জ্বালিয়ে দেবো।” ধম করে সে দরজাতে লাথি মারল।
     “খুলব না দরজা। তোকে আমি ঘরে তুলব না। এই ঘর আমি করেছি। আমি কিনেছি মাটি। তুই চলে যা। যেভাবে এসেছিস সেভাবে চলে যা। তোর ঐ মেয়েছেলের ওখানে চলে যা। যা! মাংস রাঁধ গিয়ে, মদ খা গিয়ে, ওর সঙ্গে এক বিছানাতে উঠ।” শান্ত মহিলা উন্মাদের মতো হয়ে গেছে।
     এবারে সে মীরার মায়ের চুলে ধরে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে, “শালা মাগী বেটি, দু’পয়সা রোজগার করিস বলে এতো কথা।” দরজাতে আরো দু’বার লাথি দিয়ে সুবিধে করতে না পেরে সে কাছে শুকিয়ে রাখা লাকড়ি একটা তুলে এনে ধমধম করে কোপাতে শুরু করল, “ বজ্জাত মাগি, রেণ্ডীগিরি করে পয়সার ফুটানি দেখাচ্ছিস!”
     “ কী বললে, রেণ্ডীগিরি করেছি?” কুনুই থেকে রক্ত বেরুচ্ছে।
    “ বৌ বজ্জাত না হলে কোন পুরুষ ছেড়ে যায়? তোদের বড় ছোট দুই বোনই রেণ্ডী। তোর বোনকে কেন ও ছেড়ে গেল? তোরা ভালো বলে কি আর পুরুষগুলো ছেড়ে চলে যায়?”
    “বোনের কথা বলবি না। তোর খায় না পরে?”
    “ওকে ওর মরদ ছেড়ে গেছে। তোর মরদ বাড়ি ফিরেছে।” তার গলা সামান্য মোলায়েম হয়েছে।
    “ইহ! মরদ হতে এসেছে! লাগবে না এমন মরদ আমার! আমি তোকে ঘরে তুলব না বলেছি, তুলব না।”
     “তোর সব ধ্বংস হবে। ছেলেকে পুলিশে নিয়ে গেছে। রেণ্ডীর মেয়ে রেণ্ডী হবে। তোর আবার ফুটানি...।”
     “তুই এখান থেকে চলে যা বললাম। তোর মাগিকে কথাগুলো শোনা গিয়ে যা। আমি মরি, আমার ছেলে মরে, তোর কী? আমি তোকে ঘরে তুলব না।”
    এবারে সে লাকড়ি দিয়ে মীরার মাকে মারতে গেল।
    “আমাকে মেরে ফেলছে রে!” বলে চিৎকার দিয়ে মীরার মা জটলা পাকানো মেয়েদের দিকে দৌড় দিল। চিৎকার শুনে জোনের মা, মণির মায়েরা সবাই এমনিতেই এগিয়ে আসছিল। মীরার মা গিয়ে মণির মাকে জড়িয়ে ধরল। “আমাকে বাঁচা, এর হাত থেকে বাঁচা!” ওর কুনুই থেকে বেরুনো রক্তে কাপড়ে দাগ লেগে গেছে। “ ও মেয়েছেলে রেখেছে। আমি কিছু বলিনি। মেয়েছেলের সঙ্গে একই বিছানাতে আমাকে শুতে দিয়েছে । আমি কিছু বলিনি। একটা কানাকড়িও ও আমাকে দেয় নি। আমি যা পারি রোজগার করে খেয়েছি। তোরাই বল, এখন ও এলো বলেই কি আমি ঘরে তুলব?” মীরা এসে মাকে জড়িয়ে ধরল, “মা, হাতে ব্যথা পেলি কিসে? এতো রক্ত বেরুচ্ছে!”
    হাতের লাকড়িটা ফেলে দেয় নি লোকটা।
    মীরার মাকে জোনের মায়েরা ঘিরে ফেলেছে। মণির মাকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
    লাকড়িটা উপরে তুলে নাচাতে নাচাতে একবার এগিয়েও পিছিয়ে গেল লোকটা, “আমার বিয়ে করা বৌ, আমি যাই করি। অন্যের কী?”
     “বিয়ে করা বৌ! এতো বছর ধরে তুই একে খাইয়েছিলি না পরতে দিয়েছিলি?”
     “তোর বেমার হলো বলে গুয়াহাটিটি আরেক পুরুষ ধরেছে। এখন বাড়ির কথা মনে পড়ল?”
     “বিয়ে করা বৌকে মারতে এসেছিস?”
    “বাড়ি ঘর দেখে এলি?”
    “রোজগার দেখে এলি?”
     সব্বাই মিলে ওকে চেপে ধরল। মীরার মা মণির মাকে জড়িয়ে ধরেই আছে।
    “ বল মীরার মা, ওকে ঘরে তুলবি?”
    “তুলব না। এমন মরদ আমার লাগবে না।”
    “শুনলিতো? যাগে তুই! যেভাবে এসেছিলি সেভাবেই যাগে!”
    পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে সবাই একটু চমকে গেলো।
     “চল আমার ঘরে চল।”
  
     
  পিঁপড়ে দলের মতো একের পেছনে আর জন কালীমায়ের থান পেরিয়ে একবার একবার প্রণাম করে মণির মায়ের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বাইরে পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল।
    “ভয় করবি না। আমরা এতো জন আছি। কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।” কী যেন একটা ছিল ফেলানির কণ্ঠে। সবাই মাথা তুলে তাকালো।
     “ কেমন কেটেছে দেখ তো মীরার মায়ের হাতটা।”
     “এগুলোই লাগিয়ে দিই, এখানেই বেঁটে দিয়ে দি।” হাতের তালুতে টিপে রাখা কিছু গন্ধ বেরুনো জংলি পাতা মেলে দেখালো মীরা।
     মিনতি বিছানার নিচে থেকে পাটা বের করে মীরার হাত থেকে পাতাগুলো নিয়ে থ্যাঁতলাতে শুরু করল।
    বাইরে মীরার বাবার গালি গালাজ দুই একটা শোনা যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে গালির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
    এবারে একেসঙ্গে অনেকগুলো গাড়ির গোঁ গোঁ শব্দ। গাড়িগুলোর শব্দও মিলিয়ে গেল।
    পুরো ঘরে এখন ওই থ্যাঁতলানো গন্ধপাতার কড়া গন্ধ। কে যেন মীরার মায়ের শরীরে পাতার রস লাগিয়ে দিল।
    “উফ! উফ! ধরছে তো!”
    “ সামান্য না ধরলে রক্ত বন্ধ হবে কী করে? ঘা হয়ে যাবে যে নইলে?”
    মণির মায়ের কথাতে সবার মুখে সামান্য হাসি দেখা দিল।

0 মন্তব্য(সমূহ):

ফেলানিঃ আধুনিক অসমিয়া উপন্যাস

বাছাই পোষ্ট

অধ্যায় এক (১)

ফেলানি ( 'ব্যতিক্রম' মাসিক কাগজে ধারাবাহিক বেরুতে শুরু করল 'ফেলানি' জুন , ২০১৪ থেকে। )        ফে রিখানা ব্...

ই-মেইলে গ্রাহক হোন

Enter your email address:

Delivered by FeedBurner

আমাকে চিঠি লিখুন

ভারতীয় ব্লগার দল

যারা পড়তে আসেন

ফেসবুকের সঙ্গীরা এ পথে জুড়তে পারেন

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন?

এই বিশাল ধরিত্রীর কোন বিন্দু থেকে কে এলেন? ০২

যারা নিয়মিত ফেলানি পড়েন

যে ক'জন এখানে এলেন

কে কী বললেন

আমাদের অলঙ্করণ সহযোগী

বাংলা ব্লগের প্রবাহে জুড়ুন !

কালের পদধ্বনি

ক' ফোটা স্বচ্ছ জলের সন্ধানে

Powered by Blogger.

ফেলানি

I heart FeedBurner

Blog Archive

কেমন লাগল বলুন !

এখানে আমার অনুবাদ দেখুন

এই ব্লগ সম্পর্কে

ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট অরূপা পটঙ্গীয়া কলিতা আধুনিক অসমিয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নামপাঠক-সমালোচক মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত এই লেখক ইতিমধ্যে বেশ কিছু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেনসেগুলো মধ্যে আছে ১৯৯৩তে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য সেতুনামের লিটিল ম্যাগাজিনের থেকে শৈলেশ চন্দ্র দাস গুপ্ত সাহিত্য সেতু পুরস্কার, ১৯৯৫তে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮তে দিল্লির কথানামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দেয়া কথা পুরস্কার১৯৯৫তে অসম সাহিত্য সভার দেয়া বাসন্তী বরদলৈ স্মৃতি পুরস্কারদিতে চেয়েছিলকিন্তু তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে সাহিত্য কর্মে তিনি লেখকের লিঙ্গভেদ মানেন না

১৯৯৪তে প্রকাশিত তাঁর অয়নান্তনামের উপন্যাসটি অসমিয়া উপন্যাসের প্রথম শ্রেণির গুটি কয় উপন্যাসের মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকেঅয়নান্তের নবছর পর তিনি লেখেন এই বিখ্যাত উপন্যাস ফেলানি২০০৩এ প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি গেল কয়েক দশকের জাতি-দাঙ্গাতে অভিশপ্ত ও অশান্ত অসমজাতি-দাঙ্গা ও উগ্রপন্থার শিকার দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের এক মর্মস্পর্শী উপন্যাস এটিফেলানির চরিত্রগুলোর অবস্থান সমাজের প্রান্তে , কেন্দ্রে নয়সমাজ যে মানুষগুলোকে দূরে নিক্ষেপ করছে তাদের প্রতীকআবার সমাজের কেন্দ্রকে উপেক্ষা করে প্রান্তীয়তাতেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করবার যে প্রক্রিয়া তার ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ এক সত্তার নামও ফেলানিমৃত্যু যেমন সহজ তেমনি জীবনের প্রতি সুতীব্র ভালোবাসাও মৃত্যুর বিপরীতে উপস্থাপিতজাতি-ধর্ম নয়, সুবিশাল মানবতার পরিচয়েই ফেলানির পরিচয়ফেলানির পৃথিবীতে অজস্র চরিত্র আর বিচিত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে নিষ্করুণ সমাজ সত্য এবং বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পাঠক যাত্রা করবেন সামাজিক উপলব্ধির অন্য এক সীমান্তের দিকে

টংলা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক অরূপা দামলনামের সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক অব্যবসায়িক সাময়িকীর সম্পাদনা সহযোগীতাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলঃ মৃগনাভি ( ১৯৮৭), মেপল হাবির রং ( ১৯৮৯), মরুযাত্রা আরু অন্যান্য ( ১৯৯২), অয়নান্ত ( ১৯৯৪), মরুভূমিত মেনকা আরু অন্যান্য (১৯৯৫), কাঁইটত কেতেকী (১৯৯৯), পাছ চোতালর কথকতা (২০০০) , অরুণিমার স্বদেশ (২০০০), মিলিনিয়ামর সপোন (২০০২)


অনেকদিন ধরে আমার স্বপ্ন ছিল এই শিরদাড়া খাড়া করা উপন্যাসখানি বাংলাতে অনুবাদ করবার। এবারে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো


আমাকে নিয়ে

My photo
Tinsukia, Assam, India